২০২৬ সালের ২৮ মে, বৃহস্পতিবার, পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বিকেলে রাজধানী ঢাকার রামপুরা ব্রিজের ওপর ছাট মাংসের একটি ছোট অস্থায়ী বাজার জমে ওঠে। কোরবানির পশুর মাংস যখন অনেকের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, তখন যাঁরা কোরবানি দিতে পারেননি, নিম্ন আয়ের সেই মানুষদের একাংশের কাছে কম দামে মাংস কেনার ভরসা হয়ে ওঠে এই বাজার। রিকশাচালক, দিনমজুর ও পোশাকশ্রমিকেরা সেখানে দরদাম করে আধা কেজি থেকে কয়েক কেজি পর্যন্ত মাংস কেনেন। জাগো নিউজ ২৪ সেদিন বিকেলে সরেজমিনে বাজারটির খবর প্রকাশ করে।
রামপুরা ব্রিজে ঈদের বিকেলের বাজার
সেদিন বিকেলে দেখা যায়, ব্রিজের ওপর প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ছাট মাংস বিক্রি করছেন। কোথাও হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকা মাংস, কোথাও মাথার অংশ, আবার কোথাও চর্বিযুক্ত ও তুলনামূলক ভালো মানের মাংস ছোট ছোট ভাগে সাজানো ছিল। ক্রেতারা দরদাম করে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আধা কেজি, এক কেজি বা তার বেশি মাংস কিনছিলেন।
ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি ছাট মাংসের দাম চাইছিলেন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে ক্রেতাদের অনুরোধ ও দরদামের পর কিছুটা কম দামেও মাংস বিক্রি হচ্ছিল। বিক্রেতারা জানান, কোরবানির পর বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা এসব মাংস পরিষ্কার করে তাঁরা বিক্রি করছেন।
বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মাংসের বেশির ভাগই এনেছেন কসাইরা। বিভিন্ন জায়গায় কোরবানির গরু কাটার সময় কসাইরা ছাট হিসেবে যে মাংস জমিয়েছেন, সেটাই ব্রিজে এনে বিক্রি করা হচ্ছিল। ছাট মাংসের মধ্যে কিছু ভালো মাংসও থাকে; সব একসঙ্গে কেটে মিশিয়ে ভাগ করে বিক্রি করা হচ্ছিল।
রামপুরা এলাকা
রামপুরা ঢাকার পূর্ব অংশের একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। রামপুরা থানা ২০০৯ সালে গঠিত হয় এবং এটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং বনশ্রী আবাসিক এলাকার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। থানার আয়তন প্রায় ২ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে ৪১ হাজার ৩০৮টি খানায় ১ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন মানুষ বাস করেন।
রামপুরার উত্তরে গুলশান ও বাড্ডা থানা এবং পশ্চিমে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা। ১৯৭৫ সালে নির্মিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের সদর দপ্তর রামপুরায় অবস্থিত। এলাকার রামপুরা খাল পূর্ব ঢাকার পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ, আর ডিআইটি রোড এলাকাটিকে আশপাশের থানাগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ক্রেতারা যা বললেন
রিকশাচালক মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘গরুর মাংসের দাম অনেক বেশি। পুরো ভালো মাংস কেনার সামর্থ্য নেই। তাই এখানে এসে দুই কেজি মাংস কিনলাম। বাচ্চারা ঈদের দিনে একটু মাংস খেতে পারবে, এটাই শান্তি।’ তিনি জানান, বিক্রেতারা প্রতি কেজি মাংসের দাম ৪০০ টাকা বলছিলেন। দরদাম করে তিনি দুই কেজি মাংস ৫৫০ টাকায় কিনেছেন।
আরেক রিকশাচালক মো. আলম জানান, পরিবার নিয়ে তিনি চার বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। তাঁর কথায়, ‘যে আয় করি, তা দিয়ে কোরবানি দেওয়া সম্ভব না। আবার বাজারে মাংসের যে দাম, তাতে আমাদের পক্ষে কেনাও কষ্টকর। তাই এখানে মাংস কিনতে এসেছি। বাজারে এক কেজি মাংস যে দামে বিক্রি হয়, এখান থেকে সেই টাকা দিয়ে তিন-চার কেজি মাংস কেনা যায়।’
মো. আলম জানান, আগের বছর তিনি প্রথম এখান থেকে মাংস কিনেছিলেন এবং তখন ভালো মাংস পেয়েছিলেন। সে কারণে এবারও এসেছেন। তাঁর মতে, বেছে কিনতে পারলে এখানে ভালো মাংস পাওয়া যায়। তবে এবার বিক্রেতারা দাম বেশি চাইছেন; অবশ্য দরদাম করলে কিছুটা কম দামে কেনা যাচ্ছে।
ছোট মেয়েকে নিয়ে মাংস কিনতে আসা পোশাকশ্রমিক আলেয়া বেগম বলেন, ‘ঈদের দিনে সবাই ভালো মাংস খায়। কিন্তু আমাদের মতো মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব না। বাজার থেকে এক কেজি ভালো মাংস কিনতে গেলে ৮০০ টাকার ওপরে লাগে। এত দাম দিয়ে তো মাংস কেনা সম্ভব না। তাই এখানে এসেছি কম দামে মাংস কেনার জন্য।’ তিনি জানান, দুই কেজি মাংস ৬০০ টাকায় কিনেছেন, যা দিয়ে পরিবারের কয়েক দিন চলবে।
আলেয়া বেগম আরও বলেন, তাঁদের পক্ষে কোরবানি দেওয়া সম্ভব নয়, আবার যাঁরা কোরবানি দেন তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চেয়ে আনাও সম্ভব নয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, ঢাকায় যাঁরা কোরবানি দেন তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুব কমই মাংস বিলান; বেশির ভাগ মানুষ বাড়ির সামনে যাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁদের মাংস দেন। সেটা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে যতটুকু পারেন, ছাট মাংস কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
বিক্রেতাদের কথা: কসাইয়ের ছাট থেকে ছোট ভাগ
বিক্রেতা আরিফুল জানান, ঈদের দিন তিনি চারটি গরু কাটার কাজ পেয়েছিলেন। সেই গরুগুলোর কিছু ছাট মাংস ও ভালো মাংস এনে তিনি ব্রিজে বিক্রি করছিলেন। যাঁদের গরু কাটার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তাঁরা তাঁকে কিছু ভালো মাংসও দিয়েছেন। সব একসঙ্গে কেটে তিনি বিক্রি করছিলেন। তাঁর কাছ থেকে মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ, দিনমজুর ও রিকশাচালকেরাই মাংস কিনছিলেন।
আরিফুলের কথায়, ‘সবাই একসাথে ভালো মাংস নিতে পারে না। তাই আমরা ভালো ও ছাট মাংস মিশিয়ে বিক্রি করছি। ছাট হলেও এগুলোও ভালো মাংস।’ তিনি জানান, তাঁর কাছ থেকে কেউ আধা কেজি, কেউ এক কেজি, আবার কেউ তিন-চার কেজি করেও কিনছেন।
আরেক বিক্রেতা মো. কালাম বলেন, ‘আমাদের মাংসের মধ্যে শুধু ছাট নয়, মাথার মাংস, চর্বি এবং কিছু ভালো অংশও আছে। যার যতটুকু সামর্থ্য, সে ততটুকুই নিচ্ছে।’ তিনি জানান, নিজে দুটি গরু কাটার কাজ করেছেন এবং সেই গরুর মাংসের অংশ এখানে এনেছেন। এ ছাড়া আরও দুজনের কাছ থেকে কিছু মাংস কিনেছেন। সব একসঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করছিলেন তিনি।
ঈদের মৌসুমে কসাইয়ের কাজ
রামপুরা ব্রিজের বিক্রেতাদের বড় অংশই ঈদের দিন কোরবানির গরু কাটার কাজ করেছেন। ঈদের পাঁচ দিন আগে, ২৩ মে, প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে ঢাকার কারওয়ান বাজারের ৪২ বছর বয়সী কসাই মো. আমজাদের কাজের ধরন তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছর ঈদে তিনি ১৪টি গরু কেটেছিলেন; এ বছর অন্তত ১০টি গরু কাটার কাজ নিচ্ছিলেন। শরীরের ক্লান্তির কথা ভেবেই তিনি কাজের সংখ্যা কমাচ্ছিলেন।
একই প্রতিবেদনে কোরবানির গরু কাটার পারিশ্রমিকের হিসাবও উঠে আসে। মো. আমজাদ জানান, ঈদের সকালে গরুর দামের প্রতি হাজার টাকায় ২০০ টাকা পারিশ্রমিক নেওয়া হয়, আর দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতি হাজারে ১০০ টাকায় নেমে আসে। তাঁর ব্যাখ্যা, সকালে সবাই তাড়াহুড়া করেন, তাই দক্ষ কসাইয়ের চাহিদা তখন বেশি থাকে। তাঁর দলে ছয়জন কাজ করেন: তিনজন দক্ষ কর্মী জবাই, চামড়া ছাড়ানো ও প্রাথমিক কাটার কাজ করেন, আর তিনজন সহকারী মাংস ভাগ করা ও পরিষ্কারের কাজ করেন। সাত-আট বছর বয়সে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে ঢাকায় এসে তিনি কারওয়ান বাজারে চাচার কাছে এই কাজ শেখেন।
কোরবানির আগে, ৩ মে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, কোরবানির চামড়ার সাশ্রয়ী ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাই এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে চামড়া নষ্ট না হয়। ঈদের দিন ঢাকায় পেশাদার কসাইয়ের পাশাপাশি বহু মৌসুমি কসাইও পশু কাটার কাজ করেন; রামপুরা ব্রিজের বিক্রেতাদের কথায় দেখা যায়, এই কাজ থেকেই ছাট মাংসের একটি অংশ খুচরা বাজারে আসে।

ঈদুল আজহা ও কোরবানির মাংস বণ্টনের রীতি
২০২৬ সালের ১৮ মে, সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা হয়। সভা শেষে জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, তাই ১০ জিলহজ হিসেবে ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঈদুল আজহা হজরত ইব্রাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের স্মরণে পালিত হয়, এবং পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে মুসলিমরা নিজের ভেতরের লোভ ও স্বার্থপরতা ত্যাগের শিক্ষা নেন।
কোরবানির মাংস কীভাবে ভাগ করা হয়, সে বিষয়ে ঈদের আগের দিন, ২৭ মে, প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগে প্রকাশিত এক লেখায় বলা হয়, মুস্তাহাব পদ্ধতি হলো পুরো মাংস সমান তিন ভাগে ভাগ করা: এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। একই লেখায় বলা হয়, কয়েকজন মিলে ভাগে কোরবানি দিলে মাংস ওজন করে ভাগ করতে হয়; অনুমান বা চোখের আন্দাজে ভাগ করা জায়েজ নয়। তবে মাথা, পা, কলিজার মতো অন্যান্য অংশ সংখ্যা বা আন্দাজে ভাগ করা যায়।
এই রীতির কারণেই ঈদের দিন শহরের বিভিন্ন বাড়ির সামনে মাংস নিতে আসা মানুষের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু রামপুরা ব্রিজে আসা ক্রেতাদের কথায় উঠে আসে, যাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চাইতে পারেন না বা চান না, তাঁদের একটি অংশ সামর্থ্য অনুযায়ী কিনে নেওয়ার পথ বেছে নেন।
এ বছর কোরবানির পশু ও হাটের হিসাব
ঈদের প্রায় চার সপ্তাহ আগে, ২০২৬ সালের ৩ মে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনে কোরবানির পশুর হিসাব তুলে ধরে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে সে বছর কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, আর দেশে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চাহিদা মেটানোর পর প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে মন্ত্রণালয় আশা করছিল।
প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ৫ হাজার ৬৫৫টি। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, এবং ঈদের পর উদ্বৃত্ত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার।
একই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সারা দেশে তিন হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি, মোট ২৭টি হাট নির্ধারণ করা হয়। এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে বলে জানানো হয়। অনলাইনে কোনো ফি বা কর ছাড়াই পশু বেচাকেনার সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়।

গরুর মাংসের দাম ও কমে আসা কোরবানি
রামপুরা ব্রিজের ক্রেতারা বারবার মাংসের উচ্চ দামের কথা বলেছেন। ঈদের দিন সকালে, ২৮ মে, প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ঢাকার বাজারে তখন এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৪ সালে গরুর মাংসের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা। খাসির মাংসের দাম তখন কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, যা এক বছর আগের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি।
একই প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমছে। ২০১৯ সালে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ পশু। করোনার বছর ২০২০ সালে তা আগের বছরের চেয়ে ১১ লাখ ৬৪ হাজার কমে যায়। ২০২৩ সালে কোরবানি হয় প্রায় ১ কোটি ৪২ হাজার পশু, আর ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৯১ লাখ ৩৬ হাজারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের এপ্রিলে ভারত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে গরু ঢোকা পুরোপুরি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়, এরপর থেকে দেশে গরুর দাম ক্রমাগত বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার এক কৃষক পরিবারের উদাহরণ দেওয়া হয়, যারা আগে প্রতিবছর কোরবানি দিত, কিন্তু তিন বছর ধরে দিতে পারছে না; ভাগে এক ভাগ কোরবানি দিতেও তখন হাজার বিশেক টাকা লাগত। বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়, ২০২০ সালের করোনা, ২০২২ সাল ও পরবর্তী সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির মন্দা মানুষকে আর্থিক চাপে ফেলেছে; আগে যাঁরা একটি পশু কোরবানি দিতেন, তাঁদের অনেকে এখন ভাগে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পশু কোরবানি দেওয়ার সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে।’ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ শাহজামান খানও একই প্রতিবেদনে বলেন, ‘মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে।’ রামপুরা ব্রিজে আলেয়া বেগম যে বাজারদর বলেছেন, এক কেজি ভালো মাংস ৮০০ টাকার ওপরে, তা টিসিবির এই দামের সীমার সঙ্গেই মেলে।
দেশে মাংসের উৎপাদন ও চাহিদা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৩-২০২৪)’ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদন হয় ৯২ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে মাথাপিছু দৈনিক ১২০ গ্রাম ধরে মাংসের চাহিদা ছিল ৭৬ দশমিক ২১ লাখ মেট্রিক টন। একই হিসাবে মাথাপিছু মাংসের প্রাপ্যতা ছিল দৈনিক ১৪৩ দশমিক ৭৭ গ্রাম। এই হিসাবের ভিত্তি ছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দেশের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৮ লাখ।
একই প্রকাশনায় দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০ দশমিক ১৩ লাখ, মহিষ ১৫ দশমিক ২৪ লাখ, ছাগল ২৭১ দশমিক ১৭ লাখ এবং ভেড়া ৩৯ দশমিক ০৩ লাখ। স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১ দশমিক ৮০ শতাংশ, আর কৃষি জিডিপিতে এর হিস্যা ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। প্রকাশনাটিতে বলা হয়, দেশের ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ মানুষ আংশিকভাবে এই খাতে কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল।
জাতীয় হিসাবে মাংসের প্রাপ্যতা একটি গড় সংখ্যা; এটি বলে না, কোন পরিবার কতটা মাংস কিনতে পারে। রামপুরা ব্রিজের ক্রেতাদের কথায় সেই পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়: দেশে উৎপাদন চাহিদার হিসাবের চেয়ে বেশি হলেও বাজারদরের কারণে তাঁরা ভালো মাংস কিনতে পারেন না বলে জানিয়েছেন।
আগের বছরগুলোতে ঢাকার অস্থায়ী মাংসের বাজার
ঈদুল আজহার দিন ঢাকায় এ ধরনের অস্থায়ী মাংসের বাজার নতুন নয়। ২০১৯ সালের ১৩ আগস্ট প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেবার ঈদে মালিবাগ রেলক্রসিংয়ের মতো রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, নতুন বাজার ও মগবাজারেও অস্থায়ী গরুর মাংসের বাজার বসেছিল। সেখানে বিক্রেতাদের মধ্যে ছিলেন বাড়ি বাড়ি ঘুরে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করা দরিদ্র পরিবার, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কসাইদের সহকারীরা। সেই প্রতিবেদনে বিক্রেতাদের কেজিপ্রতি ২০০, ৩০০ ও ৫০০ টাকায় মাংস বিক্রির কথা উঠে আসে। একজন ক্রেতা জানান, তিনি পরিবারের জন্য ২ হাজার টাকায় ৫ কেজি মাংস কিনেছেন।
২০২৩ সালের ২৯ জুন, ঈদুল আজহার দিন বিকেলে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা মোহাম্মদপুরে শিয়া মসজিদের সামনে এমন একটি বাজারের খবর দেয়। সেখানে কোরবানিদাতাদের বিলি করা যে মাংস নিম্ন আয়ের মানুষ সংগ্রহ করেন, তাঁদের অনেকে আর্থিক প্রয়োজনে, অনেকে আবার সংরক্ষণের জায়গার অভাবে খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাড় ও মাথার মাংস মেশানো নিম্নমানের মাংস কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা, কিছুটা ভালো মাংস ৫০০ টাকা এবং একদম ফ্রেশ মাংস ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল।
২০২৫ সালের ৭ জুন জাগো নিউজের ইংরেজি সংস্করণে মালিবাগ রেলক্রসিং ও মগবাজারের ওয়্যারলেস রেলক্রসিংয়ের এমন বাজারের বিবরণ ছাপা হয়। সেখানে মান অনুযায়ী গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়, আর মাথার মাংস, হাড় ও মেশানো অংশ ৫০০ থেকে ৫২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্রেতাদের অনেকে নিজেরাই দরিদ্র বা পশু কাটার কাজে সহায়তা করেন; কাটার কাজে হাত লাগিয়ে পাওয়া মাংস বিক্রি করেই তাঁরা চলেন বলে একজন নারী বিক্রেতা জানান। রামপুরা ব্রিজের ২০২৬ সালের বাজারেও বিক্রেতারা মূলত কসাইয়ের কাজ থেকে পাওয়া ছাট ও ভালো মাংস মিশিয়ে বিক্রি করছিলেন।
কেনা মাংস নিরাপদে রাখা ও রান্না
ঈদের সময় খোলা জায়গায় বিক্রি হওয়া মাংস কিনে অনেক পরিবার কয়েক দিন ধরে খান, যেমনটা আলেয়া বেগম বলেছেন। কাঁচা গরুর মাংস নিরাপদে রাখার বিষয়ে মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সেবা (ইউএসডিএ এফএসআইএস) যে নির্দেশনা দেয়, তার মূল কথাগুলো হলো:
- কেনার পর মাংস দ্রুত বাড়িতে নিয়ে ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বা তার কম তাপমাত্রায় রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে।
- রেফ্রিজারেটরে রাখা কাঁচা গরুর মাংস ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে রান্না করতে হবে; কিমা এবং কলিজা, কিডনি, ভুঁড়ি ও জিভের মতো অংশ ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে।
- বেশি দিন রাখতে চাইলে মাইনাস ১৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) জমিয়ে রাখতে হবে; টানা হিমায়িত থাকলে মাংস নিরাপদ থাকে।
- গরুর মাংসের বড় টুকরা ভেতরের তাপমাত্রা অন্তত ৬২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) না হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে এবং নামানোর পর অন্তত তিন মিনিট রেখে দিতে হবে; কিমা ও কলিজা-হৃৎপিণ্ডের মতো অংশ ৭১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত।
- রান্না করা মাংস দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে রাখা যাবে না; বাতাসের তাপমাত্রা ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি হলে এক ঘণ্টার বেশি নয়। ফ্রিজে রাখা রান্না করা মাংস ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেতে হবে।
ইউএসডিএ এফএসআইএস আরও বলে, গরুর মাংস দ্রুত পচনশীল, তাই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঠেকাতে বিক্রির পুরো সময় এটি ঠান্ডা রাখা হয়।
ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, দেশ রূপান্তর, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সেবা (ইউএসডিএ এফএসআইএস), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)