সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

টিউশনির জমানো টাকায় গড়া বরিশালের ফলবাগানে ৮০টির বেশি জাতের আম

করোনাকালে টিউশনি করে জমানো টাকায় বাড়ির পাশে ছোট একটি ফলবাগান শুরু করেছিলেন বরিশাল সদরের সৈকত রায়হান সাকিন। ২০২৬ সালের মে মাসে সেটি ৮০টির বেশি জাতের আমসহ এক একরের নার্সারি ও মিশ্র ফলবাগান; সাকিন জাগো নিউজকে জানান, এ থেকে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় সম্ভব।

টিউশনির জমানো টাকায় গড়া বরিশালের ফলবাগানে ৮০টির বেশি জাতের আম
ফসল

২০২৬ সালের মে মাসে বরিশাল থেকে জাগো নিউজ ২৪ সৈকত রায়হান সাকিন নামের এক তরুণের খবর প্রকাশ করে। বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের তিলক গ্রামের এই তরুণ টিউশনি করে জমানো টাকায় শুরু করা ছোট একটি ফলবাগানকে নিজ বাড়ির এক একর জমিতে নার্সারি ও মিশ্র ফলবাগানে পরিণত করেছেন। ১১ মে ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৮০টিরও বেশি জাতের আম এবং প্রায় ৭০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা রয়েছে। সাকিন জাগো নিউজকে বলেন, পরিকল্পিতভাবে ফলচাষ করলে বছরে সহজেই ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব; প্রতিবেদনেও বাগান থেকে তার বছরে আয় প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে উদ্যোগটিকে এলাকায় অনুপ্রেরণার প্রতীক বলা হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি সাকিন কাজটি শুরু করেছিলেন। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এটি তার নিজের আয়ের উৎস তো বটেই, তার বিক্রি করা চারা ও দেওয়া পরামর্শের মাধ্যমে বরিশালে আরও কয়েকটি বাগান গড়ে ওঠারও সূচনা হয়ে উঠেছিল।

করোনাকালে শুরু হওয়া একটি বাগান


প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাকালে যখন অনেক তরুণ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তখন সাকিন ভিন্ন পথ বেছে নেন। টিউশনি করে জমানো অল্প কিছু টাকা আর ফলচাষের প্রতি প্রবল আগ্রহকে পুঁজি করে তিনি বাড়ির পাশে ছোট একটি ফলবাগান শুরু করেন। সাকিন জাগো নিউজকে বলেন, 'করোনার সময়ে টিউশনির টাকা দিয়ে শখের বসে ছোট্ট একটি বাগান শুরু করি। ধীরে ধীরে সেটিকে বড় করেছি।'

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০২০ সালের মার্চে। দেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম তিনজন রোগী শনাক্তের কথা জানায়। ২২ মার্চ সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি বা শাটডাউন ঘোষণা করে, যা পরে ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

ছোটবেলায় সাকিন বাবাকে হারান। এরপর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার মায়ের কাঁধে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই কঠিন সময়ে মায়ের সাহস, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতাই সাকিনের এগিয়ে যাওয়ার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পুরো পথে তার পাশে রয়েছেন মা ও ছোট ভাই সিহাব হাসান সান্নিন।

সাকিন ২০২৩ সালে বরিশালের বিএম কলেজ থেকে মার্কেটিং বিষয়ে এমবিএ সম্পন্ন করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি নিজ বাড়ির এক একর জমিতে নার্সারি ও মিশ্র ফলবাগান গড়ে তোলেন।

৮০টির বেশি জাতের আম


সাকিনের সংগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে আম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, 'আমের প্রতি আমার আলাদা ভালোবাসা আছে।' বাগানে ঢুকলেই প্রতিবেদক দেখেন নানা জাতের আমগাছের সমাহার; বিভিন্ন রং, আকার ও স্বাদের আম। কোনোটি লম্বাটে, কোনোটি গোল বা চ্যাপ্টা, কোনোটি লালচে, কোনোটি সবুজ, আবার কিছু গাছে ঝুলছে হলুদাভ আম। পরিদর্শনের সময় প্রায় প্রতিটি গাছেই ফল এসেছিল।

প্রতিবেদনের তালিকা অনুযায়ী তার সংগ্রহে থাকা বিদেশি ও উচ্চমূল্যের জাতগুলো হলো:

  • বানানা ম্যাঙ্গো
  • চাকাপাত
  • সূর্যডিম
  • অস্টিন
  • বারি-৪ (বারি আম-৪)
  • ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড
  • আমেরিকান পালমার
  • অ্যাম্বিশ
  • পুসা সুরিয়া
  • অরুণিমা

দেশীয় জনপ্রিয় জাতের মধ্যে রয়েছে:

  • হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি ও আম্রপালি
  • গোপালভোগ, খিরসাপাত, আশ্বিনা ও মল্লিকা
  • কাটিমন, হাড়িভাঙ্গা, রানিপছন্দ ও মোহনভোগ
  • দিলপসন্দ, কোহিতুর, সুরমা ফজলি ও বোম্বাই

এই আমগুলোর কয়েকটির উৎস ও বৈশিষ্ট্য


সাকিনের তালিকার কয়েকটি নাম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত উন্নত জাত। বারি আম-৪ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইবাউব জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, জাতটি দেশি আশ্বিনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি জাত এম৩৮৯৬-এর সংকরায়ণে পাওয়া। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এর শাঁস আঁশযুক্ত, পাকা আমের খোসা ও শাঁস দুটোই হলুদ, ফলের ওজন প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ গ্রাম এবং জাতটি সারা দেশে চাষ করা যায়। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে এ আম বাজারে আসে এবং আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া যায়। লেখকেরা লিখেছেন, জাতটি জনপ্রিয় হতে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর লেগেছে।

একই গবেষণাপত্রে বলা হয়, বারি আম-৩ স্থানীয়ভাবে আম্রপালি নামে পরিচিত। গাছ খাটো, প্রতি বছর ফল দেয়, থোকায় থোকায় ছোট আকারের আম ধরে, শাঁস গাঢ় কমলা-লাল এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক জাতের তুলনায় এতে প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন থাকে। ১৫ জুন থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ আম বাজারে পাওয়া যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার চাষিদের ওপর জরিপ চালিয়ে লেখকেরা দেখেন, জেলায় আম্রপালি ও বারি-৪ প্রধান দুটি হাইব্রিড জাত এবং জরিপে অংশ নেওয়া চাষিদের ৭৮.৪৬ শতাংশ দুটি জাতই চাষ করেন। স্বাদ, ঘ্রাণ, ফলন ও জলাবদ্ধতা সহ্য করার ক্ষমতার জন্য চাষিরা আম্রপালিকে বেশি পছন্দ করেন, তবে এতে পোকামাকড় ও রোগের সমস্যার কথাও বেশি চাষি জানিয়েছেন।

আম্রপালি ও মল্লিকা নামের উৎস ভারতে। ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের (আইসিএআর) সাময়িকী ইন্ডিয়ান হর্টিকালচারে ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, নয়াদিল্লির ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইএআরআই) গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে উদ্ভাবিত মল্লিকা ও আম্রপালি দিয়েই হাইব্রিড আমের বড় পরিসরে চাষ শুরু হয়। নিবন্ধ অনুযায়ী, মল্লিকা নিলম ও দশেরির সংকর এবং আম্রপালি দশেরি ও নিলমের সংকর। আম্রপালি নিয়মিত ফল দেওয়া এবং আর্দ্র এলাকায়, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশার উপকূলীয় অঞ্চলে ভালো ফলনের জন্য পরিচিত এবং বসতবাড়ির বাগানে জনপ্রিয় জাত হয়ে উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠান আম্রপালি ও সেনসেশনের সংকরায়ণে পুসা অরুণিমা উদ্ভাবন করেছে।

২০২০ সালের মার্চে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত আইসিএআর-আইএআরআইয়ের এক গবেষণায় দিল্লির আবহাওয়ায় জন্মানো ১২টি হাইব্রিড ও জাতের আম সংরক্ষণের মান তুলনা করা হয়। তাতে পুসা অরুণিমা সবচেয়ে বেশি দিন, ১২ দিন ভালো ছিল; এতে ক্যারোটিনের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ, প্রতি ১০০ গ্রামে ৭.৪৭ মিলিগ্রাম, এবং স্বাদ পরীক্ষায় সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতার নম্বরও ছিল সবচেয়ে বেশি। সংরক্ষণের সময় যে জাতগুলোর ওজন ১০ শতাংশের কম কমেছে, পুসা সুরিয়া সেগুলোর একটি।

পালমার ও ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার নাবি জাত। ১৯২৫ সালের দিকে মায়ামিতে লাগানো একটি আঁটি থেকে পালমারের গাছ জন্মায় এবং ১৯৪৯ সালে জাতটির নাম দেওয়া হয়। এর বড় আকারের আম পাকলে লালচে আভাসহ হলুদ হয় এবং ফ্লোরিডায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত পাকে। ভ্যালেন্সিয়া প্রাইডের গাছ জন্মায় ১৯৩৭ সালে মায়ামিতে লাগানো হেডেন জাতের একটি আঁটি থেকে, প্রথম ফল ধরে ১৯৪১ সালে। এর লম্বা, সরু আম গাঢ় লাল আভাসহ হলুদ, শাঁস প্রায় আঁশহীন। গাছ খুব দ্রুত বাড়ে; ছাঁটাই না করলে ৫০ ফুটের বেশি উঁচু হতে পারে।

একটি হিমসাগর আম, ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তোলা। ছবি: সলিল কুমার মুখার্জি / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
একটি হিমসাগর আম, ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তোলা। ছবি: সলিল কুমার মুখার্জি / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দেশি জাতগুলোর মধ্যে হিমসাগরের শাঁস আঁশহীন, রং হলুদ থেকে কমলা; একেকটি আমের ওজন ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম এবং মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত বাজারে পাওয়া যায়। তালিকার দুটি জাত বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের নিবন্ধন অনুযায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম জিআই সনদ পায় ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি এবং রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল। বাংলাপিডিয়া দেশের উৎকৃষ্ট জাতের তালিকায় ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, আশ্বিনা, বোম্বাই, কোহিতুর ও মোহনভোগের নাম রেখেছে।

বাংলাদেশের ফজলি আম। ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের ফজলি আম। ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কাঁঠাল, রাম্বুটানসহ নানা ফলের চারা


বাগানটি শুধু আমে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাকিনের কাছে আঠাবিহীন কাঁঠাল, লাল জামরুল, মাল্টা, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, আঙুর, আনার, কমলা ও আপেলসহ প্রায় ৭০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা রয়েছে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে মাত্র তিন ফুট উচ্চতার গাছে ফল ধরা আঠাবিহীন কাঁঠাল।

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বাংলাপিডিয়া জানায়, কাঁঠালগাছ প্রায় যেকোনো মাটিতে জন্মায়, তবে গভীর ও পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থাযুক্ত দোআঁশ মাটি পছন্দ করে; জলাবদ্ধতা সইতে পারে না। ১৯৮৮ সালের বন্যায় বিপুলসংখ্যক কাঁঠালগাছ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মরে যায়, অথচ একই অবস্থায় আমগাছ টিকে ছিল। পরপরাগায়নের কারণে এবং বেশির ভাগ গাছ বীজ থেকে জন্মানোয় কাঁঠালের অসংখ্য স্থানীয় ধরন রয়েছে, আলাদা নামের সুনির্দিষ্ট জাত নেই। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১০ লাখ ২০ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

যেসব নতুন ফলের উৎপাদন বাড়ছে, মাল্টা তার একটি। বিবিএসের একই তথ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাল্টার উৎপাদন দেখানো হয় ১২ হাজার ৯২৯ টন, আগের বছর যা ছিল ১১ হাজার ৬৪ টন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আপেল ও কমলার জন্য বাংলাদেশ এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল; প্রায় সাড়ে আট লাখ টন ফল আমদানিতে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, কিছু এলাকায় আঙুর ছাড়া নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফলের চাষ বাংলাদেশে সাধারণভাবে সফল হয়নি, আর কমলা চাষ হয় কেবল সিলেটের সীমিত এলাকা এবং রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে।

রাম্বুটান (Nephelium lappaceum) সাপিনডেসি পরিবারের একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছ। এর আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বৈচিত্র্যের কেন্দ্র ইন্দোনেশিয়া। মিষ্টি ফলটির খোসা চামড়ার মতো, লোমশ, আর ভেতরে একটি বীজ। অ্যাভোকাডোর (Persea americana) আদি নিবাস আমেরিকা মহাদেশ, মেক্সিকো থেকে পেরু পর্যন্ত; ফলন একই রকম রাখতে প্রায়ই কলমের মাধ্যমে এর চারা তৈরি করা হয়। জামরুলের (Syzygium samarangense) আদি নিবাস বৃহত্তর সুন্দা দ্বীপপুঞ্জ ও মালয় উপদ্বীপসহ একটি অঞ্চল; এখন গ্রীষ্মমণ্ডলের বহু দেশে এর চাষ হয়।

রাম্বুটান ফল, লাল খোসা নরম কাঁটায় ঢাকা। ছবি: Challiyan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
রাম্বুটান ফল, লাল খোসা নরম কাঁটায় ঢাকা। ছবি: Challiyan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

অন্যদের জন্য চারা ও পরামর্শ


নিজের বাগান পরিচালনার পাশাপাশি সাকিন অন্যদেরও ফলচাষে উৎসাহ দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় এরই মধ্যে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় ১০টির বেশি ফলবাগান গড়ে উঠেছে, আর অনেকে তার কাছ থেকে চারা নিয়ে ছাদবাগান করেছেন। সাকিন বলেন, 'এখন বিভিন্ন এলাকার মানুষ আমার কাছ থেকে চারা নিয়ে বাগান করছেন। পরিকল্পিতভাবে ফলচাষ করলে বছরে সহজেই ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।'

তিনি আরও বলেন, 'বরিশালের মাটিতে বিদেশি ফলের চাষ সম্ভব, এটা প্রমাণ করাই আমার লক্ষ্য। সঠিক জাত নির্বাচন, ভালো চারা, নিয়মিত পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে সফল উদ্যোক্তা হতে পারে।' প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে বলা হয়, সাকিনের ফলবাগান এখন শুধু একটি নার্সারি নয়, স্বপ্ন, পরিশ্রম ও ধৈর্যের সমন্বয়ে সফলতার এক জীবন্ত উদাহরণ।

এ ধরনের ফলের নার্সারি বাংলাদেশে তুলনামূলক নতুন। বাংলাপিডিয়া জানায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি বন বিভাগ প্রথম নার্সারি গড়ে তোলে, শুধু বনজ গাছের জন্য; বিশ শতকের মাঝামাঝি উদ্যানফসলের বেসরকারি নার্সারি দেখা দেয়; আর আশির দশকের শুরুতে চারার চাহিদা বাড়ায় নার্সারির কাজ গতি পায়। আম, সফেদা, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, নারকেলসহ নানা ফলগাছের চারা সাধারণত নার্সারিতে তৈরি হয়।

আমের ক্ষেত্রে নার্সারির গুরুত্ব বেশি, কারণ আঁটি থেকে জন্মানো গাছে মাতৃগাছের গুণ বজায় থাকে না। বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেশের উৎকৃষ্ট জাতগুলোর চারা তৈরি হয় কলম ও অন্যান্য অঙ্গজ পদ্ধতিতে; আর আঁটি থেকে জন্মানো গাছ, যাকে দেশি বা গুটি আম বলা হয়, তার স্বীকৃত কোনো জাতের নাম নেই এবং স্বাদেরও নিশ্চয়তা নেই। কলমে কাঙ্ক্ষিত জাতের ডাল বা সায়ন শিকড়যুক্ত আদিজোড় বা রুটস্টকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে দুটি একসঙ্গে বাড়ে। বাংলাদেশে আমে সাধারণত ভিনিয়ার ও ক্লেফট কলম, কাঁঠালে এপিকোটাইল কলম এবং কুল, লেবুজাতীয় ফল ও গোলাপে চোখ কলম ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশে আমের জমি ও উৎপাদন


আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। আমের (Mangifera indica) আদি নিবাস ধরা হয় বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলকে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত পাওয়া যায়; সবচেয়ে পরিচিত বাগানগুলো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে, আর বাকি গাছের বেশির ভাগ বসতবাড়ির আশপাশে লাগানো।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টন এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ লাখ ২ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন। ২০২৫ মৌসুমে ডিএই প্রায় ২৭ লাখ টন উৎপাদন এবং ৫ হাজার টন রপ্তানির লক্ষ্য ঠিক করে। আম রপ্তানি হয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৫৭ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২১ টন। প্রধান উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম উল্লেখ করা হয়। বিবিএস নিজস্ব প্রাক্কলন ব্যবহার করে; ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বিবিএসের তথ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমের উৎপাদন ধরা হয় ১৮ লাখ ৭০ হাজার টন, আগের বছর যা ছিল ১৮ লাখ ৯০ হাজার টন।

বাংলাপিডিয়া জানায়, কলমের আমগাছে রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে এবং প্রায় ৪৫ বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়; আঁটির গাছে ফল আসে দেরিতে, তবে ৬০ বছর বা তারও বেশি সময় ফল দিতে পারে। জানুয়ারি থেকে মার্চে, গাছে মুকুল আসার সময়, কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়ায় ফল ধরা কমে যায়; ঝড়, বিশেষ করে শিলাবৃষ্টিতে কচি আম ঝরে পড়ে। নার্সারি পর্যায় থেকে পূর্ণবয়স্ক গাছ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় তিন ডজন পোকা আমগাছে আক্রমণ করে; এর মধ্যে আছে শোষক পোকা বা হপার, আমের ভোমরা পোকা, কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা ও ফলের মাছি পোকা। অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড ও পাউডারি মিলডিউর মতো ছত্রাকজনিত রোগেও ক্ষতি হয়। দমনের পরামর্শের জন্য চাষিদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

বরিশাল সদর, কাশিপুর ও বিএম কলেজ


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বরিশাল সদর উপজেলার আয়তন ৩২৪.৪০ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১০টি, কাশিপুর তার একটি। কীর্তনখোলা, কালিজিরা, নয়াভাঙ্গা ও তেঁতুলিয়া এ উপজেলার নদী। প্রধান ফসল ধান, গম, পান ও তেলবীজ; প্রধান ফল নারকেল, আম, লিচু, সুপারি, কলা ও আমড়া। কীর্তনখোলার তীরের বরিশাল শহর বরিশাল জেলা ও বিভাগের সদর দপ্তর এবং নদী ও খালের বিস্তৃত জালের জন্য পরিচিত।

এ অঞ্চলে ফল নিয়ে গবেষণার নিজস্ব কেন্দ্রও রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যান গবেষণা পুনর্গঠিত হয়ে জয়দেবপুরে কেন্দ্রীয় স্টেশনসহ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র হয়েছে, যার আঞ্চলিক স্টেশনগুলোর একটি বরিশালের রহমতপুরে। একই বিভাগের পটুয়াখালীতে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যা ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দুমকি কৃষি কলেজ থেকে গড়ে উঠেছে; এর উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ ফলসহ উদ্যানফসল নিয়ে গবেষণা করে।

বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, ২০১৫ সালে তোলা ছবি। ছবি: Lonely Explorer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, ২০১৫ সালে তোলা ছবি। ছবি: Lonely Explorer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সাকিন যেখানে পড়েছেন, সেই বিএম কলেজ দেশের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৮৮৪ সালে অশ্বিনীকুমার দত্ত বরিশালে ব্রজমোহন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, তার বাবা ব্রজমোহন দত্তের নামে। ১৮৮৯ সালে সেখানে কলেজের ক্লাস শুরু হয়, ১৮৯৮ সালে এটি প্রথম শ্রেণির কলেজ হয়, ১৯১৭ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে আসে, ১৯৬৫ সালের ১ জুলাই জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৯৯৩ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হয়।

কৃষি কর্মকর্তারা যা বললেন


বরিশাল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উত্তম ভৌমিক জাগো নিউজকে জানান, সাকিনের ফলবাগানের বিষয়ে এরই মধ্যে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা খোঁজ নিয়েছেন। প্রয়োজন হলে আবারও পরিদর্শন করে সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হবে।

বরিশাল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. মামুনুর রহমান বলেন, 'এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা এবং কৃষিঋণ পেতে সহযোগিতা করা হয়। সাকিনের বাগানের বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি দপ্তর। বাংলাপিডিয়া জানায়, অধিদপ্তর সারা দেশে তার বাগান, হর্টিকালচার সেন্টার ও নার্সারি থেকে উৎকৃষ্ট জাতের আমের কলম তৈরি ও বিতরণ করে, আর বারির গবেষণা কেন্দ্রগুলো চারা তৈরি, উৎপাদন ও সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে।

ছবি: SyedAminul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইবাউব জার্নাল (এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ), ইন্ডিয়ান হর্টিকালচার (আইসিএআর), ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস (আইসিএআর-আইএআরআই), বাংলাপিডিয়া, পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)