অবৈধ ট্রলিং ট্রলার ও নিষিদ্ধ জাল বন্ধের দাবিতে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই, রোববার সকালে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা চৌরাস্তায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন জেলেরা। ‘সাধারণ জেলেদের’ ব্যানারে কলাপাড়ার জেলেদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে কক্সবাজার, ভোলা, নোয়াখালীসহ দেশের নানা এলাকার প্রায় এক হাজার জেলে এতে অংশ নেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
জেলেরা জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আলীপুর-মহিপুর বন্দরের আশপাশে তাঁরা বছরের পর বছর ইলিশ ধরে আসছেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সংকট চলছে, আর এর জন্য তাঁরা অবৈধ ট্রলিং বোটকে দায়ী করছেন।
কাঠের ট্রলার থেকে ট্রলিং ট্রলার, সঙ্গে ছোট ফাঁসের বেহুন্দি জাল
জেলেদের অভিযোগ, কাঠের তৈরি ছোট ট্রলারে স্থানীয় প্রযুক্তিতে যান্ত্রিক জাল টানার ব্যবস্থা বসিয়ে সেগুলোকে অবৈধভাবে ‘ট্রলিং ট্রলারে’ রূপান্তর করা হচ্ছে, আর তাতে যুক্ত করা হচ্ছে ছোট ফাঁসের বেহুন্দি জাল। আধা ইঞ্চি ফাঁসের এই জালে গভীর ও অগভীর সাগরের মাছের রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ এবং মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যও ধরা পড়ছে। তাঁদের ভাষায়, এর ফলে গত চার থেকে পাঁচ বছরে মাছের প্রজনন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
বাংলাপিডিয়ার মাছ ধরার সরঞ্জামবিষয়ক নিবন্ধ অনুযায়ী, বেহুন্দি জাল এক ধরনের থলে জাল, যা কাঠামো দিয়ে খাড়া করে খোলা রাখা হয় এবং স্রোতের বিপরীতে পেতে রাখলে স্রোতই একে টানটান রাখে। একই নিবন্ধে ট্রল জালকে টানা জালের একটি ধরন বলা হয়েছে। সমুদ্রের তলদেশ ঘেঁষে জাল টেনে মাছ ধরাকে বলা হয় বটম ট্রলিং; এ পদ্ধতিতে লক্ষ্যের বাইরের প্রাণী ধরা পড়া ও সমুদ্রতলের ক্ষতি নিয়ে বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ রয়েছে।
জেলেদের হিসাবে, শুধু আলীপুর-মহিপুরেই এমন ৪০ থেকে ৫০টি ট্রলার আছে, আর পাশের বরগুনা জেলার পাথরঘাটার অন্তত ২০ থেকে ৩০টি অবৈধ ট্রলিং ট্রলার এই বন্দরে এসে মাছ ধরে। তাঁদের মতে, এই প্রবণতা ভোলা থেকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী পর্যন্ত ছড়িয়েছে। নোয়াখালীর জেলে আলম গাজীর দাবি, মহিপুরে ৫০টি, ভোলায় ৯০টি এবং চট্টগ্রামের কাঠখালী এলাকায় প্রায় ২০০টি রূপান্তরিত অবৈধ ট্রলার রয়েছে।
কুয়াকাটা আশার আলো মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি মো. নিজাম শেখ জাগো নিউজকে জানান, একটি সাধারণ কাঠের ট্রলারকে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। তাঁর কথায়, ‘এসব ট্রলারে যে ধরনের বেহুন্দি জাল ব্যবহার করা হয়, তাতে পানি ছাড়া আর কিছুই বের হতে পারে না।’ তিনি বলেন, এতে মাছের পোনা, ডিম, এমনকি মাছের খাবারও নষ্ট হয়।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কর্মকর্তাদের অস্বীকার
আলীপুরের জেলে মো. সেলিম ফরাজী অভিযোগ করেন, ট্রলার মালিকেরা কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে টাকা দেন বলেই তাঁরা ট্রলিং বন্ধে উদাসীন। তিনি বলেন, ট্রলিং বন্ধ না হলে জেলেরা আরও বড় আন্দোলনের ঘোষণা দেবেন।
কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিকাশ মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, তাঁরা অবৈধ মাছ ধরার বিষয়ে সব সময় সচেতন; এই ট্রলিং নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, যা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেন এবং জানান, লজিস্টিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে অনেক সময় গভীর সমুদ্রে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারের মালিকেরা তাঁদের ট্রলারের বৈধতা দাবি করে আদালতে রিট করেছেন, যা শিগগির নিষ্পত্তি হবে; কোস্টগার্ডের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং অবৈধ ট্রলিং বন্ধে দ্রুত অভিযান শুরু হবে। তাঁর ভাষায়, ‘মৎস্য বিভাগে টাকা দেওয়ারতো কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, মৎস্য বিভাগ কোনো ট্রলারকে সাগরে মাছ ধরার অনুমতি দেয়নি।
গবেষকের চোখে ইলিশ কমার কারণ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার জাগো নিউজকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের ধারাবাহিকতা বদলে যাওয়া জেলেদের ইলিশ শিকার ও জীবনমান বদলের অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ও পলিথিন সমুদ্রের তলদেশের ক্ষতি করছে এবং অবৈধ জালের কারণে ইলিশ কমেছে, যার ক্ষতি বইছেন দরিদ্র জেলেরা। অবৈধ জাল উৎপাদন, যত্রতত্র প্লাস্টিক ও নিবন্ধনহীন ট্রলিং বন্ধ হলে ইলিশ বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।

আলীপুর-মহিপুর বন্দর ও ইলিশের গুরুত্ব
আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দরটি কুয়াকাটা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে, দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মাছ ধরার কেন্দ্রগুলোর একটি। কুয়াকাটা কলাপাড়া উপজেলায়, বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা সৈকতের জন্য পরিচিত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী কলাপাড়া উপজেলার জনসংখ্যা ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৩।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ; ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট একে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য ঘোষণা করা হয়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে বাংলাদেশে; ২০২৩ সালের হিসাবে বিশ্বের মোট ইলিশ সরবরাহের ৯৭ শতাংশই আসে এ দেশ থেকে।

ছবি: Shafiul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)