২০২৬ সালের ১৪ মার্চ শনিবার সকালে ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের গোলাপ বাগানে একটি করে আমের চারা রোপণ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। জাতীয় সংসদ সচিবালয় সেদিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কর্মসূচিটির কথা জানায়। এর দুই দিন আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকে তাঁরা দুজন নিজ নিজ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বৃক্ষরোপণ ও আনুষঙ্গিক কর্মসূচি
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস ও বিডিনিউজ২৪ সংসদ সচিবালয়ের বরাত দিয়ে জানায়, প্রথমে স্পিকার একটি আমের চারা রোপণ করেন, এরপর ডেপুটি স্পিকার একটি চারা রোপণ করেন। বৃক্ষরোপণ শেষে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে ঢাকায় মারা যান।
বৃক্ষরোপণের আগে স্পিকার তাঁর সরকারি বাংলো পরিদর্শন করেন। বাসস জানায়, এ সময় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ১২ মার্চ, আর সেদিনই এই দুজন নির্বাচিত হন। প্রথম আলো জানায়, দুই পদের প্রতিটির জন্য একটি করে মনোনয়ন জমা পড়েছিল এবং দুটি প্রস্তাবই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়; উদ্বোধনী বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। কায়সার কামাল এর আগে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। একই দিনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দুজনকে শপথবাক্য পাঠ করান। বিডিনিউজ২৪ জানায়, বৃক্ষরোপণের আগের দিন ১৩ মার্চ তাঁরা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন।
লুই কানের নকশা করা সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ ভবন ঢাকা শহরের শেরেবাংলা নগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ঢাকায় আইনসভা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় ১৯৫৯ সালে; তখন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের দ্বিতীয় আসন হিসেবে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় রাজধানী এলাকায় এটি পরিকল্পনা করা হয়, যে এলাকার নাম রাখা হয় শেরেবাংলা নগর। আজকের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের উত্তরে ২০৮ একরের বিশাল জমি অধিগ্রহণ করা হয় ১৯৬১ সালে। মার্কিন স্থপতি লুই আই কানকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় ১৯৬২ সালের মার্চে, আর সে বছরই তাঁর মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়।
১৯৬৪ সালে নকশা চূড়ান্ত হয় এবং নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কাজ বন্ধ থাকে; ১৯৭৪ সালে সরকার নকশায় বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ভবনটির কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কাজ শেষ হওয়ার আগেই কান মারা যান, পরে তাঁর সহযোগীরা সংশোধিত নকশা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেন। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভবনটি উদ্বোধন করেন, আর ১৫ ফেব্রুয়ারি সেখানে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ভবনটির মোট ব্যয় ছিল ১২৮ কোটি টাকা; সংশোধিত প্রাক্কলন ছিল ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
ভবনের ভেতর ও বাইরের দেয়াল ঢালাই কংক্রিটের, কংক্রিটের গায়ে মার্বেলের সরু রেখা বসানো। প্রচলিত অর্থে এতে একটিও কলাম নেই; বিভিন্ন কক্ষের দেয়ালের অংশ হিসেবে থাকা ফাঁপা স্তম্ভই ভার বহন করে। ভবনটি নয়টি ব্লকে বিভক্ত: চারপাশের আটটি ব্লক ১১০ ফুট উঁচু, আর মাঝের অষ্টভুজ ব্লকটি ১৫৫ ফুট উঁচু; সংসদ কক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫৪ জন সদস্য বসতে পারেন। ১৯৮৯ সালে ভবনটি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার পায়।
কংক্রিটের স্থাপত্যের মতোই পরিচিত এর চারপাশের পরিবেশ। একটি কৃত্রিম হ্রদ ভবনের দেয়াল ছুঁয়ে আছে, আর বাংলাপিডিয়া প্রাঙ্গণটিকে আকর্ষণীয় বাগান ও হ্রদে ঘেরা বলে বর্ণনা করেছে। উত্তর দিকে প্রেসিডেন্সিয়াল স্কয়ার দিয়ে প্রবেশপথে রয়েছে একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার, যেখানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়, আর আছে সবুজ ঘাস ও ইউক্যালিপটাস গাছের বাগান। উত্তর প্লাজা পেরিয়ে ক্রিসেন্ট লেকের পাশ দিয়ে একটি সড়ক গেছে, আর দক্ষিণ প্লাজা খুলেছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে। প্রাঙ্গণের লন ও আশপাশের সড়ক হাঁটা ও দৌড়ানোর জনপ্রিয় পথ।

আম গাছ, বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ
চারার প্রজাতি বাছাইয়েরও আলাদা তাৎপর্য আছে। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর মন্ত্রিসভা আম গাছকে বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয় বলে সেদিন বিডিনিউজ২৪ জানায়। বৈঠক শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, "আমাদের কোনো জাতীয় বৃক্ষ ছিল না। তাই আম গাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে।" একই বৈঠকে বন আইনের সংশোধনীর খসড়াও চূড়ান্ত হয়, যাতে আইন লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়।
বাংলাপিডিয়া জানায়, আম (বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica, গোত্র Anacardiaceae) পূর্ব ভারতের স্থানীয় উদ্ভিদ বলে মনে করা হয়, যে অঞ্চলের মধ্যে আজকের বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমার পড়ে। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, সংস্কৃত নাম 'আম' থেকে বোঝা যায়, ফলটিকে মজুত খাদ্য বা রসদ হিসেবে মূল্য দেওয়া হতো। মুঘল সম্রাট আকবর, যিনি ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন, দারভাঙ্গার কাছে লাখবাগে প্রায় এক লাখ আম গাছের একটি বাগান করেছিলেন, যাকে উপমহাদেশের প্রথম সংগঠিত আমবাগান ধরা হয়। ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত সফর করা চীনা পর্যটক হিউয়েন সাংকে বহির্বিশ্বের কাছে আমের পরিচয় তুলে ধরার কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ইংরেজি 'ম্যাংগো' শব্দটি এসেছে তামিল 'মান-কে' বা 'মান-গে' থেকে, যা পর্তুগিজরা 'মাঙ্গা' হিসেবে গ্রহণ করে; ফলটি ব্রাজিলে পৌঁছায় প্রায় ১৭০০ সালে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রায় ১৭৪০ সালে।
দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের জুলাইয়ে লিখেছিল, আম ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল, আর আম গাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। পত্রিকাটির তথ্যে, বিশ্বে বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন আম উৎপাদিত হয়; এর প্রায় অর্ধেক হয় ভারতে, চীন দ্বিতীয় আর বাংলাদেশ সপ্তম। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পাকা আম সরাসরি খাওয়া হয়, কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর পাকা-কাঁচা দুই রকম আম দিয়েই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়।
আমের চারা থেকে বড় গাছ
আম চিরসবুজ গাছ, কাণ্ড বড় ও মোটা। বাংলাপিডিয়া জানায়, ফাঁকা জায়গায় লাগালে গাছটি ২০ মিটারের বেশি উঁচু এবং ৩০ মিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। ডালের মাথায় বড় মঞ্জরিতে ছোট, সুগন্ধি ফুল ফোটে; একটি মুকুলে ১০০ থেকে ২৫০টি ফুলের কুঁড়ি থাকতে পারে, কিন্তু প্রায় এক হাজার ফুলের মধ্যে মাত্র এক-দুটি পাকা ফলে পরিণত হয়; একটি মুকুলে দু-তিনটি ফল টিকলেই ফলন সন্তোষজনক ধরা হয়। আমের ফল একবীজী ড্রুপ, আকারে ডিম্বাকার, গোল, হৃৎপিণ্ডাকার, বৃক্কাকার বা লম্বা-সরু হতে পারে; ওজনে একটি বরইয়ের সমান থেকে ৭৫০ গ্রাম, এমনকি এক কেজি পর্যন্ত হয়।
মাতৃগাছের গুণ ধরে রাখতে আমের বংশবিস্তার সাধারণত কলমের মাধ্যমে করা হয়; গ্রামে আঁটি থেকে চারা তোলার চলও এখনো আছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, কলমের গাছ চতুর্থ বছরে ফল দিতে শুরু করে এবং মোটামুটি ৪৫তম বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়, তারপর ফলন কমে যায়; আঁটির গাছ ফল ধরতে আরও কয়েক বছর বেশি সময় নেয়, তবে ৬০ বছর বা তার বেশি সময় ফল দিতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) তাদের বাগান, হর্টিকালচার সেন্টার ও নার্সারি থেকে উন্নত জাতের কলম বিতরণ করে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে গবেষণা বাগান ও কেন্দ্র পরিচালনা করে।
এক মিটারের কম গভীর মাটি কিংবা পাথুরে বা ভারী এঁটেল অন্তর্মৃত্তিকা ছাড়া প্রায় সব মাটিতেই আম গাছ জন্মায়; সবচেয়ে ভালো বাগানগুলো গঙ্গা প্লাবনভূমির গভীর পলি দোআঁশ মাটিতে। মাটির অম্লমান (পিএইচ) ৫.৫ থেকে ৭.৫ আমের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। জানুয়ারি থেকে মার্চ, অর্থাৎ ফুল ফোটার মাসগুলোর আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ: কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আকাশ ফল ধরায় ক্ষতি করে, আর শিলাবৃষ্টিতে কচি আম ঝরে পড়ে।
বাংলাপিডিয়া জানায়, নার্সারি থেকে পূর্ণবয়স্ক গাছ পর্যন্ত প্রায় তিন ডজন পোকা আম গাছে আক্রমণ করে; প্রধান পোকাগুলো হলো আমের হপার বা শোষক পোকা, ফলের উইভিল, কাণ্ড ছিদ্রকারী, ডগা ছিদ্রকারী ও ফলের মাছি। ছত্রাকজনিত রোগের মধ্যে আছে অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, আগা মরা ও পাউডারি মিলডিউ; ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ রোগও ক্ষতি করে। কচি গাছের পরিচর্যা ও রোগ-পোকা দমনে পরামর্শের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করাই উপযুক্ত।

দেশের বাগানে আম
বাংলাদেশের আমকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: কলমে বংশবিস্তার করা উন্নত জাত, আর আঁটি থেকে জন্মানো স্থানীয় জাত, যা দেশি বা গুটি আম নামে পরিচিত। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ১০০টি জাত আছে; উন্নত জাতের তালিকায় আছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, কিষাণভোগ, কুয়াপাহাড়ি, লতা বোম্বাই, বোম্বাই, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ ও মিছরিভোগ। উন্নত জাতের আম প্রধানত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে হয়, আর বৃহত্তর রাজশাহী ও দিনাজপুরের অনেক পুরোনো বাগান অগোছালো ও কম ফলনশীল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে ২০০৫-০৬ সালে প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৫২৫ একর জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ টন আম উৎপাদিত হয়েছিল; কম ফলনের কারণ হিসেবে পুরোনো গাছ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রোগ-পোকা, আঁটির গাছ এবং জ্বালানি, রাস্তা ও নির্মাণের জন্য ফলন্ত গাছ কাটার কথা বলা হয়েছে।
জাতীয় উৎপাদনের হিসাব সংস্থাভেদে আলাদা। প্রথম আলো ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সে বছর প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির প্রায় ২ কোটি গাছ থেকে সাড়ে ২৪ লাখ টন আম পাওয়ার আশা করছিল, অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে বছরে আমের উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ টন; দুই সংস্থার হিসাবেই উৎপাদন প্রতিবছর বাড়ছিল। ডিএইর হিসাবে স্থায়ী বাগানের ফলের মধ্যে আমই সবচেয়ে বড়, এরপর কাঁঠাল, প্রায় ১৯ লাখ টন। একই প্রতিবেদনে আমের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ২০ টাকা এবং মৌসুম মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বলা হয়। প্রতিবেদনে বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর তথ্যও ছিল: দৈনিক মাথাপিছু ফল খাওয়ার পরিমাণ ২০১০ সালের ৪৪.৭ গ্রাম থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৯৫.৪ গ্রাম হয়েছে।
আম চাষের মানচিত্রও বদলেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জই ছিল আমের প্রধান জেলা, কিন্তু এখন নওগাঁ দুই জেলার চেয়েই বেশি আম উৎপাদন করে; সাতক্ষীরা, রংপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামেও প্রচুর আম হয়। সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছিল আম্রপালি জাতের, পাশাপাশি পুরোনো জনপ্রিয় হিমসাগর, ল্যাংড়া ও ফজলি এবং নতুন জাতের মধ্যে বারি আম-৪ ও বারি আম-১১।
সংসদ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণের এক মাস আগে, ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাসস রাজশাহী থেকে জানায়, সেখানকার আমবাগানগুলো মুকুলে ভরে উঠছে। ডিএইর রাজশাহী অঞ্চলের তথ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি জানায়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন; ২০২৫-২৬ মৌসুমে একই পরিমাণ জমিতে লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন। রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম ডিএইর তথ্যের বরাত দিয়ে বাসসকে বলেন, দশ বছরে নওগাঁয় আমের জমি বেড়েছে ১৪ হাজার ৯২৫ হেক্টর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৯ হাজার ৫২০ হেক্টর; আগের বছর নওগাঁ উৎপাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ছাড়িয়ে যায়, যদিও আমের জমি এখনো চাঁপাইনবাবগঞ্জেই বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, আম্রপালি, বারি আম-৩ ও বারি আম-৪ জাতের বাগান প্রতিবছর বাড়ছে, আর কৃষকেরা এখন দশ বছরের হিসাব ধরে বাগান করছেন।

জাতীয় হিসাবে দেশের গাছপালা
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি (বিএফআই) দেশের গাছপালার সবচেয়ে বিস্তারিত গণনা। এতে ১ হাজার ৭৮১টি মাঠ প্লট পরিদর্শন, ৬ হাজার ৪০০ খানায় জরিপ এবং ২০১৫ সালের জাতীয় ভূমি আচ্ছাদন মানচিত্র তৈরি করা হয়; এর নকশা ও প্রধান ফলাফল ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফরেস্ট ইকোসিস্টেমস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এফএওর বনের সংজ্ঞা অনুযায়ী বিএফআই দেশের বনভূমি নির্ধারণ করে ১৮ লাখ ৮৪ হাজার ১৯ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের ১২.৮ শতাংশ; নদী বাদ দিয়ে শুধু স্থলভাগ ধরলে ১৪.১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি হাজার মানুষে ১১.৭ হেক্টর। বনের ধরনের মধ্যে পাহাড়ি বন সবচেয়ে বড়, দেশের আয়তনের ৪.৬ শতাংশ; এরপর বিক্ষিপ্ত গাছসহ ঝোপঝাড় ৪.২ শতাংশ এবং ম্যানগ্রোভ বন ২.৭ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে বৃক্ষাচ্ছাদন সার্বিকভাবে ৩.৪ শতাংশ কমেছে।
দেশের গাছপালার কত বড় অংশ বনের বাইরে, সেটিও এই জরিপে উঠে এসেছে। গ্রামীণ বসতিসহ বনের বাইরের জমির গাছে আছে মোট জৈববস্তুর ৬৬ শতাংশ, আর শুধু গ্রামীণ বসতিতেই আছে দেশের মোট কাঠের মজুতের অর্ধেক। জৈববস্তুর হিসাবে শীর্ষ তিন প্রজাতি হলো একটি ম্যানগ্রোভ প্রজাতি (সুন্দরী, Heritiera fomes), একটি ফলের প্রজাতি (আম) এবং একটি বিদেশি প্রজাতি (মেহগনি, Swietenia mahagoni); এই তিনটি মিলে মোট জৈববস্তুর ১৯ শতাংশ। জরিপে ৩৯২টি গাছের প্রজাতি পাওয়া যায়, আর দেখা যায় গ্রাম অঞ্চলের গাছ বেশির ভাগই লাগানো এবং প্রায়ই ফলের গাছ। দেশের স্থলভাগে মোট কার্বন মজুত ধরা হয় ১২৭৫.৬ মিলিয়ন টন।
আনুমানিক ৩.১ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে, অর্থাৎ মোট আয়তনের ২৩.২ শতাংশে, গাছ ও বন ব্যবস্থাপনা চলছিল, আর বন অধিদপ্তরের মালিকানায় ছিল প্রায় ৯.৪ শতাংশ জমি। জরিপ করা খানার মাত্র ১.৩ শতাংশ কোনো সংস্থার কাছ থেকে গাছ ও বন ব্যবস্থাপনায় সহায়তা পেয়েছিল, তা-ও বেশির ভাগ বিনা মূল্যের চারা ও বৃক্ষরোপণ প্রশিক্ষণ হিসেবে। গাছ কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে খানাগুলো প্রধানত অতিরিক্ত আহরণ এবং নির্মাণের জন্য গাছ কাটার কথা বলে।
সুরক্ষার নিয়মও তখন বলবৎ ছিল। ২০২২ সালের অক্টোবরে মন্ত্রিসভা সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনের গাছ কাটার নিষেধাজ্ঞা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব অনুমোদন করে বলে বিডিনিউজ২৪ জানায়। স্থানীয় মানুষের অংশীদারিত্বে করা সামাজিক বনায়ন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়; সেখানে ১৫ থেকে ২০ বছর পর আকাশমণি গাছ কাটা হয়, মূল্যের ৭০ শতাংশ পান উপকারভোগীরা আর ৩০ শতাংশ বন অধিদপ্তর।
বৃক্ষরোপণ অভিযান ও ঢাকার কমে আসা সবুজ
বাংলাদেশে প্রতিবছর জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান হয়। সংসদ প্রাঙ্গণে এই বৃক্ষরোপণের আগের সর্বশেষ জাতীয় অভিযান শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ জুন; বণিক বার্তা জানায়, সেদিন ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পরিবেশ মেলা ২০২৫ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৫ উদ্বোধন করেন। এর প্রতিপাদ্য ছিল "পরিকল্পিত বনায়ন করি, সবুজ বাংলাদেশ গড়ি"। পরিবেশ মেলা চলে ২৫ থেকে ২৭ জুন, বৃক্ষমেলা ২৪ জুলাই পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে জাতীয় পরিবেশ পদক, জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পুরস্কার এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার দেওয়া হয়, সঙ্গে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির উপকারভোগীদের লভ্যাংশের চেক; ঢাকার ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
ঢাকায় গাছের প্রয়োজন বিশেষভাবে তীব্র। রয়টার্স ২০২৩ সালের এপ্রিলে জানায়, এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালে শহরের আয়তনের ১৭ শতাংশ ছিল সুস্থ সবুজ এলাকা, যা ২০২০ সালে নেমে আসে মাত্র ২ শতাংশে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের পোস্টডক্টরাল গবেষক মো. ইমরান হোসেনের নেতৃত্বে ২০২১ সালের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকার নির্মিত এলাকা ৬৭ শতাংশ বেড়েছে, এই তিন দশকে শহরটি তার সবুজ এলাকার ৫৬ শতাংশ হারিয়েছে, আর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ৬.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অর্থাৎ বছরে ০.২৪ ডিগ্রি করে বেড়েছে।
ছবি: IshratPinky / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), উইকিপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, ফরেস্ট ইকোসিস্টেমস (বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি, বন অধিদপ্তর), বণিক বার্তা, রয়টার্স





মন্তব্য
(০)