গাছভর্তি আম দেখে মৌসুমের শুরুতে আশায় ছিলেন রাজশাহীর চাষিরা। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসের শেষে কোরবানির ঈদের পর জেলার আমের হাটগুলোতে সেই আশা হতাশায় রূপ নেয়। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ৮ জুন জানায়, মোকামে আমের স্তূপ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা ছিল না, মিলছিল না প্রত্যাশিত দাম। ভালো ফলনের মৌসুমেও তাই লোকসানের শঙ্কায় পড়েছিলেন অনেক চাষি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে, সেই মৌসুমে রাজশাহীর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। দ্য ডেইলি স্টার ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, জেলার প্রায় ৭২ শতাংশ আমগাছে মুকুল এসেছিল, আর আগের মৌসুমে রাজশাহীতে আম উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৩ টন।
বানেশ্বর হাটে আম বেশি, ক্রেতা কম
পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাট রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের মোকাম। ঈদের পর ভোর থেকেই ভ্যান, অটোরিকশা, পিকআপ ও ট্রাকে আম আসছিল, কিন্তু আড়তদারদের দর শুনে অনেক চাষিই হতাশ হচ্ছিলেন। পুঠিয়ার চাষি রহমান আলী জানান, সারা বছর সার, কীটনাশক ও সেচ দিয়ে বাগান পরিচর্যা করেছেন; যে দামে আম বিক্রি হচ্ছিল, তাতে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন।
ভুবননগর গ্রামের আমিনুল ইসলামের প্রায় ২০ বিঘা বাগান। তাঁর হিসাবে, আগে একজন শ্রমিককে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দিলেই চলত, তখন দিতে হচ্ছিল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। চারঘাটের চাষি আব্দুল হান্নান বলেন, অনেক কৃষক ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বাগান পরিচর্যা করেছেন। দুর্গাপুরের পালি গ্রামের রাজু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, 'এখন আম বিক্রি মানে লাভ নয়, লোকসান কমানো।'

জাতভেদে আমের দাম
বাংলাদেশে এক মণ ৪০ কেজি। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগের মণ ছিল ২ হাজার টাকার বেশি, ঈদের পর তা বিক্রি হচ্ছিল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। গুটি আম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে নেমে আসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। লক্ষ্মণভোগের মণ ছিল ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, রানীপছন্দও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছিল না। তুলনামূলক ভালো ছিল ক্ষীরসাপাত, মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ক্ষীরসাপাত ২০১৯ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, আগের বছর একই সময়ে গোপালভোগ মণপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়েছিল এবং লক্ষ্মণভোগ দেড় হাজার টাকার নিচে নামেনি। বানেশ্বরের ব্যবসায়ী ইমান আলী বলেন, আগের বছর গোপালভোগ কিনতে পাইকারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল, এবার বাজারে আম বেশি কিন্তু ক্রেতা কম।

ঈদ, পরিবহন আর কুরিয়ারের প্রভাব
চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, ঈদের আগে মানুষ কোরবানির পশু ও অন্যান্য কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিলেন, আর ঈদের পর কয়েক দিন মাংস নিয়ে ব্যস্ততায় ফলের চাহিদা কমে যায়। ঈদের ছুটিতে পরিবহন সীমিত ছিল, কুরিয়ার সেবাও পুরোপুরি চালু ছিল না; ফলে ঢাকাসহ বড় বাজারে আম পাঠানো ব্যাহত হয়। ঢাকা ট্রিবিউনও ৪ জুন একই কারণগুলো তুলে ধরেছিল। অনলাইনে আম বিক্রি করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিরাজ আফ্রিদি জানান, ডেলিভারি নিয়ে অনিশ্চয়তায় অনেক নিয়মিত ক্রেতাও অর্ডার দিতে দেরি করছিলেন।
জেলা প্রশাসনের সময়সূচি অনুযায়ী ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাংগো, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই থেকে বারি আম-৪, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি সংগ্রহের কথা ছিল। ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, এসব জাত বাজারে এলে চাহিদা বাড়তে পারে।

সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দাবি
চাষিদের দাবি ছিল, সরকারিভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে বেশি উৎপাদনেও বাজারে এমন ধস নামত না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান জাগো নিউজকে বলেন, 'আমের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগও বাড়াতে হবে।' জুস, পাল্প, শুকনো আম ও আচারের মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্যের শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক ভালো দাম পেতে পারেন বলে মত দেন কৃষি অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেশি, তাই দামের ওপর কিছুটা চাপ স্বাভাবিক। তাঁর মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট ছিল না; মৌসুম এগোলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে তিনি আশা করছিলেন।
ছবি: Mostafizur Rahman Sawon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)