সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ঈদের ছুটির পর দিনাজপুরে জমতে শুরু করেছে লিচুর বাজার, দাম গতবারের চেয়ে কম

২০২৬ সালের ১ জুন দিনাজপুর শহরের নিউমার্কেটে মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই ও চায়না-থ্রি লিচুর বেচাকেনা জমে ওঠে; ঈদের ছুটিতে পরিবহন বন্ধ থাকায় ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছিল ২৫০ থেকে ৮০০ টাকায়, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে কম।

ঈদের ছুটির পর দিনাজপুরে জমতে শুরু করেছে লিচুর বাজার, দাম গতবারের চেয়ে কম
ফল

লিচুর জন্য দেশজুড়ে পরিচিত দিনাজপুরে ২০২৬ সালের জুনের শুরুতে লিচুর বেচাকেনা জমে উঠতে শুরু করে। ১ জুন সোমবার জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা শহরের সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার নিউমার্কেটে তখন মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই ও চায়না-থ্রি জাতের লিচু উঠেছিল। জাত ও আকারভেদে ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছিল সর্বনিম্ন ২৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায়। আগের বছর একই সময়ে এই দাম ছিল সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা।

দাম কম থাকার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে শহরের মানুষ গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন এবং ছুটির মধ্যে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সে বছর সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিসে ঈদের ছুটি ছিল ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত, টানা সাত দিন। জাগো নিউজ জানায়, ১ জুন থেকে পণ্যবাহী পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিসের বুকিং আবার চালু হয়, আর ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা দিনাজপুরে আসতে শুরু করেন। ফলে এক-দুই দিনের মধ্যেই দাম বাড়তে পারে বলে তখন বাজারে ধারণা ছিল।

দাম নিয়ে বাজারের বিভিন্ন পক্ষের মত ছিল ভিন্ন। চাষিরা বলছিলেন, তাঁরা ভালো দাম পাচ্ছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, অন্য বছরের তুলনায় সেবার দাম অনেক কম। ক্রেতারাও বলছিলেন, আগের বছরের চেয়ে তখন পর্যন্ত দাম অনেক কম।

নিউমার্কেটে সকাল থেকে হাঁকডাক, জায়গার সংকট


দিনাজপুর শহরের কোতোয়ালি থানার কাছের নিউমার্কেট জেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার। জাগো নিউজ জানায়, প্রতিদিন ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এ বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় থাকে। বাসসের প্রতিবেদনে একই বাজারকে কালিতলা নিউমার্কেট বলা হয়েছে এবং শহরের সবচেয়ে বড় ফলের বাজার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১ জুন সকালে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক চলছে, অন্যদিকে চলছে দর-কষাকষি। পাইকারি বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচু বেশি দেখা গেলেও খুচরা বাজারে বেদানা ও চায়না-থ্রি লিচু ছিল অল্প পরিমাণে। বাজারে জায়গা না হওয়ায় চাষি ও বাগানিরা ভ্যান ও ইজিবাইকে লিচু নিয়ে বিক্রির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ জানতে পারে, সেদিন পাইকারিতে প্রতি হাজার লিচুর দর ছিল এ রকম:

  • মাদ্রাজি: ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা
  • বেদানা: ৩,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকা
  • চায়না-থ্রি: ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা
  • বোম্বাই: ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকা

লিচু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান দরদী ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. রানা বলেন, বৃষ্টি ও রোদের কারণে সেবার লিচুর আকার ও রং অনেক ভালো হয়েছে। তিনিও মাদ্রাজি প্রতি হাজার ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা, চায়না-থ্রি সাত থেকে আট হাজার টাকা এবং বোম্বাই ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় বিক্রির কথা জানান।

মামুন ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী ও আড়তদার মো. মামুন বলেন, বাজারে জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় তাঁরা খুব কষ্টে আছেন। তিনি চান, পৌরসভা যেন এ বিষয়ে সহায়তা করে।

ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলামের মতে, বাজারে ব্যাপক লিচু আসায় দাম কম ছিল। তিনি জানান, বাগান থেকে বোম্বাই লিচু কিনে এনেছিলেন প্রতি হাজার ২,৪০০ টাকায়, কিন্তু বাজারে বিক্রি করতে হয়েছে ২,২০০ টাকায়, হাজারে ২০০ টাকা লোকসানে। আগের দিন দাম ভালোই ছিল বলে জানান তিনি।

বিক্রেতাদের দীর্ঘ অপেক্ষা, ক্রেতাদের স্বস্তি


বাজারের ভিড়ে লিচু নিয়ে আসা অনেক বিক্রেতাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বিরল উপজেলার কামদেবপুর থেকে মাদ্রাজি লিচু নিয়ে আসা মিজানুর রহমান জানান, তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নিউমার্কেটে অপেক্ষা করছিলেন; কখন আড়তে পৌঁছে বিক্রি করতে পারবেন, তা তিনি জানতেন না।

সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা থেকে আসা সজীব হাসান বলেন, লিচু বিক্রির জন্য তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর কতক্ষণ লাগবে বলা মুশকিল, আর ভালো দাম পাবেন কি না, তা নিয়েও তাঁর সন্দেহ ছিল।

ক্রেতাদের জন্য অবশ্য কম দাম ছিল স্বস্তির। দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা মুশফিকুর রহমান চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। দুপুর ২টার গাড়িতে লিচু নিয়ে ঢাকায় ফেরার আগে তিনি নিউমার্কেট থেকে বেদানা লিচু প্রতি ১০০টি ৫০০ টাকা এবং চায়না-থ্রি প্রতি ১০০টি ৮০০ টাকা দরে কেনেন। দাম কম পেয়ে তিনি খুশি বলে জানান।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সেবার লিচুর ফলন কিছুটা কম হয়েছে, তবে লিচুর আকার ও রং ভালো। তাঁর ভাষায়, কেবল বাজার শুরু হয়েছে, আর চাষিরা ভালো দাম পাবেন বলে তিনি আশা করছেন।

একই দিনের অন্য প্রতিবেদনে বাজারের চিত্র


একই দিন অন্য গণমাধ্যমও দিনাজপুরের লিচুর বাজার নিয়ে প্রতিবেদন করে। ১ জুন সকালে প্রকাশিত দিনাজপুর টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলার ১৩টি উপজেলা থেকে প্রান্তিক কৃষক ও বাগানিরা ভোর থেকেই লিচুর গাড়ি নিয়ে নিউমার্কেটে আসছিলেন, আর ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর জন্য আড়তে পাইকারদের ভিড় ছিল। তখন প্রধানত মাদ্রাজি ও বেদানা জাতের আগাম লিচু উঠছিল এবং মানভেদে প্রতি হাজার লিচু ৩,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ডিএইর উপপরিচালক আফজাল হোসেন সেখানে জানান, গাছের ক্ষতি না করে সঠিক পদ্ধতিতে লিচু সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে কর্মকর্তারা নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের আশা ছিল, মৌসুমে এ বাজারে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লিচু কেনাবেচা হবে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) একই দিন দুপুরে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে আগের দিন, অর্থাৎ ৩১ মে রোববার বিকেলের কালিতলা নিউমার্কেটের দর তুলে ধরে। সেখানে প্রতি ১০০ মাদ্রাজি লিচু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বেদানা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং চায়না-থ্রি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। বাসসের হিসাবে দিনাজপুরে উৎপাদিত লিচুর ২০ শতাংশ জেলার চাহিদা মেটায়, বাকি ৮০ শতাংশ যায় দেশের অন্য জেলায়। বাজারের ইজারাদার মো. দবিরুল ইসলাম বাসসকে জানান, এ বাজারে দৈনিক ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়।

বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের পুলহাট এলাকায় লিচু ও আমের অস্থায়ী পাইকারি বাজারও বসেছিল, যেখানে বাগান মালিকেরা লিচু আড়তে আনছিলেন এবং দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা দরদাম করে কিনছিলেন। তখন বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও চায়না-থ্রি থাকলেও বোম্বাই, হাড়িয়া, চায়না-টু, মোজাফফরি ও কাঁঠালি জাতের লিচু আসতে আরও কয়েক দিন লাগবে বলে জানানো হয়। আবহাওয়ার ঝুঁকির কথা ভেবে চাষিরা কিছুটা আগেভাগে লিচু পাড়তে শুরু করেছিলেন। এক খুচরা বিক্রেতা বাসসকে বলেন, ঢাকা থেকে আসা পাইকারদের কারণে বাজার চড়া; এক ক্রেতাও আগের বছরের তুলনায় দাম একটু বেশি বলে মত দেন। অর্থাৎ বাজার ও সময়ভেদে দামের চিত্র নিয়ে প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে পার্থক্য ছিল।

গাছে চায়না-থ্রি জাতের লিচু। ছবি: Mohammad Tanvir Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
গাছে চায়না-থ্রি জাতের লিচু। ছবি: Mohammad Tanvir Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

জেলায় লিচুর আবাদ ও উৎপাদনের হিসাব


জাগো নিউজকে কৃষি বিভাগ জানায়, জেলায় পাঁচ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে পাঁচ হাজার ৪১৮টি। জাতভিত্তিক আবাদ ছিল এমন:

  • বোম্বাই: তিন হাজার ১৭০ হেক্টর
  • মাদ্রাজি: এক হাজার ১৬৬ হেক্টর
  • চায়না-থ্রি: ৮০২ হেক্টর
  • বেদানা: ২৯৫ দশমিক ৫ হেক্টর
  • কাঁঠালি: ৫৬ হেক্টর
  • মোজাফফরপুরী: ১ হেক্টর

এর বাইরে বসতবাড়ির উঠান ও বাগান মিলিয়ে জেলায় প্রায় সাত লাখ লিচুগাছ আছে। সে মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩০ হাজার মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবে সেবার ফলন কিছুটা কম ছিল।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দপ্তরের দেওয়া হিসাবে অবশ্য পার্থক্য দেখা যায়। ২০২৬ সালের ৮ মে জাগো নিউজকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছিল, সে বছর লিচু চাষের জমি পাঁচ হাজার ৪৮৪ হেক্টর, বাগান পাঁচ হাজার ৪১৮টি এবং উৎপাদনের আশা ৩৭ হাজার ৫৯৩ মেট্রিক টন। ১ জুন বাসসকে দিনাজপুর হর্টিকালচার বিভাগের উপপরিচালক মো. এজামুল হক জানান, জেলায় ৭ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে লিচুবাগান রয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন; তাঁর আশা ছিল, চাষিরা লিচু বিক্রি থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার বেশি আয় করতে পারবেন।

জাতীয় পর্যায়ে দিনাজপুরের অবস্থান নিয়ে প্রথম আলো ২০২৬ সালের ২২ মে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, একক জেলা হিসেবে লিচু উৎপাদনে দিনাজপুর শীর্ষে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় মোট উৎপাদন ছিল ৩৯ হাজার ৫৯৩ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাবনায় উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার টন, তৃতীয় রাঙামাটিতে ১৭ হাজার টন, আর গাজীপুর ও খাগড়াছড়িতে ১১ হাজার টন করে। ওই বছর সারা দেশে লিচুর উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার ৭২৯ টন।

জেলার ভেতরে কোন উপজেলায় লিচু বেশি হয়, তা নিয়েও প্রতিবেদনগুলো তথ্য দেয়। আজকের পত্রিকা ২০২৬ সালের ২৪ মে জানায়, জেলার ১৩টি উপজেলাতেই কমবেশি লিচুর আবাদ হলেও সদর, বিরল ও চিরিরবন্দরে উৎপাদন বেশি। চিরিরবন্দর উপজেলায় সে বছর প্রায় ৫৬৫ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ৬৮০ টন; সেখানে মাদ্রাজি, বেদানা, হাড়িয়া বেদানা, বোম্বাই, চায়না-থ্রি, চায়না-টু, কাঁঠালি ও মোজাফফরি জাতের লিচু চাষ হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিচু হয় বিরল উপজেলায়।

বৈরী আবহাওয়ায় কম ফলনের মৌসুম


কর্মকর্তারা যে ফলন কম হওয়ার কথা বলছিলেন, তার পেছনে ছিল মৌসুমজুড়ে বৈরী আবহাওয়া। ২০২৬ সালের ৮ মে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে সদর উপজেলার মহব্বপুর গ্রামের চাষি অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন জানান, মৌসুমের শুরুতে জেলায় তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছেছিল, ভোরে কুয়াশাও ছিল, ফলে মুকুল পুড়ে যায়। এরপর শুরু হয় ঝড় ও শিলাবৃষ্টি।

ওই প্রতিবেদনে চাষিরা জানান, মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টি, মাঝে জ্বালানি তেলের সংকটে বাগানে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারা এবং এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসে কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে লিচু ফেটে ও ঝরে পড়ায় উৎপাদন কমার আশঙ্কা দেখা দেয়। সদর, বিরল, চিরিরবন্দর, খানসামা, কাহারোল ও বোচাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টিতে লিচু ঝরে পড়ার খবর পাওয়া যায়। সদরের ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের এক চাষি জানান, তাঁর বাগানে উৎপাদন আগের বছরের অর্ধেকে নেমেছে। হিমাগার না থাকায় প্রতিবছর বিপুল লিচু নষ্ট হয় বলে তিনি সরকারের পদক্ষেপ চান।

কৃষি বিভাগ অবশ্য তখন ক্ষতিকে বড় করে দেখেনি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেছিলেন, ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে কমবেশি এক থেকে দেড় হেক্টর জমির লিচু নষ্ট হয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো নয়। উপপরিচালক নুরুজ্জামান বলেছিলেন, তাপপ্রবাহে কিছুটা ক্ষতি হলেও বাগানিরা ব্যাপক পরিচর্যা করছেন বলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না। ২৪ মে আজকের পত্রিকাকে চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহারা সুলতানা জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেখানে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম হতে পারে।

দ্য বাংলাদেশ টুডে ১৩ মে জানায়, তাপমাত্রা বেশি থাকায় এবং ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে অনেক গাছে গুটি ঝরে গেলেও কৃষি অফিসের পরামর্শে চাষিরা গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দিয়েছেন এবং গাছে পানি স্প্রে করেছেন। ১ জুন বাসসকে উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, চৈত্র-বৈশাখে বৃষ্টি ছিল, জ্যৈষ্ঠেও কিছুটা বৃষ্টি হয়েছে, আর মাঠকর্মীরা বাগান মালিকদের পরামর্শ দিয়ে গাছে থাকা লিচু রক্ষায় সহায়তা করেছেন।

একটি লিচুবাগান। ছবি: Mohammad Tanvir Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
একটি লিচুবাগান। ছবি: Mohammad Tanvir Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আগাম অপরিপক্ব লিচু নিয়ে কৃষি বিভাগের সতর্কতা


মূল মৌসুমের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই দিনাজপুরের বাজারে লিচু উঠতে শুরু করেছিল। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ১১ মে জানায়, সেদিন সকালে নিউমার্কেট, থানা মোড়, বাহাদুর বাজার ও পুলহাটসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতি ১০০ মাদ্রাজি লিচু ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। রং কাঁচাপাকা আর স্বাদে টক হলেও বছরের নতুন ফল হিসেবে কৌতূহলী ক্রেতারা চড়া দামে তা কিনছিলেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুরের সহকারী উপপরিচালক (শস্য) আনিছুজ্জামান তখন জানান, বাজারে পাওয়া লিচু কোনোভাবেই পরিপক্ব নয় এবং এগুলো খাওয়া ঠিক হবে না; পরিপক্ব ও সুস্বাদু লিচু আসতে আরও ১০ থেকে ১২ দিন লাগবে। অপরিপক্ব ফল খাওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। ১৩ মে দ্য বাংলাদেশ টুডেকেও তিনি বলেন, প্রথমে আগাম জাত মাদ্রাজি ও বোম্বাই বাজারে আসবে, এরপর পর্যায়ক্রমে বেদানা, চায়না-থ্রি ও কাঁঠালি।

বাগান থেকে বাজার: কয়েক দফা হাতবদল


লিচু কীভাবে বাগান থেকে ক্রেতার হাতে পৌঁছায়, তা নিয়ে প্রথম আলো ২২ মে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পত্রিকাটির পর্যবেক্ষণ ছিল, বাগান থেকে বাজারে আসতে লিচু কয়েক দফা হাতবদল হয়, এমনকি গাছে থাকতেই একাধিকবার বিক্রি হয়ে যায়, আর প্রতিটি ধাপে দাম বাড়ে। প্রতিবেদনে বিরলের মাধববাটীর একটি বাগানের উদাহরণ দেওয়া হয়: ৪৫টির বেশি গাছের বাগানটি ফুল আসার পর ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় বিক্রি হয় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।

বিরলের একটি বড় বাগানের মালিক শিশির শাহ প্রথম আলোকে বলেন, অনেক সময় বিক্রয়মূল্যের ওপর ১ শতাংশ হারে কমিশন দিতে হয় এজেন্টদের, আর বাগান লিজ থেকে শুরু করে তিন থেকে পাঁচবার হাতবদল হয়। তবে তাঁর মতে এতে দামে খুব প্রভাব পড়ে না; দাম বাড়ানোয় মূল ভূমিকা আড়তদারদের বলে তিনি মনে করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, বাগানে লিচু বিক্রি হয় হাজার হিসেবে; তখন বাগানে এক হাজার বোম্বাই লিচুর দাম তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং মাদ্রাজি এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা। বাগানিরা প্রতি হাজারে ১১০০ লিচু দেওয়ায় অতিরিক্ত লিচু থেকেই পাইকারদের পরিবহন খরচ উঠে যায় বলেও জানানো হয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবার হাতবদলেই দাম বাড়ে এবং এটি হয় অনিশ্চয়তা থেকে। বিদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির বিপরীতে চাষিদের জন্য শস্যবিমা থাকলেও দেশে তেমন পদ্ধতি না থাকায় হাতবদল ঠেকানোর সুযোগ কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বেদানা লিচুর জিআই স্বীকৃতি ও রপ্তানি


দিনাজপুরের লিচুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা বেদানা জাতের। বাংলা ট্রিবিউন জানায়, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল দিনাজপুরের বেদানা লিচু ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পত্রিকাটির তথ্যমতে, সদর উপজেলার মাসিমপুর ও বিরল উপজেলার মাধববাটি এলাকাকে বেদানা লিচুর প্রধান উৎপাদন এলাকা ধরা হয়। তখন দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ ইমরুল আহসান জানান, কৃষি বিভাগের পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তম কৃষি চর্চার (গ্যাপ) প্রটোকল মেনে, কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত রেখে রপ্তানিযোগ্য লিচু উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের ১ জুন দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বাসসকে জানান, আগের দুই বছর ধরে বেদানা লিচু বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং আগের বছর তা ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছে। উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, সে বছরও কয়েকটি দেশ বেদানা লিচু নেওয়ার আগাম আগ্রহ দেখিয়েছে এবং লিচু পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

আগের বছরের মৌসুমের সঙ্গে তুলনা


২০২৫ সালের মৌসুমেও দিনাজপুরের লিচুর বাজার ঈদুল আজহার আগে জমে উঠেছিল। ২০২৫ সালের ২৭ মে বাসস জানায়, কালিতলা নিউমার্কেটে তখন প্রতি ১০০ মাদ্রাজি লিচু ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, বেদানা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং চায়না-থ্রি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ইজারাদারদের হিসাবে তখন বাজারে দৈনিক আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার লিচু লেনদেন হতো। সে সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান জানান, জেলায় ৫ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে লিচুবাগান আছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৪ হাজার ৬২৮ মেট্রিক টন।

২০২৫ সালের ৬ জুন বাংলা ট্রিবিউন জানায়, তখন প্রতি ১০০টি বোম্বাই লিচু ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাদ্রাজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, বেদানা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং চায়না-থ্রি ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সেবারও তার আগের বছরের তুলনায় দাম কম ছিল, তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছিল এবং কৃষি বিভাগ জেলায় ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশা করেছিল। ২০২৬ সালের ৮ মে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীরা মনে করিয়ে দেন, তার আগের কয়েক বছরে শিলাবৃষ্টি, করোনা মহামারি ও তীব্র তাপপ্রবাহে লিচুতে পোড়া দাগ ও ক্ষতের কারণে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

গাছে থোকায় থোকায় লিচু, গাজীপুরে তোলা। ছবি: Mazhar Zarif / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
গাছে থোকায় থোকায় লিচু, গাজীপুরে তোলা। ছবি: Mazhar Zarif / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

লিচু ফল ও দিনাজপুর অঞ্চল


লিচু (বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis) সোপবেরি বা স্যাপিন্ডেসি পরিবারের একটি চিরসবুজ গাছের ফল। এর চাষ শুরু হয় দক্ষিণ চীন, মালয়েশিয়া ও উত্তর ভিয়েতনাম অঞ্চলে, পরে গাছটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জলবায়ু, স্থান ও জাতভেদে ফল পরিপক্ব হতে ৮০ থেকে ১১২ দিন লাগে। কাঁচা অবস্থায় খোসা সবুজ থাকে, পাকলে লাল বা গোলাপি-লাল হয়। খোসার নিচের রসালো, স্বচ্ছ সাদা শাঁস খাওয়া হয়; ভেতরে থাকে একটি বাদামি বীজ। একটি ফলের ওজন সাধারণত ২০ গ্রামের মতো। বিশ্বে লিচুর প্রায় ২০০টি জাত আছে; গাছের বংশবিস্তারে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি গুটিকলম।

দিনাজপুর রংপুর বিভাগের একটি জেলা, উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড়। জেলার আয়তন ৩ হাজার ৪৩৭ দশমিক ৯৮ বর্গকিলোমিটার; পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ঢেপা, পুনর্ভবা ও আত্রাই এ জেলার প্রধান নদী। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ২৩৬। জেলা শহরটি পুনর্ভবা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বিরল উপজেলার আয়তন ৩৫৩ দশমিক ৯৮ বর্গকিলোমিটার; এর দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর ও উত্তর দিনাজপুর জেলা। আজকের পত্রিকার ভাষায়, দিনাজপুর চাল ও লিচুর জন্য দেশজুড়ে সুপরিচিত।

ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দিনাজপুর টিভি, প্রথম আলো, আজকের পত্রিকা, দ্য বাংলাদেশ টুডে, বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণ, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)