যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলা ও বেনাপোল এলাকায় এক সময় পতিত পড়ে থাকা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন কৃষকরা। জাগো নিউজের ২০২৬ সালের ২২ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তেলবীজ উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে বীজ ও সার নিয়ে তারা এই চাষ করেন। মাঠ তখন হলুদ ফুলে ভরা, আর তা দেখতে প্রতিদিন দর্শনার্থীরাও ভিড় করছিলেন।
আগের বছরের পরীক্ষামূলক চাষ থেকে উপজেলাজুড়ে আবাদ
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের বছর কৃষকরা পরীক্ষামূলকভাবে সামান্য জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে ভালো ফলন ও দাম পেয়েছিলেন। তাই ২০২৬ সালের মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন মাঠে পতিত জমিসহ নানা জমিতে সূর্যমুখী লাগানো হয়। কৃষি অফিসের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও পরিচর্যায় গাছ বড় হয়ে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জাগো নিউজকে জানান, দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে ডিএইর প্রণোদনা কার্যক্রমের আওতায় সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। তার হিসাবে চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৭০০ শতক জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে এবং ফলন ভালো হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, সূর্যমুখী বীজের তেল তুলনামূলক দামি, ভোজ্যতেলের জন্য এ ফসলের চাহিদা বাড়ছে, আর কৃষকরা আগ্রহী হলে আবাদ বাড়াতে কৃষি অফিস প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।

কৃষকরা যা বলছেন
কৃষকরা জানান, উপজেলায় তারা ধান, পাট, আখ, গম, ভুট্টা ও সরিষার আবাদ করেন। তবে এসব ফসলে লাভ কম হওয়ায় তারা সূর্যমুখীর দিকে ঝুঁকেছেন। পতিত ও এক ফসলি জমিতে সূর্যমুখী আবাদ করা যায় বলে তাদের আগ্রহ বাড়ছে। তাদের ভাষ্য, কম খরচে ৯০ থেকে ১১০ দিনে ফসল তোলা যায়; বিঘাপ্রতি ফলন হয় ৭ থেকে ১০ মণ, আর প্রতি মণ বিক্রি হয় তিন থেকে চার হাজার টাকায়।
শার্শার চাষি আব্দুল মান্নান জানান, বীজ রোপণের ৩ থেকে সাড়ে ৩ মাসের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা যায়। তার জমিতে প্রতিবেদনের দুই মাস আগে বীজ বোনা হয়েছিল এবং এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে ফসল তোলার আশা করছিলেন তিনি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলনের আশা ছিল তার। চাষি আলতাফ হোসেন ও মনির হোসেন বলেন, অল্প খরচে, অল্প সময়ে সূর্যমুখীর ফলন পাওয়া যায় এবং দামও ভালো মেলে। আগের বছর কৃষি অফিসের পরামর্শে সামান্য জমিতে চাষ করে তারা ভালো ফলন ও দাম পেয়েছিলেন।

সূর্যমুখী ফসল ও ভোজ্যতেলের প্রেক্ষাপট
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী তেলফসল হিসেবে আবাদ হচ্ছে, এবং যশোর সূর্যমুখী চাষের জেলাগুলোর একটি। সূর্যমুখী সাধারণত সব মাটিতেই জন্মে, তবে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত জাতগুলোর জীবনকাল মোটামুটি ৯০ থেকে ১১০ দিন; বারি সূর্যমুখী-২ জাতের বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২ থেকে ৪৪ ভাগ। এআইএস জানায়, সূর্যমুখীর হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১.৭ থেকে ১.৯ টন, আর এর খৈল গরু ও মহিষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ভোজ্যতেলের জন্য বাংলাদেশ মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বৈদেশিক কৃষি সেবার ২০২৫ সালের মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত তেলবীজ ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটায়, বাকিটা অপরিশোধিত তেল বা তেলবীজ হিসেবে আমদানি হয়। ডিএইর তথ্যের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সূর্যমুখীর আবাদ প্রায় ১০ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ২০ হাজার টন বলে প্রাক্কলন করা হয়।

শার্শা যশোর জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা, আয়তন ৩৩৬.২৮ বর্গকিলোমিটার। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল এই উপজেলাতেই।
ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), মার্কিন কৃষি বিভাগের বৈদেশিক কৃষি সেবা (ইউএসডিএ এফএএস), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)