২০২৬ সালের মার্চে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ জমিতে সূর্যমুখী ফুটে ছিল, আর চাষিরা বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন। ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে জাগো নিউজ ২৪ এ খবর দেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) টাঙ্গাইল কার্যালয় জানায়, সেই রবি মৌসুমে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১৭৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছিল। কৃষি অফিস জানিয়েছিল, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চাষিরা সূর্যমুখী চাষে লাভবান হবেন।
সেবার খেতগুলোতে পর্যাপ্ত ফুল এসেছিল। ভোরবেলা সূর্যের মিষ্টি আলো পড়তেই পুরো খেত সোনালি আভায় ভরে উঠত। সরেজমিনে প্রতিবেদক দেখেন, ভোরের আলো ফুটতেই টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নে যমুনা নদীর তীরে সূর্যমুখীর খেত ঝলমল করে উঠছে; সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলগুলো যেন সূর্যের দিকে তাকিয়ে নতুন দিনকে অভিবাদন জানাচ্ছে। কৃষকেরা বলছিলেন, অল্প পুঁজিতে সূর্যমুখী চাষে বেশি লাভের আশা করছেন তারা। কৃষি বিভাগ জানিয়েছিল, ভালো ফলনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যমুনার তীরে মৌমাছি, প্রজাপতি ও দর্শনার্থী
ফুলের খেতে প্রতিদিনই প্রজাপতি ও মৌমাছির ব্যস্ত আনাগোনা দেখা যেত; মধু সংগ্রহে তাদের এই মেলা দৃশ্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা সূর্যমুখী দেখতে আসছিলেন, আর তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষ খেতে ঘুরে ছবি ও সেলফি তুলছিলেন।
সেই পক্ষকালে জাগো নিউজ ২৪ একাই এই খেতের খবর দেয়নি। ২০২৬ সালের ১ মার্চ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস টাঙ্গাইল থেকে জানায়, যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মাঠ হলুদে ঢেকে গেছে, টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় সেবার সূর্যমুখীর অধিক ফলন হয়েছে, আর সদর ছাড়াও ভূঞাপুর, গোপালপুর, নাগরপুর ও কালিহাতী উপজেলার চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর চাষ হচ্ছে। বাসস জানায়, সরকারি প্রণোদনার আওতায় এবং কৃষকদের আগ্রহে চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল সদরের কাকুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ গয়লা দুর্গম চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড টিএসএফ ২৭৫ জাতের তেলজাতীয় সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।
বাসসের সঙ্গে কথা বলা কৃষকেরা জানান, কেন তারা এই ফসল বেছে নিয়েছেন। এক প্রান্তিক কৃষক বলেন, আগে তিনি সূর্যমুখীকে শুধু শৌখিন ফুল ভাবতেন, কিন্তু কৃষি অফিসের পরামর্শে এবার ১ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন এবং ফলন দেখে আশা করছেন, তেলের চাহিদা মিটিয়েও হাতে ভালো টাকা আসবে। আরেকজন জানান, আগের বছর সূর্যমুখী চাষ করে অন্যান্য ফসলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লাভ হওয়ায় তিনি সেই মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে ৭ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করছেন। তৃতীয় এক কৃষক বলেন, ধান বা পাটে অনেক পানি আর সার লাগে, কিন্তু সূর্যমুখীতে পানি কম লাগে, পোকার আক্রমণও কম হয়।
একই এলাকা থেকে ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদনে কাকুয়া ইউনিয়ন ও যমুনার তীরবর্তী এলাকাকে হলুদ আর সবুজের মিতালী বলে বর্ণনা করা হয়। সেখানকার কৃষকেরা পত্রিকাটিকে জানান, ধান ও অন্যান্য আবাদের তুলনায় সূর্যমুখীতে খরচ অনেক কম; একজন বলেন, তার খেত দেখে পাশের অনেকেই পরের বছর সূর্যমুখী চাষের কথা ভাবছেন। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ অনলাইনে ছবি দেখে এসেছিলেন, আর তারা এই খেতকে কৃষি পর্যটনের একটি রূপ বলে উল্লেখ করেন।
কৃষকেরা জাগো নিউজ ২৪-কে জানান, অন্যান্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে খরচ কম এবং লাভের সম্ভাবনা বেশি। সূর্যমুখীর বীজ থেকে উৎপাদিত তেল পুষ্টিগুণের জন্য সমাদৃত হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছিল, ফলে অনেক কৃষক সেবার নতুন করে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হন। মো. রফিকুল নামের এক চাষি বলেন, ‘আমি ১ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছি। আশা করছি এবার ফলন ভালো হবে।’
১২ উপজেলায় ১৭৮ হেক্টর
জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেই মৌসুমে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১৭৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়। উপজেলাওয়ারি হিসাব ছিল এমন:
- টাঙ্গাইল সদর: ৪৫ হেক্টর
- বাসাইল: ৪৬ হেক্টর
- কালিহাতী: ৮ হেক্টর
- ঘাটাইল: ১০ হেক্টর
- নাগরপুর: ১০ হেক্টর
- মির্জাপুর: ১০ হেক্টর
- মধুপুর: ১৪ হেক্টর
- ভূঞাপুর: ৫ হেক্টর
- গোপালপুর: ৫ হেক্টর
- সখীপুর: ৩ হেক্টর
- দেলদুয়ার: ২০ হেক্টর
- ধনবাড়ী: ২ হেক্টর
সবচেয়ে বেশি জমি ছিল বাসাইল ও টাঙ্গাইল সদরে, তার পরে দেলদুয়ার ও মধুপুরে; জেলার সবচেয়ে ছোট আবাদ ছিল ধনবাড়ী ও সখীপুরে। সূর্যমুখীর খেত থাকা কয়েকটি উপজেলা, যেমন টাঙ্গাইল সদর, ভূঞাপুর, গোপালপুর, নাগরপুর ও কালিহাতী, যমুনা ও তার চরের পাশে; বাসস এসব চরাঞ্চলকেই সূর্যমুখী চাষের প্রধান এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে।
টাঙ্গাইল সদরের হিসাব নিয়ে প্রতিবেদনগুলো একমত ছিল না। সদর উপজেলা কৃষি অফিসার রুমানা আক্তার জাগো নিউজ ২৪-কে বলেন, সেবার টাঙ্গাইল সদরে ২৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে; ২৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাবকেও তিনি একই হিসাব দেন, প্রায় ২৫ হেক্টর। অথচ জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত ডিএইর জেলা হিসাবে সদরের জন্য ৪৫ হেক্টর লেখা ছিল, আর ১ মার্চ বাসসও সদরে প্রায় ৪৫ হেক্টরের কথা জানায়। কোনো প্রতিবেদনে এই পার্থক্যের ব্যাখ্যা নেই; গণনার ভিন্ন পর্যায় বা ভিন্ন এলাকা ধরার কারণে এমন হতে পারে। তাই এখানে দুটি হিসাবই সূত্রে যেভাবে এসেছে, সেভাবে রাখা হলো।
কৃষি কর্মকর্তারা যা বলেছিলেন
রুমানা আক্তার জাগো নিউজ ২৪-কে বলেন, ‘সূর্যমুখী চাষ দিন দিন বেড়েই চলেছে। একদিকে তেল উৎপাদন হচ্ছে, অপরদিকে সৌন্দর্য উপভোগ হচ্ছে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, সার ও বীজ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে সূর্যমুখী হতে পারে জেলার অর্থকরী ফসলের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।’
এর কয়েক দিন আগে বাসসকে তিনি বলেন, সরিষার বিকল্প এবং স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে সূর্যমুখী একটি অধিক লাভজনক তেলজাতীয় ফসল, আর টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে দিন দিন ব্যাপক হারে এর চাষ বাড়ছে। তিনি জানান, চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং উন্নত মানের বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে; সূর্যমুখী একদিকে ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি পর্যটনের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে।
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ জাগো নিউজ ২৪-কে বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকদের ফলন ভালো হবে। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং পুষ্টিকর তেলের চাহিদা মেটাতে কৃষকদের এই অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে থেকে উন্নত জাতের বীজ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি কৃষকেরা এবার ভালো ফলন পাবেন।’
টাঙ্গাইল জেলায় সারা বছরই নানা ধরনের ফল, ফসল ও ফুলের চাষ হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি সহায়তায় স্থানীয় চাষিদের সূর্যমুখী চাষে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এই ফসল জেলার আয়ের আরেকটি সম্ভাবনাময় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
টাঙ্গাইল, যমুনা ও কাকুয়া ইউনিয়ন
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলার আয়তন ৩,৪১৪.৩৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এবং পশ্চিমে যমুনার ওপারে সিরাজগঞ্জ জেলা। প্রধান নদী যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং, বংশী, তুরাগ ও ঝিনাই। টাঙ্গাইল মহকুমা হয় ১৮৭০ সালে এবং জেলা হয় ১৯৬৯ সালে। জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ঘাটাইল সবচেয়ে বড় এবং ধনবাড়ী সবচেয়ে ছোট। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩৬,০৫,০৮৩ জন, আর বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৫৭.২৮ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার আয়তন ৩৩৪.২৬ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া এর প্রধান নদী হিসেবে যমুনা, ধলেশ্বরী ও লৌহজংয়ের নাম দিয়েছে, আর এর পশ্চিম সীমানা যমুনার ওপারে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলা পর্যন্ত। উপজেলায় ১২টি ইউনিয়ন, তার একটি কাকুয়া, যেখানে প্রতিবেদক ভোরে সূর্যমুখীর খেত দেখেছিলেন। কাকুয়ার আয়তন ৮,৭১২ একর; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে সেখানে ১৩,৯৫৫ জন পুরুষ ও ১৩,৩০৫ জন নারী গণনা করা হয়, সাক্ষরতার হার ছিল ৩১.৮ শতাংশ। বাংলাপিডিয়া এই উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, সরিষা, গম, আলু, আখ, চিনাবাদাম, ভুট্টা ও শাকসবজির নাম দিয়েছে; সেই তালিকায় সূর্যমুখী নেই।
চর হলো নদীর গতিপথে জেগে ওঠা বালুর স্তূপ, যা কখনো নদীর মাঝে দ্বীপ হিসেবে, কখনো তীরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় থাকে; গাছপালা জন্মালে মানুষ সেখানে বসতি গড়ে ও চাষাবাদ করে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, দ্বীপচর ও সংযুক্ত চর সাধারণত পাশের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কম উৎপাদনশীল, কারণ কিছু চরের মাটি তুলনামূলক কম অনুকূল এবং ভাঙন ও ঘন ঘন বন্যার অনিশ্চয়তা থাকে; অনেক চরে সেচনির্ভর ফসলও কম। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের এমন জমিতেও সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় সেই মৌসুমে ৬২০ জন কৃষক ২২৯ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন, আগের বছর যা ছিল ১৯৫ হেক্টর; এর প্রায় ৭০ শতাংশ চাষ হয়েছিল ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ ২৬টি নদীর ৬০টি চরে।

ফসল হিসেবে সূর্যমুখী
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সূর্যমুখী (Helianthus annuus) অ্যাস্টারেসি গোত্রের একটি বর্ষজীবী বীরুৎ; হলুদ পাপড়িঘেরা এর পুষ্পমঞ্জরি কখনো কখনো ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়। এর বীজ হাঁস-মুরগির খাদ্য এবং ভোজ্যতেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর তেল বের করার পর থাকা খৈল গবাদিপশুর খাবার হয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, চাষের সূর্যমুখীর উৎপত্তি সম্ভবত মেক্সিকোতে; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীদের ২০২৩ সালের একটি গবেষণাপত্রে একে উত্তর আমেরিকার উদ্ভিদ বলা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথমে বাগানের গাছ হিসেবে এর প্রচলন হয়, আর ১৯৮০-র দশকে তেলবীজ ফসল হিসেবে কিছু খাটো জাত আনা হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশের কিছু মধ্য ও উত্তরাঞ্চলীয় জেলায় খরিফ ও রবি দুই মৌসুমেই এর চাষ হয় এবং ফসল তুলতে প্রায় ৯০ থেকে ১১০ দিন লাগে।
বারির তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, মসলা গবেষণা কেন্দ্র ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ওই গবেষণাপত্রটি ২০২৩ সালে Acta Universitatis Agriculturae et Silviculturae Mendelianae Brunensis সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে সূর্যমুখীকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেলবীজ ফসল এবং বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ গৌণ ফসল বলা হয়েছে, যা ১৯৭৫ সাল থেকে এ দেশে ছোট পরিসরে চাষ হচ্ছে। গবেষণাপত্রে বলা হয়, দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল না হওয়ায় দেশের সব অঞ্চলে রবি ও খরিফ দুই মৌসুমেই এর চাষ সম্ভব, তবে রবি মৌসুমই সবচেয়ে উপযুক্ত। বেলে থেকে এঁটেল, ৫.৭ থেকে ৮ পিএইচের মাটিতে এটি জন্মায়; গভীর ও শাখাযুক্ত প্রধান মূল মাটির নিচের স্তর থেকে আর্দ্রতা টেনে নেয় বলে খরার সময়েও গাছ টিকে থাকতে পারে। লেখকেরা একে লবণাক্ততার প্রতি মাঝারি সংবেদনশীল ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যার সহনসীমা ২ থেকে ১২ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার।
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, প্রতিটি বীজে ৪০ থেকে ৪৭ শতাংশ ভোজ্যতেল থাকে, আর সরিষা-রাই তেলের তুলনায় সূর্যমুখী তেলে লিনোলেইক ও লিনোলেনিক অ্যাসিডের মতো ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে এবং এতে ইরুসিক অ্যাসিড নেই। সাতক্ষীরার বেনারপোতায় ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ সালের দুই মৌসুমের মাঠ পরীক্ষায় বারি সূর্যমুখী-২ জাত এসভিএস ০০৯০১ জাতের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি বীজ দেয়; আর বারির সুপারিশকৃত সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনায় মাঝারি ব্যবস্থাপনার চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার চেয়ে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশ বেশি বীজ পাওয়া যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের হিসাবে ফসলটির আয়-ব্যয়ের একটি ধারণা মেলে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির রংপুর অঞ্চলের প্রতিবেদনে ডিএই সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, নভেম্বরের মাঝামাঝি সূর্যমুখীর বীজ বুনতে হয়, ১০০ থেকে ১১০ দিনে ফসল ঘরে তোলা যায়, প্রতি হেক্টরে ২,১০০ থেকে ২,৪০০ কেজি বীজ হয় এবং খরচ পড়ে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা, আর সেই মৌসুমে প্রতি কেজি বীজ বিক্রি হচ্ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। ফলন ও দাম জেলা, জাত ও বছরভেদে বদলায়; চলতি হিসাব জানতে কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা উচিত।
তেলের পরিমাণ অনেকটা বীজের মানের ওপর নির্ভর করে। ২০২৩ সালের মে মাসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের পরিচালক জসীম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমদানি করা হাইব্রিড বীজ থেকে ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ তেল পাওয়া যায়, কিন্তু দেশে ঠিকভাবে চাষ না হলে দানা অপরিপক্ব থাকে এবং ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি তেল বের হয় না; তাই তেল প্রক্রিয়াজাতকারীরা আমদানি করা বীজে বেশি আগ্রহী। বাসস জানায়, কাকুয়ার খেতগুলো ছিল হাইব্রিড টিএসএফ ২৭৫ জাতের।

ফুল কেন সূর্যের দিকে মুখ করে, মৌমাছি কেন জরুরি
জাগো নিউজ ২৪ ও বাসস দুটি প্রতিবেদনেই ফুলগুলোকে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকার কথা লেখা হয়েছে। গবেষণা এই ছবিটিকে আরও স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস ও ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার বিজ্ঞানীদের ২০১৬ সালের আগস্টে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, কচি সূর্যমুখী গাছ দিনে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সূর্যকে অনুসরণ করে এবং রাতে ঘুরে ভোরের আগেই আবার পূর্বমুখী হয়; কিন্তু পরিণত গাছ নড়াচড়া থামিয়ে দেয়, তখন ফুল পূর্ব দিকে মুখ করে থাকে। গবেষকেরা দেখান, গাছের ভেতরের সার্কাডিয়ান ঘড়িই এই চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, আর পূর্বমুখী ফুলে পরাগায়নকারী পতঙ্গ বেশি আসে।
এই আনাগোনা বীজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গবেষকদের ২০০৬ সালে প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়, মানুষের খাদ্য সরবরাহের ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদনে পরাগায়নকারী প্রাণী প্রয়োজন। ক্যালিফোর্নিয়ার হাইব্রিড সূর্যমুখী বীজের খেতে তারা ৩৩ প্রজাতির মৌমাছির ২০,৪৭২টি আগমন রেকর্ড করেন, যার ৭২ শতাংশ ছিল মধুমক্ষিকার; বুনো মৌমাছির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় মধুমক্ষিকার পরাগায়ন দক্ষতা পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল। প্রাকৃতিক আবাসের কাছের খেতগুলো বুনো মৌমাছির কাছ থেকে এই সহায়তা বেশি পেয়েছিল।
তাই টাঙ্গাইলের খেতে জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদক ও বাসস যে মৌমাছি আর প্রজাপতিকে মধু সংগ্রহ করতে দেখেছেন, তারা শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, ফসলেরও কাজ করছিল। বাসসও শেষ বিকেলে সূর্যমুখী থেকে মৌমাছিদের মধু সংগ্রহের একই দৃশ্যের কথা লিখেছে।

ভোজ্যতেলের আমদানি ও তেলবীজ চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ
আশেক পারভেজ সূর্যমুখী চাষ বাড়ানোর উদ্যোগকে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ২০২৩ সালের মে মাসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাতে জানায়, দেশে বছরে ২৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা, যার প্রায় ৮৮ শতাংশ আমদানি করতে হয়; বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে খরচ হয় ২৫৩ কোটি ডলার। তখন দেশে সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী থেকে প্রায় ৩ লাখ টন তেল উৎপাদন হতো। সরকার ধানের উৎপাদন না কমিয়ে ২০২৫ সাল নাগাদ মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ টন তেল দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছিল।
জসীম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দেশে সরিষাই প্রধান তেলবীজ, তারপর সূর্যমুখী; সূর্যমুখীর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা উপকূলের লবণাক্ত জমিতে, যেখানে বোরো ধান করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, সেই মৌসুমে দেশে ১৪ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে, আর সরকারের লক্ষ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ৩৪ হাজার ৬০০ হেক্টরে এর চাষ করা, যা থেকে ৫৩ হাজার ৪০০ টন বীজ ও ২০ হাজার ২৯২ টন তেল পাওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, সয়াবিনের মতো নয়, স্থানীয় ঘানিতে ভাঙালেই সূর্যমুখী থেকে সরাসরি তেল পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের তথ্য দিয়ে জানায়, পাঁচ বছরে দেশে সূর্যমুখী চাষের জমি ১৩.৭৭ শতাংশ বেড়েছে, আর তেলবীজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ২৩.৩৯ শতাংশ, বেড়েছে সরিষার চাষ। ডিএইর হিসাবে তেলবীজ হিসেবে সূর্যমুখীর সবচেয়ে বেশি চাষ হয় বরগুনায়। বরিশালে ডিএইর এক অতিরিক্ত পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, সরকার ভোজ্যতেল আমদানি ৪০ ভাগ কমানোর লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আলো কার্যালয়ে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা জানান, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩০ লাখ টন আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ১৫ লাখ টন পাম তেল ও ১০ লাখ টন সয়াবিন তেল; এতে খরচ হয় প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার, আর ২০৩০ সালের মধ্যে চাহিদা বেড়ে ৩৫ লাখ টন হতে পারে। তারা বলেন, দেশে তেলবীজের উৎপাদন বাড়াতে সঠিক বীজ, প্রযুক্তি ও নীতিসহায়তা দরকার। এই প্রেক্ষাপটেই টাঙ্গাইলের কর্মকর্তারা আমদানিনির্ভরতা কমানোর উপায় হিসেবে সূর্যমুখীর কথা বলেছিলেন।
প্রণোদনা, বীজ ও বাজার
টাঙ্গাইলের মতো জেলায় সূর্যমুখীর বড় অংশ চাষ হয় সরকারি সহায়তায়। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি বাসস জানায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৭০ হাজার ৫০ জন তালিকাভুক্ত কৃষকের মধ্যে প্রণোদনার বীজ ও সার বিতরণ শুরু করেছে। কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক কৃষক সূর্যমুখীসহ ১১ ধরনের রবি ফসলের যেকোনো একটির জন্য এক বিঘা (৩৩ শতক) জমির বিপরীতে বিনামূল্যে ফসলভেদে ১ থেকে ২০ কেজি বীজ, ১০ থেকে ২০ কেজি ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং ৫ থেকে ১০ কেজি মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার পান। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষকেরা সরকার অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে বীজ ও সার নেন, আর প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি কমিটি বিতরণ তদারক করে।
এই কর্মসূচি নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, যা দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় প্রকাশিত হয়, রবি মৌসুমের সূর্যমুখীসহ ১০ ফসলের জন্য ৬৪ জেলার ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ১৮৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার প্রণোদনা দেওয়া হবে। প্রত্যেক কৃষক একটি ফসলের জন্য এক বিঘা জমির বীজ ও সার বিনামূল্যে পান, যার মধ্যে সরিষা বা সূর্যমুখীর বীজ ছিল ১ কেজি। টাঙ্গাইলে বাসস জানায়, কাকুয়ার সূর্যমুখী চাষ হয়েছিল সরকারি প্রণোদনার আওতায়, আর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার জানান, কৃষকদের বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
কিছু এলাকায় ফসল ফলানোর চেয়ে বিক্রি করা কঠিন হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রংপুর অঞ্চলের চাষিরা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, অন্য ফসলের মতো সহজে সূর্যমুখীর বীজ বিক্রি করা যায় না; আগের বছর তারা প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। স্থানীয় এক কৃষি কর্মকর্তা জানান, ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে তেলবীজ ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে পটুয়াখালীর চাষিরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ন্যায্য দামে কেনার মতো ক্রেতা পেতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে; জসীম উদ্দিন বলেন, এর প্রধান কারণ এক্সট্র্যাকশন মেশিন ও বাজার সংযোগের অভাব এবং অনুন্নত বীজ, আর পাইকারেরা কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা দাম বলছিলেন।
২০২৬ সালের মার্চে টাঙ্গাইলের চাষিদের সামনে তখনো ফসল তোলার কাজ বাকি ছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, আর মো. রফিকুলের মতো কৃষকেরা অপেক্ষা করছিলেন তাদের এক বিঘার খেত কী ফল দেয়, তা দেখার জন্য।
ছবি: মোহিন রিয়াদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস, দৈনিক ইনকিলাব, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, অ্যাক্টা ইউনিভার্সিটাটিস অ্যাগ্রিকালচারি এট সিলভিকালচারি মেন্ডেলিয়ানি ব্রুনেনসিস (২০২৩), সায়েন্স (২০১৬), প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (২০০৬)





মন্তব্য
(০)