মুকুলের সময় অনাবৃষ্টি ও তাপ, তারপর কালবৈশাখী আর শিলাবৃষ্টি: এই বৈরী আবহাওয়ায় ২০২৬ সালের মৌসুমে দিনাজপুরে লিচুর ফলন কমে যাওয়ার শঙ্কায় ছিলেন চাষি ও বাগান কেনা ব্যবসায়ীরা। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ৮ মে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখন জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বলেছিল, ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি উল্লেখ করার মতো নয়।
মুকুল পোড়া থেকে শিলাবৃষ্টি
দিনাজপুর সদর উপজেলার মহব্বপুর গ্রামের লিচু চাষি অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, মৌসুমের শুরুতে জেলায় তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল, ভোরে কুয়াশাও ছিল, এতে মুকুল পুড়ে যায়। তাঁর ভাষায়, 'এখন আবার শুরু হয়েছে ঝড়-শিলাবৃষ্টি। সব মিলিয়ে লিচুর অবস্থা খারাপ।'
চাষিরা জানান, মৌসুমের শুরুতে মুকুল আর পরে গুটি দেখে তাঁরা ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। কিন্তু খরা ও তাপে প্রথমে মুকুল পুড়তে থাকে, পরে গুটি ঝরতে শুরু করে। মাঝে বৃষ্টিতে ঝরা থামলেও এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসে জেলায় ব্যাপক ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়। চাষিদের দাবি, মৌসুমের শুরুতে তেল সংকটের কারণে তাঁরা বাগানে পর্যাপ্ত সেচও দিতে পারেননি। এপ্রিলের শুরুতেও জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার এলুয়ারি ইউনিয়নে শিলাবৃষ্টিতে আম, লিচু ও আগাম বোরো ধানের ক্ষতির খবর দিয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাক।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের শঙ্কা
লিচুর জন্য পরিচিত সদর, বিরল, চিরিরবন্দর, খানসামা, কাহারোল ও বোচাগঞ্জ উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জাগো নিউজ জানায়, শিলাবৃষ্টিতে অনেক এলাকায় লিচু ঝরে পড়ছে, অনেক লিচু পচে যাচ্ছে। বাজারে আসার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে এই অবস্থায় লোকসানের শঙ্কায় ছিলেন চাষি ও বাগান লিজ নেওয়া ব্যবসায়ীরা।
বিরল উপজেলার চাষি রতন রায় বলেন, তাঁর বাগানে লিচু পচে ঝরে পড়ছে, গাছে ধরে রাখা যাচ্ছে না। একই উপজেলার রবিপুরের ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম রবিপুর ও মাধববাটিতে বোম্বাই লিচুর বাগান কিনেছিলেন; তিনি জানান, শিলাবৃষ্টিতে লিচু ফেটে ঝরে যাচ্ছে। সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের জুয়েল ইসলাম তিন একর জমিতে লিচু বাগান করেছেন; তাঁর হিসাবে বাগানের উৎপাদন আগের বছরের অর্ধেকে নেমেছে। হিমাগার না থাকায় প্রতি মৌসুমে বিপুল লিচু নষ্ট হয় বলে তিনি সরকারের পদক্ষেপ চান।
ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে গিয়ে মাধববাটিতে বাগান কেনা আব্দুর রহমান বলেন, আগের মৌসুমে দাবদাহে লিচু পুড়ে কালো হয়ে যাওয়ায় ১০০ টাকায় ১০০ লিচু বিক্রি করতে হয়েছিল। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ঝড়-বৃষ্টি চলতে থাকলে লিচুর গোড়ায় পচন ধরবে।

কৃষি বিভাগ বলছে ক্ষতি সামান্য
জেলা ডিএইর অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে লিচুর খুব একটা ক্ষতি হয়নি; কমবেশি এক থেকে দেড় হেক্টর জমির লিচু নষ্ট হয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো নয়। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানও তৈরি করা হয়নি। উপপরিচালক নুরুজ্জামান বলেন, তাপের কারণে লিচুর কিছুটা ক্ষতি হলেও এবার পর্যাপ্ত লিচু হয়েছে এবং চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান আশা প্রকাশ করেন, এবারও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে। বালাই দমনে কোন ওষুধ কতটুকু দিতে হবে, তা জানতে চাষিদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা উচিত।
ডিএইর জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জেলায় পাঁচ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়, বাগান ছিল পাঁচ হাজার ৪১৮টি, আর উৎপাদনের আশা ছিল ৩৭ হাজার ৫৯৩ মেট্রিক টন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মের মধ্যে লিচু বাজারে উঠতে শুরু করার কথা ছিল, তবে ঈদুল আজহার সময়ের পরিবহন সংকট বিবেচনায় মূল বেচাকেনা ঈদের পরে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

লিচুর জেলা দিনাজপুর
লিচু (Litchi chinensis) সাপিনডেসি গোত্রের ফল, যার আদি নিবাস দক্ষিণ চীন, মালয়েশিয়া ও উত্তর ভিয়েতনাম অঞ্চল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলো ডিএইর তথ্য উল্লেখ করে জানায়, দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হয় বোম্বাই লিচু, তিন হাজার ২২৫ হেক্টরে; এ ছাড়া চায়না-থ্রি, বেদানা, চায়না-টু, কাঁঠালি ও মাদ্রাজি জাতের চাষ হয়, আর প্রতি হেক্টরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন। বাসস সে মাসে জানায়, আগের বছর জেলায় পাঁচ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছিল এবং মুকুল আসা থেকে ফল তোলা পর্যন্ত তিন থেকে চার মাস লাগে।
ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দৈনিক ইত্তেফাক, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)