রূপচর্চায় গোলাপের ব্যবহার বহু পুরোনো। গোলাপজলের পাশাপাশি গোলাপের তেলও ত্বকের যত্নে ব্যবহার হয়ে আসছে। ঘরে বসে অলিভ অয়েলে গোলাপের পাপড়ি ভিজিয়ে সহজেই এক ধরনের গোলাপ-মিশ্রিত তেল তৈরি করা যায়। তবে মনে রাখা দরকার, এই ঘরোয়া তেল কারখানায় পাতন করে তৈরি ঘন সুগন্ধি গোলাপ তেল নয়; এটি গোলাপের পাপড়ির সুবাস মেশানো সাধারণ অলিভ অয়েল। এই লেখায় দুই ধরনের তেলের পার্থক্য, ঘরে তৈরির ধাপ এবং ত্বকে মাখার আগে কী সতর্কতা নেওয়া উচিত, তা তুলে ধরা হলো।
গোলাপের সুগন্ধি তেল কোথা থেকে আসে
বাণিজ্যিক গোলাপ তেলের প্রধান উৎস দামেস্ক গোলাপ (Rosa damascena), যা ইরানে ‘গোলে মোহাম্মদি’ নামে পরিচিত। ২০১১ সালে ইরানিয়ান জার্নাল অব বেসিক মেডিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত মাশহাদ মেডিক্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, ইরান, ইউরোপ, বুলগেরিয়া, তুরস্ক ও ভারতসহ বিশ্বের নানা দেশে এই গোলাপের চাষ হয়; ইরানের কাশান এর সবচেয়ে বিখ্যাত চাষ এলাকা। সুগন্ধি, ওষুধ ও খাদ্যশিল্পে ব্যবহারের জন্যই মূলত এই গোলাপ চাষ করা হয়।
একই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গোলাপ তেল পাতন করে তৈরি একটি উদ্বায়ী তেল এবং প্রায় ৩০০০ ভাগ ফুল থেকে মাত্র এক ভাগ তেল পাওয়া যায়। ভাপ দিয়ে পাতন করে যে তেল পাওয়া যায় তাকে বলা হয় ‘রোজ অটো’, আর দ্রাবক দিয়ে নিষ্কাশন করলে পাওয়া যায় ‘রোজ অ্যাবসোলিউট’। বুলগেরিয়ার কাজানলাক শহরের কাছের ‘গোলাপ উপত্যকা’ বিশ্বে গোলাপ আতরের অন্যতম প্রধান উৎপাদক এলাকা; ভারতের কনৌজ শহরও গোলাপ আতর তৈরির জন্য পরিচিত।


ত্বকের জন্য গবেষণায় কী জানা যায়
মাশহাদের ওই পর্যালোচনায় দামেস্ক গোলাপের ব্যাকটেরিয়ারোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণের কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যাকটেরিয়ারোধী ফলাফলগুলো এসেছে পরীক্ষাগারে, ডিস্ক, ওয়েল-ডিফিউশন ও মাইক্রোডাইলিউশন পদ্ধতিতে ই. কোলাই ও স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াসের মতো ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরীক্ষা করে। পর্যালোচনায় ক্ষত সারানো ও ত্বকের যত্নে গোলাপ তেলের প্রচলিত ব্যবহারের কথাও উল্লেখ আছে।
পরীক্ষাগারের এসব ফলাফল প্রমাণ করে না যে ঘরে তৈরি গোলাপ-মিশ্রিত তেল ব্রণ সারায় বা বয়সের ছাপ ঠেকায়। তাই ব্রণ, দাগ বা অন্য কোনো চর্মসমস্যায় নিজে চিকিৎসা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘরে গোলাপ-মিশ্রিত তেল তৈরির ধাপ
- একটি সসপ্যানে অল্প পানি ফুটিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে নিন।
- একটি পরিষ্কার কাচের পাত্রে ভালো মানের অলিভ অয়েল নিন এবং তাতে গোলাপের পাপড়ি থেঁতো করে ভিজিয়ে দিন।
- কাচের পাত্রের মুখ ঢেকে পাত্রটি গরম পানির পাত্রে বসিয়ে দিন।
- ২৪ ঘণ্টা পাত্রটি কুসুম গরম পানিতে রাখুন; পানি ঠান্ডা হয়ে গেলে প্রয়োজনমতো বদলে দিন।
- ২৪ ঘণ্টা পর ছাঁকনি দিয়ে তেল ছেঁকে নিন।
- তেল গাঢ় রঙের বোতলে ভরে রাখুন; রোদে বা গরম জায়গায় রাখবেন না।

ব্যবহারের নিয়ম ও প্যাচ টেস্ট
রাতে শোয়ার আগে কয়েক ফোঁটা তেল হাতে নিয়ে মুখে আলতো করে মালিশ করা যায়। চাইলে মধু বা অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে মেখে প্রায় ২০ মিনিট রেখে কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে ফেলা যায়।
তবে মুখে মাখার আগে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া জরুরি। আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি (এএডি) নতুন যেকোনো প্রসাধনী পরীক্ষার জন্য এই নিয়ম দিয়েছে:
- বাহুর নিচের দিক বা কনুইয়ের ভাঁজের মতো এমন জায়গা বেছে নিন, যেখানে জিনিসটি ঘষে বা ধুয়ে উঠে যাবে না; জায়গাটি একটি ছোট মুদ্রার সমান হলেই চলবে।
- স্বাভাবিকভাবে যতটা মাখেন, ততটাই দিন এবং ততক্ষণই রাখুন।
- ৭ থেকে ১০ দিন দিনে দুবার একই জায়গায় লাগান।
- এর মধ্যে ত্বক লাল হওয়া, চুলকানি বা ফোলাভাব না দেখা দিলে তবেই ব্যবহার করুন।
- প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব আলতো করে ধুয়ে ফেলুন এবং আর ব্যবহার করবেন না।
এএডি আরও সতর্ক করেছে, ‘সুগন্ধিহীন’ লেখা বা উদ্ভিদজাত উপাদানের প্রসাধনীতেও সুগন্ধি-সংক্রান্ত উপাদান থাকতে পারে। তাই ‘প্রাকৃতিক’ বলেই কোনো তেল সবার ত্বকে নিরাপদ, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ছবি: H. Zell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (অনলাইন ডেস্ক), ইরানিয়ান জার্নাল অব বেসিক মেডিক্যাল সায়েন্সেস (বসকাবাদি ও অন্যান্য, ২০১১), আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি, উইকিপিডিয়া (রোজ অয়েল)




মন্তব্য
(০)