টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষে মৌলভীবাজার জেলায় ধান কাটার ভরা মৌসুমে পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল, বুধবার জানায়, জেলার বেশির ভাগ পাকা ধান তখন পানির নিচে এবং ফসল ঘরে তুলতে না পেরে কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষকেরা জানান, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে যেসব খেতের ধান বন্যায় আক্রান্ত হয়নি, সেগুলোও ২৯ এপ্রিল সকালে ডুবে যায়।
কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদরে পানির নিচে খেত
জাগো নিউজের প্রতিনিধি জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখেন, বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। সেখানকার কৃষকেরা জানান, দুই দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শীত থেকে যে ফসলের যত্ন তাঁরা নিয়ে আসছিলেন, পানি যখন এল তখন সেই ধান পেকে কাটার উপযোগী হয়ে ছিল; অনেকের চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না।
এই বৃষ্টি ছিল গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলা বৃষ্টির অংশ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২৮ এপ্রিল রাতে জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মৌলভীবাজার জেলার উপজেলা শ্রীমঙ্গলে ১৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। ওই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ ১৫২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় ভোলায়; ফেনীতে ১৫১, কুমিল্লায় ১০৩ ও সিলেটে ৯২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। অধিদপ্তরের একজন আবহাওয়াবিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এটি মূলত কালবৈশাখীর মৌসুম; পশ্চিমবঙ্গে থাকা পশ্চিমা লঘুচাপটি শক্তিশালী থাকায় কালবৈশাখী বেশি হচ্ছে এবং মে মাসের ৩-৪ তারিখ পর্যন্ত এর পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সেদিন সন্ধ্যা ৬টার নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়, পরের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে, আর ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। বুধবার সকালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, সিলেট অঞ্চলসহ সারা দেশে ৩-৪ মে পর্যন্ত বৃষ্টি চলতে পারে এবং সিলেট অঞ্চলে ১-২ মে পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
কতটা ধান কাটা হয়েছিল
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের মৌসুমে মৌলভীবাজারে ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়, যেখানে প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত প্রায় ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল। হাওরের বাইরের এলাকায় প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল, যার মাত্র ১৭ শতাংশ কাটা হয়েছিল।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, 'হাওর এলাকায় এখন পর্যন্ত ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় কাটা হয়েছে ১৭ শতাংশ। নিমজ্জিত এলাকা থেকে পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান হয়তো রক্ষা হবে।'
এর ১১ দিন আগেও মৌসুমটি আশা জাগাচ্ছিল। ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল কাউয়াদীঘি হাওর থেকে প্রথম আলো জানায়, ডিএইর হিসাবে জেলায় বোরোর আবাদ একই ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর, যেখানে ব্রি ধান-৯২, ব্রি ধান-১০৮, ব্রি ধান-২৯ ও ব্রি ধান-২৮ জাত বেশি চাষ হয়েছে। তখন প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ধান থোড় অবস্থায়, প্রায় ১৫ শতাংশে ফুল এবং বাকি বেশির ভাগ জমির ধানের দানা পুষ্ট হয়ে গিয়েছিল; প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছিল। উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, সামগ্রিকভাবে ফলন ভালো, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলেও বড় সমস্যা হয়নি, তবে ভারী বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দুই সপ্তাহের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ হবে বলে তিনি আশা করেছিলেন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে হওয়া বৃষ্টিতে কাউয়াদীঘি হাওরের নিচু এলাকার কিছু জমিতে পানি জমে ধান তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পানি চলাচলের পথে থাকা বাঁধ কেটে দেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়, আর মনু নদ সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্পহাউস চালু থাকায় বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো গিয়েছিল।
২৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সোমবার (২৭ এপ্রিল) জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে এবং সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সতর্ক করা হয়েছে। কতটা ধান কাটা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্ষতির শঙ্কা প্রধানত বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায়, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ধান কাটা হয়ে গেছে।

'সবাই খালি হাতে ফিরছেন'
কমলগঞ্জের কৃষক কামাল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, 'ধান কাটার সময় আমার এক একর জমি ডুবে গেছে। কীভাবে বছরের বাকি সময় ভাত খাবো, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। শুধু আমি একা না, আমার মতো সব কৃষকের কপাল পুড়েছে। সবাই খালি হাতে ফিরছেন। চোখের সামনে ধানক্ষেত ডুবে গেলো, কিছুই করতে পারলাম না।'
সজিব আহমেদ নামের আরেক কৃষক বলেন, 'অনেক কষ্ট করে ধান চাষ করেছিলাম। ৮০০ টাকা মণ ধান বিক্রি করে আগাম টাকাও এনেছিলাম। এগুলো এখন কীভাবে পরিশোধ করবো? একদিকে মাথায় ঋণের বোঝা, অন্যদিকে ঘরে খাবার নেই। সবমিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছি।'
সজিব আহমেদ যে দামের কথা বলেছেন, সেই সপ্তাহে হাওরাঞ্চলের অন্য জায়গার কৃষকেরাও প্রায় একই দামের কথা জানাচ্ছিলেন। ২৯ এপ্রিল টিবিএস সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার এক কৃষকের বরাতে জানায়, মিলমালিকেরা ৮০০ টাকা মণ দরে ধান কিনছেন, অথচ ধান কাটার একজন শ্রমিককে দিনে দিতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে, ২২ এপ্রিল, কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে প্রথম আলো জানায়, কৃষকদের ভাষ্যে এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়, আর ধান কাটার একজন শ্রমিকের দিনের মজুরি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
সরকারি ক্রয়মূল্য ছিল এর চেয়ে বেশি। সিলেট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক টিবিএসকে বলেন, ধানের সরকারি দর মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরকারি ধান সংগ্রহ শুরু হবে।
বিপৎসীমার ওপরে নদী, বন্যার পূর্বাভাস
উজানের বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারের নদীগুলো ভরে উঠছিল। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ১১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। নেত্রকোনার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াঝাঞ্জাইল পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় বণিক বার্তা ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এই তথ্য প্রকাশ করে।
২৯ এপ্রিল সকালে টিবিএস কেন্দ্রটির পূর্বাভাস তুলে ধরে জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি বেড়েছে; সিলেট-সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ এবং নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে এবং আরও তিন দিন তা চলতে পারে। মনু, খোয়াই ও জুড়ী নদীর পানি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, যা মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। সার্বিকভাবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে বলে কেন্দ্রটি জানায়।
পাউবো ২৮ এপ্রিল একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলে, যার কাজ মাঠপর্যায়ের দপ্তর থেকে বন্যার তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২৩ এপ্রিলেই বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, ২৪ ও ২৫ এপ্রিল থেকে টেলিভিশনে টিকার দেওয়া শুরু হয়, আর প্রায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, জেলা প্রশাসকদের চাহিদা অনুযায়ী সিলেট ও ময়মনসিংহে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং সাড়াদানের ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মৌলভীবাজার ও তার নদী
মৌলভীবাজার সিলেট বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ২ হাজার ৭৯৯ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় জেলার উত্তরে সিলেট জেলা, পূর্ব ও দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্য এবং পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলা। জেলার সাতটি উপজেলা: কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, মৌলভীবাজার সদর, বড়লেখা, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল। মৌলভীবাজার ১৯৬০ সালে মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালে জেলা হয়। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২১ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৭। প্রধান নদী মনু, ধলাই, জুড়ী ও লংলা; প্রধান জলাভূমি হাকালুকি, হাইল ও কাউয়াদীঘি হাওর। কৃষিই জেলার প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আর এখানে রয়েছে বহু চা-বাগান ও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট।
২৮ এপ্রিল বিপৎসীমা ছাড়ানো মনু নদীর উৎপত্তি ভারতের ত্রিপুরার সাক্কানক্লাং পর্বতশ্রেণির কাহোইসিব চূড়ার নিচে। বাংলাপিডিয়া জানায়, উজানে নদীটি সরু গিরিখাতের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে, যার পাথুরে খাড়া পাড় প্রায়ই ৩০ মিটার বা তার বেশি উঁচু; সমতলে নেমে এটি চওড়া, ধীরগতির, আঁকাবাঁকা নদী হয়ে যায়। কুলাউড়া উপজেলা দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং মনুমুখে কুশিয়ারা নদীতে মেশে। মনুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার; এটি ত্রিপুরার দীর্ঘতম নদী।
কমলগঞ্জের প্রধান নদী ধলাইয়ের উৎপত্তিও ত্রিপুরার পাহাড়ে। প্রায় ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি কমলগঞ্জ উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে এবং রাজনগর উপজেলায় মনু নদীতে মেশে। দুটি নদীই সীমান্তের ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসায় সেখানকার অববাহিকায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত মৌলভীবাজারের সমতলে চলে আসে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তিন উপজেলার একটি কমলগঞ্জ, আয়তন ৪৮৫ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার; জেলার এই অংশটি ত্রিপুরা ও আসাম সীমান্তঘেঁষা। বাংলাপিডিয়া এর প্রধান ফসল হিসেবে আমন ও আউশ ধান, গম, আখ, চা, সরিষা, আলু, পান ও সবজির নাম দিয়েছে। এর উত্তরে রাজনগর উপজেলা, আয়তন ৩৩৮ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার; মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদী এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, কাউয়াদীঘি হাওর এখানেই, আর ধান, চা, আলু, সরিষা, আদা, হলুদ ও সবজি এর প্রধান ফসল। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে রাজনগরে আয়ের উৎসের ৫১ দশমিক ৬১ শতাংশই কৃষি।
কাউয়াদীঘি হাওর ও মনু নদ সেচ প্রকল্প
সদর ও রাজনগরের বোরো জমির বড় অংশ কাউয়াদীঘি হাওর ঘিরে, যা দুই উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলো জানায়, ডিএইর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের হিসাবে কাউয়াদীঘি হাওরাঞ্চলে মনু নদ সেচ প্রকল্পের আওতায় বোরো জমি ১০ হাজার হেক্টর। ২০২৪ সালের এপ্রিলে একই পত্রিকা ডিএইর বরাতে জানায়, প্রকল্পের সেচসুবিধা পেয়ে হাওরপারের যেসব জমিতে আগে বোরো চাষ হতো না, গত কয়েক বছর ধরে কৃষকেরা সেসব জমিতেও বোরো চাষ করছেন।
প্রকল্পের অধীনে করাদাইর খালের ওপর কাশিমপুর পাম্পহাউস কাউয়াদীঘি হাওরের বাড়তি পানি পাম্প করে কুশিয়ারা নদীতে ফেলে, যাতে ধান কাটার সময় বোরো ফসল ডুবে না যায়। দ্য ডেইলি স্টার ২০১১ সালের এপ্রিলে জানায়, ১৯৮০ সালে পাম্পহাউসে আটটি পাম্প বসানো হয়েছিল, যার প্রতিটি সেকেন্ডে ১৫০ ঘনফুট পানি নিষ্কাশন করতে পারে; সে সময় এর মাত্র তিনটি চালু ছিল।
হাওরপারের কৃষকেরা বহুদিন ধরেই বৈশাখের সপ্তাহগুলোকে ভয় পান। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির মৌলভীবাজার সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি প্রথম আলোকে বলেন, বৈশাখ মাসে ধান পাকার সময় বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যায়; তখন কাশিমপুর পাম্পহাউস ঠিকমতো কাজ করলে কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে হাওরপারের কাদিপুর গ্রামের কৃষকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁদের বড় ভয় শিলাবৃষ্টি, যাকে তাঁরা 'পাথর' বলেন।

বোরো, হাওরের একমাত্র ফসল
হাওর হলো গামলার মতো বড় এক টেকটোনিক নিম্নভূমি, যা বর্ষায় পানিতে ভরে যায় এবং পরে বেশির ভাগ শুকিয়ে যায়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাওর অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল রয়েছে; অববাহিকাটি পুরো সুনামগঞ্জ জেলা, হবিগঞ্জের বেশির ভাগ এবং সিলেট ও মৌলভীবাজারের অংশজুড়ে। শুধু হাকালুকি হাওরের আয়তনই প্রায় ১৮১ বর্গকিলোমিটার, যা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের দুটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত; প্রায় দুই লাখ মানুষ এর সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব জলাভূমির নিষ্কাশিত প্রান্তে বোরো চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।
বোরো শুষ্ক মৌসুমের ধান। শীতে এর চারা রোপণ হয় এবং ফসলটি সেচনির্ভর; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী স্থানীয় জাতের বোরো কাটা হয় এপ্রিল-মে মাসে, উচ্চফলনশীল জাতের মে-জুন মাসে। কাউয়াদীঘি এলাকায় পৌষের শেষ ও মাঘের শুরুতেই চারা রোপণ শেষ হয়েছিল বলে ২০২৫ সালে প্রথম আলো জানায়। হাওরের বেশির ভাগ জমি বছরের বাকি সময় পানির নিচে থাকে, তাই কৃষক সেখান থেকে শুধু বোরোই পান; ধান কাটার সময়ের আগাম বন্যা তাই একটি পরিবারের সারা বছরের খোরাক কেড়ে নিতে পারে, যে ভয়ের কথা কামাল আহমেদ বলেছেন।
এই ফসলের গুরুত্ব জেলার সীমা ছাড়িয়ে। টিবিএসের তথ্যমতে, দেশের বেশির ভাগ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে, যার প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরভুক্ত সাত জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। ডিএই জানায়, ২০২৬ সালে এই সাত জেলায় ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, এর মধ্যে হাওরে ৪ দশমিক ৫৫ লাখ এবং হাওরের বাইরে ৫ দশমিক ০৮ লাখ হেক্টর। ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল, প্রায় অর্ধেক ফসল তখনো মাঠে ছিল এবং মাঠে থাকা ধানের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্যার ঝুঁকিতে ছিল বলে ডিএই জানায়।
চাষ করা জাতও বদলাচ্ছিল। ২০২২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) গবেষকেরা জানান, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অবমুক্ত দুটি জাত ব্রি ধান-২৮ ও ব্রি ধান-২৯ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বোরো জমির প্রায় ৭০ শতাংশ জুড়ে ছিল; কিন্তু ব্রি ধান-২৮ সবচেয়ে কম ফলন দিচ্ছিল ও তাতে পোকার আক্রমণ ছিল সবচেয়ে বেশি, আর কিছু জায়গায় ব্রি ধান-২৯ নেক ব্লাস্টে আক্রান্ত হচ্ছিল। তাঁদের পরীক্ষায় বোরো মৌসুমে সবচেয়ে ভালো ফলন দেয় ব্রি ধান-৮৮, ব্রি ধান-৯৬ ও ব্রি ধান-৯২, আর ব্রি ধান-২৯ এর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ফলন-সুবিধা দেখায় ব্রি ধান-৯২ ও ব্রি ধান-৮৯। মৌলভীবাজারে ডিএই ২০২৪ সালে জানিয়েছিল, সে বছর ব্রি ধান-৮৮, ৮৯ ও ৯২ জাত বেশি চাষ হয়েছে।
আগের বছরগুলোর আগাম বন্যা
বাংলাপিডিয়ার ভাষায় আকস্মিক বন্যায় 'পানি হঠাৎ বাড়ে এবং হঠাৎ কমে'; বাংলাদেশে এই বন্যা আসে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নেমে আসা পাহাড়ি অববাহিকা থেকে, সাধারণত তা স্বল্পস্থায়ী হলেও কবে কতটা তীব্র হবে তা আগে থেকে বলা কঠিন, আর খরস্রোতা নদীগুলোতে এক বছরেই কয়েকবার এমন বন্যা হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে ২০১৭ সালে। ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন নদী উপচে মৌলভীবাজারে অন্তত ১২ হাজার ৮০০ একর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে; হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর প্রায় পাকা ধান এবং সুনামগঞ্জে অন্তত ২৭ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। সেই বছরের কথা স্মরণ করে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো লেখে, ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জের হাওরে অকালবন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে সব ফসল তলিয়ে যায়, জেলায় খাদ্যসংকট দেখা দেয়, দেশে চালের দাম বেড়ে যায় এবং সরকার জেলার প্রায় দুই লাখ কৃষক পরিবারকে টানা এক বছর খাদ্যসহায়তা দেয়।
২০২৬ সালে বৃষ্টি চরমে ওঠার আগেই অঞ্চলজুড়ে ঝুঁকি টের পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথম আলো ২৭ এপ্রিল জানায়, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে; শনিবার (২৫ এপ্রিল) পর্যন্ত কাটা হয়েছে ৭৮ হাজার ২২৮ হেক্টরের ধান, অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় ৫ হাজার ৫০ হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে এবং মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় মাঠে থাকা ধানের অর্ধেক তখনো পাকেনি। পাউবো সেবার জেলায় ১৪৫ কোটি টাকা প্রাক্কলনে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছিল, আর সেখানকার নির্বাহী প্রকৌশলী সতর্ক করেছিলেন যে বৃষ্টিতে বাঁধের মাটি এমনিতেই দুর্বল হয়ে আছে।
কৃষকদের প্রতি পরামর্শ ও সরকারি উদ্যোগ
সেই মাসে হাওর জেলাগুলোর কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ছিল, পুরোপুরি পাকার অপেক্ষা না করে ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কেটে ফেলা। ২২ এপ্রিল প্রথম আলোতে কিশোরগঞ্জের ডিএই উপপরিচালক এই পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করেন যে শিলাবৃষ্টি ও আগাম পানিতে ক্ষতি হতে পারে; ২৮ এপ্রিল সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ৮০ শতাংশের বেশি পেকে যাওয়া ধান দ্রুত কেটে ফেলতে কৃষকদের বলা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের কর্মকর্তারা জানান, শ্রমিকসংকট এবং জলাবদ্ধ হাওরে কম্বাইন হারভেস্টার নামাতে না পারায় ধান কাটার গতি কমে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের একজন অতিরিক্ত পরিচালক ২৯ এপ্রিল টিবিএসকে বলেন, বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে এবং হারভেস্টার দিয়েও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
২৯ এপ্রিল যাঁদের খেত ইতিমধ্যে পানির নিচে, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদরের সেই কৃষকদের ভরসা ছিল উপপরিচালকের কথাটুকুই: নিমজ্জিত এলাকা থেকে পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান হয়তো রক্ষা পাবে।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, প্রথম আলো, বণিক বার্তা, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)