ঢাকার প্রায় যেকোনো ভবনের ওপরের তলা থেকে তাকালে চোখে পড়ে সারি সারি ফাঁকা কংক্রিটের ছাদ। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছিল, রাজধানীতে প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাদ আছে, যার আয়তন প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর এবং এর বেশির ভাগই অব্যবহৃত। ড্রোন জরিপে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার মাত্র ২ শতাংশ ছাদে বাগান পাওয়া গিয়েছিল।
সেই কংক্রিটের ওপর শহরের একটি পরিবার যা রাখতে পারে, তার মধ্যে ড্রামে লাগানো কলমের আমগাছ সবচেয়ে আনন্দের একটি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্য এগ্রো নিউজ শহরের বাসিন্দাদের জন্য একটি ছোট নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল, যাঁরা ছাদে দু-চারটি আমগাছ লাগাতে চান: কোন জাত বেছে নেবেন, ড্রাম কীভাবে তৈরি করবেন এবং কলমের চারা কীভাবে লাগাবেন ও যত্ন নেবেন। এই লেখায় সেই নির্দেশিকা রাখা হয়েছে এবং তা মিলিয়ে দেখা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাপিডিয়া এবং সেই তারিখ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে।
এখানে জানবেন ছাদে আমগাছ কেন লাভজনক, ড্রামের জন্য কোন জাত উপযোগী, চারা কেন কলমের হতে হবে, কীভাবে লাগাবেন, আমগাছে সার ও সেচ নিয়ে ডিএই কী পরামর্শ দেয়, কোন পোকা ও রোগের দিকে নজর রাখতে হবে এবং সাহায্যের জন্য কোথায় যাবেন।
শহরের ছাদে আমগাছ কেন
২০২৪ সালের অনেক আগেই ঢাকায় ছাদবাগান ছড়িয়ে পড়ছিল। ২০১৯ সালের এপ্রিলে দ্য ডেইলি স্টার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি জরিপের খবর দেয়। ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মহাখালী ডিওএইচএস ও উত্তরার ২ হাজার ৭০০ ভবনে চালানো ওই জরিপে দেখা যায়, ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ ছাদ বাগানের কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
জরিপের নেতৃত্ব দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুজ্জামান পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, যেসব এলাকায় ছাদবাগান বেশি, গরমের দিনে সেসব এলাকা তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে; সবুজের অভাবের কারণে তাপমাত্রার পার্থক্য ১ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়। একই প্রতিবেদনে ডিএইর কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক একটি প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক গোলাম মারুফ বলেছিলেন, ৫ হাজার বর্গফুটের একটি ছাদবাগান চাষ শুরুর এক বছরের মধ্যে একটি পরিবারের দৈনিক সবজির চাহিদা মেটাতে পারে।
নগর কর্তৃপক্ষও ছাদবাগানকে উৎসাহ দিতে শুরু করেছিল। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ছাদবাগানের জন্য হোল্ডিং ট্যাক্সে ১০ শতাংশ ছাড় দিয়েছিল। ঢাকা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা উত্তরের মেয়র ছাদকৃষি করা বাসিন্দাদের জন্য ১০ শতাংশ ছাড়ের পরিকল্পনার কথা জানান, আর এর নির্দেশিকা তৈরিতে সহায়তা করছিল এফএও।
বার্তা সংস্থা ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৪ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় ছাদবাগানের জন্য হোল্ডিং ট্যাক্সে ১০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দেন। তিনি বলেছিলেন, তাপমাত্রা কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে আম: সংখ্যায় ফলের রাজা
আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা, এটি অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের উদ্ভিদ। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, আমের আদি নিবাস সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল, যার মধ্যে বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমার পড়ে; আমকে বলা হয় ফলের রাজা। দেশে প্রায় ১০০ জাতের আম চাষ হয়, প্রধানত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুরে। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসলই আম।
বাংলাপিডিয়া ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা ও লতা বোম্বাইকে উৎকৃষ্ট কলমের জাতের মধ্যে গণ্য করে। বীজ থেকে হওয়া স্থানীয় আম, যাকে দেশি বা গুটি আম বলা হয়, সেগুলোর কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই এবং গাছভেদে মানও আলাদা।
উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ টন, অর্থাৎ প্রতি চারটি আমের একটি, ছিল আম্রপালি; ডিএইর কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এই জাত দেশের ৬৪ জেলাতেই চাষ হচ্ছে। সাড়ে ৪ লাখ টন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল হিমসাগর, আর শীর্ষ পাঁচের বাকি তিনটি ছিল রুনিভাঙ্গা, আশ্বিনা ও ল্যাংড়া।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। গবেষকদের হিসাবে দেশে ৭২টির বেশি জাতের আম আছে, যার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়, যার অর্ধেকে আম্রপালি।
দেশে আমের ফলন কেন দীর্ঘদিন অন্য আম উৎপাদনকারী দেশের চেয়ে কম ছিল, বাংলাপিডিয়া তারও কারণ দেখিয়েছে: পুরোনো ও অনুৎপাদনশীল গাছ, অপর্যাপ্ত পরিচর্যা, দুর্বল উদ্ভিদ সুরক্ষা, বীজের চারার ব্যবহার এবং নির্বিচারে গাছ কাটা। প্রমাণিত জাতের ভালো কলমের চারা দিয়ে যিনি ছাদে শুরু করেন, তিনি এর প্রথম ও চতুর্থ সমস্যা শুরুতেই এড়িয়ে যান।
ড্রামের জন্য জাত বাছাই
মূল নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, সব জাতের আমই ছাদে চাষ করা যায়, তবে টবে বা ড্রামে ভালো ফলন দেয় এমন জাত বেছে নেওয়া উচিত। এর প্রথম পছন্দ ছিল বারি আম-৩, যার পরিচিত নাম আম্রপালি: গাছ ছোট আকারের, ফল মাঝারি ও খেতে বেশ সুস্বাদু, আর প্রায় প্রতিবছরই ফল দেয়। এ কারণেই নির্দেশিকা ছাদে আম্রপালিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলেছিল।
আম্রপালির জন্ম ভারতে। ১৯৭১ সালে দিল্লির ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে পীযূষকান্তি মজুমদার দশেরি ও নীলম জাতের সংকরায়ণে এটি উদ্ভাবন করেন। গাছটিকে বামন আকারের ও নিয়মিত ফলদানকারী বলা হয়, ফল ধরে থোকায় থোকায়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রথম আলো জানায়, ১৯৭৮ সালের দিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক কর্মকর্তা এর চারা দেশে আনেন, আর ১৯৯৬ সালে বারি জাতটিকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করে।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিষ্টতা মাপার ব্রিক্স মানে আম্রপালির মাত্রা প্রায় ২৬, যা প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ; ফলের প্রায় ৭২ শতাংশ খাওয়া যায়, আর জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত এর মৌসুম। গাজীপুরে বারির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সরফ উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, এই আম সহজে পচে না এবং মৌসুমে অনেক দিন পাওয়া যায়।
ছোট জায়গার জন্য আরও দুটি বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যোক্তা মুনজের আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, আম্রপালি রোপণের দ্বিতীয় বছর থেকেই ফল দেয় এবং অন্য জাতের তুলনায় এর গাছ কম জায়গা নেয়, ফলে কম জমিতে বেশি গাছ লাগানো যায়।
আরও বিকল্প আছে। ডিএইর বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) পোর্টালের ফসল নির্দেশিকায় বারি আম-১ থেকে বারি আম-৯ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এফটিআইপি বাউ আম-১, ২, ৩, ৯ ও ১০ জাতের নাম আছে; সেখানে বলা হয়েছে, বাউ আম-৯ ও বাউ আম-১০ বছরের যেকোনো সময় লাগানো যায়। মূল নির্দেশিকাতেও বাউ আমের জাত ও লতা বোম্বাইকে ছাদের উপযোগী বলা হয়েছিল। বারির সরফ উদ্দিন ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, বারি আম-৪, কাটি ও কলা আমও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে।

চারা কেন কলমের হতে হবে
আঁটি থেকে হওয়া আমগাছ মাতৃগাছের মতো হয় না। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, কলমের মাধ্যমে অঙ্গজ বংশবিস্তার মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে, যদিও গ্রামে এখনো বীজের চারা ব্যবহার হয়। মাঠে কলমের গাছ মোটামুটি চতুর্থ বছরের মধ্যে ফল দেয়, বীজের গাছে লাগে আরও কয়েক বছর, আর ফলবান কলমের গাছ প্রায় ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত ফলন দিয়ে যায়।
ছাদের জন্য এর গুরুত্ব দ্বিগুণ: পরিচিত জাতের কলমের চারা থেকে আপনি সেই ফলই পান, যার জন্য দাম দিয়েছেন, আর গাছ তাড়াতাড়ি ফল দেয়। মূল নির্দেশিকায় প্রতিটি ড্রামের জন্য একটি সুস্থ, সবল কলমের চারা বেছে নিতে বলা হয়েছিল।

কখন লাগাবেন, ড্রাম কীভাবে তৈরি করবেন
ডিএইর বামিস নির্দেশিকা আম লাগানোর দুটি সময় দিয়েছে: জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় (মে-জুন) এবং ভাদ্র-আশ্বিন (আগস্ট-সেপ্টেম্বর)। বাগানে প্রতি গর্তে একটি চারা, গর্তের মাপ ১ মিটার × ১ মিটার × ১ মিটার, চারা থেকে চারার দূরত্ব ৮ থেকে ১০ মিটার, আর গর্ত ভর্তির ১০ থেকে ১৫ দিন পর চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাপিডিয়া বলছে, গভীর, পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত দোআঁশ মাটিতে আম সবচেয়ে ভালো হয় এবং মাটির আদর্শ পিএইচ ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫। ছাদে গর্তের জায়গা নেয় ড্রাম, তাই ড্রাম কেমন তৈরি হলো তার ওপরই গাছের বৃদ্ধি নির্ভর করে। মূল নির্দেশিকার ধাপগুলো ছিল এমন:
- প্রতিটি গাছের জন্য ২০ ইঞ্চির একটি রঙিন ড্রাম বা সমান মাপের টব সংগ্রহ করুন।
- ড্রামের তলায় তিন থেকে পাঁচটি ছিদ্র করুন, যাতে গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে।
- ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে ঢেকে দিন, যাতে মাটি ধুয়ে না যায়।
- দোআঁশ মাটির সঙ্গে গোবর মেশান, সঙ্গে দিন কাঠের ছাই, হাড়ের গুঁড়া ও সরিষার খৈল এবং টিএসপি ও পটাশ সার।
- এই মিশ্রণ দিয়ে ড্রাম ভরে পানিতে ভিজিয়ে ১৫ দিন রেখে দিন।
- এরপর মাটি কিছুটা খুঁচিয়ে দিয়ে আরও চার-পাঁচ দিন একইভাবে রাখুন, যতক্ষণ না মাটি ঝুরঝুরে হয়।
মূল নির্দেশিকায় প্রতিটি উপকরণের নির্দিষ্ট পরিমাণও দেওয়া ছিল। কিন্তু ডিএই বা বারি মাঠের গর্তের বাইরে ড্রামের জন্য আলাদা কোনো পরিমাণ প্রকাশ করেনি, তাই সেই পরিমাণগুলো এখানে রাখা হয়নি। এই মাপের ড্রামে কতটা সার দিতে হবে, সে বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পরামর্শ দিতে পারেন।
অপেক্ষার সময়টি মাঠের পরামর্শের সঙ্গেও মেলে: ডিএই গর্ত ভর্তির পর চারা লাগানোর আগে ১০ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে বলে, যাতে সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়।
চারা রোপণ ও প্রথম কয়েক মাসের যত্ন
মাটি ঝুরঝুরে হলে কলমের চারা লাগানোর সময়। মূল নির্দেশিকার পদ্ধতি ছিল:
- চারাটি ড্রামের মাঝখানে সোজা করে বসান।
- গোড়ার চারপাশে মাটি কিছুটা উঁচু করে দিন এবং হাত দিয়ে চেপে চেপে শক্ত করে দিন, যাতে গোড়া দিয়ে বেশি পানি ঢুকতে না পারে।
- একটি সোজা কাঠির সঙ্গে চারাটি বেঁধে দিন।
- প্রথম দিকে পানি কম দিন, তারপর ধীরে ধীরে পানির পরিমাণ বাড়ান।
- ড্রামটি এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে প্রায় সারা দিন রোদ পড়ে।
অন্য দেশের সম্প্রসারণ পরামর্শও এর দুটি বিষয়ে একমত। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ির বাগানে আম চাষ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার নির্দেশিকা বলছে, ভালো বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য আমগাছ পূর্ণ রোদে লাগাতে হবে, আর চারায় খুঁটি দিলে তারের বদলে প্রাকৃতিক আঁশের সুতলি দিয়ে বাঁধতে হবে। ডিএই বলছে, দ্রুত বৃদ্ধির জন্য চারাগাছে ঘন ঘন সেচ দিতে হয়, আর বেশি খরায় গাছের গোড়ায় সকাল-বিকেল পর্যাপ্ত পানি দিতে হয়।
ডিএইর পরামর্শ, শিলাবৃষ্টিতে চারাগাছ হেলে পড়লে তা সোজা করে দিতে হবে এবং প্রয়োজনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। গাছের গোড়ার মাটি মাঝে মাঝে আলগা করে আগাছা তুলে ফেলারও পরামর্শ দেয় সংস্থাটি, কারণ আগাছা গাছের খাবারে ভাগ বসায়।
ছাদে আরেকটি কাজ হলো গাছের আকার নিয়ন্ত্রণ। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার পরামর্শ, প্রতিবছর ওপরের দিকের কয়েকটি বাছাই করা ডাল গোড়া থেকে ছেঁটে দিলে গাছ নিচু থাকে, স্প্রে ও ফল পাড়াও সহজ হয়।
সার ও সেচ: ডিএই কী বলে
ডিএইর বামিস নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাগানে চারা রোপণের সময় ১ মিটার মাপের প্রতিটি গর্তে দিতে হয় ২২ কেজি গোবর, ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫৫০ গ্রাম টিএসপি, ৩০০ গ্রাম এমওপি, ৩০০ গ্রাম জিপসাম ও ৬০ গ্রাম জিংক সালফেট।
পূর্ণবয়স্ক ফলন্ত গাছের জন্য বছরে দিতে হয় ৫০ কেজি গোবর, ২ কেজি ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি, ৫০০ গ্রাম জিপসাম ও ২৫ গ্রাম জিংক সালফেট। এই সার দুই কিস্তিতে দিতে হয়: প্রথমবার জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে, দ্বিতীয়বার আশ্বিন মাসে।
এই হিসাব মাটিতে লাগানো গাছের জন্য। ২০ ইঞ্চির ড্রামে মাটি অনেক কম ধরে, তাই মাঠের পরিমাণ ড্রামে ঢালা যাবে না। এই হার থেকে বোঝা যায় আমগাছের কোন পুষ্টি কখন লাগে; টব বা ড্রামের জন্য পরিমাণ জেনে নিতে হবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে।
গাছে ফল ধরা শুরু হলে সেচের নিয়ম বদলায়। ডিএইর পরামর্শ, ফলন্ত গাছে মুকুল বের হওয়ার তিন মাস আগে থেকে সেচ বন্ধ রাখতে হবে, তারপর মুকুল ফোটার শেষ পর্যায়ে একবার এবং আম মটরদানার আকার পেলে আবার সেচ দিতে হবে। চারাগাছের বেলায় অবশ্য ঘন ঘন সেচের পরামর্শ।
মুকুল, পোকামাকড় ও রোগ
বাংলাপিডিয়া বলছে, জানুয়ারি থেকে মার্চে আমের মুকুল আসে, আর এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়া ফসলের ক্ষতি করে। প্রতি হাজার ফুলের মধ্যে মোটামুটি এক বা দুটি পরিণত ফলে পরিণত হয়, আর একটি মুকুলে দু-তিনটি আম টিকলেই ফলন সন্তোষজনক। হালকা বৃষ্টি ফলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, কিন্তু ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কচি আম ঝরে পড়ে।
নার্সারি থেকে পূর্ণবয়স্ক গাছ পর্যন্ত প্রায় তিন ডজন প্রজাতির পোকা আমগাছ আক্রমণ করে। বাংলাপিডিয়া প্রধান পোকা হিসেবে হপার বা শোষক পোকা, আমের ভোমরা পোকা (উইভিল), কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা, ডগা ছিদ্রকারী পোকা ও ফলের মাছি পোকার নাম বলেছে; প্রধান রোগ এনথ্রাকনোজ, সুটি মোল্ড বা ঝুল রোগ, পাতা ঝলসানো, আগামরা, পাউডারি মিলডিউ ও ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ।
ডিএইর বামিস নির্দেশিকা যে দমনব্যবস্থা দিয়েছে:
- হপার পোকা: সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলিলিটার মিশিয়ে পুরো গাছে স্প্রে; প্রথমবার মুকুল ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হলে, দ্বিতীয়বার আম মটরদানার মতো হলে।
- সুটি মোল্ড বা ঝুল রোগ, যা হপার পোকার আক্রমণের পর দেখা দেয়: সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক ১০ লিটার পানিতে ৪০ গ্রাম, ১০ দিন পর পর দুই-তিনবার শেষ বিকেলে।
- পাউডারি মিলডিউ: একই সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক ১০ লিটারে ৪০ গ্রাম, পাঁচ থেকে সাত দিন পর পর দুই-তিনবার শেষ বিকেলে।
- এনথ্রাকনোজ (পচা রোগ): ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ১০ লিটারে ২০ গ্রাম; প্রথমবার মুকুল ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে, আবার আম মটরদানার মতো হলে।
- আমের ভোমরা পোকা: মুকুল আসার আগেই ব্যবস্থা; ফেনিট্রোথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ১০ লিটারে ২০ মিলিলিটার, ১০ দিন পর পর দুই-তিনবার।
নির্দেশিকায় সতর্কতাও আছে: ব্যবহারের আগে লেবেল ভালো করে পড়ুন, নিরাপত্তা পোশাক পরুন, স্প্রের সময় ধূমপান বা পানাহার করবেন না, স্প্রে করা জায়গার পানি যেন মুক্ত জলাশয়ে না মেশে, আর স্প্রের অন্তত সাত থেকে ১৫ দিন পর ফল বাজারে তুলুন। ছাদের গাছ বসতঘরের পাশেই, অনেক সময় প্রতিবেশীর জানালার কাছেও থাকে, তাই যেকোনো স্প্রের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

ফল সংগ্রহ, পুষ্টি ও কোথায় সাহায্য পাবেন
প্রথম আলোর তথ্যমতে, আম্রপালি পাকে জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত। পরিপক্ব কাঁচা আমের জন্য ডিএই একটি সহজ গরম পানি শোধন পদ্ধতির কথা বলেছে: আম পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ৫২ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানিতে ঠিক পাঁচ মিনিট রেখে একসঙ্গে তুলে নিতে হবে, তারপর শুকিয়ে প্যাকেট করতে হবে। সংস্থাটির হিসাবে, এভাবে শোধন করা আম সাধারণ আমের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি ভালো থাকে।
ডিএইর নির্দেশিকায় ১০০ গ্রাম পাকা আমের পুষ্টিমানও দেওয়া আছে: ৯০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৮ হাজার ৩০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন, ৭৮ দশমিক ৬ গ্রাম পানি, ২০ গ্রাম শর্করা, ১ গ্রাম আমিষ, শূন্য দশমিক ৭ গ্রাম স্নেহ, শূন্য দশমিক ৭ গ্রাম আঁশ, ২০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম লৌহ, ৪১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১। সেখানে বলা হয়েছে, পাকা আমে প্রচুর ভিটামিন এ থাকে।
জাত বাছাই, ড্রামে সারের পরিমাণ কিংবা সহজে দমন না হওয়া পোকার সমস্যায় প্রথমে যেতে হবে ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিসে। ডিএইর বামিস পোর্টালে এখানে ব্যবহৃত আমের নির্দেশিকাসহ বিভিন্ন ফসলের চাষপদ্ধতি প্রকাশ করা হয়, আর আম্রপালিকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করা বারির প্রধান কার্যালয় গাজীপুরে।
ছবি: উইকি রুহান / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস), বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএনবি, উইকিপিডিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন





মন্তব্য
(০)