গরমের মৌসুমে পাকা আম দিয়ে তৈরি নানা পদ সবার প্রিয়, আর লম্বা গ্লাসে স্তরে স্তরে সাজানো ঠান্ডা মিষ্টি আমের ফালুদা তার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ডেজার্ট। ২০২৬ সালের ১ জুন, যখন বাজারে পাকা আম আসতে শুরু করেছে, জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগ ঘরে হাতের কাছের কিছু সাধারণ উপকরণ দিয়ে আমের ফালুদা বানানোর একটি রেসিপি প্রকাশ করে। এতে লাগে পানিতে ভেজানো তোকমা, সেদ্ধ সাবুদানা ও নুডলস, জেলির কিউব, চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে ঘন করা দুধ, কিউব করে কাটা একটি আম, ব্লেন্ড করা আরেকটি আমের পিউরি এবং ওপরে এক স্কুপ ভ্যানিলা আইসক্রিম। এই প্রতিবেদনে সেই রেসিপি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো; সঙ্গে আছে ফালুদার ইতিহাস, সে সময় কোন কোন জাতের আম বাজারে ছিল, প্রধান উপকরণগুলো আসলে কী, এবং চিনি খাওয়া ও ঘরে দুধ, ফল আর বরফ নাড়াচাড়া নিয়ে স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ।
আমের ফালুদায় কী কী লাগে
প্রকাশিত রেসিপিতে ওজন বা কাপের মাপ দেওয়া হয়নি। এতে উপকরণগুলোর নাম এবং কোনটি কোন ক্রমে তৈরি করে গ্লাসে সাজাতে হবে তা বলা আছে, তাই কয় গ্লাস পরিবেশন করবেন সেই অনুযায়ী পরিমাণ কমবেশি করে নিতে পারেন। একটি পাকা আম কিউব করে কাটা হয় আর আরেকটি ব্লেন্ড করা হয়, অর্থাৎ দুটি আমই এই পদের মূল ভিত্তি; ওপরে সাজানোর জন্য আমের কয়েকটি ছোট টুকরাও আলাদা করে রাখা হয়। উপকরণগুলো হলো:
- তোকমা, পানিতে ভেজানো
- সাবুদানা
- নুডলস
- প্যাকেটের জেলি, এর মধ্যে আমের জেলিও
- দুধ
- চিনি
- কনডেন্সড মিল্ক
- দুটি পাকা আম: একটি কিউব করে কাটা, অন্যটি ব্লেন্ড করে ঘন পিউরি; সাজানোর জন্য আরও কয়েকটি ছোট টুকরা
- ভ্যানিলা আইসক্রিম
- বাদামকুচি
- বরফকুচি
এর বেশির ভাগই সাধারণ রান্নাঘরে থাকে, না থাকলে পাড়ার মুদি দোকানেই পাওয়া যায়। ফালুদাকে সাধারণ আমের মিল্কশেক থেকে আলাদা চেহারা আর স্বাদ দেয় দুটি উপকরণ: তোকমা, যা পানিতে ভিজলে ফুলে জেলির মতো হয়ে যায়, আর সাবুদানা, যা সেদ্ধ করলে নরম ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এ দুটি নিয়ে নিচে আলাদা করে বলা হয়েছে।
উপকরণ প্রস্তুত করা
শেষে গ্লাসে সাজানো ছাড়া বাকি সব কাজ আগেভাগেই সেরে রাখা যায়, আর দুধ ঠান্ডা হতে সময় লাগে। তাই রেসিপির শুরু সেই কাজগুলো দিয়ে, যেগুলোতে কিছু ভেজাতে, সেদ্ধ করতে বা ঠান্ডা করতে হয়।
- প্রথমে পানিতে তোকমা ভিজিয়ে রাখুন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর তোকমা ফুলে নরম হয়ে গেলে পানি ঝরিয়ে আলাদা করে রাখুন।
- সাবুদানা ও নুডলস আলাদাভাবে সেদ্ধ করে নিন। সেদ্ধ হয়ে গেলে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ভালোভাবে পানি ঝরিয়ে একপাশে রাখুন।
- প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলি তৈরি করুন, জমে গেলে কিউব করে কেটে নিন।
- একটি পাত্রে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করুন। এতে চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে ভালোভাবে নাড়ুন। মিশ্রণ ঠান্ডা হলে ফ্রিজে রেখে দিন।
- একটি পাকা আম কিউব করে কেটে নিন। আরেকটি আম ব্লেন্ড করে ঘন পিউরি বানান।
সাবুদানা আর নুডলস আলাদা করে সেদ্ধ করলে দুটোরই নিজস্ব গড়ন ঠিক থাকে, কারণ সাবুদানার দানা ভেতর পর্যন্ত সেদ্ধ হতে চিকন নুডলসের চেয়ে বেশি সময় নেয়। সেদ্ধ করার পর ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে নিলে রান্না আর এগোয় না এবং গ্লাসে দানাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে যায় না। চিনি আর কনডেন্সড মিল্ক মেশানোর আগে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়, আর ডেজার্টটি ঠান্ডা পরিবেশন করা হয় বলে মিশ্রণটি ফ্রিজে রাখা হয়।

গ্লাসে সাজানো ও পরিবেশন
ফালুদা লম্বা গ্লাসে স্তরে স্তরে সাজানো হয়, যাতে প্রতি চামচে আলাদা কিছু উঠে আসে। রেসিপিতে সাজানোর ক্রম এমন:
- একটি লম্বা গ্লাস নিন। গ্লাসের নিচে প্রথমে দিন আমের জেলি ও ভেজানো তোকমা।
- এরপর একে একে দিন সেদ্ধ সাবুদানা, নুডলস, জেলির কিউব, কিউব করা আম এবং আমের পিউরি।
- তার ওপর ঢেলে দিন ঠান্ডা ঘন দুধ।
- সবশেষে ওপরে এক স্কুপ ভ্যানিলা আইসক্রিম, সামান্য বাদামকুচি, আমের ছোট টুকরা আর কিছু বরফকুচি দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
আইসক্রিম আর বরফকুচি একেবারে শেষে দেওয়া হয় বলে আইসক্রিম দুধে গলে যাওয়ার আগেই গ্লাসটি পরিবেশন করা ভালো। দুধের মিশ্রণ, জেলি এবং সেদ্ধ সাবুদানা ও নুডলস সাজানোর সময় পর্যন্ত ফ্রিজে রেখে দেওয়া যায়।
ফালুদা এল কোথা থেকে
ফালুদা মোগলাই রান্নার ধারার একটি ঠান্ডা মিষ্টি পদ। বিশ্বকোষের বিবরণ অনুযায়ী এর উৎস পারস্যের ফালুদে নামের পদ, যা এখনো ইরানে জনপ্রিয়। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে মধ্য এশিয়ার রাজবংশগুলোর হাত ধরে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। এর বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে মোগল সাম্রাজ্যে এবং সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে; পরে পারস্য-প্রভাবিত দরবারগুলো, বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যের হায়দরাবাদ ও কর্ণাটিক অঞ্চলে, পদটিকে আরও নিজেদের মতো করে নেয়। হিন্দুস্তানি ভাষায় 'ফালুদা' শব্দটি কুচি কুচি হয়ে যাওয়া যেকোনো কিছু বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়।
প্রচলিত ফালুদায় গোলাপের শরবত, সেমাই আর মিষ্টি তুলসীর বীজ দুধের সঙ্গে মেশানো হয়, অনেক সময় সঙ্গে থাকে কুলফি, উপমহাদেশের ঘন জমাট দুধের মিষ্টি। সেমাই তৈরি হতে পারে গম, অ্যারারুট, কর্নস্টার্চ বা সাগু থেকে। দেশভেদে পদটির রূপও বদলায়: মিয়ানমারে ফালুদা নামের সংস্করণে থাকে তুলসীর বীজ, গ্রাস জেলি ও ডিমের পুডিং; শ্রীলঙ্কায় ফালুদার ওপর দেওয়া হয় আইসক্রিম; আর মরিশাসে আছে আলুদা নামের পানীয়। একই বিশ্বকোষে বাংলাদেশের একটি সংস্করণের বর্ণনা আছে, যাতে সাবুদানা, আম, দুধ ও সেমাইয়ের সঙ্গে পেস্তাবাদাম, নারকেলের ক্রিম ও পান্ডান পাতার নির্যাস দেওয়া হয়।
এই রেসিপির আমের ফালুদা সেই পরিবারেরই সদস্য। পুরোনো পদের তোকমা, নুডলস আর সাবুদানা এতে রয়ে গেছে, গোলাপের শরবত বাদ পড়েছে, আর মূল স্বাদ হয়ে উঠেছে পাকা আম, কিউব ও পিউরি দুই রূপেই; সঙ্গে যোগ হয়েছে জেলি ও আইসক্রিম। তুলসী বীজ নিয়ে ২০২১ সালের একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ইরান ও ভারতে এই বীজ শরবত নামের পানীয়তে এবং ফালুদে নামের জমাট ডেজার্টে খাওয়া হয়, মূলত দেখতে সুন্দর লাগে বলে এবং আঁশের উৎস হিসেবে।
২০২৬ সালের জুনের শুরুতে বাজারে কোন আম
রেসিপিটি প্রকাশিত হয় বছরের এমন সময়ে, যখন নামকরা জাতের প্রথম আমগুলো বাজারে আসছিল। ২০২৬ সালের ১০ মে রাজশাহী জেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এক সভায় আম পাড়ার সময়সূচি ঘোষণা করে, যা আম ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। অপরিপক্ব আম পেড়ে বাজারে তোলা ঠেকাতে চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে এই ক্যালেন্ডার তৈরি করা হয়। জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, এর লক্ষ্য হলো নির্ধারিত তারিখের আগে কেউ যেন অপরিপক্ব আম পেড়ে বাজারজাত না করে; সময়সূচি না মানলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ওই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সব ধরনের গুটি আম পাড়া যাবে ১৫ মে থেকে, গোপালভোগ ২২ মে থেকে, রানীপছন্দ ও লক্ষ্মণভোগ ২৫ মে থেকে, আর হিমসাগর বা খিরসাপাত ৩০ মে থেকে। ল্যাংড়া ও বানানা ম্যাঙ্গোর তারিখ ১০ জুন, আম্রপালি ও ফজলির ১৫ জুন, বারি আম-৪-এর ৫ জুলাই, আশ্বিনার ১০ জুলাই এবং গৌড়মতির ১৫ জুলাই; কাটিমন ও বারি আম-১১ সারা বছরই পাড়া যাবে। অর্থাৎ ১ জুন রাজশাহী থেকে বাজারে আনার অনুমতি ছিল গুটি আম, গোপালভোগ, রানীপছন্দ, লক্ষ্মণভোগ ও হিমসাগরের। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী জেলায় আমের আবাদ ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন, আর কেজিপ্রতি আনুমানিক ৩২ টাকা দরে এর বাজারমূল্য প্রায় ৭৮০ কোটি টাকা।
মৌসুমের শুরুর দিকে, ২০২৬ সালের মার্চে, রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর এই চার জেলায় ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আম আবাদ এবং প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে; এই অঞ্চলে আমগাছের সংখ্যা ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, এ বছর কিছুটা ব্যতিক্রম, কারণ প্রায় সব গাছেই মুকুল এসেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, মুকুল ও গুটি আসার সময় আদর্শ তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সারা দেশের হিসাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বাংলাদেশে বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়; বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হয় ২৩টি জেলায়, দেশজুড়ে চাষ হয় ৭২টি জাত, আর দেশের ভেতরের আমের বাজার ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার। রপ্তানি হয় সামান্যই: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫ মৌসুমে ২ হাজার ১৯৪ টন, যেখানে ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩২১ টন রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে কৃষিসচিব জানিয়েছিলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ২৭ লাখ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ২৪ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়েছে।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, আমের (Mangifera indica) আদি নিবাস সম্ভবত বাংলাদেশ, আসাম, মিয়ানমার ও উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল, আর দেশে প্রায় ১০০টি জাতের আম আছে। উন্নত জাতের মধ্যে বাংলাপিডিয়া ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, আশ্বিনা, কিষাণভোগ, কুয়াপাহাড়ি, লতা বোম্বাই, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ ও মিশ্রিভোগের নাম উল্লেখ করেছে, যার বেশির ভাগ বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে। কলমের গাছে মোটামুটি চতুর্থ বছর থেকে ফল ধরে এবং প্রায় ৪৫তম বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়। জানুয়ারি থেকে মার্চে মুকুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া গুটি ধরায় ক্ষতি করে, আর শিলাবৃষ্টিতে আম ঝরে যায়। বেশির ভাগ আম পাকা অবস্থায় খাওয়া হয়; কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর কাঁচা-পাকা দুই রকম আম থেকেই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়।

একটি পাকা আমে কী থাকে
পাকা আমই এই ডেজার্টের প্রাণ, আর এটি শুধু মিষ্টি স্বাদই দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রালের হিসাবে রান্না না করা ১০০ গ্রাম পাকা আমে প্রায় ৮৩ গ্রাম পানি থাকে এবং এ থেকে মেলে ৬০ কিলোক্যালরি শক্তি; এতে আছে ০.৮২ গ্রাম আমিষ, ০.৩৮ গ্রাম চর্বি, ১৪.৯৮ গ্রাম শর্করা, ১.৬ গ্রাম খাদ্য আঁশ এবং ১৩.৬৬ গ্রাম চিনি জাতীয় উপাদান।
একই ১০০ গ্রাম আম থেকে পাওয়া যায় ৩৬.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি; ৬৪০ মাইক্রোগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন, যা আমের শাঁসের হলুদ-কমলা রঙের উৎস, এবং তা থেকে ৫৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল অ্যাক্টিভিটি ইকুইভ্যালেন্ট); ৪৩ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট এবং ১৬৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, ১০ বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেকের দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত; আম সেই হিসাবের মধ্যে পড়ে।
তোকমা আর সাবুদানা: ফালুদার দুই বিশেষ উপকরণ
ফালুদায় যে তোকমা দেওয়া হয়, তা মিষ্টি তুলসী বা সুইট বেসিলের (Ocimum basilicum) বীজ। ফুডস সাময়িকীতে প্রকাশিত ক্যালদেরন ব্রাভো ও সহকর্মীদের ২০২১ সালের একটি পর্যালোচনায় এই বীজকে কালো, ছোট ও ডিম্বাকার বলে বর্ণনা করা হয়েছে, লম্বায় মোটামুটি ২.৩১ থেকে ৩.১১ মিলিমিটার। বীজের বাইরের স্তরে থাকে মিউসিলেজ বা পিচ্ছিল আঠালো পদার্থ, বীজের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ। এ কারণেই পানিতে ভেজালে বীজগুলো ফুলে ওঠে এবং চারপাশে স্বচ্ছ জেলির মতো আবরণ তৈরি হয়, রেসিপিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভেজানোর ধাপে যা দেখা যায়।
পর্যালোচনাটিতে প্রতি ১০০ গ্রাম বীজে আমিষ ১১.৪ থেকে ২২.৫ গ্রাম, চর্বি ৯.৭ থেকে ৩৩ শতাংশ এবং খাদ্য আঁশ ৭.১১ থেকে ২৬.২ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়ার কথা বলা হয়েছে; নমুনা ও জাতভেদে এই পার্থক্য। লেখকেরা লিখেছেন, ইরান ও ভারতে বহুদিন ধরে ভেজানো বীজ সতেজ ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে খাওয়া হয়, তবে এর পুষ্টিগুণ ও কার্যকারিতা সম্পর্কে এখনো খুব কমই জানা গেছে। তাই এই ডেজার্টকে কোনো রোগের ওষুধ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
সাগু হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কিছু পামগাছের, প্রধানত সাগু পাম (Metroxylon sagu) গাছের কাণ্ডের নরম শাঁস থেকে বের করা শ্বেতসার বা স্টার্চ। শাঁস থেঁতলে ও ধুয়ে স্টার্চ আলাদা করা হয়, তারপর শুকানো হয়। ভেজা স্টার্চ গরম করে নাড়তে নাড়তে প্রায় ২ মিলিমিটার ব্যাসের ছোট ছোট দানা বানানো হয়, এগুলোই সাগুদানা, যা সেদ্ধ করলে ফুলে ওঠে। কাসাভা বা শিমুল আলুর মূল থেকে তৈরি দানা দামে সস্তা বলে এগুলোই ব্যাপকভাবে সাগু নামে বিক্রি হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় যার নাম সাবুদানা; যদিও আসল সাগু আর ট্যাপিওকা আলাদা গাছ থেকে আসে। যেটাই হোক, দানাগুলো প্রায় পুরোটাই স্টার্চ, তাই ফুটন্ত পানিতে এগুলো নরম আর কাচের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়।

চিনি, কনডেন্সড মিল্ক ও পরিমিতি
ফালুদা একটি মিষ্টি পদ। আমের নিজস্ব চিনির পাশাপাশি দুধে মেশানো হয় চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক দুটোই; জেলি আর আইসক্রিমও মিষ্টি, আর গ্লাসের তলার আমের জেলি আরও মিষ্টি যোগ করে। মিষ্টি কনডেন্সড মিল্ক তৈরি হয় দুধ থেকে পানি বাষ্প করে তাতে চিনি মিশিয়ে; সাধারণ একটি কনডেন্সড মিল্কে প্রায় ৪৫ শতাংশ চিনি ও ৮ শতাংশ চর্বি থাকে, আর এই চিনির কারণেই এটি এত দিন ভালো থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ দেয়, 'ফ্রি সুগার' বা মুক্ত চিনি একজন মানুষের দৈনিক মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের কম হওয়া উচিত, আর তা ৫ শতাংশ বা তার নিচে রাখলে স্বাস্থ্যের আরও উপকার হতে পারে। মুক্ত চিনি বলতে বোঝায় প্রস্তুতকারক, রাঁধুনি বা খাদ্যগ্রহণকারী খাবার ও পানীয়তে যে চিনি যোগ করেন, এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসে থাকা চিনি। ফালুদায় মেশানো চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক এই মুক্ত চিনির মধ্যেই পড়ে। তাই আমের ফালুদা মাঝেমধ্যে খাওয়ার মতো একটি ডেজার্ট হিসেবেই উপভোগ করা ভালো। যাঁদের ডায়াবেটিস আছে বা অন্য কোনো কারণে চিনি খাওয়া সীমিত রাখতে হয়, তাঁরা কতটা খেতে পারবেন বা আদৌ খাবেন কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
গরমের রান্নাঘরে নিরাপদ রাখার উপায়
সবচেয়ে গরম মাসগুলোতে দুধ, কাটা ফল আর বরফ দিয়ে তৈরি ডেজার্টে বাড়তি সতর্কতা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) না-ধোয়া ফল এবং পাস্তুরিত নয় এমন দুধকে সেই খাবারের তালিকায় রেখেছে, যেগুলোতে খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটানো জীবাণু থাকার আশঙ্কা বেশি। ঘরে রান্নার জন্য সংস্থাটির পরামর্শ: খাবার তৈরির আগে, মাঝে ও পরে অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, তাজা ফল চলমান পানির নিচে ধুয়ে নেওয়া, এবং ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে রাখা। দ্রুত নষ্ট হয় এমন খাবার কখনো ২ ঘণ্টার বেশি বাইরে রাখা উচিত নয়, আর তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে ১ ঘণ্টার বেশি নয়। এই রেসিপিতে দুধ জ্বাল দিয়ে তারপর ঠান্ডা করা হয়, আর গ্লাসে সাজিয়েই সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
বরফের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তাপপ্রবাহের সময় ঢাকা ট্রিবিউন রাজধানীর রাস্তার পাশের দোকানে বিক্রি হওয়া শরবত নিয়ে প্রতিবেদন করে। এক বরফ ব্যবসায়ী পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁর বরফ খাবার বা পানীয়তে ব্যবহারের উপযোগী নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বরফ তৈরির কারখানাগুলোকে তাঁরা কখনো নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে দেখেননি। তিনি সতর্ক করেন, অস্বাস্থ্যকর পানীয় থেকে টাইফয়েড, জন্ডিস ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগ ছড়াতে পারে, যা তাঁর ভাষায় প্রতি গ্রীষ্মে ঢাকায় দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি'ও সাধারণভাবে একই কথা বলে: পরিচ্ছন্ন থাকুন, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন, ভালোভাবে রান্না করুন, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন, এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। ঘরে ফালুদা বানাতে এর অর্থ হলো, বরফকুচি বানাতে হবে নিরাপদ খাওয়ার পানি দিয়ে।
আমও হতে হবে ভালো ও ঠিকমতো পাকা। বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ৪৩ নং আইন) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য, যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন ও সোডিয়াম সাইক্লামেট, কোনো খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করতে পারবেন না, এবং এমন দ্রব্য মেশানো খাদ্য মজুত, বাজারজাত বা বিক্রিও করতে পারবেন না। ওপরে যে আম ক্যালেন্ডারের কথা বলা হয়েছে, তারও উদ্দেশ্য একই: সময়ের আগে অপরিপক্ব আম পেড়ে বাজারে তোলা বন্ধ করা।
ছবি: Kanchana Bose / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাসস, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, ফুডস সাময়িকী (ক্যালদেরন ব্রাভো ও সহকর্মী, ২০২১), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), ঢাকা ট্রিবিউন, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ (বিডিলজ), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)