শীত এলে বাংলাদেশের বাজারে ও রাস্তার পাশে টক-মিষ্টি বরই বা কুল দেখা যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাগো নিউজ ২৪ এই মৌসুমি ফলের পুষ্টিগুণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পুষ্টির তথ্যভান্ডার, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশিত গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, বরই ভিটামিন সির ভালো উৎস; তবে এর নামে প্রচলিত সব উপকারিতার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বরই কোন ফল
বাংলাদেশে যে বরই বা কুল খাওয়া হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Ziziphus mauritiana, ইংরেজিতে একে ইন্ডিয়ান জুজুব বলা হয়। একে প্রায়ই চীনা জুজুবের (Ziziphus jujuba) সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। উদ্যানতত্ত্ববিদ জুলিয়া এফ. মর্টনের ‘ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস’ (১৯৮৭) গ্রন্থ অনুযায়ী, চীনা জুজুব মৃদু শীতের শুষ্ক অঞ্চলের গাছ, আর বরই উষ্ণ জলবায়ুর উপযোগী।
বরই কাঁটাযুক্ত ছোট থেকে মাঝারি আকারের গাছ। বাংলাদেশে প্রায় সব ধরনের মাটিতে এটি জন্মে; সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ফুল আসে, ফল ধরে শীতে। কাঁচা ও পাকা দুই অবস্থাতেই বরই খাওয়া হয়। মর্টনের বিবরণে, পাকা ফল সাধারণত কাঁচাই খাওয়া হয়, রোদে শুকিয়ে বা গুঁড়া করে মৌসুমের বাইরে রাখা যায়, আর টক জাতের বরই দিয়ে আচার ও চাটনি তৈরি হয়।

১০০ গ্রাম বরইয়ে কী আছে
যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্রপ সংকলনে প্রকাশিত মর্টনের গ্রন্থে ভারত ও হন্ডুরাসে করা বিশ্লেষণের হিসাব দেওয়া আছে। সে অনুযায়ী তাজা বরইয়ের প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার অংশে থাকে:
- পানি: ৮১.৬ থেকে ৮৩ গ্রাম
- শর্করা: ১৭ গ্রাম (মোট চিনি ৫.৪ থেকে ১০.৫ গ্রাম)
- প্রোটিন: ০.৮ গ্রাম; আঁশ: ০.৬ গ্রাম
- ক্যালসিয়াম: ২৫.৬ মিলিগ্রাম; ফসফরাস: ২৬.৮ মিলিগ্রাম
- আয়রন: ০.৭৬ থেকে ১.৮ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড): ৬৫.৮ থেকে ৭৬ মিলিগ্রাম
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালে কাঁচা জুজুবের প্রতি ১০০ গ্রামে ৭৯ কিলোক্যালরি শক্তি, ৬৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ২৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম দেখানো হয়েছে। তুলনার জন্য, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (এনআইএইচ) খাদ্য সম্পূরক দপ্তরের হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দিনে ৯০ মিলিগ্রাম ও নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন।

ভিটামিন সি কী করে, কী করে না
এনআইএইচের তথ্যপত্র অনুযায়ী, শরীরে কোলাজেন তৈরিতে ভিটামিন সি অপরিহার্য। কোলাজেন যোজক কলার মূল উপাদান এবং ক্ষত সারাতে এর বড় ভূমিকা আছে। ভিটামিন সি একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কাজে ভূমিকা রাখে এবং উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা নন-হিম আয়রনের শোষণ বাড়ায়। ফলে শাকসবজি ও ডালের সঙ্গে বরইয়ের মতো ভিটামিন সিযুক্ত ফল খেলে সেগুলোর আয়রন শোষণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
সর্দি-কাশি নিয়ে প্রচলিত ধারণা অবশ্য পুরোপুরি ঠিক নয়। এনআইএইচ জানায়, দিনে অন্তত ২০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি নিয়মিত গ্রহণেও সাধারণ মানুষের সর্দি হওয়ার হার কমে বলে প্রমাণ মেলেনি; তবে এতে সর্দির মেয়াদ কিছুটা কমতে ও উপসর্গ হালকা হতে পারে। তাই বরই সর্দি-কাশি প্রতিরোধে খুবই কার্যকর, এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ নেই।
বরইয়ে পটাশিয়ামও আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১২ সালে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের পটাশিয়াম গ্রহণ নিয়ে প্রথম বৈশ্বিক নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যার লক্ষ্য অসংক্রামক রোগ কমানো।
হজম ও প্রচলিত ব্যবহার নিয়ে গবেষণা
ইসরায়েলের মেইর মেডিকেল সেন্টারের গবেষকেরা ২০০৮ সালে ‘ডাইজেশন’ সাময়িকীতে দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা ৩৭ জন রোগীর ওপর ১২ সপ্তাহের একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। চীনা জুজুবের তরল নির্যাস পাওয়া দলে উপসর্গ কমে এবং গবেষকেরা নির্যাসটিকে কার্যকর ও নিরাপদ বলে উল্লেখ করেন। তবে পরীক্ষাটি ছিল নির্যাস দিয়ে, তাজা বরই দিয়ে নয়।
প্রচলিত চিকিৎসায় বরইয়ের নানা ব্যবহার আছে। মর্টনের বিবরণে, পাকা শুকনো বরইকে মৃদু জোলাপ এবং বীজকে প্রশান্তি আনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একই বিবরণে সতর্ক করা হয়েছে, গাছের বাকল বা শিকড় বেশি মাত্রায় বিষাক্ত হতে পারে।
২০২০ সালে ‘ফাইটোথেরাপি রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ভারতের ইন্টিগ্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি পর্যালোচনায় বলা হয়, বরই গাছের পাতা, কাণ্ড ও ফলের নির্যাস নিয়ে করা গবেষণায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, জীবাণুরোধী ও ডায়রিয়ারোধী কার্যকারিতা দেখা গেছে। লেখকেরা লিখেছেন, প্রচলিত স্বাস্থ্য দাবিগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইয়ে আরও গবেষণা দরকার। রক্ত পরিশোধন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হাড়ের ঘনত্ব বাড়ানো বা হরমোনের ভারসাম্য রক্ষার মতো দাবির পক্ষে যাচাই করা উৎসগুলোতে মানুষের ওপর করা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ছবি: Shmunmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় নিউক্রপ (জুলিয়া এফ. মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস, ১৯৮৭), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএইচ) খাদ্য সম্পূরক দপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ডাইজেশন (নাফতালি ও অন্যান্য, ২০০৮), ফাইটোথেরাপি রিসার্চ (প্রকাশ ও অন্যান্য, ২০২০), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)