বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী ২০২৬ সালের ২৭ জুন, শনিবার বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় দেশের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সেদিন সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে 'ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক; কৃষি অর্থনীতিবিদ, ফল বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা, প্রাণ গ্রুপ ও হাসেম ফুডসসহ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ক্যাব এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তারা এতে অংশ নেন।
কার কী দায়িত্ব, ফাঁক কোথায়
তাঁর ব্যাখ্যায়, গবেষকদের কাজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, সেই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব, আর বাজার তৈরির দায়িত্ব কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। ফল উৎপাদন বাড়ানোর নানা প্রকল্প থাকলেও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাজ তখনো খুব সীমিত ছিল বলে তিনি মনে করেন; ফলে গবেষণায় উদ্ভাবিত অনেক প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছিল না।
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বারির প্রধান কার্যালয় গাজীপুরের জয়দেবপুরে; ধান, পাট, আখ ও চায়ের আলাদা ইনস্টিটিউট থাকায় এই চার ফসল বাদে অন্য সব ফসল নিয়ে বারি গবেষণা করে। ১৯৮২ সালে গঠিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর দুটিই কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি দপ্তর।
দেড় শতাধিক প্রযুক্তি, বাজার নিয়ে গবেষণা কম
ড. গোলাম ফেরদৌস জানান, বারি ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে ১৫০টিরও বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে আছে শুকনো আম, ম্যাঙ্গো লেদার ও কাঁঠাল থেকে তৈরি নানা খাদ্যপণ্য। উদ্যোক্তা তৈরির বিভিন্ন কর্মসূচিতেও প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। তবে উদ্যোক্তারা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও অনেক সময় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবদান স্বীকার করেন না, যা নতুন গবেষণাকে নিরুৎসাহিত করে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ম্যাঙ্গো লেদার হলো আমের শাঁস চিনির ঘন দ্রবণে মিশিয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরি পাতলা স্তর; দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রিয় এই খাবার বাংলায় আমসত্ত্ব নামে পরিচিত।
তাঁর মতে, এ শিল্পের বড় দুটি চ্যালেঞ্জ বাজার সৃষ্টি ও বাজার অনুসন্ধান। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা আছে, কী ধরনের পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব, তা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকায় রপ্তানি তখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগনির্ভর ছিল। কৃষকের বাগান থেকে বিদেশের সুপারশপে পৌঁছাতে একটি ফলের কোথায় কত সময় লাগে, কোথায় মান নষ্ট হয়, বিদেশি ভোক্তারা কেমন সাড়া দেন, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে এমন সমন্বিত গবেষণাও হয়নি বলে জানান তিনি।
উৎপাদন আর রপ্তানির ব্যবধান সরকারি হিসাবেও দেখা যায়। কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান ২০২৫ সালের মে মাসে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছিলেন, ২০২৩-২৪ সালে দেশে ২৪.৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়, আর রপ্তানি হয় ১,৩২১ টন।

শোধন সুবিধা উৎপাদন এলাকার কাছে, সমুদ্রপথেও রপ্তানি
ড. গোলাম ফেরদৌস বলেন, ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি), কোয়ারেন্টাইন ল্যাব ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো অবকাঠামো উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি স্থাপন করা দরকার। এসব সেবা দূরে হওয়ায় রপ্তানিকারকদের সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছিল, অথচ ফল দ্রুত নষ্ট হয় বলে এমন দেরি রপ্তানির বড় বাধা। এ ধরনের শোধনের একটি বড় কারণ ফলের মাছি: ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই (Bactrocera dorsalis) সবচেয়ে বেশি ডিম পাড়ে আম, পেঁপে ও অ্যাভোকাডোতে, আর এই পোকার কারণেই বাণিজ্যিক ফল চালানের আগে কোয়ারেন্টাইন শোধন করতে হয়।
তিনি বলেন, শুধু উড়োজাহাজে নয়, সমুদ্রপথেও ফল রপ্তানির সুযোগ আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক প্যাকেজিং এবং ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নিশ্চিত করা গেলে আম পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়, যা কম খরচে সমুদ্রপথে রপ্তানির পথ খুলে দেয়।

প্রসেসিং জোন, ফলভিত্তিক বোর্ড ও প্রণোদনার প্রস্তাব
কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে দেশের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অন্তত চার থেকে আটটি বিশেষায়িত 'অ্যাগ্রো প্রসেসিং জোন' গড়ার আহ্বান জানান তিনি, যেখানে মান পরীক্ষাগার, প্যাকহাউস, কোল্ড স্টোরেজ, গুদাম, প্যাকেজিং ও রপ্তানির সব সুবিধা এক জায়গায় থাকবে। আম, কাঁঠাল ও আনারসের মতো প্রধান ফলের জন্য আলাদা বোর্ড গঠনেরও পরামর্শ দেন তিনি, যাতে গবেষক, উদ্যোক্তা, বিপণন বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা মিলে উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও রপ্তানি পর্যন্ত সমন্বিত পরিকল্পনা করতে পারেন।
মৌসুমে বেশি উৎপাদিত হয়ে যে ফল নষ্ট হয়, তা প্রক্রিয়াজাত করতে সরকার তাৎক্ষণিক নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিলে খুব অল্প সময়ে এ শিল্পে বড় বিনিয়োগ আসবে এবং বিপুল মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে পরের পাঁচ থেকে ছয় বছরে দেশের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, আমসত্ত্ব, ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই)




মন্তব্য
(০)