দেশে ফলের উৎপাদন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে, বিদেশ থেকে ফল কেনাও কমেছে; কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফলের রপ্তানি বাড়েনি। ২০২৬ সালের ২৭ জুন জাগো নিউজ ২৪-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে আসে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য এবং একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ, একজন সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি জানায়, দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদেশি জাতের ফলের চাষ ছড়িয়ে পড়া এবং আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো, এই তিন কারণে ফলের আমদানি কমেছে। অথচ রপ্তানি তখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল।
রপ্তানি না বাড়ার পেছনে বিমান ভাড়া বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছিলেন রপ্তানিকারকরা। খাতসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছিলেন, ফল রপ্তানির পর্যাপ্ত সক্ষমতা বাংলাদেশ এখনো অর্জন করতে পারেনি; আবার কারও মতে, বাংলাদেশি ফল এখনো বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, 'দেশে ফল আমদানি কমার প্রধান কারণ হলো ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি। বিশেষ করে ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডোর মতো বিদেশি ফল এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে এবং সাধারণ ভোক্তার নাগালে এসেছে। পাশাপাশি আম, কাঁঠাল, পেয়ারাসহ দেশীয় ফলের উৎপাদনও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফল আমদানি কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।'
রপ্তানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না থাকায় মানুষের আয় ও ব্যয়ক্ষমতা কমেছে, যার প্রভাব ফলের চাহিদার ওপরও পড়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি ফলের চাহিদা কমেছে এবং রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশি ফল এখনো মূলত এথনিক মার্কেটনির্ভর। আন্তর্জাতিক চেইন শপে প্রবেশ করতে না পারায় রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। কেবল বিমান ভাড়ার কারণে ফলের রপ্তানি কমেছে বিষয়টি এমন নয়।'
বছরে দেড় কোটি টনের বেশি ফল
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ফলের বার্ষিক উৎপাদন তখন দেড় কোটি টন ছাড়িয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৯ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৫ টন ফল উৎপাদন হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবাদ ও উৎপাদন দুটোই কিছুটা কমে; সে বছর ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৩৩৮ টন। প্রতিবেদনে উল্লিখিত সর্বশেষ পূর্ণ বছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫১ লাখ ৫২ হাজার ২৪২ টন ফল উৎপাদন হয়। শেষ হতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের মে মাসে জানিয়েছিল, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দেশে ফলের উৎপাদন ছিল ৮৭ লাখ ৮৬ হাজার টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ১ কোটি ২১ লাখ টনে পৌঁছায়। ২০২২ সালের জুনে জাতীয় ফল মেলার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ড. মুহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় এক কোটি টন, যা তখন ১ কোটি ২২ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে; দেশে তখন ৭২ জাতের ফল উৎপাদিত হচ্ছিল, আগে যা ছিল ৫৬টি। সংবাদ সংস্থা ইউএনবি এ তথ্য প্রকাশ করে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, একাধিক ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যভিত্তিক আগের প্রতিবেদনগুলোতে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশকে বিশ্বে দ্বিতীয়, আমে সপ্তম এবং পেয়ারায় অষ্টম বলা হয়েছিল। ডেইলি স্টারের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে এফএওর বরাতে বাংলাদেশকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল উৎপাদনে বিশ্বে দশম বলেও উল্লেখ করা হয়।
২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ডেইলি স্টারের এক ফিচারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আলাদা আলাদা ফলের হিসাব দেওয়া হয়: আম প্রায় ২৭ লাখ টন (২০১২-১৩ অর্থবছরে যা ছিল ১৫ লাখ টন), কলা ২৫ লাখ টন, পেঁপে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টন, পেয়ারা ৬ লাখ ৬৪ হাজার টন, আনারস ৬ লাখ ৭ হাজার টন, লিচু ২ লাখ ৩২ হাজার টন এবং ড্রাগন ফল প্রায় এক লাখ টন। ২০১২ সালে দেশের মাঠে ড্রাগন ফলের চাষ প্রায় ছিলই না। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ডিএইর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁঠালের উৎপাদন ছিল ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪ টন।
বিদেশি ফল এখন দেশের মাঠে
দেশি উৎপাদন কীভাবে আমদানির জায়গা নিচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ পেয়ারা। ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রথম আলো জানায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে কৃষিবিদ এস এম কামরুজ্জামান থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই অঞ্চল থেকে থাই জাতের পেয়ারার চারা আনেন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে নাটোরের ঝাউতলা ফুলবাড়ী এলাকায় চাষ শুরু করেন। ভালো ফলন ও দামের কারণে জাতটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ২০১৯ সালে দেশে উৎপাদিত পেয়ারার ৭০ শতাংশই ছিল থাই জাতের। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পেয়ারার উৎপাদন ছিল ৩ লাখ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ৫ লাখ ৬ হাজার টনে দাঁড়ায়। কৃষিবিদেরা পত্রিকাটিকে বলেন, আপেলের বদলে থাই পেয়ারার চাহিদা বাড়ায় আপেল আমদানি কমছে।
ডেইলি স্টারের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ফিচারে অন্য ফসলেও একই পরিবর্তনের কথা আসে। রাজশাহী অঞ্চলের চাষিদের ভাষায় সারা বছর ফল দেওয়া কাটিমন জাতের আমের চাষ সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরের এক হেক্টর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৫৭ হেক্টরে পৌঁছায়। টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় হানি কুইন, জায়েন্ট কিউ ও ফিলিপাইনের এমডি-২সহ বিভিন্ন জাতের আনারস প্রায় ৭ হাজার হেক্টরে চাষ হচ্ছিল, আর চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা হাজার হাজার হেক্টরে আঙুর, কমলা, মাল্টা ও অ্যাভোকাডো চাষ করছিলেন।
এই পরিবর্তনের বড় অংশে ভূমিকা রাখে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ড. মো. মেহেদী মাসুদ যার প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের মে মাসে জানায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে চলা প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল সারা বছর ফলের জোগান নিশ্চিত করা; ততদিনে হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে এক লাখের বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এবং ২১ থেকে ২২ লাখ ফলগাছ লাগানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পত্রিকাটি জানায়, থাই পেয়ারাকে প্রথম লক্ষ্য করে ১৯৫ কোটি টাকা বাজেটে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হয়েছে; হর্টিকালচার সেন্টারগুলো তখনো চারা বিতরণ করছিল এবং ডিএই একই ধরনের আরেকটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছিল।
২০১৯ সালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে দেশি ফলের বেশির ভাগ পাওয়া যেত গ্রীষ্মের তিন মাসে; আম, লিচু ও কাঁঠালের ভরা মৌসুম ছিল মে থেকে জুলাই। সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেশি ফলের সরবরাহ কম থাকায় তখনই বেশি কেনা হতো আমদানি করা ফল। ততদিনে পেয়ারা, পেঁপে ও আনারস প্রায় সারা বছরই পাওয়া যাচ্ছিল।

২০২১-২২ থেকে কমছে আমদানি
প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বিদেশি ফলের আমদানি কমছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ফল আমদানি হয় ৮ লাখ ৬২ হাজার ৮৮৯ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯০১ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৮৪৭ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ লাখ ৮ হাজার ৬৬১ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২০ জুন পর্যন্ত আমদানি হয় ৬ লাখ ২২ হাজার ৮০৬ টন।
দেশে সাধারণত ৩২ ধরনের তাজা ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসে কমলা, আপেল, আঙুর ও মাল্টা; এর বাইরে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, খেজুর, আমলকী, লংগন, আলুবোখারা ও কাস্টার্ড আপেলও আমদানি হয়। ডিএইর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২০ জুন পর্যন্ত আপেল আমদানি হয় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭৪ টন, কমলা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৮২ টন, আঙুর ৮৭ হাজার ৩৩৮ টন, তাজা খেজুর (ফ্রেশ ডেটস) ৫৩ হাজার টন, খেজুর ২১ হাজার টন, মাল্টা ৭০৮ টন, কাস্টার্ড আপেল ৪৫৪ টন, আমলকী ৮১ টন, স্ট্রবেরি ২৫ টন, উড আপেল ১৬ টন, লংগন ৪ দশমিক ৭ টন এবং ড্রাগন ফল ৪ টন।
ফল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার বড় অঙ্কই ব্যয় হয়ে আসছিল। প্রথম আলো ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফল আমদানিতে ব্যয় হয় ২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৯ কোটি ডলার; ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুধু আপেলই আমদানি হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার টন। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২২ সালের জুনে জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ফল আমদানি হয় ৮ লাখ ২৪১ টন, যার ৮৫ শতাংশই ছিল আপেল, আঙুর, কমলা ও মাল্টা।

আমদানি করা ফলে বাড়তি শুল্ক
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের বছর শুকনো ও তাজা ফল আমদানির ওপর কর বাড়ানো হয় এবং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে এর ফলেও আমদানি কমেছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সে বছরের ৯ জানুয়ারি বাদাম ও সুপারির মতো কিছু শুকনো ও তাজা ফলের সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করে, আর আঙুর, আপেল ও তরমুজের মতো কিছু তাজা ফল এবং জুসের শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করে।
পত্রিকাটি জানায়, এরপর খুচরা বিক্রেতারা আপেল, কমলা, আঙুর, মাল্টা ও তরমুজের মতো ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়ান; ব্যবসায়ীরা বলেন, আগের দফার শুল্ক বৃদ্ধিতেই আমদানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ঋণপত্রের (এলসি) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে ফল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ৮ শতাংশ কমে ১০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে নামে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, রমজানের আগে শুল্ক অব্যাহতি ও অগ্রিম আয়কর কমানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা। পত্রিকাটি শুল্ক বৃদ্ধিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্তের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ফিচারেও ডেইলি স্টার আমদানিকারক সমিতির সভাপতিকে উদ্ধৃত করে, যিনি আমদানি কমার প্রধান কারণ হিসেবে বাড়তি শুল্ককেই দেখিয়েছিলেন।
রপ্তানি আটকে আছে কয়েক হাজার টনে
প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে তখন বিশ্বের ৩৮টি দেশে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেঁপে, ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন ফল রপ্তানি হচ্ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ হাজার ১৬ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৯৩ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮ হাজার ২৪১ টন ফল রপ্তানি হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানায়, দেশের মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির মূল্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
উৎপাদন ও রপ্তানির ব্যবধান সবচেয়ে স্পষ্ট কাঁঠালে। ডিএইর হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁঠালের উৎপাদন ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪ টন, অথচ রপ্তানি হচ্ছিল বছরে মাত্র ১ থেকে ২ হাজার টনের কিছু বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ২ হাজার ২৩১ টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১ হাজার ২০৩ টনে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল আরও কম, মাত্র ১ হাজার ৮৩ টন। প্রতিবেদনের ভাষায়, ১৮ লাখ টনের বেশি উৎপাদনের বিপরীতে কাঁঠাল রপ্তানি মোট উৎপাদনের এক শতাংশেরও অনেক কম।
কাঁঠাল (Artocarpus heterophyllus) বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের ফলের মধ্যে আবাদি জমির হিসাবে কাঁঠাল তৃতীয় এবং উৎপাদনে দ্বিতীয়; বসতবাড়ির আঙিনা ও পাহাড়ি এলাকায় গাছটি ব্যাপকভাবে জন্মে। ডিসেম্বর থেকে মার্চে ফুল আসে, মে থেকে আগস্টে ফল পাকে। পাকা কোষ টাটকা খাওয়া হয়, সিরায় সংরক্ষণ বা শুকানো হয়; কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে রান্না হয় এবং বীজ সেদ্ধ বা ভেজে খাওয়া হয়।

আম রপ্তানির ওঠানামা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে মাত্র ৩০৯ টন আম রপ্তানি হয়েছিল; ২০২৩ সালে তা সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ টনে ওঠে, ২০২৪ সালে কমে ১ হাজার ৩২১ টনে নামে এবং ২০২৫ সালে আবার বেড়ে ২ হাজার ১৯৪ টনে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে ২৪ জুন পর্যন্ত রপ্তানি হয় ৭৬৫ টন। যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, সুইডেনসহ ৩৮টি দেশে বাংলাদেশের আম যাচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালে মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া নতুন করে বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি হয়। চায়না ডেইলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালের ২৮ মে মেরিডিয়ান অ্যাগ্রোর পাঠানো প্রথম চালান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ে এবং আমদানিকারক হুনান বাবাইলি হোল্ডিং গ্রুপের জন্য ৩ টন আম চাংশা শহরে পৌঁছায়। ডিএই ২০২৫ সালে প্রায় ২৭ লাখ টন আম উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছিল এবং প্রায় ৫ হাজার টন রপ্তানির পরিকল্পনা করেছিল।
আম রপ্তানি এর আগেও ওঠানামা করেছে। দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণ ২০২০ সালের জুলাইয়ে জানায়, ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ১৬৫ টন আম পাঠানো হয়, ২০১৬ সালে রপ্তানি হয় তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬৬৫ টন; কিন্তু ২০১৯ সালে তা ১০০ টনের নিচে নেমে যায়। পত্রিকাটির তথ্যমতে, কিছু রপ্তানিকারক চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের বাদ দিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের আম কিনে পাঠিয়েছিলেন; পোকার সংক্রমণ ধরা পড়ায় আমেরিকা ও ইউরোপে চালান প্রত্যাখ্যাত ও ধ্বংস হয়।
২০২৩ সালে নতুন করে উদ্যোগ শুরু হয়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ২০২৩ সালের ২৫ মে ঢাকার শ্যামপুরে কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে আম রপ্তানি শুরু হয়, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার টন; ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৮টি দেশে ১ হাজার ৭৫৭ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প ২০২২ থেকে ২০২৭ মেয়াদে ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ জেলার ৪৬টি উপজেলায় চাষিদের উত্তম কৃষি চর্চার (গ্যাপ) প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। পত্রিকাটি উল্লেখ করে, দেশে তখন গ্যাপ সনদ দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না, আর এই সনদ ছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকার মূলধারার সুপারশপে আম পাঠানো যায় না। ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের জুনে জানায়, রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভিদস্বাস্থ্য সনদ (ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট) দেয় ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং; তখন ৬৬ জন নিবন্ধিত রপ্তানিকারক প্রায় ২৮টি দেশে আম পাঠাচ্ছিলেন, আর সুইজারল্যান্ডের একটি সুপারশপ চেইনে ৪৫০ কেজির একটি চালান যায়, যা প্রবাসীদের বাজারের বাইরে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
আম (Mangifera indica) দেশের সব জায়গায় জন্মে, বেশির ভাগই বসতবাড়ির আশপাশে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, গঙ্গা প্লাবনভূমিতে দেশের কিছু সেরা আমবাগান রয়েছে; রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাতের মতো উৎকৃষ্ট বাণিজ্যিক জাতের আম হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চে গাছে মুকুল আসে; এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধরায় ক্ষতি করে।

বিমান ভাড়া, প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতা
ফল বিশেষজ্ঞ ও বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ মনে করেন, দেশ থেকে ফল রপ্তানির পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, 'দেশে দেশীয় ফলের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় ফল আমদানি কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশের মানুষ দেশীয় ফল বেশি ভোগ করায় আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ফল রপ্তানি কমার পেছনে প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী ফল উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। এছাড়া পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ফল রপ্তানিও কমেছে। দেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পরিবহন ব্যয় কমানো গেলে ফল রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।'
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর জাগো নিউজকে বলেন, 'দেশ থেকে ফল ও সবজি রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ পরিবহন ব্যয় বা এয়ার ফ্রেইটের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী কার্গোর ভাড়া প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। আগে যে পরিবহন ব্যয় ১০০ টাকা ছিল, এখন তা ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে ইউরোপে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মতো ভাড়া গুনতে হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা মূলত ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন। কিন্তু আমাদের এয়ার ফ্রেইট প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। একই ধরনের ফল বা সবজি অন্য দেশের রপ্তানিকারকরা কম খরচে বাজারে পৌঁছে দিতে পারছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি পড়ে যাচ্ছে এবং আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।' তাঁর মতে, রপ্তানি কমার পেছনে বড় কোনো নতুন কারণ নেই, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। 'এয়ার ফ্রেইট কমানো না গেলে ফল ও সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
প্রতিবেদনে দেশের শীর্ষ ফল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লিখিত লী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসাইন বলেন, আগে প্রতি কেজি পণ্যের এয়ার ফ্রেইট ছিল প্রায় ২৫০ টাকা, পরে তা ৩২০ টাকায় ওঠে; 'সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের অজুহাতে' এই ভাড়া বেড়ে প্রতি কেজিতে ৫৪৭ টাকায় পৌঁছেছে। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল, শাক-সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের বিকল্প এখন ক্রেতারা সহজেই পাচ্ছেন।' ভারত, পাকিস্তান, মিশরসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে একই ধরনের ফল ও সবজি ইউরোপের বাজারে যাচ্ছে, বিশেষ করে কলকাতা থেকে ব্যাপক হারে; যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের ক্রেতারা দাম তুলনা করে যেখানে সস্তা সেখান থেকেই কিনছেন। অন্য দেশে বিকল্প কম থাকায় কিছু বিশেষ কৃষিপণ্য এখনো রপ্তানি হচ্ছে, 'কিন্তু এয়ার ফ্রেইট এভাবে বাড়তে থাকলে ফল ও শাক-সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও কমে যাবে।'
একই চাপের কথা বছরের শুরুতেও এসেছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানায়, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাত শুরুর পর ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে বিমানে পণ্য পাঠানোর ভাড়া কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬২০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ থেকে ২৮০ টাকায় দাঁড়ায়। রপ্তানিকারকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, ভারত থেকে পাঠানোর খরচ কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, অথচ বাংলাদেশের খরচ প্রায় ৭০০ টাকা; মার্চে সবজি রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কমে যায়।
কোল্ড চেইন, প্যাকেজিং ও সংগ্রহোত্তর ক্ষতি
খাতসংশ্লিষ্টরা জাগো নিউজকে বলেন, দেশে ফলের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে হলে বিমানভাড়া কমানো, কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্যাকেজিং এবং রপ্তানিযোগ্য ফলের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সংগ্রহের পরের ক্ষতিও একই সমস্যার অংশ। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২২ সালের জুনে সরকারি পরিসংখ্যানের বরাতে জানায়, তাজা ফলের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়; ঝালকাঠি, বরিশাল ও পিরোজপুর অঞ্চলে দেশের এক-ষষ্ঠাংশ পেয়ারা ও এক-তৃতীয়াংশ আমড়া উৎপাদিত হলেও সেগুলো দিয়ে জুস, জেলি, আচার বা চাটনি তৈরির কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নেই। ডেইলি স্টারের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ফিচারে দুর্বল সংগ্রহোত্তর প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ ফল নষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়।
দেশের ভেতরের চাহিদাও তখন পুরো মেটেনি। ২০২২ সালের জুনে কৃষিমন্ত্রী জানান, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে প্রায় ২০০ গ্রাম ফল প্রয়োজন, কিন্তু জনপ্রতি জোগান ছিল প্রায় ৮৫ গ্রাম। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড. মেহেদী মাসুদ ডেইলি স্টারকে বলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ফলের উৎপাদন ৩ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে; তখন বিশেষ করে কীটনাশক ছাড়াই উৎপাদিত পেঁপে ও কাঁঠাল রপ্তানি করা যাবে। এ ক্ষেত্রে তিনি ভিয়েতনামের ফল রপ্তানি শিল্পকে উদাহরণ হিসেবে দেখান।
ছবি: Hasan Iqbal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএনবি, চায়না ডেইলি, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)