২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে, উত্তরাঞ্চলে যখন মাঘের তীব্র শীত চলছিল, তখনই দিনাজপুরের আমগাছে উঁকি দিতে শুরু করে হলদে মুকুল। জাগো নিউজের দিনাজপুর প্রতিনিধি ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি জানান, উত্তরের হিমেল হাওয়ায় জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, ঠিক তখন জেলার বিভিন্ন এলাকায় আগাম আসা এসব মুকুলের সৌরভ বাতাসে ছড়াচ্ছিল, আর মুকুল ঘিরে শুরু হয়েছিল মৌমাছির গুঞ্জন।
বাগানমালিকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে মুকুলে রোগ ধরতে পারে; তাঁদের ভাষায় তা 'পাউডারি মিলডিউ' বা পচন, যা ফলন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কুয়াশার প্রকোপ কমলে সে বছর আমের বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন তাঁরা। দিনাজপুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মূলত আবহাওয়া ও জাতের কারণে আগাম মুকুল এসেছে, আর প্রতিবছরই কিছু গাছে এমন আগাম মুকুল আসে।
কোথায় দেখা গেল আগাম মুকুল
প্রতিবেদক ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে বাগানমালিকদের সঙ্গে কথা বলেন। দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে, শহরের মডার্ন মোড়ে, মোহনপুর ব্রিজের পশ্চিম পাশে টোলপ্লাজা এলাকায়, ৩ নম্বর ফাজিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে, ৯ নম্বর আস্করপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুরে এবং পার্বতীপুর উপজেলার বিভিন্ন আমবাগানে আগাম মুকুল দেখা যায়।
মোহনপুর মোড়ের আমগাছ মালিক রুহুল আমিন জানান, তাঁর ২০ বছর বয়সী গুটি জাতের আমগাছে কয়েক বছর ধরেই আগাম মুকুল আসছে। তিনি বলেন, আগাম মুকুল দেখে মন ভালো হলেও ভয় একটাই, ঘন কুয়াশা; কুয়াশা বেশি হলে মুকুল পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রামপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের সাগর মিয়া ও সোহেল মিয়া জানান, বেশির ভাগ গাছ মুকুলে ভরে গেছে, আর মাসখানেক আগে থেকেই গাছে মুকুল আসা শুরু হয়েছে।
চণ্ডীপুর ইউনিয়নের বসিরবানিয়া বড় মেড়েয়াপাড়া গ্রামের 'দিনাজপুর আম বাগান'-এর মালিক আবু রেজা প্রামানিক জানান, তাঁর বাগানে প্রায় তিন হাজার আমগাছ আছে। মুকুল আসার পর থেকেই তিনি গাছগুলোর প্রাথমিক পরিচর্যা করছেন।
কৃষি বিভাগ যা বলেছে
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই আমের মুকুল আসতে শুরু করেছে মূলত আবহাওয়া ও জাতের কারণে।
তিনি বলেন, প্রতিবছরই কিছু আমগাছে আগাম মুকুল আসে, এবারও আসতে শুরু করেছে। ঘন কুয়াশার কবলে না পড়লে এসব গাছে আগাম ফলন পাওয়া যায়; আবহাওয়া বৈরী হলে ফলন মেলে না। তবে নিয়ম মেনে শেষ মাঘে যেসব গাছে মুকুল আসবে, সেসব গাছে মুকুল স্থায়ী হবে বলে জানান তিনি।
মাঘ বাংলা বর্ষপঞ্জির দশম মাস। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার হিসাবে শীতকাল পৌষ ও মাঘ মাস জুড়ে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত; আর বসন্তকাল ফাল্গুন ও চৈত্র, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি। বাংলাপিডিয়া জানায়, আম ও কাঁঠালের মতো ফলগাছে ফুল আসে বসন্তে, আর এ সময়েই মৌমাছি মধু সংগ্রহে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে কর্মকর্তা যে 'শেষ মাঘ'কে স্বাভাবিক সময় বলেছেন, তা পড়ে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, শীত থেকে বসন্তে পা রাখার মুখে। জানুয়ারির শেষে চাষিরা যে গাছগুলোর কথা বলছিলেন, সেগুলোতে মুকুল এসেছিল তার কয়েক সপ্তাহ আগেই।
দিনাজপুর জেলা ও এর উপজেলা
দিনাজপুর দেশের উত্তর-পশ্চিমে রংপুর বিভাগের একটি জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ৩,৪৪৪.৩০ বর্গকিলোমিটার; এতে ১৩টি উপজেলা, ৮টি পৌরসভা ও ১০১টি ইউনিয়ন রয়েছে, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৯০ হাজার ১২৮। জেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়, দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট, পূর্বে নীলফামারী ও রংপুর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ১৭৮৬ সালে ঘোড়াঘাট জেলা নামে এ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। যমুনা, তুলসীগঙ্গা, পুনর্ভবা ও আত্রাই এখানকার উল্লেখযোগ্য নদী। একই ভুক্তি অনুযায়ী জেলার ৬৩.৯০ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
প্রতিবেদনে নাম আসা ফাজিলপুর ও আস্করপুর দিনাজপুর সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের দুটি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সদর উপজেলার আয়তন ৩৫৪.৭৩ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তরে কাহারোল ও খানসামা, দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে চিরিরবন্দর এবং পশ্চিমে বিরল উপজেলা। পুনর্ভবা ও আত্রাই নদী এবং রামসাগর দিঘি এ উপজেলার উল্লেখযোগ্য জলাশয়; প্রধান ফসল ধান, গম, আখ, আলু, সরিষা ও সবজি। বাংলাপিডিয়া জানায়, আত্রাই নদী দিনাজপুর শহরের পূর্বাংশ দিয়ে বয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত অপর উপজেলা পার্বতীপুর চিরিরবন্দরের পূর্বে। এর আয়তন ৩৯৫.০৪ বর্গকিলোমিটার; উপজেলাটি পার্বতীপুর পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন পরিষদে বিভক্ত, আর ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানে ৪ লাখ ৬৪৮ জন মানুষ গণনা করা হয়। দেশের একমাত্র চালু কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া এবং উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় রেলজংশন এই উপজেলায়।
দিনাজপুর অবশ্য আমের চেয়ে লিচুর জন্যই বেশি পরিচিত। দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের মার্চে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ২০২৪ সালে জেলার পাঁচ হাজার ৭৮৭ হেক্টর জমি থেকে ৪২ হাজার টন লিচু পাওয়া গিয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল ৮০০ কোটি টাকা, আর জেলার ১৩ উপজেলায় লিচুবাগান ছিল পাঁচ হাজার ৪১৮টি। ধান এ জেলার আরেক প্রধান ফসল: ২০২৪ সালের মৌসুমে জেলা কৃষি বিভাগ ২ লাখ ৭০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্য ঠিক করেছিল বলে বাসস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জানায়।

কেন কিছু গাছে আগাম মুকুল আসে
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় আম চিরসবুজ গাছ; এর ছোট, সুগন্ধি, সাদাটে-হলুদ বা বেগুনি ফুল ডালের মাথায় বড় মঞ্জরিতে, অর্থাৎ মুকুলে, ফোটে। একটি মুকুলে ১০০ থেকে ২৫০টি ফুলের কুঁড়ি থাকতে পারে, যার সবগুলো ফোটে না। ফুল একলিঙ্গ বা উভলিঙ্গ হতে পারে, আর গাছে কত ফল ধরবে তা নির্ভর করে পূর্ণাঙ্গ ফুলের সংখ্যার ওপর। প্রায় এক হাজার ফুলের মধ্যে মাত্র এক-দুটি থেকে পরিণত ফল হয়, আর একটি মুকুলে দু-তিনটি ফল ধরলেই সাধারণত সন্তোষজনক ফলন মেলে। এ কারণেই জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মুকুলের ভাগ্যই অনেকটা ঠিক করে দেয় গ্রীষ্মের ফলন।
রুহুল আমিন যে গুটি গাছের কথা বলেছেন, তা বাংলাপিডিয়ার করা দুই ভাগের দ্বিতীয়টির অন্তর্ভুক্ত। প্রথম ভাগে উন্নত বা অভিজাত জাত, যেগুলোর বংশবিস্তার হয় কলমের মাধ্যমে। দ্বিতীয় ভাগে আঁটি থেকে জন্মানো স্থানীয় জাত, যা দেশি বা গুটি আম নামে পরিচিত; এগুলোর স্বীকৃত কোনো জাতনাম নেই, স্বাদেরও নিশ্চয়তা নেই। কলমের গাছে রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে এবং মোটামুটি ৪৫তম বছর পর্যন্ত ফল দেয়; আঁটির গাছে ফল আসতে আরও কয়েক বছর বেশি লাগে, তবে এসব গাছ বেশি দিন বাঁচে এবং ৬০ বছর বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত ফল দিতে পারে।
আমগাছে কখন মুকুল আসে, তা নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন। ২০০৭ সালে ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব প্ল্যান্ট ফিজিওলজিতে প্রকাশিত আমের প্রজনন-শারীরতত্ত্ববিষয়ক এক পর্যালোচনায় টি. এল. ডেভেনপোর্ট লেখেন, উপক্রান্তীয় অঞ্চলে আমের মুকুল আসা মূলত শীতল তাপমাত্রা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, আর সেখানে মুকুল আসার প্রক্রিয়া চালিত হয় ঠান্ডার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দিয়ে। কোনো ডালে শেষবার যে নতুন পাতা এসেছিল, তা যত পুরোনো হয়, ঠান্ডায় সাড়াও তত জোরালো হয়। উষ্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অবস্থায়, যেখানে ঠান্ডা থাকে না, সেখানে শেষ পাতার বয়সই প্রধান বিষয়। পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, কম বয়সী গাছ এবং আর্দ্র অবস্থায় বেশি মাত্রায় নাইট্রোজেন সার পাওয়া গাছে প্রায়ই মুকুলের বদলে নতুন পাতা গজায়, আর মুকুল আসার আগে কতটা বিশ্রাম লাগে, তা জাতভেদে আলাদা।
এই গবেষণা ডিএই কর্মকর্তার ব্যাখ্যার পটভূমি দেয় যে আবহাওয়া ও জাতের কারণেই আগাম মুকুল আসে। ঢাকার ফলবীথি হর্টিকালচার সেন্টারের একজন উদ্যানতত্ত্ববিদ ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত পরামর্শে প্রায় একই কথা বলেন: মুকুল আসার ৩০ থেকে ৪৫ দিন আগে থেকে গাছে পানি ও সার দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়, কারণ এ সময় সার ও পানি পেলে গাছ মুকুল না দিয়ে নতুন পাতা ছাড়ে।

দিনাজপুরের মাঘে কুয়াশা ও শীত
শীতকালে দেশের উত্তরাঞ্চল দক্ষিণের চেয়ে বেশি ঠান্ডা থাকে। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করে, শীতে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাংশে একটি উচ্চচাপ কেন্দ্র অবস্থান করে, আর সেখান থেকে ঠান্ডা বাতাসের একটি স্রোত দেশের উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। ঋতুটি খুব শুষ্ক, বছরের মোট বৃষ্টির চার শতাংশেরও কম হয় এ সময়ে; রাত দিনের চেয়ে লম্বা, আর সকালগুলো প্রায়ই কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। জানুয়ারিতে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে উপকূলে তা ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি।
২০২৫-২৬ সালের শীতে দিনাজপুরেও সেই চিত্র দেখা যায়। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি বাসস জেলা থেকে জানায়, আবহাওয়া অফিস সেদিন মৌসুমের তখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে, আর ঘন কুয়াশায় জেলা আচ্ছন্ন ছিল দুপুর পর্যন্ত। ৩ জানুয়ারি ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, সেদিন তাপমাত্রা ছিল ১০.৮ ডিগ্রি, আগের দিন ১০.৫ ডিগ্রি, এবং কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছিল; ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়া জেলায় সেই শনিবার সূর্যের দেখা মেলেনি, আর দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের যে শ্রেণিবিভাগ তুলে ধরে, তাতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৬ ডিগ্রির নিচে নামলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। দিনাজপুরে প্রায়ই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার কাছাকাছি রেকর্ড হয়। যেমন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ১৩ জানুয়ারি দিনাজপুরে ৮.৫ ডিগ্রি এবং ১৮ জানুয়ারি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করে, যা ছিল ওই দুই দিনের দেশের সর্বনিম্ন; আর ২০২৪ সালের ২৮ জানুয়ারি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৫.৩ ডিগ্রিতে নেমে যায়, সেদিন জেলার স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়।
আমের ফলনে কুয়াশার প্রভাব আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, জানুয়ারি থেকে মার্চে আমগাছে ফুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধরায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। শীত জেলার বাগানে ফুল আসার সময়ও বদলে দেয়: ২০২৪ সালের এপ্রিলে দিনাজপুরের ডিএই কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, আগের বছরগুলোর তুলনায় সে বছর শীতের তীব্রতা বেশি থাকায় লিচুগাছে ফুল আসতে একটু দেরি হয়েছিল।

পাউডারি মিলডিউ ও অ্যানথ্রাকনোজ: যে রোগের ভয় চাষিদের
বাংলাপিডিয়া জানায়, অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, ডাইব্যাক ও পাউডারি মিলডিউয়ের মতো কয়েকটি ছত্রাকজনিত রোগ এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ রোগ দেশের আমবাগানে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে। প্রায় তিন ডজন পোকা আমগাছ আক্রমণ করে, যার মধ্যে আমের হপার পোকা অন্যতম প্রধান; এ পোকা আক্রান্ত মুকুলে খুব কম ফল ধরে, কখনো একটিও ধরে না।
পাউডারি মিলডিউ রোগের কারণ ওইডিয়াম ম্যানজিফেরি নামের একটি ছত্রাক, যা কেবল আমগাছকেই আক্রমণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের কলেজ অব ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্সেসের (সিটিএএইচআর) উদ্ভিদরোগতত্ত্ববিদ স্কট সি. নেলসনের ২০০৮ সালের এক সম্প্রসারণ বুলেটিনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত মুকুল, ফুল ও কচি ফলের গায়ে সাদাটে পাউডারের মতো আস্তরণ পড়ে, আর শেষ পর্যন্ত ফুল ও ফল বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়। বুলেটিন অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে রোগটি অনিয়মিত হলেও খুব মারাত্মক হতে পারে; ফল ধরায় প্রভাব ফেলে এটি ফসলের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট করতে পারে। পূর্ণ প্রস্ফুটিত মুকুলই সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। ১০ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতার বিস্তৃত পরিসরে ছত্রাকটি ছড়াতে পারে; প্রায় ২৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় উচ্চ আর্দ্রতার পর হঠাৎ আর্দ্রতা কমে গেলে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়, যা ঘটে ঠান্ডা রাতের পর উষ্ণ দিন এলে। এর রেণু বাতাসে ভেসে ছড়ায়।
অ্যানথ্রাকনোজ রোগের কারণ কলিটোট্রিকাম গ্লিওস্পোরিওয়েডিস নামের ছত্রাক। সিটিএএইচআরের ২০০৮ সালের সহযোগী বুলেটিন একে বিশ্বে আমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ধ্বংসাত্মক রোগ বলেছে। মুকুলে প্রথমে ছোট কালো বা গাঢ় বাদামি দাগ দেখা দেয়, যা বড় হয়ে একসঙ্গে মিশে যেতে পারে এবং ফল ধরার আগেই ফুল মেরে ফেলে ফলন অনেক কমিয়ে দেয়; ফুলের গুচ্ছ কালির মতো কালো হয়ে মরে যায়। ভেজা, আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় রোগটি বাড়ে, আর বৃষ্টি বা সেচের পানির ছিটায় এর রেণু ছড়ায়। আক্রান্ত ডালের আগা ও পরিণত পাতায় ছত্রাকটি এক মৌসুম থেকে আরেক মৌসুম পর্যন্ত টিকে থাকে, আর কাঁচা ফলের সংক্রমণ পাকার আগ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকতে পারে; ফল পাকলে তাতে বসে যাওয়া কালো দাগ দেখা দেয়।
মুকুল দেখে দুটি রোগ আলাদা করা যায়। পাউডারি মিলডিউতে মুকুলে সাদাটে-ধূসর আভা পড়ে, আর মরে যাওয়া ফুল বাদামি ও ধূসর হয়; অ্যানথ্রাকনোজে সুচের ডগার মতো কালো দাগ পড়ে, আর মরা ফুল কালির মতো কালো হয়ে যায়। দুই ক্ষেত্রেই ফল ধরার আগেই মুকুল মরে যায়, আর এই ক্ষতিরই আশঙ্কা করছিলেন দিনাজপুরের চাষিরা।

মুকুলের পরিচর্যা, আর পরামর্শ কোথায় মিলবে
২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত পরামর্শে মুকুলের মৌসুমের পরিচর্যা ধাপে ধাপে বলা হয়। মুকুল আসার এক থেকে দেড় মাস আগে প্রথমবার প্রতিরোধমূলক স্প্রে এবং মুকুল যখন ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা কিন্তু ফুল তখনো ফোটেনি, তখন দ্বিতীয়বার স্প্রের পরামর্শ দেওয়া হয়; এই স্প্রে করতে হয় বিকেলে, মুকুল, পাতা ও কাণ্ড ভালোভাবে ভিজিয়ে। উদ্যানতত্ত্ববিদ লেখেন, ফুল ফুটে গেলে কোনো ধরনের কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যাবে না, কারণ তখন স্প্রে করলে ফুলের এবং ফুলে আসা উপকারী পোকার ক্ষতি হতে পারে। ফল মটরদানার আকারের হলে তৃতীয়বার এবং মার্বেলের আকারের হলে চতুর্থবার স্প্রের কথা বলা হয়, আর পরে ফল ব্যাগিং করা যেতে পারে।
একই পরামর্শে মুকুলের মৌসুমের আরও কিছু দিক তুলে ধরা হয়। মুকুল আসার আগে বা পরে ডাল ছাঁটাই করা যাবে না; ছাঁটাইয়ের উপযুক্ত সময় ফল সংগ্রহের ঠিক পরে। মুকুলের সময় অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার দিলে মুকুল ঝরে যেতে পারে। গাছের গোড়ার আগাছা, শুকনো পাতা ও ঝরে পড়া মুকুল নিয়মিত পরিষ্কার করলে রোগ ও পোকার ঝুঁকি কমে। ফল ধরার পর মাটিতে পানির ঘাটতি রাখা যাবে না। আর ঘন কুয়াশা, অতিরিক্ত বৃষ্টি বা দীর্ঘ খরায় গাছের বিশেষ যত্ন দরকার। পরামর্শে এফিড, থ্রিপস, মিলিবাগ ও হপারকে মারাত্মক পোকা এবং অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউকে প্রধান ছত্রাকজনিত রোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সিটিএএইচআরের বুলেটিনগুলো রাসায়নিকনির্ভর নয় এমন কিছু পরিচর্যার কথাও বলে: গাছের ভেতরে বাতাস চলাচলের জন্য ছাঁটাই, ঝরে পড়া পাতা ও আবর্জনা কুড়িয়ে নষ্ট করা, বেশি আক্রান্ত মুকুল সরিয়ে ফেলা এবং গাছের মধ্যে বেশি দূরত্ব রাখা, যা রোগের তীব্র প্রাদুর্ভাব ঠেকায়। অ্যানথ্রাকনোজের জন্য স্প্রে দরকার হলে তা শুরু করতে হয় মুকুল প্রথম দেখা দেওয়ার সময়, বুলেটিনে বলা হয়েছে।
কোন ওষুধ কী মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে, তা নির্ভর করে বাংলাদেশে প্রচলিত নিয়ম ও সুপারিশের ওপর। দিনাজপুরের চাষিদের এ পরামর্শ নিতে হবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ডিএই সারা দেশে তাদের বাগান, হর্টিকালচার কেন্দ্র ও নার্সারি থেকে উন্নত জাতের আমের কলম উৎপাদন ও বিতরণ করে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) আম নিয়ে গবেষণাকেন্দ্র পরিচালনা করে; ১৯৮৫ সালে নবাবগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বারির আম গবেষণা কেন্দ্রের আয়তন প্রায় ১২.৪০ হেক্টর, সেখানে প্রায় ৬৫টি জাতের ৩০০টির বেশি আমগাছ আছে।
দিনাজপুরের আম: বাগান, বাজার ও রপ্তানি
বাংলাপিডিয়া রাজশাহী ও নবাবগঞ্জের সঙ্গে দিনাজপুরকে সেই জেলাগুলোর মধ্যে রেখেছে, যেখানে দেশের উন্নত জাতের আমের বেশির ভাগ চাষ হয়। দেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত আছে, আর জ্ঞানকোষটি জানায়, বৃহত্তর রাজশাহী ও দিনাজপুরে ছড়িয়ে থাকা অনেক বাগানই পুরোনো এবং সুসংগঠিত নয়।
২০২২ সালের জুলাইয়ে দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইত্তেফাককে জানান, জেলায় ৫ হাজার ৬৯১ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে, যেখান থেকে ৬৩ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। দিনাজপুর ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পত্রিকাটিকে বলেন, অন্যান্য বছর শহরের আমের বাজার থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ ট্রাক এবং জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক আম দেশের নানা প্রান্তে যেত। তিনি জানান, সেই মৌসুমে অতিবর্ষণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা এবং আসন্ন কোরবানির ঈদের কারণে বাইরের পাইকার কম আসায় সংখ্যাটি নেমে আসে শহরের বাজার থেকে দৈনিক আট-১০ ট্রাকে এবং জেলা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ ট্রাকে।
এরপর দিনাজপুরের আম রপ্তানিও শুরু হয়। বাসস ২০২৫ সালের ২৩ জুন জানায়, বিরল উপজেলার একটি বাগানের ব্যানানা জাতের আম আনুষ্ঠানিকভাবে রপ্তানি শুরু হয়েছে; ২১ জুন ১০০ কেজির প্রথম চালান যায় সুইজারল্যান্ডে, আর পর্যায়ক্রমে সুইডেন ও কাতারে তিন মেট্রিক টন ব্যানানা, কাটিমন ও বারি-৪ জাতের আম পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। বাগানমালিক জানান, রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষিরা বিরলে এসে ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য জমি ইজারা নিয়ে আমবাগান করছেন। দিনাজপুর ডিএইর উপপরিচালক বলেন, জেলায় উৎপাদিত কয়েকটি জাতের আম আগের বছর পরীক্ষামূলকভাবে রপ্তানি হয়েছিল।
২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাসস জানায়, হাকিমপুর উপজেলার একজন চাষি সরকারের পার্টনার কর্মসূচির আওতায় উত্তম কৃষিচর্চা (গ্যাপ) মেনে করা এক একরের প্রদর্শনী বাগান থেকে দুই মেট্রিক টনের বেশি বারি-৪ আম সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে রপ্তানি করেছেন, যা ওই উপজেলা থেকে এ ধরনের প্রথম রপ্তানি। উপজেলা কৃষি বিভাগের একজন মাঠ কর্মকর্তা ফ্রুট ব্যাগিংকে এ পদ্ধতির অংশ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এতে বালাইনাশকের ব্যবহার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে যায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ৮ জুলাই জানায়, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জের একটি বাগান থেকে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আম পাঠানো হচ্ছে, যার শুরু হয় আম্রপালি জাত দিয়ে।
এসব চালান যায় এমন এক অঞ্চল থেকে, যেখানে আম উৎপাদনে রাজশাহী অঞ্চল এখনো এগিয়ে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একই প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আম উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক হয় রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায়; ২০২৫ সালের মৌসুমে সর্বোচ্চ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে, ৪ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন, এরপর নওগাঁয়, যেখানে ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয় এবং লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন।
ছবি: Amar / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের কলেজ অব ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্সেস (সিটিএএইচআর), ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব প্ল্যান্ট ফিজিওলজি





মন্তব্য
(০)