কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হাঁস পালন বহু পরিবারের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার প্রায় ২ হাজার খামারে তখন ২৫ লাখের বেশি হাঁস পালন হচ্ছিল এবং বছরে ডিম উৎপাদন হচ্ছিল প্রায় ২ কোটি। খামারিরা লাভের কথা বললেও রোগবালাইয়ের সময় দ্রুত ভেটেরিনারি সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
ঘোড়াউত্রার তীরে পানির ওপর খামার
নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদীর দুই তীরে চোখে পড়ে শত শত হাঁসের খামার। বাঁশের খুঁটি আর জালের বেষ্টনী দিয়ে পানিতে গড়া এসব অস্থায়ী খামারে দেশি জাতের হাঁস সারাদিন সাঁতার কাটে, রাতে থাকে নদীর ধারে বানানো খুপড়ি ঘরে। ঘোড়াউত্রা আসলে সুরমার একটি অংশ: স্থানীয়ভাবে ধনু নামে পরিচিত সুরমা ইটনা দিয়ে জেলায় ঢুকে দুই শাখায় ভাগ হয়, নিকলীর সিংপুরের কাছে শাখা দুটি আবার মিলিত হলে নদীর নাম হয় ঘোড়াউত্রা।
হাওর হলো বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গামলা আকৃতির নিচু জলাভূমি, বর্ষায় নদী ও খালের পানিতে যা বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। কিশোরগঞ্জের পূর্বাংশ এমনই হাওর অববাহিকা, যার অনেক জায়গা বছরের বড় অংশ পানির নিচে থাকে। নিকলীর পাশাপাশি ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও তাড়াইলেও বর্ষায় নদী ও হাওরের পানিতে হাঁস পালন দ্রুত বাড়ছিল।
খামারিদের ভাষায়, কম পুঁজি, শামুক-ঝিনুকের মতো সহজলভ্য প্রাকৃতিক খাবার আর সামান্য দানাদার খাদ্যেই এ খাত লাভজনক। নিকলীর খামারি আলমগীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানিতে খামার করলে আলাদা জমি লাগে না। জাল-বাঁশের ঘের দিয়ে হাঁস ছেড়ে দিই। শামুক আর দানাদার খাবারেই বেশিরভাগ চাহিদা মেটে। খরচ কম, তাই মৌসুমে ভালো লাভ হয়।’

ডিম, হ্যাচারি ও হাজারো পরিবারের জীবিকা
স্থানীয় ও জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সূত্রে জাগো নিউজ জানায়, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের খামার থেকে বছরে প্রায় ২ কোটি হাঁসের ডিম আসে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশে হাঁসের ডিমের মোট চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ এখান থেকে জোগান যায়; ডিম যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরগুলোতে। হাওরের হাঁসের মাংসও দেশজুড়ে জনপ্রিয়।
জেলায় খামারি বা উদ্যোক্তা প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন, আর এ খাত থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সুবিধা পাচ্ছিল প্রায় ১২ হাজার পরিবার। ডিমকে ঘিরে তাড়াইল উপজেলার দামিহা এলাকায় (দামিহা তাড়াইলের একটি ইউনিয়ন) গড়ে উঠেছে শতাধিক হ্যাচারি। তুষ বা ভাপ পদ্ধতিতে সেখানে প্রতিদিন মোট ২ থেকে আড়াই লাখ হাঁসের বাচ্চা ফোটানো হয়, যা স্থানীয় খামারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। মিঠামইনের খামারি রাবেয়া খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের হাঁসের ডিম পাইকাররা সরাসরি নিয়ে যায় ঢাকা-চট্টগ্রামে।’
জাতীয় পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে হাঁসের সংখ্যা ছিল ৬৮২.৬১ লাখ, আর হাঁস-মুরগি মিলিয়ে ডিম উৎপাদন হয় ২ হাজার ৩৭৪.৯৭ কোটি।

খামারিদের চাওয়া: দ্রুত চিকিৎসা ও বাজারসংযোগ
খামারিদের অভিযোগ, হাঁসের রোগ দেখা দিলে দ্রুত ভেটেরিনারি সহায়তা পাওয়া যায় না। তাঁরা মোবাইল ভেট সেবা, টিকা ও ওষুধে সহায়তা, স্বল্পসুদে ঋণ, খাদ্য ও ডিমের সংগ্রহকেন্দ্র এবং ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা চান। রাবেয়া খাতুনের কথায়, ‘রোগ হলে দ্রুত ডাক্তার পাই না। মোবাইল ভেট টিম থাকলে ক্ষতি অনেক কমে যেত।’
দামিহার হ্যাচারি উদ্যোক্তা শাহাদত হোসেন বলেন, ‘দামিহায় এখন অনেক হ্যাচারি হয়েছে। আমরা প্রতিদিন হাজার হাজার বাচ্চা তুলতে পারি। যদি বিদ্যুৎ স্থিতিশীল থাকে আর একটা স্থায়ী সংগ্রহকেন্দ্র হয়, তাহলে কাজটা আরও বড় পরিসরে করা যাবে।’ সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজারসংযোগ বাড়লে হাওরের হাঁস পালন স্থানীয় জীবিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের একটি বড় অর্থনৈতিক খাত হতে পারে।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘হাওরের পানিতে উৎপাদিত হাঁসের মাংস ও ডিম নির্ভেজাল, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। তাই বাজারে এর চাহিদা সব সময়ই বেশি। এই সম্ভাবনাময় খাতের উন্নয়নে খামারিদের প্রশিক্ষণ, টিকাদান ও পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’

ছবি: Belayet2014 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪), উইকিপিডিয়া (কিশোরগঞ্জ জেলা, তাড়াইল উপজেলা, হাওর)




মন্তব্য
(০)