টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ২০২৬ সালের ৩ মে নতুন করে আরও ১ হাজার হেক্টরের বেশি বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এতে জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫০ হেক্টরে, আর চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন জেলার প্রায় ৩৬ হাজার কৃষক। সেদিন (রোববার) বিকেলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জাগো নিউজকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
কয়েক দিন ধরেই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছিল। বাসস ২ মে জানায়, ৩০ এপ্রিল বিকেল পর্যন্ত কৃষি বিভাগ ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হিসাব দিয়েছিল। ৩ মে বিকেলে প্রকাশিত বাসসের আরেক প্রতিবেদনে কৃষি কর্মকর্তাদের অনুমান ছিল প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। ঢাকা ট্রিবিউনের ২ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল, যার ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর হাওর এলাকায়।
ইটনা ও অষ্টগ্রামে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি
অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক পাকা ধান কাটতে পারেননি। দিনভর রোদ না থাকায় খলায় (ধান মাড়াই ও শুকানোর খোলা জায়গা) রাখা ধানও শুকানো যাচ্ছিল না; এতে ধানে চারা গজানো ও পচন ধরার ঝুঁকি বাড়ছিল। শুধু ধান নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির খেতেও ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, বিপুল পরিমাণ জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় তাঁরা চরম অনিশ্চয়তায় আছেন, আর রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকাতে না পেরে অনেকে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ঢাকা ট্রিবিউন ২ মে জানায়, পানিতে ডোবা খেতের ধান কাটতে দিনে ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়েও প্রয়োজনমতো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না।


বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি
নিকলী আবহাওয়া অফিস জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৩৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বরাতে বাসস ৩ মে জানায়, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়ে ৩ দশমিক ১৬ মিটারে এবং চামড়াঘাটে মেঘনার পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে ২ দশমিক ৭৮ মিটারে দাঁড়ায়। অন্যদিকে অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার কমে ২ দশমিক ৪০ মিটারে এবং ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনার পানি ৩ সেন্টিমিটার কমে ১ দশমিক ৭৭ মিটারে নামে। সব নদীর পানি তখনো বিপৎসীমার ১১০ থেকে ৪০০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছিল, তবে বৃষ্টি ও উজানের ঢল চলতে থাকলে পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
ধনু নদী সুনামগঞ্জ থেকে দক্ষিণে নেত্রকোনার পূর্বাংশ ও ইটনা উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে মেঘনায় পড়েছে। ইটনা আয়তনে দেশের বড় উপজেলাগুলোর একটি, যার বড় অংশজুড়ে হাওর। হাওর হলো বাটি বা পিরিচের মতো নিচু জলাভূমি, যা বর্ষায় বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়; শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। মেঘালয়ের খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে নামা নদীগুলো প্রচুর পানি বয়ে আনে বলে হাওরের পানি দ্রুত বাড়তে পারে।

প্রশাসনের সতর্কতা ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ড. সাদিকুর রহমান জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছেন। বৃষ্টিপাত না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ছবি: Ahad Adnan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)