রান্নায় ঘি-মাখন ভালো, নাকি সয়াবিন-সরিষার তেল, এই প্রশ্নে পুষ্টিবিদদের মত তুলে ধরে ২০২৬ সালের ৩০ মে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি নিউজ বাংলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. সায়েদুল আরেফিন সেখানে বলেন, প্রাণিজ চর্বির চেয়ে উদ্ভিজ্জ চর্বি অনেক বেশি ভালো, তবে প্রাণিজ চর্বিও খাওয়া যায়, পরিমিত মাত্রায়।
প্রতিবেদনটি এসেছিল এমন সময়ে, যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই এমন ভিডিও দেখা যাচ্ছিল, যেখানে কোনো কোনো চিকিৎসক সয়াবিন ও সরিষার তেলের বদলে মাখন বা ঘি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলছিলেন, প্রাণিজ এই চর্বি বেশি উপকারী। ঈদুল আজহার সময় অনেকে আবার ভাবেন, একদিন একটু বেশি গরু বা খাসির মাংস খেলে তেমন কিছু হয় না। গরু, মহিষ বা ছাগলের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংসকে রেড মিট বলা হয়।
পুষ্টিবিদরা যা বলেছিলেন
অধ্যাপক আরেফিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এক কথায় যেটা বলা যায়, উদ্ভিজ্জ ফ্যাট বা চর্বি প্রাণিজ ফ্যাটের চেয়ে সবসময়ই অনেক বেশি ভালো। প্রাণিজ ফ্যাটও খেতে হবে তবে পরিমিত। এখন পর্যন্ত যত গবেষণা হয়েছে তাতে এটিই প্রমাণিত।"
তাঁর ব্যাখ্যায়, প্রাণিজ চর্বিতে স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাট অনেক বেশি থাকে, যা শরীরের জন্য খারাপ এবং খুব অল্প পরিমাণেই গ্রহণ করা যায়। উদ্ভিজ্জ চর্বিতে বেশি থাকে অসম্পৃক্ত ফ্যাট, যার দুটি ভাগ। এর মধ্যে মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটকে তিনি সবচেয়ে ভালো বলেন এবং এর উৎকৃষ্ট উৎস হিসেবে অলিভ অয়েল, কাঠবাদাম ও চিনাবাদামের কথা বলেন। সূর্যমুখী তেল ও সামুদ্রিক মাছ থেকে পাওয়া পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে বলেও জানান তিনি।
পুষ্টিবিদরা বলেন, ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে একজন মানুষ কতটা প্রাণিজ চর্বি খাচ্ছেন তার ওপর। পরিমিত মাত্রার চেয়ে বেশি রেড মিট খেলে নানা শারীরিক জটিলতার সম্ভাবনা থাকে। আবার তাঁদের মতে, চর্বি বাদ দিয়ে ছোট টুকরো করে খেলে রেড মিট দৈনন্দিন প্রোটিনের ভালো উৎস হতে পারে, আর কম চর্বিযুক্ত রেড মিট শিশু, কিশোর, তরুণ ও গর্ভবতী নারীর জন্য পুষ্টিকর।

শরীরের জন্য চর্বি কেন দরকার
চর্বি শুধু প্রাণী থেকে আসে না, উদ্ভিদেও থাকে; আর শরীরের কাজ চালাতে চর্বি দরকারও। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) জানায়, ভিটামিন এ, ডি ও ই চর্বিতে দ্রবণীয়, তাই চর্বির সাহায্য ছাড়া শরীর এগুলো শোষণ করতে পারে না। অধ্যাপক আরেফিনের ভাষায়, "ফ্যাট হলো এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিডের উৎস, যেটি শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না।"
এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, চর্বি সম্পৃক্ত হোক বা অসম্পৃক্ত, এক গ্রাম চর্বিতে ৯ কিলোক্যালরি শক্তি থাকে, যেখানে এক গ্রাম কার্বোহাইড্রেট বা প্রোটিনে থাকে ৪ কিলোক্যালরি।
কোন খাবারে কোন চর্বি, সীমা কতটুকু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্রে বলেছে, দিনের মোট শক্তির ৩০ শতাংশের বেশি চর্বি থেকে আসা উচিত নয়; এর মধ্যে সম্পৃক্ত চর্বি থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয় এবং ট্রান্স ফ্যাট থেকে ১ শতাংশের বেশি নয়। সংস্থাটির তালিকায় সম্পৃক্ত চর্বির উৎস চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, ঘি, পনির, ক্রিম, লার্ড এবং পাম ও নারকেল তেল; অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস মাছ, অ্যাভোকাডো, বাদাম এবং সূর্যমুখী, সয়াবিন, ক্যানোলা ও অলিভ অয়েল।
অর্থাৎ সব উদ্ভিজ্জ তেল সমান নয়: এনএইচএসও বলে, পাম ও নারকেল তেল উদ্ভিদ থেকে এলেও তাতে সম্পৃক্ত চর্বি বেশি। এনএইচএসের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন পুরুষের দিনে ৩০ গ্রাম এবং একজন নারীর ২০ গ্রামের বেশি সম্পৃক্ত চর্বি খাওয়া উচিত নয়, আর প্রাপ্তবয়স্কদের ট্রান্স ফ্যাট দিনে মোটামুটি ৫ গ্রামের বেশি নয়। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বড় গবেষণায় যা পাওয়া গিয়েছিল
বিবিসির প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ-এএআরপি ডায়েট অ্যান্ড হেলথ স্টাডির একটি বিশ্লেষণের কথা বলা হয়, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরে জামা ইন্টারনাল মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৩১ জন নারী-পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেন, যাঁরা বেশি উদ্ভিজ্জ চর্বি, বিশেষ করে শস্য ও ভোজ্যতেল থেকে পাওয়া চর্বি খেতেন, তাঁদের সামগ্রিক ও হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি কম ছিল। অন্যদিকে প্রাণিজ চর্বি, যেমন দুগ্ধজাত খাবার ও ডিমের চর্বি বেশি খাওয়ার সঙ্গে এই ঝুঁকি বেশি ছিল।
গবেষকরা নিজেরাই উল্লেখ করেন, উদ্ভিজ্জ চর্বির সঙ্গে কম মৃত্যুঝুঁকির এই সম্পর্ক ধারাবাহিক হলেও মাত্রায় ছোট। পুষ্টিবিদদের পরামর্শের মূল কথাও তাই পরিমাণ ও উৎস: চর্বি পুরো বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রাণিজ চর্বি পরিমিত রেখে উদ্ভিজ্জ উৎসের অসম্পৃক্ত চর্বিকে প্রাধান্য দেওয়া।

ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস), জামা ইন্টারনাল মেডিসিন (পাবমেড)




মন্তব্য
(০)