সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

মুকুলের আগে আম বাগানের পরিচর্যা: মাঘে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা যা করেন

মুকুল আসার মাসখানেক আগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিরা বাগানে আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সার আর কীটনাশক স্প্রে করছিলেন। সার, সেচ ও পোকা দমনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কী বলে, জেনে নিন।

মুকুলের আগে আম বাগানের পরিচর্যা: মাঘে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা যা করেন
ফল

মাঘ মাস। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গাছে তখনো মুকুল আসেনি, আসতে আরও মাসখানেক দেরি। চাষিরা জানতেন, এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না: মাঘ শেষ হওয়ামাত্র ফাল্গুনের গরম বাতাসে জেলার প্রায় সব আম গাছে মুকুল আসবে। তাই ফুল আসার এক মাস আগেই তাঁরা বাগানে কাজে নেমে পড়েছিলেন।

দ্য এগ্রো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক দেখেছিলেন, ছোট-বড় সব আম বাগানের মালিকই তখন ব্যস্ত সময় পার করছেন, যাকে তাঁরা বলেন আগাম পরিচর্যা। তাঁরা বাগানের আগাছা পরিষ্কার করছিলেন, সেচ দিচ্ছিলেন, সার দিচ্ছিলেন, আর পোকা দমনে কীটনাশক স্প্রে করছিলেন। লক্ষ্য একটাই: পোকা দূর করে প্রতিটি ডালে স্বাস্থ্যকর মুকুল আনা, কারণ স্বাস্থ্যকর মুকুলই ভালো ফলনের প্রথম ধাপ। কিছুদিন আগে সামান্য যে বৃষ্টি হয়েছিল, তাতেও আমচাষিদের উপকার হয়েছিল।

এই প্রতিবেদনে সেই কাজের বিবরণ আর তার ব্যাখ্যা থাকছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাছে আম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, ফুল আসার আগের সপ্তাহগুলোতে গাছে কী ঘটে, আর সার, সেচ, আগাছা, পোকামাকড় ও রোগ দমনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কী সুপারিশ করে, তা জানা যাবে। মূল প্রতিবেদনে ওঠা আরও দুটি সমস্যাও এখানে আছে: জৈব পদার্থের ঘাটতি থাকা মাটি, আর আমের ডালে জন্মানো পরগাছা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কেন আমের দেশ


মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে ৭০টি ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়, আম তার মধ্যে অন্যতম। মোট ফল চাষের জমির ৪০ ভাগে আম চাষ হয়, আর দিন দিন এর পরিধি আরও বাড়ছে। তবে অঞ্চলভেদে ফলনের তারতম্য দেখা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে আমের ফলন দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশের সবচেয়ে পশ্চিমের জেলা। এটি রাজশাহী বিভাগের অংশ, এর সীমানা ঘেঁষে আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী জেলার আয়তন ১৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এটি রাজশাহী জেলার অংশ ছিল, সে বছর আলাদা জেলার মর্যাদা পায়। জেলায় পাঁচটি উপজেলা: ভোলাহাট, গোমস্তাপুর, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ।

দুটি নদী এখানকার ভূমির চেহারা গড়ে দিয়েছে। গঙ্গা শিবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নিয়েছে, আর মহানন্দা জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মায় মিশেছে। মহানন্দার পূর্ব দিকের জমি বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ, যেখানে ধানই প্রধান ফসল। পদ্মা অববাহিকার দিয়াড় অঞ্চলের মাটি উর্বর, বছরে কয়েকবার ফসল ফলানো যায়, আর সেখানে আম বাগান দ্রুত বাড়ছে।

জেলাটিকে প্রায়ই বাংলাদেশের আমের রাজধানী বলা হয়, কারণ গ্রীষ্মের এই ফলই এখানকার অর্থনীতির প্রধান ভরসা, আর জেলার জমির বড় অংশজুড়ে আম বাগান। উৎপাদনের বেশির ভাগ আসে শিবগঞ্জ, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর উপজেলা থেকে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুরোনো নাম) ও দিনাজপুরের নাম উল্লেখ করেছে।

আম গাছ ও তার মৌসুম


আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica), এটি অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় আম চিরসবুজ গাছ, এর কাণ্ড মোটা ও বড়, আর ফাঁকা জায়গা পেলে গাছটি ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়ে। গাছ ২০ মিটারের বেশি উঁচু এবং ৩০ মিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। প্রজাতিটির আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল, যার মধ্যে বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমার পড়ে। আম গাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ।

বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২০০৫-০৬ সালে দেশে ৬,৪১,৫২৫ একর জমি থেকে ৬,৩৯,৮২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। বাংলাপিডিয়া যেসব উৎকৃষ্ট জাতের নাম দিয়েছে, তার মধ্যে আছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, কিষাণভোগ, কুয়াপাহাড়ি, লতা বোম্বাই, বোম্বাই, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ ও মিছরিভোগ। বীজ থেকে জন্মানো গাছকে বলে দেশি বা গুটি আম, এর ফলের স্বাদের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) 'বারি আম' নামে একাধিক উন্নত জাতও অবমুক্ত করেছে।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, কলমের গাছে চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে এবং গাছটি প্রায় ৪৫ বছর ভালো ফল দেয়, আর বীজের গাছ ৬০ বছর বা তারও বেশি সময় ফল দিতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আম চাষ নির্দেশিকা অনুযায়ী জাতভেদে শতকপ্রতি ফলন ৫০ থেকে ৬০ কেজি।

একই নির্দেশিকা বলছে, পাকা আমে প্রচুর ভিটামিন এ থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে আছে ৯০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৮৩০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন, ২০ গ্রাম শর্করা, ১ গ্রাম আমিষ, ২০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.৩ মিলিগ্রাম লোহা এবং ৪১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।

ফুল আসার আগের সপ্তাহগুলো কেন জরুরি


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে আম গাছে ফুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে। ফুলগুলো ছোট, সাদাটে-হলুদ বা বেগুনি রঙের এবং সুগন্ধি, আর এগুলো ডালের মাথায় বড় মঞ্জরিতে, অর্থাৎ মুকুলে, ফোটে। একটি মুকুলে ১০০ থেকে ২৫০টি ফুলের কুঁড়ি থাকতে পারে, যদিও সবগুলো ফোটে না। ফুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়া ফসলের ক্ষতি করে।

এ কারণেই মুকুল আসার আগে গাছকে তৈরি করে নেন চাষিরা। সময় ভুল হলে কী বিপদ, মূল প্রতিবেদনে তা বলা হয়েছিল: ফুল আসার এক মাস আগে সেচ দিলে গাছে নতুন পাতা বের হয়, তাতে মুকুলের সংখ্যা কমে যায় এবং ফলনও কমে আসে। ফলন্ত গাছের ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশিকা আরও আগে থামতে বলে: মুকুল বের হওয়ার তিন মাস আগে থেকেই সেচ বন্ধ রাখতে হবে।

প্রতিবেদনের চাষিরা আশা করছিলেন, মুকুলের আগের স্প্রেতে তাঁরা স্বাস্থ্যকর মুকুল পাবেন। প্রধান পোকা ও রোগ দমনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো; মুকুল কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা হওয়া থেকে শুরু করে আমের গুটি মটরদানার আকার হওয়া পর্যন্ত কোন ধাপে কোন স্প্রে, তা সেখানে বলা আছে।

গাছে আমের মুকুল। ছবি: কায়সার আহমদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে আমের মুকুল। ছবি: কায়সার আহমদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সার: কতটা আর কখন


মূল প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল, আম বাগানে সার প্রয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি গাছে বছরে কী পরিমাণ সার লাগবে, তা নির্ভর করে মাটির গুণাগুণের ওপর, আর গাছ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারের চাহিদাও বাড়তে থাকে। প্রতিবেদনে গাছের বয়স অনুযায়ী বছরভিত্তিক সারের একটি তালিকাও ছিল, কিন্তু দ্য এগ্রো নিউজ সেই তালিকার উৎস হিসেবে কোনো সরকারি বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুঁজে পায়নি। তাই সেটির বদলে এখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আম চাষ নির্দেশিকায় দেওয়া মাত্রা দেওয়া হলো।

নতুন চারা রোপণের জন্য অধিদপ্তর প্রতি গর্তে নিচের হারে সার দিতে বলে:

  • গোবর: ২২ কেজি
  • ইউরিয়া: ১৫০ গ্রাম
  • টিএসপি: ৫৫০ গ্রাম
  • এমওপি: ৩০০ গ্রাম
  • জিপসাম: ৩০০ গ্রাম
  • জিংক সালফেট: ৬০ গ্রাম

নির্দেশিকা অনুযায়ী গর্তের মাপ হবে ১ মিটার লম্বা, ১ মিটার চওড়া ও ১ মিটার গভীর, চারা থেকে চারার দূরত্ব ৮ থেকে ১০ মিটার। গর্ত ভরাটের ১০ থেকে ১৫ দিন পর চারার গোড়ার মাটির বলসহ গর্তের মাঝখানে চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের সময় জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় (মে-জুন) এবং ভাদ্র-আশ্বিন (আগস্ট-সেপ্টেম্বর)।

একটি পূর্ণবয়স্ক ফলন্ত আম গাছের জন্য অধিদপ্তর বছরে এই হারে সার দিতে বলে:

  • গোবর: ৫০ কেজি
  • ইউরিয়া: ২ কেজি
  • টিএসপি: ১ কেজি
  • এমওপি: ৫০০ গ্রাম
  • জিপসাম: ৫০০ গ্রাম
  • জিংক সালফেট: ২৫ গ্রাম

অধিদপ্তরের নির্দেশিকায় এই সার দুই কিস্তিতে দিতে বলা হয়েছে: প্রথমবার জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে, দ্বিতীয়বার আশ্বিন মাসে। মূল প্রতিবেদনের পরামর্শও এর সঙ্গে মেলে: অর্ধেক সার বর্ষার আগে আর বাকিটা বর্ষার পরে আশ্বিন মাসে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, কোনো চাষি প্রথম কিস্তির সার না দিলে দ্বিতীয় কিস্তির সময় চাহিদার পুরো সারটাই প্রয়োগ করতে হবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, অনেক আমচাষি বাগানের নাবি জাতের ফজলি ও আশ্বিনা আম সংগ্রহের পর সার দেন, যাকে প্রতিবেদনটি বিজ্ঞানসম্মত মনে করেনি। এর যুক্তি ছিল, আম গাছে ফল আসার পর গাছগুলো সাধারণত দুর্বল হয়ে যায় এবং তখন গাছের খাদ্যের প্রয়োজন হয়; বর্ষার আগে সার দেওয়া থাকলে বর্ষা শুরু হলে গাছ তার প্রয়োজনীয় খাদ্য মাটি থেকে নিতে পারে।

প্রয়োগের পদ্ধতি হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দুপুরবেলা গাছের ছায়া যতটুকু জায়গায় পড়ে, ততটুকু জায়গায় সার ছিটিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে, রাসায়নিক ও জৈব সার একসঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে। মাটি জায়গাভেদে আলাদা, তাই নিজের বাগানের জন্য সঠিক পরিমাণ উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়াই ভালো।

বাংলাদেশের একটি আম গাছ। ছবি: বৈশাখী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি আম গাছ। ছবি: বৈশাখী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সেচ, আগাছা ও মাটির রস


মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, আম বাগানে নিয়মিত সেচ দিতে হবে, তবে মাটিতে রস থাকলে সেচের দরকার নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবর্তিত বেসিন পদ্ধতিতে সেচ দিলে পানি কম লাগে এবং বেশির ভাগ পানি গাছ গ্রহণ করতে পারে। এ পদ্ধতিতে গাছের গোড়ার চারদিকের জায়গা সামান্য উঁচু রেখে, দুপুরবেলা যতটুকু জায়গায় গাছের ছায়া পড়ে ততটুকু জায়গায় থালার মতো একটি বেসিন তৈরি করা হয়। বেসিন পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হলো গাছের গোড়া পরিষ্কার থাকে, ফলে আগাছা জন্মাতে পারে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশিকাও বেসিন পদ্ধতিতে সেচের কথা বলে, আর ফলন্ত গাছে সেচের সময়ও ঠিক করে দেয়। মুকুল বের হওয়ার তিন মাস আগে থেকে সেচ বন্ধ থাকবে। মুকুল ফোটার শেষ পর্যায়ে প্রথমবার এবং ফল মটরদানার আকার ধারণ করলে দ্বিতীয়বার সেচ দিতে হবে। চারা গাছের বেলায় নিয়ম আলাদা: দ্রুত বৃদ্ধির জন্য চারায় ঘন ঘন সেচ দিতে হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সেচ দেওয়ার পর জায়গাটি কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিলে মাটিতে রস ধরে থাকে। চরম আবহাওয়ার জন্যও অধিদপ্তরের পরামর্শ আছে: অতিবৃষ্টিতে বাগানে পানি জমে গেলে তাড়াতাড়ি তা সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অতিরিক্ত খরায় আম গাছের গোড়ায় সকাল-বিকাল পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে।

অধিদপ্তর বলছে, আগাছা গাছের খাদ্যে ভাগ বসায়, এতে আম গাছের ক্ষতি হয়। নির্দেশিকার পরামর্শ: গাছের গোড়ার মাটি মাঝে মাঝে কুপিয়ে আলগা করে আগাছা বেছে ফেলতে হবে, বছরে অন্তত একবার বাগানে লাঙল দিয়ে ভালোভাবে চাষ দিলে আগাছা জন্মানোর সম্ভাবনা কমে যায়, আর কাঁচি ও নিড়ানি দিয়েও আগাছা দমন করা যায়।

মুকুলের সময়ের পোকামাকড় ও রোগ


প্রতিবেদনের চাষিরা মুকুল রক্ষা করতে আগেভাগেই কীটনাশক স্প্রে করছিলেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশিকায় প্রধান পোকা ও রোগের নাম এবং মাত্রা দেওয়া আছে। নিচের মাত্রাগুলো অধিদপ্তরের; যেকোনো বালাইনাশক ব্যবহারের আগে বোতল বা প্যাকেটের লেবেল পড়ে নিতে হবে এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।

  • শোষক পোকা (হপার): মুকুল যখন ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তখন প্রথমবার, এবং আম যখন মটরদানার মতো আকার নেয় তখন দ্বিতীয়বার, সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (১০ ইসি) ১০ মিলিলিটার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে পুরো গাছে স্প্রে করতে হবে।
  • সুটি মোল্ড বা ঝুল রোগ, যা হপারের আক্রমণের পরে দেখা দেয়: সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক ৪০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
  • ফল ছিদ্রকারী পোকা (ভোমরা পোকা): মুকুল আসার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে; ফেনিট্রোথিয়ন জাতীয় কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।
  • অ্যানথ্রাকনোজ (পচন রোগ): ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম মিশিয়ে, মুকুল ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে প্রথমবার এবং আম মটরদানার মতো হলে আরেকবার স্প্রে করতে হবে।
  • পাতা কাটা উইভিল: গাছে কচি পাতা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেনিট্রোথিয়ন জাতীয় কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করলে পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়; কার্বারিল জাতীয় কীটনাশক ৩০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করাও চলে।
  • পাউডারি মিলডিউ: সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক ৪০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।

অধিদপ্তর কিছু সতর্কতাও দিয়েছে। বালাইনাশক ব্যবহারের আগে বোতল বা প্যাকেটের গায়ের লেবেল ভালো করে পড়ে নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। স্প্রের সময় নিরাপত্তা পোশাক পরতে হবে, আর ধূমপান বা পানাহার করা যাবে না। বালাইনাশক ছিটানো জমির পানি যেন মুক্ত জলাশয়ে না মেশে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে, আর বালাইনাশক দেওয়া জমির ফসল কমপক্ষে সাত থেকে ১৫ দিন পর বাজারজাত করতে হবে।

বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে আমের প্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে হপার, ফলের ভোমরা পোকা (উইভিল), কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা, ডগা ছিদ্রকারী পোকা ও ফলের মাছি পোকার নাম দিয়েছে। প্রধান রোগ হিসেবে তালিকায় আছে অ্যানথ্রাকনোজ, সুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, ডাইব্যাক বা আগা মরা, পাউডারি মিলডিউ এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ রোগ।

জৈব পদার্থ ও ধৈঞ্চা


মূল প্রতিবেদনের পরামর্শ ছিল, আম বাগানে জৈব পদার্থের ঘাটতি থাকলে ধৈঞ্চার চাষ করতে হবে। এতে বাগানে জৈব পদার্থসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যোগ হয় এবং মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে।

ধৈঞ্চার বৈজ্ঞানিক নাম সেসবানিয়া বিসপিনোসা (Sesbania bispinosa); ইংরেজিতে একে প্রিকলি সেসবান বা স্পাইনি সেসবানিয়াও বলা হয়। এটি একবর্ষজীবী গুল্ম, সাত মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, তবে সাধারণত এক থেকে দুই মিটারের বেশি বাড়ে না। এর কাণ্ড আঁশযুক্ত, পাতা লম্বা, আর ফুল হলুদ, তাতে বেগুনি ছোপ থাকে। শিম গোত্রের উদ্ভিদ বলে ধৈঞ্চা নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে, মাটির মান বাড়াতে লাগানো যায়, আর এটি গবাদিপশুর ভালো খাদ্যও।

থাইল্যান্ডের রাচাবুরি প্রদেশে ধৈঞ্চার (সেসবানিয়া বিসপিনোসা) একটি গাছ। ছবি: Xufanc / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
থাইল্যান্ডের রাচাবুরি প্রদেশে ধৈঞ্চার (সেসবানিয়া বিসপিনোসা) একটি গাছ। ছবি: Xufanc / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আমের ডালে পরগাছা


মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আম গাছে দুই-তিন ধরনের পরগাছা দেখা যায়, আর ছোট গাছের চেয়ে বড় গাছে পরগাছার আক্রমণ বেশি হয়। পরগাছার বীজ আম গাছের ডালে অঙ্কুরিত হয়ে বাড়তে থাকে এবং ডাল থেকে প্রয়োজনীয় পানি, খাদ্যরস ও খনিজ পদার্থ শোষণ করে বেঁচে থাকে। পরগাছার নিজের কোনো শিকড় থাকে না; শিকড়ের মতো একধরনের অঙ্গ, হস্টোরিয়া, তৈরি করে সে ডাল থেকে খাদ্য নেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্ষাকালে পরগাছার বীজ বেশি ছড়ায়।

এ ধরনের পরগাছার অনেকগুলোই লোরান্থেসি গোত্রের, যাকে মিসলটো পরিবার বলা হয়। এর একটি হলো ডেনড্রোফথো ফ্যালকাটা (Dendrophthoe falcata), যা ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা মিসলটো; প্রায় ৪০১টি পোষক উদ্ভিদে এর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে, যা যেকোনো মিসলটোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এটি আধা-পরজীবী উদ্ভিদ, পানি ও খনিজের জন্য হস্টোরিয়ার মাধ্যমে পোষক গাছের ওপর নির্ভর করে। ফলখেকো পাখি এর বীজ ছড়ায়, তাই মূল্যবান ফলগাছে এটি বারবার বড় ক্ষতি করে চলে।

গাছের ডালে ফুল ফোটা অবস্থায় লোরান্থেসি গোত্রের পরগাছা ডেনড্রোফথো ফ্যালকাটা। ছবি: প্রাইমজ্যোতি / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছের ডালে ফুল ফোটা অবস্থায় লোরান্থেসি গোত্রের পরগাছা ডেনড্রোফথো ফ্যালকাটা। ছবি: প্রাইমজ্যোতি / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

ফলনের আশা আর পরামর্শ কোথায় মেলে


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মঞ্জুরুল হুদা দ্য এগ্রো নিউজকে জানান, সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া ভালো থাকলে এবারও আমের বাম্পার ফলন হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে চাষিদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, আর চাষিরাও অধিক ফলনের আশায় সে অনুযায়ী কাজ করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সরকারের মাঠপর্যায়ের কৃষি সেবা সংস্থা, যার দপ্তর আছে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায়। আম নিয়ে গবেষণা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর সূচনা ১৯০৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত কৃষি গবেষণাগার থেকে, আর এখন এর সদর দপ্তর গাজীপুরের জয়দেবপুরে। ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া সব ফসল নিয়ে বারি গবেষণা করে, কারণ ওই চার ফসলের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে; বারির ফসলভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোর একটি উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র।

জেলায় বারির আম গবেষণা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্র নামে প্রতিষ্ঠিত হয়, আর আমের পাশাপাশি অন্যান্য ফল, ফুল ও সবজি নিয়েও গবেষণার জন্য ১৯৯০ সালে এর নাম বদলে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র রাখা হয়। জাত, সার বা পোকামাকড় নিয়ে প্রশ্ন থাকলে চাষিরা এই কেন্দ্রে বা নিজ নিজ উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

ছবি: মাহমুদুল করিম ফারসাদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস আম চাষ নির্দেশিকা), বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)