২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা মেহেরপুরের আমবাগানগুলো সোনারঙা মুকুলে ভরে উঠেছিল, আর চাষিরা আসন্ন মৌসুমে বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১০ মার্চ জানায়, আবহাওয়া তখন পর্যন্ত গাছের অনুকূলে ছিল। তবে ভালো মুকুলের আনন্দের পাশাপাশি চাষিদের দুটি দুশ্চিন্তা ছিল: মেহেরপুরের আমের জন্য বিদেশে কোনো বাজার তৈরি হবে কি না, আর প্রশাসনের আম পাড়ার সময়সূচি তাদের ঠিক সময়ে আম তুলতে দেবে কি না।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পত্রিকাটিকে জানায়, সে মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল এবং ৪৪ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। দপ্তরের উপপরিচালক বলেন, মাঠকর্মীরা চাষিদের বাগান পরিচর্যার পরামর্শ দিচ্ছেন, রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে তারা কাজ করছেন, আর আম পাড়ার সঠিক সময় নির্ধারণের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত জানাবেন।
মুকুলে ভরা বাগান, আবহাওয়ার দিকে নজর
জাগো নিউজ ২৪ জানায়, জেলার বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা গেছে ছোট-বড় সব বাগানের গাছ মুকুলের ভারে নুয়ে পড়েছে। পোকার আক্রমণ থেকে মুকুল বাঁচাতে চাষিরা তখন গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলেন। তারা বলেন, আগের কয়েক বছরের তুলনায় এবার মুকুল আসার হার অনেক বেশি, আবহাওয়াও সহায়ক ছিল। তাদের চিন্তা ছিল দিনের প্রচণ্ড গরম আর রাতের ঠান্ডার এই আচমকা ওঠানামা নিয়ে। সব ঠিক থাকলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে মুকুল থেকে গুটি বের হবে, আর বৈশাখের শেষভাগে বাজারে আসবে 'মধুমাসের' আম, এমনটাই আশা ছিল তাদের।
সেবার মুকুল এসেছিল দেরিতে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর থেকে জানায়, শীতের তীব্রতার কারণে সে বছর মুকুল একটু দেরিতে এসেছে: মাঘ মাসেই আঁটি আমের গাছে মুকুল আসতে শুরু করেছিল, কিন্তু বনেদি জাতের গাছে সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি মুকুল আসে এবং তখনো আসেনি। কৃষি কর্মকর্তারা বাসসকে বলেন, মূলত তিনটি পর্যায়ে আমের মুকুল আসে, আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফাল্গুনের মাঝামাঝির মধ্যে প্রতিটি গাছে পুরোপুরি মুকুল ফুটে যাবে। এক চাষি সংস্থাটিকে জানান, আগাম আসা মুকুল কুয়াশায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি, তাই শুরু থেকেই তিনি গাছ ও মুকুলের পরিচর্যা করছেন।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে আমগাছে জানুয়ারি থেকে মার্চে মুকুল আসে, আর এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধরায় ক্ষতি করে। বাংলাপিডিয়া আমের প্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে শোষক পোকা বা হপারের কথা বলেছে, সঙ্গে আমের ভোমরা পোকা, কাণ্ড ও ডগার মাজরা পোকা এবং ফলের মাছি। রোগের মধ্যে আছে অ্যানথ্রাকনোজ, পাউডারি মিলডিউ, শুটি মোল্ড, পাতার ঝলসানো ও আগামরা রোগ। দেশে আমের প্রায় তিন ডজন ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত হয়েছে। এ কারণেই মুকুল আসা ও গুটি ধরার সপ্তাহগুলো, যখন জাগো নিউজের প্রতিবেদনটি লেখা হয়, বাগানে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়: মুকুল আর কচি গুটি ধরে রাখতে চাষিরা গাছে ওষুধ ছিটান ও যত্ন নেন। কোন বালাইনাশক কতটুকু দিতে হবে, তা পোকা বা রোগ, জাত আর ফসলের অবস্থার ওপর নির্ভর করে, তাই এ সিদ্ধান্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে নেওয়াই নিয়ম।

আম পাড়ার সময়সূচি নিয়ে চাষিদের অভিযোগ
ভালো মুকুল সত্ত্বেও বাগান মালিক সাখাওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে তার উৎকণ্ঠার কথা জানান। তার অভিযোগ, আম পাড়ার জন্য প্রশাসনের দেওয়া নির্দিষ্ট সময়সূচি বা 'ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার' অনেক সময় চাষিদের বিপাকে ফেলে।
স্থানীয় বাগান মালিক বিল্লাল হোসেন বলেন, 'গত কয়েক বছর ধইরে প্রশাসনের কাছ থাইকে সঠিক সময়ে আম ভাঙার অনুমতি আমরা পাইনি। গাছে আম পেকে ঝরে পড়ে যায় কিন্তু আমরা বাজারে তুলতে পারি না। পাশাপাশি আম রপ্তানি না হওয়ায় আমাদের অনেক টাকা লোকসানে পড়তে হয়।'
দেশের আম-উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে কয়েক বছর ধরেই এমন সময়সূচি দেওয়া হচ্ছে। যেমন রাজশাহী জেলা প্রশাসন কৃষিবিজ্ঞানী, ফল গবেষক, চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করে ২০২৪ সালের ১২ মে সে বছরের সময়সূচি ঘোষণা করে এবং জানায়, অপরিপক্ব ও ভেজাল আম বাজারজাত ঠেকানোই এর উদ্দেশ্য; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর এই সময়সূচি দেওয়া হচ্ছে। মেহেরপুরে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ এই তারিখ ঠিক করে। ঢাকা পোস্ট ২০২৩ সালের ১২ মে জেলা প্রশাসনের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, সে বছর আঁটি ও বোম্বাই আম ১৫ মে, গোপালভোগ ১৮ মে, হিমসাগর ২৫ মে, ল্যাংড়া ২৮ মে, আম্রপালি ৫ জুন, মল্লিকা ১০ জুন, ফজলি ২০ জুন এবং বিশ্বনাথ, আশ্বিনা ও বারি-৪ আম ১৫ জুলাই থেকে সংগ্রহের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল। সমকাল জানায়, ২০২৪ সালেও আঁটি ও বোম্বাই আম ১৫ মে, হিমসাগর ২৫ মে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
জাগো নিউজে চাষিদের এই অভিযোগ নতুন ছিল না। ২০২৩ সালের মে মাসের সেই ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনেই মেহেরপুরের খুচরা আম বিক্রেতারা বলেছিলেন, জেলায় তখনো আম সংগ্রহ শুরু হয়নি অথচ অনেক গাছের আম পাকতে শুরু করেছে, পাকা আম গাছ থেকে পড়ে নষ্ট হচ্ছে; গাছের আম দেখে সংগ্রহের সময় ঠিক করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তারা।
ফিকে হয়ে আসা রপ্তানির আশা
বাগান মালিক সুমন হোসেন জাগো নিউজকে চাষিদের দ্বিতীয় দুশ্চিন্তার কথা এভাবে বলেন, 'মুকুল তো ভালো হইছে কিন্তু রপ্তানির বাজার যদি তৈরি না হয় আর ঠিক সময়ে আম ভাঙার দিনক্ষণ না দেয়, তবে আমাদের সব কষ্ট বৃথা যাবে। আমরা চাই সরকার আম রপ্তানির ব্যবস্থা করুক, যাতে আমরা ন্যায্য দাম পাই।'
মেহেরপুরের আম আগেও ইউরোপে গেছে। সমকাল ২০২৪ সালের ১৮ মে জানায়, সদর উপজেলার আমঝুপির এক বাগান মালিক বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আশায় ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ফ্রুট প্রটেকশন ব্যাগিং পদ্ধতিতে বাগান শুরু করেন এবং সেবার ভালো মুনাফা করেন; ২০১৭ ও ২০১৮ সালে তার মতো মেহেরপুরের অন্য চাষিদের বাগানের আমও ইউরোপে সুনাম কুড়ায়। ভালো দামের আশায় বহু বাগান মালিক ব্যাগিং শুরু করেন। কিন্তু তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির কারণে ২০১৯ সালের পর রপ্তানিকারকরা আর মেহেরপুরে আসছেন না; ব্যাগিং করা চাষিদের লোকসান গুনতে হয়, আর ২০২৩ সালে তিনি ব্যাগিং বন্ধ করে দেন।
এর এক বছর আগে পরিস্থিতি কিছুটা আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছিল। ঢাকা পোস্ট ২০২৩ সালের ১২ মে জানায়, জেলার আমবাগানের মধ্যে ৭০০ হেক্টর জমিতে হিমসাগরের বাগান, আর সে মৌসুমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে ৪০ মেট্রিক টন হিমসাগর রপ্তানির সম্ভাবনা ছিল। তখনকার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, এ লক্ষ্যে কয়েকটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু বাগান নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে, আর আগের বছরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হিমসাগর রপ্তানি করেছিল। গাংনী ও মুজিবনগরের চাষিরা তখন বলেছিলেন, বিদেশে মেহেরপুরের আমের জন্য উন্মুক্ত বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকেরা আরও লাভবান হবেন, এবং এ জন্য কৃষি বিভাগের সহায়তা চেয়েছিলেন।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য ও জেলার হিসাব
চাষিদের উদ্বেগের জবাবে মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধা জাগো নিউজকে বলেন, 'আমরা মাঠ পর্যায়ে চাষিদের বাগান পরিচর্যার বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি আম রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছি। কৃষকদের উদ্বেগের বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। আম সংগ্রহের সঠিক সময় নির্ধারণের বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত জানাবো, যাতে বাগান মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সে মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল, আর বছরে ৪৪ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছিল দপ্তরটি।
আগের প্রতিবেদনগুলোর পরিসংখ্যান দেখায়, বছর বছর জেলার আমবাগানের আয়তন ও উৎপাদনের হিসাব কীভাবে এসেছে। ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির বাসসের প্রতিবেদনে একই উপপরিচালক বলেন, জেলায় ২ হাজার ৩৬১ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে এবং গত মৌসুমে ৩৮ হাজার ১৭৭ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে ঢাকা পোস্ট জানায়, ২ হাজার ৩৪০ হেক্টর বাগানে প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তখনকার উপপরিচালক বাসসকে জানান, জেলায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে; আর সে বছরের মে মাসে সমকাল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায় ২ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি ও ৩৬ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার কথা। সেটি ছিল কর্মকর্তাদের ভাষায় আমের 'অফ ইয়ার': গাছে মুকুল কম এসেছিল, তীব্র তাপদাহে অনেক গুটি ঝরে গিয়েছিল, আর কর্মকর্তারা সমকালকে বলেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংখ্যাগুলো আলাদা, তাই প্রতিটি সংখ্যা এখানে তার সূত্র যেভাবে বলেছে সেভাবেই দেওয়া হলো।
মেহেরপুর জেলা ও তার আম
মেহেরপুর দেশের ছোট জেলাগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী খুলনা বিভাগের এই জেলার আয়তন ৭৫১.৬২ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা তিনটি: গাংনী, মুজিবনগর ও মেহেরপুর সদর। এর উত্তরে কুষ্টিয়া জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে চুয়াডাঙ্গা জেলা ও পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া এবং পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব, ইছামতী, মাথাভাঙ্গা ও কাজলা নদী। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯২।
জেলার সবচেয়ে পরিচিত স্থানটিও একটি আমবাগান। বাংলাপিডিয়া জানায়, মুজিবনগরে (আগের নাম বৈদ্যনাথতলা) ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয় এবং একই দিন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়; বাসস জায়গাটিকে ব্রিটিশ শাসনামলের আম্রকানন হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেখানে এখন ২০.১০ একর জায়গাজুড়ে একটি স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্স রয়েছে।
বাসস ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং আবার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, মেহেরপুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সব জাতের আমেরই চাষ হয়, লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর কৃষিজমিতে নতুন বাগান তৈরি হচ্ছে, আর এ জেলার হিমসাগর, ল্যাংড়া, বোম্বাই ও তিলি বোম্বাই আম স্বাদের জন্য সমাদৃত। ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি ও আশ্বিনা জাতের বাগান বেশি হলেও চাষিরা গবেষণায় উদ্ভাবিত বারি-৩ ও বারি-৪ জাত, জুলাই-আগস্টে পাকে এমন নাবি জাত এবং বারোমাসি জাতের বাগানও করছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাসসকে কৃষি বিভাগ জানায়, মেহেরপুরের হিমসাগর আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এ কারণে জেলার আমের চাহিদা বেড়েছে।

দেশে আমের উৎপাদন ও রপ্তানির চিত্র
আম (Mangifera indica) ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের, বাংলাদেশসহ, স্থানীয় ফল বলে ধারণা করা হয়। বাংলাপিডিয়া দেশে প্রায় ১০০টি আমের জাতের কথা বলেছে; উৎকৃষ্ট জাতের আমের প্রধান এলাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৫ সালের মে মাসে জানায়, ২০২০-২১ সালে দেশে ২ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে ২৩ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ সালে ২৭ দশমিক ৭ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৩-২৪ সালে ২ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমিতে ২৫ দশমিক ৮৯ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছে, আর আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।
এই বিপুল উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি সামান্য এবং ওঠানামা করেছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২০ সালের জুলাইয়ে জানায়, ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ১৬৫ টন আম রপ্তানি হয়, ২০১৬ সালে তা তখনকার সর্বোচ্চ ৬৬৫ টনে পৌঁছায়, ২০১৭ সালে নেমে আসে ৩২৪ টনে এবং ২০১৯ সালে ১০০ টনের নিচে। উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের এক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, বেশির ভাগ আম কীটে আক্রান্ত থাকায় ক্রেতা দেশগুলো চালান ফেরত দিয়েছে, আর কিছু রপ্তানিকারক চুক্তিবদ্ধ চাষির বদলে স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের আম কিনেছিলেন।
এরপর রপ্তানি আবার বাড়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানায়, ২০২০-২১ সালে ৭৯১ মেট্রিক টন এবং ২০২১-২২ সালে ১ হাজার ৭৫৭ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রথম আলো উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের সূত্রে জানায়, ২০২৩ সালে বিশ্বের ৩৮টি দেশে ৩ হাজার ৯২ টন আম রপ্তানি হয়েছিল, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। পরের মৌসুমে রপ্তানি আবার কমে: ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৬৭৭ দশমিক ৬ টন। রপ্তানিকারকেরা এর জন্য উড়োজাহাজে জায়গার অভাব, দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়া ভাড়া এবং কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সরকারি নগদ প্রণোদনা ১৫ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনাকে দায়ী করেন। পরে প্রথম আলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ২৪ লাখ টন আম উৎপাদিত হলেও রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩২১ টন, ২১টি দেশে।
২০২৫ সালে নতুন একটি বাজার খোলে। প্রথম আলো জানায়, বাংলাদেশি আমের প্রথম চালান হিসেবে সাতক্ষীরা ও যশোর অঞ্চলের ১০ টন আম ২০২৫ সালের ২৮ মে ঢাকা থেকে চীনে যাওয়ার কথা, আর পুরো মৌসুমে ১০০ টন রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল। চীনে আমসহ কিছু কৃষিপণ্য রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ ২০১৯ সালে আবেদন করেছিল।
আম রপ্তানিতে যা যা লাগে
তাজা আম রপ্তানি করতে হলে আমদানিকারক দেশের উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য বিধি মানতে হয়। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২০ সালের জুলাইয়ে জানায়, রপ্তানির জন্য উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য সনদ (ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট) দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইং, আর রপ্তানিযোগ্য আম পরীক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে নিয়ে যেতে হতো। ২০২৫ সালের মে মাসে চীনে আম রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানোর সময় ইপিবি বাংলাদেশের করণীয়ের একটি তালিকা দেয়: আমের সংরক্ষণকাল বাড়ানো, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সুবিধা তৈরি, রাসায়নিকের সঠিক ব্যবহার, উন্নত মোড়ক, ফলের মাছির আক্রমণ কমানো, উত্তম কৃষি চর্চা (জিএপি) অনুসরণ, চাষি ও রপ্তানিকারকদের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি প্রশিক্ষণ এবং কোল্ড চেইন বজায় রাখা। চীনের জন্য চাষি ও রপ্তানিকারকদের তালিকা তৈরি হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও এর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে।
সেই প্রকল্পে মেহেরপুরও ছিল। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৩ সালের জুনে জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও পার্বত্য এলাকা রয়েছে; প্রকল্পের লক্ষ্য ৮ হাজার ৪০০ চাষিকে আম উৎপাদন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া, আর তখন ৯৯০ জন আমচাষির সঙ্গে কাজ চলছিল। প্রথম আলো ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, সে মৌসুমে প্রকল্পের আওতায় ৯৩০ জন উদ্যোক্তার কাছ থেকে শুধু রপ্তানির জন্য আম সংগ্রহ করা হচ্ছিল। পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, খামার থেকে বন্দর পর্যন্ত অবকাঠামো আর মোড়কের মান এখনো উন্নত করা দরকার।
রপ্তানিকারকেরা আরও কিছু বাধার কথা বলেছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা প্রথম আলোকে বলেন, আম রপ্তানিতে নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে যে সরকারি উদ্যোগ দরকার তা দেখা যাচ্ছে না, আর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নেই। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক একই পত্রিকাকে বলেন, উড়োজাহাজের ভাড়া আকাশচুম্বী হওয়ায় তারা জাহাজে আম পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন, প্রথম চালান যাবে নেদারল্যান্ডসে। এই পরিস্থিতিতেই ২০২৬ সালের মার্চে মুকুলে ভরা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে মেহেরপুরের চাষিরা তাদের আমের জন্য বিদেশে বাজার খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছিলেন।
ছবি: কায়সার আহমেদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস, ঢাকা পোস্ট, সমকাল, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)