বর্ষায় টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে বাংলাদেশের বহু এলাকা ডুবে যায়, শহরে দিনের পর দিন জমে থাকে পানি। ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন ব্যাখ্যা করেন, এমন সময়ে কোন রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং কীভাবে তা কমানো যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময় সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা থাকে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, বিভিন্ন চর্মরোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ ও ই-এর মতো পানিবাহিত সংক্রমণের।
সব রোগের কারণ এক নয়। কোনোটি দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়, কোনোটি মশাবাহিত, আবার কোনোটি দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকার ফল। ডা. মুশতাক হোসেন ঝুঁকিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেন: বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাবার ও স্যানিটেশনের সংকট থেকে আসা ঝুঁকি, এবং দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত কারণে তৈরি ঝুঁকি।
খাওয়ার পানির সংকটে ডায়রিয়া ও কলেরা
"চারদিকে অনেক পানি আছে, কিন্তু খাবার মতো পানি নেই। এটাই বন্যার সময় সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি," বলেন ডা. মুশতাক হোসেন। নিরাপদ পানি ও খাবার নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া ও কলেরা অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ২৪ ঘণ্টায় তিন বা তার বেশিবার পাতলা পায়খানা হলে সাধারণত তাকে ডায়রিয়া বলা হয়, আর এতে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। শিশুরাই এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, কলেরা হয় ভিব্রিও কলেরি নামের ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত খাবার বা পানি খেলে। সংক্রমণের ১২ ঘণ্টা থেকে ৫ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়, এবং চিকিৎসা না হলে তীব্র পানির মতো পাতলা পায়খানা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাণঘাতী হতে পারে। ডব্লিউএইচও বলছে, বেশির ভাগ রোগীকে দ্রুত খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) দিয়েই সফলভাবে চিকিৎসা করা যায়। ডা. হোসেনও পানিশূন্যতা ঠেকাতে দ্রুত ওআরএস খাওয়ানো এবং গুরুতর রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কয়েক দিন বা সপ্তাহ পরে দেখা দেওয়া রোগ
কিছু রোগ সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় না। টাইফয়েড বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ। ডব্লিউএইচও জানায়, সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার এই রোগ সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়; লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, পেটব্যথা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, আর অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এর চিকিৎসা হয়। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৮ হাজার মানুষ মারা যান, যাদের ৬৮ শতাংশই শিশু।
জলাবদ্ধ এলাকায় হেপাটাইটিস এ ও ই, অর্থাৎ জন্ডিসের প্রকোপও বাড়ে। ডব্লিউএইচও জানায়, হেপাটাইটিস ই মূলত দূষিত খাওয়ার পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং সংক্রমণের ২ থেকে ১০ সপ্তাহ পরে লক্ষণ দেখা দেয়। গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি বিশেষ বিপজ্জনক: গর্ভের শেষ তিন মাসে আক্রান্ত হলে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত গর্ভবতী নারীর মৃত্যু হতে পারে। প্রতিরোধে নিরাপদ পানি ব্যবহারই প্রধান উপায়; থালাবাসন ধোয়া ও গোসলের পানিও বিশুদ্ধ হওয়া দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানায়, লেপ্টোস্পাইরোসিস ছড়ায় সংক্রমিত প্রাণীর প্রস্রাব থেকে, আর ভারী বৃষ্টি বা বন্যার পরে এর ঝুঁকি বেশি, কারণ মাটিতে থাকা প্রাণীর প্রস্রাব বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে মিশে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকায় স্ক্যাবিসসহ চর্মরোগ, শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং নিরাপদ টয়লেটের অভাবে মূত্রনালির সংক্রমণও (ইউটিআই) বাড়তে পারে বলে জানান ডা. হোসেন। ডেঙ্গু নিয়ে তিনি একটি ভুল ধারণার কথা বলেন: বন্যার পানিতে এডিস মশার ডিম ও লার্ভা ভেসে যেতে পারে, তবে পানি নামার পর বিভিন্ন জায়গায় পরিষ্কার পানি জমলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে, কী সতর্কতা দরকার
শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন; জ্বর, পেশিব্যথা, ডায়রিয়া বা অন্য গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে তাদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। ডা. হোসেন ত্রাণের সঙ্গে শিশুখাদ্য ও তা তৈরির বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা এবং নারীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন। দ্বিতীয় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া, সাপের কামড় এবং পানিতে হাঁটার সময় কাচ বা টিনে পা কেটে সংক্রমণ; টিটেনাসের টিকা নেওয়া না থাকলে ধনুষ্টংকারের ঝুঁকিও থাকে।
প্রতিবেদনে ও সিডিসির বন্যা-নির্দেশনায় দেওয়া প্রধান সতর্কতাগুলো হলো:
- যতটা সম্ভব জলাবদ্ধতার পানি এড়িয়ে চলা; বন্যায় ডোবা পথে হেঁটে বা গাড়ি চালিয়ে পার না হওয়া।
- পানিতে নামলে পরে সাবান দিয়ে হাত-পা ধোয়া এবং ভেজা জুতা-মোজা দ্রুত বদলানো।
- শরীরে কাটা বা ক্ষত থাকলে ঢেকে রাখা এবং দূষিত পানির সংস্পর্শ এড়ানো।
- শেষ কবে টিটেনাসের টিকা নেওয়া হয়েছে তা জেনে রাখা।
- খাওয়া, রান্না ও ধোয়ার জন্য শুধু নিরাপদ পানি ব্যবহার করা; ডায়রিয়া হলে সঙ্গে সঙ্গে ওআরএস খাওয়ানো।

ছবি: Nayeemibnmatiur / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (কলেরা, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস ই তথ্যপত্র), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)




মন্তব্য
(০)