আম রপ্তানির আগে ফলকে পোকামাকড়মুক্ত করতে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) বাধ্যতামূলক হলেও দেশে এ প্রযুক্তির ব্যবহার তখনো সীমিত ছিল বলে জানান বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ। ২০২৬ সালের ২৭ জুন, শনিবার সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, রপ্তানির আগে প্রতিটি আম পোকামাকড় ও জীবাণুমুক্ত করতে আধুনিক ভিএইচটি প্রযুক্তি দরকার, কিন্তু অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় রপ্তানিকারকদের বাড়তি সময় ও খরচ বহন করতে হচ্ছে।
ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট কী এবং কেন দরকার
ভিএইচটি হলো তাপ দিয়ে ফল শোধনের একটি বিশেষ পদ্ধতি, যা ফলের ভেতরে থাকতে পারে এমন ফলের মাছির ডিম, লার্ভা ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা মেরে ফেলে। জাপানের মতো কঠোর মানদণ্ডের বাজারে তাজা আম পাঠানোর অন্যতম শর্ত এই শোধন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ সুরক্ষা কনভেনশন (আইপিপিসি) ২০১৭ সালে আমের জন্য ভিএইচটির একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করে। সেই নিয়মে আম একটি বাষ্প-তাপ কক্ষে রেখে বাতাসের তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা অন্তত ৯৫ শতাংশে ধরে রাখা হয়, যতক্ষণ না ফলের কেন্দ্রের তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়।
প্রথম আলোর ২০২৬ সালের ৩১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলীতে একটি ভিএইচটি স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল। ফল ও সবজি বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফ্রেশপ্লাজা ৯ জুন জানায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এই স্থাপনায় দিনে প্রায় তিন টন আম শোধন করা যায়, আর আমের পাশাপাশি কামরাঙা, মাল্টা, লিচু, পেয়ারা, ড্রাগন ফল ও কয়েকটি সবজিও এখানে শোধনের আওতায় আনা হয়।

উৎপাদন বেশি, রপ্তানি সামান্য
ফ্রেশপ্লাজার হিসাবে দেশে বছরে আনুমানিক ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হয়, কিন্তু রপ্তানির পরিমাণ তার তুলনায় খুব কম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানায়, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩২১ টন এবং ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৮৮ টন আম রপ্তানি হয়। জাপানের বাজার ধরতে ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং কাজ করছিল; জাপান এমন ১৬টি ক্ষতিকর পোকার বিষয়ে বাড়তি বৈজ্ঞানিক তথ্য চেয়েছিল, যা আগের জমা দেওয়া নথিতে পুরোপুরি আসেনি।
গোলটেবিলে ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, উন্নত দেশগুলো লেজার প্রযুক্তি দিয়ে ফলের গুণগত মান যাচাই করে; রপ্তানিযোগ্য ফল আরও মানসম্মতভাবে বাছাই করতে বাংলাদেশেও এমন প্রযুক্তি চালু করা দরকার। পরিবহন ব্যয়কে আরেকটি বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এক কেজি ফল বিদেশে পাঠাতে কয়েকশ টাকা পরিবহন খরচ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও পরিবহন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

শুকনো ফল, পাহাড়ি জমি ও নতুন ফল
তিনি বলেন, ইউরোপের বাজারে ডিহাইড্রেটেড বা শুকনো ফলের বিশাল চাহিদা রয়েছে; দেশে এ ধরনের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের বিপুল অনাবাদি জমি ফল চাষের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় সব পাহাড়ি এলাকায় ফলের চাষ হয়, কিন্তু বাংলাদেশে সেই সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো হয়নি। সেচের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ে বাণিজ্যিক ফল চাষ কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে বলে তাঁর মত।
আঙুরসহ নতুন ফলের চাষে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত প্রযুক্তি প্যাকেজ তৈরি করতে হবে এবং শুধু চারা বিক্রির ওপর জোর না দিয়ে কৃষককে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আধুনিক সংরক্ষণ, উন্নত রপ্তানি প্রযুক্তি ও বছরব্যাপী উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে ফল খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

গোলটেবিলটি সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক। আলোচনায় আরও ছিলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, ফ্রেশপ্লাজা, আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ সুরক্ষা কনভেনশন (আইপিপিসি, এফএও)





মন্তব্য
(০)