টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে কিশোরগঞ্জে নতুন করে আরও আড়াই হাজার হেক্টরের বেশি জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এ নিয়ে জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ধানি জমির পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টরে, আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৯ হাজারে। সোমবার, ৪ মে ২০২৬ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন বলে সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজ২৪ জানায়।
অব্যাহত বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল তখন প্লাবিত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক কৃষক পাকা ধানও কাটতে পারছিলেন না, ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন তাঁরা।
৪ মে কৃষি বিভাগ যা জানায়
ড. সাদিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার, ৩ মে বিকেল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে যায়, যার মধ্যে ইটনা ও অষ্টগ্রামে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। ততদিনে জেলার হাওরাঞ্চলের ৬১ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছিল বলে তিনি জানান। বৃষ্টি না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কমতে পারে, তবে পরিস্থিতি তখনো ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছিলেন।
অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজিখেতেও ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত বৃষ্টি হলেও ৪ মে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদ ওঠে, এতে কৃষকের মনে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। জেলার হাওর উপজেলা নিকলীর আবহাওয়া অফিস জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
স্থানীয় কৃষকেরা জাগো নিউজকে জানান, বিপুল পরিমাণ জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় তাঁরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, কাটা ধান শুকাতে না পেরে কৃষকেরা অল্প দামেই তা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিলেন, আর এতে অনেকে লোকসানের মুখে পড়েন।
নদীর পানি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ৪ মে সকাল ৯টার তথ্যে জেলার বেশির ভাগ নদীর পানি বাড়তে দেখা যায়:
- ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদী: ৩ দশমিক ২৬ মিটার, আগের দিনের চেয়ে ১০ সেন্টিমিটার বেশি।
- চামড়াঘাটে মেঘনা নদী: ২ দশমিক ৯৫ মিটার, বেড়েছে ১৭ সেন্টিমিটার।
- অষ্টগ্রামে কালনী নদী: ২ দশমিক ৫৮ মিটার, বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার।
- ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদী: কমে ১ দশমিক ৭২ মিটার, আগের দিনের চেয়ে ৫ সেন্টিমিটার কম।
পাউবো জানায়, সব নদীর পানি তখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, তবে বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়তে পারে। কিশোরগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সেদিন বিকেলে সারা দেশের নদীর চিত্র তুলে ধরে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) বুলেটিন, যা ৪ মে সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটে ঢাকা ট্রিবিউন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, হাওরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার সাতটি নদী বিপৎসীমার ওপরে, এর মধ্যে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে নলজুর নদী ৪০ সেন্টিমিটার, নেত্রকোনার খালিয়াজুরিতে বৌলাই ৮ সেন্টিমিটার এবং হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে কালনী-কুশিয়ারা ১০ সেন্টিমিটার ওপরে। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে ধনু-বৌলাই নদীর পানি পরের তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে পাশের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি থাকতে পারে বলে কেন্দ্রটি জানায়। হাওরের প্লাবিত এলাকার অবনতি এবং নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলে এফএফডব্লিউসি।

দশ দিনে যেভাবে বাড়ে ক্ষতি
৪ মের হিসাবটি ছিল ক্রমাগত বাড়তে থাকা হিসাবের সর্বশেষ ধাপ। আগের দিনগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, কখনো ডিএইর বরাতে, কখনো কৃষকদের বরাতে, দেখা যায় কিশোরগঞ্জের হাওরে কত দ্রুত পানি ছড়িয়েছে:
- ২৭ এপ্রিল: প্রথম আলো জানায়, দুই দিনের বৃষ্টিতে অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকা এবং ইটনা ও মিঠামইন হাওরের কিছু এলাকায় প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ডিএইর কাছে তখনো সঠিক হিসাব ছিল না; কৃষকদের দাবি ছিল, দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। ড. সাদিকুর রহমান জানান, হাওরে ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।
- ৩০ এপ্রিল: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কৃষি বিভাগের বরাতে জানায়, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী এই চার উপজেলায় হাওরের প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়েছে, আর প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ধান আগেই কাটা শেষ হয়েছিল।
- ১ মে: ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে প্রায় সাত হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়েছে; ওই সময়ে জেলায় মোট ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়।
- ২ মে: প্রথম আলো ডিএইর বরাতে জানায়, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর হাওরে ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর ধানি জমি তলিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২১ হাজার কৃষক।
- ৩ মে: প্রথম আলো জেলা ডিএইর বরাতে জানায়, ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর ধানখেত তলিয়েছে, বিপাকে পড়েছেন ৩০ হাজারের বেশি কৃষক।
- ৪ মে: ডিএই জানায়, তলিয়ে যাওয়া জমি সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক প্রায় ৪৯ হাজার।
পুরো সপ্তাহজুড়ে কৃষকের অভিযোগ ছিল একটাই: কাটা ধান শুকানো যাচ্ছে না। ১ মে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, বৃষ্টিতে খলাও (মাড়াইয়ের জায়গা) ডুবে গেছে, ফলে কাটা ধান না শুকিয়ে তাতে চারা গজাচ্ছে, আর কৃষকেরা নষ্ট ধান কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ২ মে ঢাকা ট্রিবিউন ও প্রথম আলো জানায়, প্রায় পাঁচ দিন স্তূপ করে রাখা ধান কালো হয়ে পচে যাচ্ছে; নিকলীর মজলিশপুর এলাকার এক কৃষক বলেন, দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরিতেও শ্রমিক মিলছে না। ৩ মে প্রথম আলো করিমগঞ্জের মানিকপুর হাওর থেকে জানায়, চারা গজানো পচা ধান কোনো কোনো কৃষক হাওরের পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।
৩০ এপ্রিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অষ্টগ্রাম ও মিঠামইনের কৃষকেরা জানান, জমি চাষ, সার ও শ্রমিকের মজুরির জন্য তাঁরা ধারদেনা করেছিলেন, সব ফসল পানির নিচে চলে গেছে। ইটনার আটপাশা গ্রামের এক কৃষক বলেন, জমি পানির নিচে থাকায় ধান কাটা যাচ্ছে না, নির্ধারিত মজুরির দ্বিগুণ দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃষ্টিতে হাওরের মেঠোপথ কর্দমাক্ত হওয়ায় হারভেস্টারে ধান কাটা ও কাটা ধান বাড়িতে আনাও কঠিন হয়ে পড়ে।

একই সপ্তাহে হাওরের অন্য জেলাগুলো
একই সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যে সাতটি হাওর জেলা ক্ষতির মুখে পড়ে, কিশোরগঞ্জ তার একটি। ২০২৬ সালের ১ মে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ডিএইর আঞ্চলিক হিসাব প্রকাশ করে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বোরো আবাদ হয় ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টরে, এর মধ্যে হাওরে ৪ দশমিক ৫৫ লাখ হেক্টর। বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরের ৬৩ শতাংশ ধান কাটা হয়, মাঠে থেকে যায় প্রায় ৩৭ শতাংশ: হবিগঞ্জে ৪৫ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৪৭ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ৩৮ শতাংশ ও নেত্রকোনায় ৩৫ শতাংশ। না কাটা জমির মধ্যে ৮৮ হাজার হেক্টর নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ, আর ২৮ হাজার হেক্টরের ধান তখনই পানিতে নিমজ্জিত, যার ১৩ হাজার ৫৪১ হেক্টর সিলেট বিভাগে।
একই প্রতিবেদন হাওরকে জাতীয় চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখায়। দেশের বেশির ভাগ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে, আর তার প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরভুক্ত সাত জেলা থেকে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে ২ কোটি ২৭ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল ডিএই। স্থানীয় কৃষক ও সংগঠনগুলো ডিএইর তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং বলে, প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি। ডিএইর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তখনো চূড়ান্ত হয়নি, আর এত ধান একসঙ্গে শুকানোর কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, হাওরে ধান কাটার জন্য হারভেস্টার, রিপার ও শুকানোর জন্য ড্রায়ার সরবরাহ করা হয়েছে, আর যেখানে যন্ত্র নামানো যাচ্ছে না, সেখানে হাতে দ্রুত কাটার জন্য লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে।
৩ মে প্রথম আলো স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্যের বরাতে জানায়, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরে ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি ধানখেত তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে। সুনামগঞ্জের কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে অতিবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার হেক্টরের ধানের ক্ষতি হয়, এর আগে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয় আরও ২ হাজার হেক্টর। নেত্রকোনায় সরকারি হিসাবে তখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছিল, যদিও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি এর দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিলের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিতে সুরমা-কুশিয়ারা, খোয়াই ও ধনু-বৌলাই নদী অববাহিকায় পানি দ্রুত বাড়ছে। কিশোরগঞ্জকে তারা ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে থাকা জেলাগুলোর তালিকায় রাখে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ৫ জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে, আর কাটার উপযোগী হয়ে আসা বোরো ধান ইতিমধ্যে ক্ষতির মুখে।
কিশোরগঞ্জ, তার হাওর ও বোরো ফসল
কিশোরগঞ্জ ঢাকা বিভাগের জেলা। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ২ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৫৯ বর্গকিলোমিটার, প্রধান নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কালনী, ঘোড়াউত্রা ও ধনু। ১৮৬০ সাল থেকে ময়মনসিংহ জেলার মহকুমা ছিল কিশোরগঞ্জ, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যে জেলার ৬০ দশমিক ১৮ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। ২০২০ সালের অক্টোবরে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী এই চার উপজেলাসহ জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা সম্পূর্ণ হাওর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
৪ মে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দুই উপজেলা দেশের সবচেয়ে কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোর মধ্যে পড়ে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ইটনার আয়তন ৪০১ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার, সেখানে ৭৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ মানুষের প্রধান আয় কৃষি; উপজেলার নদীর মধ্যে ধনু, বৌলাই ও কালনী, আর জলাভূমির মধ্যে হাউলার হাওর উল্লেখযোগ্য। অষ্টগ্রামের আয়তন ৩৫৫ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার; সেখানে ৮২ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল, আর এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে মেঘনা, কালনী ও ঘোড়াউত্রা।
২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলা ডিএইর তথ্যমতে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়, এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর; ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো ও ২ মে ঢাকা ট্রিবিউন এ হিসাব প্রকাশ করে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার কথা। (৩০ এপ্রিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে উপপরিচালকের বরাতে সামান্য ভিন্ন হিসাব আসে: মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর, হাওরে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর।)
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায় হাওর হলো বাটির মতো বড় একটি নিচু ভূমি, যেখানে নদী ও খাল দিয়ে উপরিভাগের পানি এসে জমে; বর্ষায় তা বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়, আর বর্ষার পরে বেশির ভাগ অংশ শুকিয়ে যায়। দেশে হাওর মূলত বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে। হাওর অববাহিকার উত্তরে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও মিজোরামের পাহাড়; এসব পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী বছরে প্রায় সাত থেকে আট মাস হাওরের সমভূমি প্লাবিত রাখে। শুকনো মৌসুমে হাওরের বেশির ভাগ অংশে বোরো চাষ হয়, আর এটিই হাওরের কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল, ২০২২ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ঢাকা ট্রিবিউন এ কথা উল্লেখ করে।
পলি, সড়ক ও বাঁধ: কেন পানি নামেনি
স্থানীয় লোকজন কেবল বৃষ্টিকে দায়ী করেননি। ২৭ এপ্রিলের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে তাঁরা বলেন, পরিবেশ না মেনে হাওরে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পলি জমে নদী ভরাট হওয়া এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অষ্টগ্রামের কলিমপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, হবিগঞ্জ সীমান্তের শিবপুর এলাকায় খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ড. সাদিকুর রহমান পত্রিকাটিকে বলেন, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতা হয়েছে; ধানগাছ পাঁচ-ছয় দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে, এর আগে পানি নেমে গেলে ক্ষতি কম হতে পারে।
কিশোরগঞ্জের হাওরের সবচেয়ে পরিচিত সড়ক ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে যুক্ত করা ২৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ অলওয়েদার সড়ক। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৮৭৪ দশমিক ০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করে, আর ২০২০ সালের অক্টোবরে সড়কটি খুলে দেওয়া হয়। সড়কটি হাওরের মাঝখান দিয়ে ধনু ও বৌলাই নদীর সমান্তরালে চলে গেছে; এতে আছে তিনটি পিসি গার্ডার সেতু, ১১টি আরসিসি গার্ডার সেতু ও ৬২টি বক্স কালভার্ট। ২০২২ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটি হাওর দিয়ে উজানের পানি নদীতে নেমে যাওয়ার পথে বাধা তৈরি করছে; আগে মার্চ-এপ্রিলে জমা পানি দ্রুত নেমে যেত, এখন কয়েক দিন আটকে থেকে ধানের ক্ষতি করে। ওই মৌসুমের বন্যার পর ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে হাওরে আর কোনো সড়ক না করার সিদ্ধান্ত হয় বলে পত্রিকাটি জানায়।
বারবার ফিরে আসা আরেকটি প্রশ্ন বাঁধ। ২০১৭ সালের আকস্মিক বন্যা নিয়ে ৮ এপ্রিল ২০১৭ ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, স্থানীয়দের মতে প্রাক-বর্ষার আকস্মিক বন্যা হাওরে স্বাভাবিক ঘটনা হলেও নদী ও বাঁধের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বছরের পর বছর পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরে আগের আকস্মিক বন্যা
প্রাক-বর্ষার আকস্মিক বন্যা আগেও হাওরের বোরো ফসলে আঘাত হেনেছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে, যখন ২৮ মার্চ থেকে ঢল নামতে শুরু করে, ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, কিশোরগঞ্জে প্রায় ২৩ হাজার ৩০০ হেক্টর ধানখেত পুরোপুরি তলিয়ে গেছে বলে ডিএই পেয়েছে, আর ফসলের ক্ষতি প্রায় ২৯১ কোটি টাকা হতে পারে বলে অনুমান করেছে; তবে স্থানীয়দের মতে প্রকৃত ক্ষতি এর দ্বিগুণ হতে পারে। তখনকার জেলা ডিএই উপপরিচালক অষ্টগ্রামকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা বলেন এবং জানান, মাঠকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছেন, যেমনটি ২০২৬ সালেও করা হচ্ছিল।
২০১৭ সালের বন্যাই হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের মাপকাঠি। ২০২২ সালের ২ মে ঢাকা ট্রিবিউন স্মরণ করায়, সে বছর হাওরের প্রায় সব বোরো ফসল ভেসে গিয়েছিল, আর দেশকে ২০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছিল। ২০২২ সালে নতুন করে আকস্মিক বন্যায় সাত হাওর জেলায় আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার হেক্টর জমির দাঁড়ানো ধানের ক্ষতি হয়; তবে কৃষি মন্ত্রণালয় হাওরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার নামিয়েছিল, আর ডিএইর তথ্যে সে বছর ৩০ এপ্রিলের মধ্যে কিশোরগঞ্জের হাওরের ৮০ শতাংশ বোরো কাটা হয়ে যায়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনের ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে, আর সাত হাওর জেলায় বোরো চাষের উপযোগী প্রায় ১০ লাখ হেক্টর জমি হাওর ও হাওরের বাইরের এলাকায় প্রায় সমানভাবে ভাগ করা।

৮০ শতাংশ পাকলেই কাটা, আর শুকানোর সংকট
২০২৬ সালে কিশোরগঞ্জের কৃষকদের যে পরামর্শ দেওয়া হয়, তা হাওরের জন্য ডিএইর প্রচলিত নির্দেশনা। ২ মে ড. সাদিকুর রহমান কৃষকদের বলেন, মাঠে আরও ক্ষতি ঠেকাতে ৮০ শতাংশ পাকা ধান রোদ না থাকলেও কেটে ফেলতে হবে; ২৭ এপ্রিলও তিনি একই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের আগে ডিএই সাত হাওর জেলার জন্য জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, বোরো ধান ৮০ শতাংশ পরিপক্ব হলে দ্রুত কেটে নিরাপদ ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে, আর ধানখেতে যেন পানি জমে না থাকে সে জন্য নিষ্কাশন নালা পরিষ্কার রাখতে হবে; ২৯ এপ্রিল ২০২৪ যুগান্তর এ খবর দেয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে স্থানীয় জাতের বোরো কাটা হয় এপ্রিল-মে মাসে, আর উচ্চফলনশীল বোরো মে-জুন মাসে; এ কারণেই প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি শুরুর সময় হাওরের ধান মাঠে থেকে যায়।
ভেজা ধান কেন এত দ্রুত নষ্ট হয়, তা ব্যাখ্যা করেছে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) তাদের রাইস নলেজ ব্যাংকে। কাটার সময় ধানে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতা থাকতে পারে; বেশি আর্দ্রতা নিয়ে রাখলে দানার রং বদলায়, ছত্রাক জন্মায়, পোকার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা কমে যায়। ইরির পরামর্শ, কাটার পর যত দ্রুত সম্ভব, আদর্শভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, ধান শুকাতে হবে; দেরি বা অসম্পূর্ণ শুকানো দানার মান কমায় ও ক্ষতি ঘটায়। ভাঙানোর জন্য ধান ১৪ শতাংশ আর্দ্রতায় শুকানো দরকার। ২০২৬ সালের মে মাসের প্রথম দিনগুলোতে কিশোরগঞ্জে খলা পানির নিচে আর সূর্য মেঘে ঢাকা থাকায় কৃষকেরা এর কোনোটিই করতে পারেননি; সে কারণেই মাঠ থেকে বাঁচানো ধানও নষ্ট হচ্ছিল।

ছবি: Hanif raaz / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, যুগান্তর, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) রাইস নলেজ ব্যাংক



মন্তব্য
(০)