বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার, সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সুনামগঞ্জের অন্তত ২৫টি হাওরে লক্ষাধিক কৃষক কাস্তে হাতে বোরো ধান কাটতে মাঠে নামেন। জাগো নিউজের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরুষেরা জমিতে ধান কাটছিলেন, আর নারীরা খলায় সেই ধান মাড়াই করে রোদে শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে সেবার বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছিল। হাওর হলো বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাটি বা পিরিচ আকৃতির অগভীর নিচু জলাভূমি, যা বর্ষায় নদী ও খালের পানিতে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। শুকনো মৌসুমে এসব জমিতে বোরো ধান চাষ হয়, আর বর্ষার পানি আসার আগেই সেই ধান ঘরে তোলা কৃষকের প্রধান লক্ষ্য।
জেলা কৃষি বিভাগের হিসাব
জাগো নিউজকে দেওয়া জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই মৌসুমে সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন কৃষকেরা, আর এ জমি থেকে ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের হিসাব দিয়েছিল বিভাগটি।
এর আগে, ১০ এপ্রিল, এটিএন নিউজ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। তখন পর্যন্ত ব্রি ধান৯৬সহ বিভিন্ন জাতের প্রায় ১১৪ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছিল, বিশেষ করে মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হাওরগুলোতে আগাম জাতের ধান কাটা চলছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলায় ধান কাটায় ৫৭৭টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ছয় হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছিলেন এবং আরও ৫০টি হারভেস্টার ভাড়া আনার পরিকল্পনা ছিল।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক ১৪ এপ্রিল জাগো নিউজকে বলেন, হাওরের ধান কাটা শুরু হয়েছে, কৃষকেরা আনন্দের সঙ্গে ধান কাটছেন এবং কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে। তবে পুরো হাওর এলাকার ধান ঘরে তুলতে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

বৃষ্টির শঙ্কা পেরিয়ে কৃষকের ধান কাটা
করচার হাওরের কৃষক জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বলেন, কষ্ট করে রোপণ করা বোরো ধান বৈশাখের প্রথম দিনেই ঘরে তুলতে পেরে তিনি খুব আনন্দিত। একই হাওরের কৃষক নজরুল ইসলামের কথায়, বৈশাখের প্রথম দিনে কষ্টে ফলানো ধান ঘরে তোলার আনন্দটা অন্য রকম।
দেখার হাওরের কৃষক সাজু মিয়া বলেন, যেভাবে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, তাতে তিনি ভেবেছিলেন এ বছর ধান ঘরে তুলতে পারবেন না; শেষ পর্যন্ত সেদিন শ্রমিক নিয়ে ধান কাটছেন। একই হাওরের কৃষক শাফি মিয়া বলেন, হাওরের কৃষকের স্বপ্ন এই ধানকে ঘিরেই, আর এ ধান ঘরে উঠলে জেলার ১০ লাখ কৃষকের মুখে হাসি ফোটে।
বৃষ্টির এই শঙ্কা অমূলক ছিল না। দৈনিক ইত্তেফাক ১১ এপ্রিল জানায়, সেদিন দেখার হাওরের গুজাউনি বেড়িবাঁধ হঠাৎ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। আশপাশের গ্রামের হাজারো কৃষক বাঁশ, টুকরি ও কোদাল নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ভাঙন বন্ধ করেন, তবে এর আগেই বেশ কিছু নিচু জমি ডুবে যায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, সদরসহ তিন উপজেলার মানুষের জমি থাকা দেখার হাওরে ৪৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমি রয়েছে, যার মধ্যে সেবার ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টরে চাষ হয়েছিল।

বছরে একটি ফসলের ওপর নির্ভরতা
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বোরো ধানকে দেখার হাওরের "একমাত্র ফসল" বলা হয়, আর সেই ফসল নিয়েই আগের এক সপ্তাহ ধরে কৃষকেরা উৎকণ্ঠায় ছিলেন। জামালগঞ্জের এক কৃষক এটিএন নিউজকে জানিয়েছিলেন, তাঁর ৮০ কেয়ার বোরো জমির ১৫ কেয়ার তখন জলাবদ্ধতায় পানির নিচে ছিল। এ কারণেই চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখজুড়ে ধান কাটার সময়টি হাওরের কৃষকের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ১৪ এপ্রিল, আর ২০২৬ সালে এই দিনেই সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটা পুরোদমে শুরু হয়।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, এটিএন নিউজ, দৈনিক ইত্তেফাক, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)