২০২৬ সালের আম মৌসুমের শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলের বাগানজুড়ে সোনালি মুকুল দেখে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন চাষিরা। কিন্তু মে মাসের শুরুতে সেই আশা অনেকটাই ফিকে হয়ে আসে। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ৫ মে জানায়, খরা, অনিয়মিত আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে আমের গুটি ঝরে পড়ছে, ফলে বহু বাগানে প্রত্যাশিত ফলন মিলছে না। চাষিরা উৎপাদন ঘাটতি ও লোকসানের আশঙ্কা করছিলেন।
খরা আর তাপে ঝরেছে গুটি
চাষিরা জানান, মুকুল আসার আগে থেকেই তাঁরা সেচ দেওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ ও নিয়মিত তদারকি করেছেন, তবু প্রকৃতির প্রতিকূলতায় অনেক বাগানে আশানুরূপ আম টেকেনি। রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষি আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ভালো মুকুল এসেছিল, কিন্তু খরার কারণে আম টিকিয়ে রাখা যায়নি। বাগমারা উপজেলার আমচাষি মতিউর রহমানের ভাষ্য, শুরুতে বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও গাছে তখন অর্ধেকেরও কম আম ছিল এবং প্রতিদিনই আম ঝরে পড়ছিল; সার, কীটনাশক ও সেচের খরচ বেড়েছে, অথচ ফলন কমেছে। গোদাগাড়ী উপজেলার চাষি আজমত আলী জানান, পানি সংকটের কারণে অনেক গাছে ঠিকমতো ফল ধরেনি; বাজারে ভালো দাম না পেলে ঋণ শোধ করাই তাঁর জন্য কঠিন হবে।
এর আগে ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল রাইজিংবিডি জানায়, চাষিদের ভাষ্যে সে মৌসুমে বাগানের প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল, কিন্তু গুটিগুলো প্রচণ্ড খরা ও পোকার উপদ্রবে ঝরে যাচ্ছিল। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে দুই সপ্তাহ ধরে গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি। প্রথম আলোর ২ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন বলছে, এপ্রিলে রাজশাহীতে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি; ২ মে বেলা ১১টা পর্যন্ত ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা সে বছরের সর্বোচ্চ। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন তখন বলেন, এই বৃষ্টি আমের জন্য খুবই ভালো হয়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে রাজশাহী অঞ্চলের আম
জাগো নিউজকে দেওয়া কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৯৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ১২ লাখ টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চল গঠিত রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নিয়ে; রাইজিংবিডির ২৫ এপ্রিলের প্রতিবেদনে এ অঞ্চলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বলা হয় ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ মেট্রিক টন।
চাষিরা জানান, কয়েক বছর ধরেই তাঁরা একের পর এক সংকটে পড়ছেন। খরা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মৌসুমে দীর্ঘ ঈদের ছুটিতে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা তাঁদের লোকসানের চক্রে আটকে রেখেছে। রাইজিংবিডির তথ্য অনুযায়ী, আগের মৌসুমে ফলন ভালো হলেও বৃষ্টিতে অনেক আম নষ্ট হয়, দাম কমে যায় এবং অনেক চাষি উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। তবু গাছে যে আম ছিল, ভরা মৌসুমে তা ভালো দামে বিক্রি করা গেলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছিলেন।

কেন ঝরে আমের গুটি
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ‘কৃষিকথা’ পত্রিকার ২০২৬ সালের মার্চের এক নিবন্ধ অনুযায়ী, আমের প্রতিটি মুকুলে অনেক ফুল থাকলেও গুটি আসার ২৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে প্রতি থোকায় সাধারণত মাত্র এক-দুটি গুটি টিকে থাকে; কিছু গুটি ঝরা তাই স্বাভাবিক। তবে মার্চ-এপ্রিলে বৃষ্টি কম হলে মাটিতে রসের অভাবে গুটির বোঁটায় দ্রুত ঝরে পড়ার স্তর তৈরি হয় এবং গুটি বেশি ঝরে। হপার পোকা কচি গুটির রস খেয়ে এবং ফল ছিদ্রকারী পোকা মটরদানার মতো গুটিতে ছিদ্র করে গুটি ঝরায়।
নিবন্ধটির পরামর্শ, গুটি মটরদানার আকার হলে গাছের গোড়ায় প্রথম সেচ দিতে হবে এবং এরপর বর্ষা শুরু না হওয়া পর্যন্ত ১৫ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। কোন কীটনাশক বা হরমোন কতটুকু দিতে হবে, সে বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে অনুমোদিত মাত্রা মেনে চলা জরুরি।

আম সংগ্রহের সময়সূচি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, অপরিপক্ব আম যাতে আগেভাগে সংগ্রহ না করা হয়, সে জন্য নির্ধারিত সময়সূচি দেওয়া হবে এবং কৃষকেরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়েও তাঁরা কাজ করছেন। তিনি জানান, আম সংরক্ষণের বিকল্প হিসেবে আমসত্ত্ব, চিপস, জ্যাম ও জেলি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাজারদর কমে গেলেও তাঁরা বিকল্প উপায়ে লাভবান হতে পারেন।
ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, রাইজিংবিডি, প্রথম আলো, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা)





মন্তব্য
(০)