সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ছুটির দুপুরের জন্য নারকেল দুধে ঝাল হাঁস ভুনার রেসিপি

২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি জাগো নিউজের শুক্রবারের রেসিপিতে সরিষার তেল, বাটা ও গুঁড়া মসলা, নারকেলের দুধ আর পেঁয়াজ বেরেস্তায় এক কেজি হাঁসের মাংসের ঘন ঝোলের ঝাল ভুনা রান্নার পদ্ধতি জানানো হয়।

ছুটির দুপুরের জন্য নারকেল দুধে ঝাল হাঁস ভুনার রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি, শুক্রবার, অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক তাদের শুক্রবারের রেসিপি আয়োজনে ঝাল ঝাল হাঁস ভুনার রান্নার পদ্ধতি প্রকাশ করে। এ রান্নায় লাগে এক কেজি হাঁসের মাংস, সরিষার তেল, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনবাটা, কয়েক রকম গুঁড়া মসলা, নারকেলের দুধ আর পেঁয়াজ বেরেস্তা। পত্রিকাটি পদটিকে সাপ্তাহিক ছুটির দুপুরের খাবার হিসেবে তুলে ধরে, যেদিন একটু সময় নিয়ে রান্না করা যায় এবং পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসেন।

লেখায় বলা হয়, সপ্তাহজুড়ে কাজের ব্যস্ততায় যেসব রান্না সময়ের অভাবে হয়ে ওঠে না, ছুটির দিনে সেগুলোই খাবার টেবিলে জায়গা পায়; আর সেই তালিকায় ঝাল হাঁস ভুনা আলাদা করে চোখে পড়ে মসলা কষানোর গাঢ় রং, ঝাঁঝালো ঘ্রাণ আর নরম মাংসের ঝোলের জন্য। এই প্রতিবেদনে জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপিটি হুবহু ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছে এবং আরেকটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের রেসিপির সঙ্গে পদ্ধতিটি মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সঙ্গে আছে রেসিপি প্রকাশের আগের প্রকাশিত তথ্য থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস), বাংলাপিডিয়া, এফএওর একটি উত্তম চর্চা নোট এবং খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পটভূমি: ভুনা মানে কী, প্রধান উপকরণগুলো কোথা থেকে আসে, দেশে কত হাঁস পালন হয় ও কীভাবে, আর রান্নাঘরে কাঁচা হাঁস কীভাবে নাড়াচাড়া করা উচিত।

ভুনা মানে কী, হাঁস কেন শীতের পদ


ভুনা আসলে একটি রান্নার ধরন, নির্দিষ্ট কোনো একটি রেসিপি নয়। ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত শীতের হাঁস ভুনার এক রেসিপিতে দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণ ব্যাখ্যা করে, ‘ভুনা’ বললে যে পদটি মাথায় আসে তাতে ঝোল বেশি হয় না, একটা মাখো মাখো ভাব থাকে: মসলা মাংসের গায়েই লেগে থাকে, তবে ভাত মেখে খাওয়ার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট। জাগো নিউজের রেসিপিও একই নীতিতে চলে। প্রথমে তেলে মসলা ভালো করে কষানো হয়, তারপর মাংস দিয়ে মসলার সঙ্গে কষানো হয়, মাংস সেদ্ধ হওয়ার জন্য অল্প পানি দেওয়া হয়, আর ঝোল গাঢ় হয়ে তেল ওপরে উঠে এলে হাঁড়ি নামানো হয়।

ডেইলি স্টারের লেখায় আরও বলা হয়, শীত এলেই ভোজনরসিকদের মধ্যে হাঁসের মাংস খাওয়ার তোড়জোড় পড়ে যায়; হাঁস ভুনা খাওয়ার জন্য সেখানে চালের রুটি, ভাত, পোলাও, ছিটা রুটি বা পরোটার কথা বলা হয়। তবে সেখানকার পদ্ধতি জাগো নিউজের পদ্ধতি থেকে খুঁটিনাটিতে আলাদা। সেখানে বাটা ও গুঁড়া মসলা, লবণ এবং চার থেকে পাঁচ টেবিল চামচ ফেটানো টক দই দিয়ে মাংস অন্তত আধা ঘণ্টা মাখিয়ে রাখা হয়, তারপর সরিষার তেলে কষিয়ে অল্প অল্প করে গরম পানি দিয়ে সেদ্ধ করা হয়, আর শেষে দেওয়া হয় দুই চামচের মতো বাদামবাটা, দুই-তিনটি চেরা কাঁচামরিচ ও এক চিমটি চিনি। জাগো নিউজের রেসিপিতে মাংস দেওয়ার আগেই মসলা কষানো হয় এবং ঝোল ঘন ও সমৃদ্ধ করা হয় নারকেলের দুধ ও পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে। দুটিই একই অর্থে ভুনা: ভালো করে কষানো, মসলায় মোড়া, অল্প ঘন ঝোলের পদ।

হাঁসের মাংস মুরগির মাংসের চেয়ে আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সংস্থা (এফএসআইএস) তাদের ‘ডাক অ্যান্ড গুজ ফ্রম ফার্ম টু টেবিল’ নির্দেশিকায় ব্যাখ্যা করে, হাঁস উড়তে পারা পাখি, তাই এর বুকের মাংস মুরগি বা টার্কির বুকের মাংসের চেয়ে গাঢ় রঙের; কর্মক্ষম পেশিতে অক্সিজেন ধরে রাখে যে প্রোটিন, সেই মায়োগ্লোবিনই মাংসকে গাঢ় রং দেয়। এফএসআইএসের ভাষায়, হাঁসের সব মাংসই গাঢ় বলে এর স্বাদ মুরগির বুকের মাংস, এমনকি মুরগির রানের মাংসের চেয়েও তীব্র। হাঁস সাঁতারও কাটে, আর ভেসে থাকার জন্য এর চামড়ার নিচে চর্বির একটি স্তর থাকে। সেই চর্বি মাংসের ভেতরে ছড়ানো থাকে না, তাই কাঁচা মাংসের ওপর থেকে তা ছাঁটাই করে ফেলা যায়।

এক কেজি হাঁসের মাংসের উপকরণ


জাগো নিউজ বিশটি উপকরণের তালিকা দেয়:

  • হাঁসের মাংস ১ কেজি
  • পেঁয়াজ কিউব করে কাটা আধা কাপ
  • আস্ত রসুন ৫টি
  • পেঁয়াজবাটা ১ টেবিল চামচ
  • আদাবাটা দেড় টেবিল চামচ
  • রসুনবাটা ১ টেবিল চামচ
  • মরিচগুঁড়া ২ চা চামচ
  • হলুদগুঁড়া ১ চা চামচ
  • ধনিয়াগুঁড়া ১ চা চামচ
  • জিরাগুঁড়া আধা চা চামচ
  • ভাজা জিরার গুঁড়া আধা চা চামচ
  • নারকেলের দুধ ১ কাপ
  • পেঁয়াজ বেরেস্তা ৩ টেবিল চামচ
  • গরম মসলার গুঁড়া ১ চা চামচ
  • তেজপাতা ৩টি
  • দারুচিনি ৪ টুকরা
  • এলাচ ৪টি
  • লবণ স্বাদমতো
  • ভিনেগার বা লেবুর রস ২ টেবিল চামচ
  • সরিষার তেল ১ কাপ

তালিকায় ভিনেগার বা লেবুর রস আছে, কিন্তু রান্নার ধাপে সেটি কখন দিতে হবে তা বলা হয়নি; লবণ কখন দিতে হবে, সেটিও উল্লেখ নেই। রেসিপিতে কতজনের জন্য বা কত সময় লাগবে, তাও দেওয়া হয়নি। পরিমাণের একটি ধারণা হিসেবে এফএসআইএস জনপ্রতি আস্ত কাঁচা হাঁসের ১ থেকে দেড় পাউন্ড ধরার পরামর্শ দেয় এবং জানায়, হাড় ছাড়া কাঁচা মাংসের প্রতি পাউন্ড রান্নার পর মোটামুটি তিনজনের পরিবেশনের সমান হয়।

রান্নার ধাপ


জাগো নিউজ রান্নার পদ্ধতি দুটি অনুচ্ছেদে বলেছে; একই ক্রমে তা এখানে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:

  • হাঁস কেটে পরিষ্কার করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন।
  • চুলায় একটি হাঁড়ি বসিয়ে তাতে তেল, তেজপাতা, এলাচ ও দারুচিনি দিন।
  • কিউব করে কাটা পেঁয়াজ ও আস্ত রসুন দিয়ে হালকা বাদামি করে ভেজে নিন।
  • সব বাটা মসলা ও গুঁড়া মসলা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিন।
  • মসলা কষানো হলে মাংস দিন, ভালোভাবে মিশিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে কিছুক্ষণ কষান।
  • কষানো হয়ে এলে মাংস সেদ্ধ হওয়ার জন্য অল্প পানি দিন।
  • মাংস অর্ধেক সেদ্ধ হলে নারকেলের দুধ ও পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে রান্না করুন।
  • ঝোল গাঢ় হয়ে তেল ওপরে উঠে এলে ভাজা জিরার গুঁড়া ও গরম মসলার গুঁড়া দিয়ে নামিয়ে নিন।

ভাজা জিরা ও গরম মসলা আসে একেবারে শেষ ধাপে। নারকেলের দুধ দেওয়া হয় মাংস অর্ধেক সেদ্ধ হওয়ার পর, আর তখন থেকে হাঁড়ি থাকে অল্প আঁচে। জাগো নিউজ রেসিপি শেষ করেছে এই বলে যে এভাবেই তৈরি হয়ে যায় ঝাল ঝাল হাঁস ভুনা, যা পরিবার নিয়ে ছুটির দুপুরে উপভোগ করা যায়।

সরিষার তেল ও সরিষা দানা, ভারতের কলকাতায় তোলা। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সরিষার তেল ও সরিষা দানা, ভারতের কলকাতায় তোলা। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

সরিষার তেল, মসলা ও নারকেল: উপকরণগুলো আসে কোথা থেকে


এই রেসিপি ও ডেইলি স্টারের রেসিপি, দুটিরই রান্নার তেল সরিষার তেল। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, মাত্র কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল দেশের একমাত্র রান্নার তেল। প্রথাগতভাবে এই তেল বের করা হতো ঘানিতে, যা দিনের দীর্ঘ সময়, কখনো রাতভর গরু টেনে ঘোরাত; এ পেশার মানুষকে বলা হতো কলু। এখন তেল মূলত বিদ্যুৎচালিত মিলে ভাঙানো হয়। বাংলাপিডিয়ার ভুক্তিতে দেশে সরিষা চাষের জমি প্রায় ০.২৪ মিলিয়ন হেক্টর এবং বছরে সরিষার তেল উৎপাদন প্রায় ০.১৯ মিলিয়ন টন বলা হয়েছে, যা দেশের রান্নার তেলের চাহিদার সামান্য অংশ মেটায়; ফলে প্রচুর সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়। রবি মৌসুমের ফসল সরিষা প্রায় সব জেলাতেই হয়, তবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় এর আবাদ তুলনামূলক বেশি।

মসলাগুলো আসে নানা গাছের নানা অংশ থেকে। বাংলাপিডিয়ার মসলা ভুক্তি অনুযায়ী আদা ও হলুদ আসে কন্দ বা রাইজোম থেকে, দারুচিনি গাছের বাকল থেকে, ধনিয়া, জিরা ও মরিচ ফল থেকে, আর এলাচ বীজ থেকে। দেশে সাধারণত যেসব মসলা চাষ হয় তার মধ্যে আছে আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়া; অন্য অনেক মসলার বড় অংশ আসে ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। একই ভুক্তিতে গরম মসলাকে লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও এলাচের মিশ্রণ বলা হয়েছে, যা মূলত বিশেষ মাংসের তরকারি ও চালের পদে ব্যবহৃত হয়। এই রেসিপিতে এর ভূমিকাও তাই: ভাজা জিরার সঙ্গে নামানোর ঠিক আগে দেওয়া শেষ মসলা।

জাগো নিউজের রেসিপির সমৃদ্ধ স্বাদের বড় উৎস নারকেলের দুধ। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে নারকেল গাছ বসতবাড়ির গাছ হিসেবে চাষ হয়, ফল ও নানা কাজের জন্য, আবার রাস্তার ধারেও লাগানো হয়; ভালো যত্নের একটি গাছে বছরে ২০০ বা তার বেশি নারকেল ধরতে পারে, আর নারকেলের শাঁস কাঁচা খাওয়া হয় বা নানা খাবার ও মিষ্টিতে ব্যবহৃত হয়। সেই কোরানো শাঁস থেকেই নারকেলের দুধ বের করা হয়, যা পেঁয়াজ বেরেস্তার সঙ্গে হাঁড়িতে যায়।

বাটিতে টিনজাত নারকেলের দুধ। ছবি: S Sepp / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাটিতে টিনজাত নারকেলের দুধ। ছবি: S Sepp / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

বাংলাদেশে হাঁস: জাতীয় হিসাব


হাঁড়ির হাঁসটি আসে দেশের বিশাল হাঁসের ঝাঁক থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে যে ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৪-২০২৫)’ তৈরি করে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশ করে, তাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে হাঁসের সংখ্যা ৭০৫.৮২ লাখ। সারণিতে প্রতিবছরই এ সংখ্যা বেড়েছে: ২০১৫-১৬ সালে ৫২২.৪০ লাখ, ২০২১-২২ সালে ৬৩৮.৪৫ লাখ এবং ২০২৩-২৪ সালে ৬৮২.৬১ লাখ। একই বছরে দেশে মুরগি ছিল ৩,৩৬০.৭০ লাখ, আর মোট হাঁস-মুরগির সংখ্যা ৪,০৬৬.৫২ লাখ।

ডিএলএসের একই হিসাবে ২০২৪-২৫ সালে মাংস উৎপাদন ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম ধরে চাহিদা ৭৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন; ডিম উৎপাদন ২,৪৪০.৬৫ কোটি। তবে মাংস বা ডিমের হিসাব প্রাণীভিত্তিক ভাগ করে দেওয়া নেই। স্থির মূল্যে ২০২৪-২৫ সালে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১.৮১ শতাংশ (সাময়িক হিসাব), প্রবৃদ্ধি ৩.১৯ শতাংশ, আর কৃষিজ জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ; কর্মসংস্থানে খাতটির অংশ প্রত্যক্ষভাবে ২০ শতাংশ ও আংশিকভাবে ৫০ শতাংশ বলে ডিএলএস উল্লেখ করেছে।

২০১২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত, উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের কর্মীদের লেখা বাংলাদেশের হাঁস পালন নিয়ে এফএওর একটি উত্তম চর্চা নোটে হক ও সহকর্মীদের (২০১১) গবেষণার বরাতে বলা হয়, দেশের বার্ষিক ডিম উৎপাদনের প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ আসে হাঁস থেকে। বাংলাপিডিয়ার পোলট্রি ভুক্তি জানায়, গৃহপালিত হাঁস এসেছে বুনো নীলশির বা ম্যালার্ড হাঁস থেকে; বুনো ও গৃহপালিত রূপের পার্থক্য খুবই সামান্য এবং এরা অবাধে প্রজনন করে। হাঁস ভুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আবাসিক বুনো হাঁস পাতি হাঁস বা স্পটবিল দেখতে গৃহপালিত হাঁসের মাদির মতো।

বাংলাদেশের একটি পুকুরে সাঁতার কাটছে হাঁস। ছবি: Md. Asad-Uz-Zaman Shakil / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি পুকুরে সাঁতার কাটছে হাঁস। ছবি: Md. Asad-Uz-Zaman Shakil / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

হাওরে যেভাবে হাঁস পালন হয়


দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হাঁস পালনের এলাকা। মো. মাজহারুল ইসলাম, মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া ও মো. ইউসুফ হারুনের লেখা ২০১২ সালের এফএও নোটে হাওর অববাহিকার বর্ণনা আছে: সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলা এবং সিলেট সদর উপজেলাজুড়ে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি, যার প্রান্তে কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা। এখানে প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬,৩০০ বিল আছে, যার প্রায় ৩,৫০০টি স্থায়ী ও ২,৮০০টি মৌসুমি। প্রাকৃতিক খাবার, সাঁতারের জন্য প্রচুর পানি ও সহনীয় তাপমাত্রা এলাকাটিকে হাঁস পালনের বিশেষ উপযোগী করেছে। নোটে বলা হয়, হাওরের প্রায় প্রতিটি পরিবার কিছু হাঁস রাখে, ৫ থেকে ১০০টি পর্যন্ত, বিশেষ করে বর্ষা ও শরতে, যখন গ্রামের চারপাশে পানি থাকে এবং শামুক, ছোট মাছ, পোকামাকড় ও কচুরিপানার মতো প্রাকৃতিক খাবার মেলে।

এই হাঁস পালিত হয় চরে খাওয়ার পদ্ধতিতে; চালের কুঁড়া, সেদ্ধ আলু বা ধান-চালের মতো বাড়তি খাবার দেওয়া হয় বছরের অল্প সময়। বাণিজ্যিক খামারে সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০ হাঁস থাকে, যেগুলো খাবারের খোঁজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। নোট অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত খামারিরা ঝাঁক নিয়ে হাওরের গভীরে থাকেন, আর জুন থেকে আগস্টে হাওর ডুবে গেলে ফিরে আসেন প্রান্তে; কখনো বাড়ি থেকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে চলে যান। মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাকৃতিক খাবার খুব কমে যায়, ডিম পাড়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, আর বাড়তি খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকলে খামারিরা ঝাঁক বিক্রি করে পরের মৌসুমের শুরুতে আবার ডিম পাড়া হাঁস কিনতে বাধ্য হন।

হাওরের বেশির ভাগ খামারি হাঁস পালেন ডিমের জন্য; মাংসের জন্য পালেন অল্প কয়েকজন। সরকারি হাঁস প্রজনন খামার ডিমের জন্য খাকি ক্যাম্পবেল ও জিনডিং এবং মাংসের জন্য মাসকোভি জাতের হাঁসের বাচ্চা সরবরাহ করে, তবে নোটে বলা হয়েছে, উৎপাদিত বাচ্চার সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। বেশির ভাগ বাচ্চা আসে তুষ পদ্ধতির হ্যাচারি থেকে: ব্র্যাকের এক জরিপে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে এমন প্রায় ১২৫টি হ্যাচারি পাওয়া যায়, যেগুলো বছরে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন বাচ্চা ফোটায়, বেশির ভাগই খাকি ক্যাম্পবেল, জিনডিং ও দেশি হাঁসের সংকর। প্রথাগত পদ্ধতিতে, দেশি জাত ও বাড়তি খাবার ছাড়া, একটি হাঁস বছরে ৮০ থেকে ১২০টি ডিম দেয়; উন্নত জাতের হাঁস সুষম খাবার পেলে দেয় প্রায় ২২০ থেকে ৩০০টি। জরিপ এলাকার ডিমের প্রায় ৭০ শতাংশ যেত ঢাকা ও অন্যান্য শহরে, আর ঢাকার তেজগাঁও ছিল হাঁসের ডিমের পাইকারি বাজার।

নোটে আরও দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় হাঁস পালনের বেশির ভাগ কাজ করেন নারীরা, এবং ব্র্যাকের ভিত্তি জরিপে ১০০টি পর্যন্ত হাঁসের খামারের বেশির ভাগের মালিক ছিলেন নারী। সমস্যার তালিকায় ছিল স্থানীয় মহাজনদের ‘দাদন’ নামে পরিচিত চড়া সুদের মৌসুমি ঋণ, যা আসলের দেড় থেকে দুই গুণ শোধ করতে হয়; টিকার ঘাটতি, যা কেবল সরকারই সরবরাহ করত; হাওরের গভীরে থাকা ঝাঁকের নাগালে প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসকের অভাব; আর ডাক প্লেগ ও ডাক কলেরায় মৃত্যু, যা লেখকদের পর্যবেক্ষণে ওই অঞ্চলে প্রায় ৩০ শতাংশ।

একটি খাকি ক্যাম্পবেল হাঁস; বাংলাদেশের সরকারি হাঁস খামার থেকে সরবরাহ করা ডিমের জাতগুলোর একটি। ছবিটি বাংলাদেশের বাইরে তোলা। ছবি: Keith / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
একটি খাকি ক্যাম্পবেল হাঁস; বাংলাদেশের সরকারি হাঁস খামার থেকে সরবরাহ করা ডিমের জাতগুলোর একটি। ছবিটি বাংলাদেশের বাইরে তোলা। ছবি: Keith / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

কাঁচা হাঁস নিরাপদে রাখা ও রান্না করা


জাগো নিউজের রেসিপি শুরু হয় হাঁস পরিষ্কার করা দিয়ে, তাই খাদ্য নিরাপত্তাও এ রান্নার অংশ। এফএসআইএস জানায়, যেকোনো পচনশীল মাংস, মাছ বা পোলট্রির মতো কাঁচা বা আধা সেদ্ধ হাঁসেও ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, এবং ৪০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ‘বিপজ্জনক সীমায়’, অর্থাৎ ফ্রিজ থেকে বের করার পর থেকে ভালোভাবে রান্না হওয়ার আগ পর্যন্ত, সেগুলো দ্রুত বাড়ে। হিমায়িত করলে বৃদ্ধি কমতে পারে, কিন্তু ব্যাকটেরিয়া মরে না; মরে ভালোভাবে রান্না করলে। পোলট্রির সঙ্গে প্রায়ই যুক্ত সালমোনেলা পেটব্যথা, ডায়রিয়া ও বমিভাব ঘটায়, তাই কাঁচা হাঁস বা এর রস রান্না করা খাবার এবং সালাদের মতো কাঁচা খাওয়ার খাবার থেকে দূরে রাখতে হয়।

এফএসআইএসের পরামর্শ, তাজা হাঁস কেনার পরপরই ফ্রিজে রেখে এক বা দুই দিনের মধ্যে রান্না করা, নয়তো হিমায়িত করা। হিমায়িত হাঁস গলাতে হবে ফ্রিজের ভেতরে, পানি ঢুকতে না পারে এমন ব্যাগে ভরে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে প্রতি ৩০ মিনিটে পানি বদলে, অথবা মাইক্রোওয়েভে গলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রান্না করে; কখনো রান্নাঘরের তাকে খোলা রেখে নয়। হাঁস আংশিক ভেজে বা আধা রান্না করে রেখে পরে বাকিটা রান্না করা উচিত নয়, কারণ তখনো ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি মরে না-ও থাকতে পারে। এফএসআইএস হাঁসের জন্য খাদ্য থার্মোমিটারে মাপা ভেতরের ন্যূনতম নিরাপদ তাপমাত্রা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট নির্ধারণ করেছে, এবং জানিয়েছে ঠিকমতো রান্না হওয়া হাঁসও গোলাপি দেখাতে পারে। রান্না করা হাঁসের ঝোল বা তরকারি ফ্রিজে তিন থেকে চার দিন এবং ফ্রিজারে দুই থেকে তিন মাস ভালো থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) মুরগির ক্ষেত্রে বলে, কাঁচা মুরগি রান্নার জন্য প্রস্তুত অবস্থায় থাকে, আগে ধোয়ার দরকার নেই; কাঁচা পোলট্রির জন্য আলাদা কাটার বোর্ড ব্যবহার করতে হবে; আর বেঁচে যাওয়া খাবার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখতে হবে, তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে এক ঘণ্টার মধ্যে। রেসিপির মতো আস্ত হাঁস কিনে পরিষ্কার করতে হলে কাঁচা হাঁসে ব্যবহৃত বোর্ড, ছুরি ও হাত অন্য খাবার থেকে আলাদা রাখার নিয়মও একই।

বার্ড ফ্লু ও হাঁস


বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ইতিহাসে হাঁসের বিশেষ ভূমিকা আছে। ২০১৭ সালে ইমার্জিং মাইক্রোবস অ্যান্ড ইনফেকশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত বর্মন ও সহকর্মীদের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে অতি সংক্রামক এইচ৫এন১ এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে; পরে দেশে ২.২.২, ২.৩.৪.২ ও ২.৩.২.১এ ক্লেড শনাক্ত হয়, আর ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ প্রচলিত ভাইরাসগুলো ছিল কেবল ২.৩.২.১এ ক্লেডের। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জীবিত পাখির বাজারে এবং টাঙ্গুয়ার হাওরের বুনো পাখি ও মুক্তভাবে চরে বেড়ানো হাঁসের মধ্যে কাজ করে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পরিযায়ী পাখি এবং টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো জলাভূমিতে মুক্তভাবে পালিত গৃহপালিত হাঁস ভাইরাসটির একটি নতুন জিনোটাইপের উদ্ভবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এভিয়ান ও অন্যান্য প্রাণিবাহিত ইনফ্লুয়েঞ্জা বিষয়ক ফ্যাক্টশিট, যার তারিখ ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, জানায়, ঠিকমতো প্রস্তুত ও রান্না করা পোলট্রি বা ডিমের মাধ্যমে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। সংস্থাটির মতে মূল ঝুঁকি হলো জীবিত বা মৃত আক্রান্ত প্রাণী অথবা জীবিত পাখির বাজারের মতো দূষিত জায়গার সংস্পর্শ, যার মধ্যে আছে আক্রান্ত পাখি নাড়াচাড়া, জবাই ও খাবারের জন্য প্রস্তুত করা, বিশেষ করে বাড়িতে। ডব্লিউএইচও কেবল সুস্থ প্রাণী খাবারের জন্য জবাই করা; ডিম, মাংস ও অন্যান্য প্রাণিজ খাবার ঠিকমতো নাড়াচাড়া, সংরক্ষণ ও রান্না করা; বুনো পাখিসহ অসুস্থ বা মৃত প্রাণীর সংস্পর্শ এড়ানো; এবং বিশেষ করে প্রাণী ছোঁয়ার আগে ও পরে ভালো করে বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়। হাঁস অসুস্থ হলে বা মারা গেলে খামারিরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নিতে পারেন।

ছবি: OdetomyLife / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫), বাংলাপিডিয়া (হাঁস; পোলট্রি; সরিষা; মসলা; নারকেল), এফএও/আইএনএফপিডি উত্তম চর্চা নোট নং ০৪, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইমার্জিং মাইক্রোবস অ্যান্ড ইনফেকশনস (বর্মন ও সহকর্মী, ২০১৭)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)