সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

অক্ষাংশ, তাপ আর লবণের কারণে রাজশাহীর আগে বাজারে সাতক্ষীরার আম

জেলা প্রশাসনের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২৬ সালের ৫ মে সাতক্ষীরায় গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ আম পাড়া শুরু হয়, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের দশ দিন আগে। বিবিসি বাংলাকে গবেষকরা বলেন, কম অক্ষাংশ, বেশি তাপমাত্রা ও মাটির লবণাক্ততাই আগাম পাকার কারণ; জেলার লক্ষ্য ৭০ হাজার টন উৎপাদন।

অক্ষাংশ, তাপ আর লবণের কারণে রাজশাহীর আগে বাজারে সাতক্ষীরার আম
ফল

জ্যৈষ্ঠ মাস, যাকে মধুমাস বলা হয়, শুরু হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের বাজারে উঠতে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার আম। জেলা প্রশাসনের 'ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার' অনুযায়ী মঙ্গলবার ৫ মে থেকে গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ আম সংগ্রহ শুরু হয়। দেশের প্রচলিত আমের ভান্ডার উত্তর-পশ্চিমের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাড়া শুরুর কথা ছিল ১৫ মে থেকে, ২০২৬ সালের ৮ মে বিবিসি বাংলা এ খবর দেয়। অর্থাৎ প্রায় দশ দিন বাজার ছিল কেবল উপকূলের আমের দখলে।

কৃষি গবেষকরা বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই আগাম বাজার ধরার পেছনে আছে ভৌগোলিক কারণ: সাতক্ষীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের চেয়ে প্রায় দুই ডিগ্রি অক্ষাংশ দক্ষিণে, উপকূলের তাপমাত্রা বেশি, আর মাটিতে আছে লবণ। তাদের মতে, একসময় মূলত সুন্দরবন আর চিংড়ি ঘেরের জন্য পরিচিত এই জেলা গত এক দশকে উত্তরবঙ্গের চিরাচরিত আমের সাম্রাজ্যে ভাগ বসিয়ে দেশের আম অর্থনীতির নতুন এক উৎস হয়ে উঠেছে। ভালো স্বাদের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে সবার আগে বাজারে আসা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তারা।

২০২৬ সালের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার


২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল রোববার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে 'নিরাপদ আম বাজারজাতকরণ' শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এ বছরের ক্যালেন্ডার ঘোষণা করেন, সেদিনই প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস এ খবর দেয়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাইসহ স্থানীয় জাতের আম ৫ মে থেকে, হিমসাগর ও খিসরা ১৫ মে থেকে, ল্যাংড়া ২৭ মে থেকে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে সংগ্রহ ও বাজারজাত করা যাবে। জেলা প্রশাসক বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো জাতের আম পাড়া, সংরক্ষণ বা বিক্রিতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কৃষি বিভাগের সহায়তায় কঠোর নজরদারি থাকবে।

সভায় জানানো হয়, মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত, চেকপোস্ট ও বিশেষ তদারকি দল কাজ করবে, আর কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে প্রচার চালানো হবে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি জাতের আম পরিপক্ব হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে; তার আগে পাড়লে স্বাদ ও গুণগত মান কমে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় বাধা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাতক্ষীরা কার্যালয়ের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, চাষিদের দাবি অনুযায়ী ল্যাংড়া ও আম্রপালি আম পাড়ার সময় সামান্য এগিয়ে আনা হয়েছে, তবে এই সময়ের মধ্যেই আম পরিপক্ব হবে; অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ঠেকাতে প্রশাসনিক নজরদারি থাকবে।

কয়েক মৌসুম ধরেই অপরিপক্ব ও কৃত্রিমভাবে পাকানো আম ঠেকাতে জেলার হাতিয়ার এই ক্যালেন্ডার। দেশ রূপান্তর ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বোম্বাই ও গোলাপখাস পাড়া শুরু হয় ৯ মে, গোবিন্দভোগ ১১ মে, ল্যাংড়া ২৯ মে এবং আম্রপালি ১০ জুন থেকে। ২০২৫ সালে চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের সর্বসম্মতিতে ৩০ এপ্রিল ঠিক হওয়া ক্যালেন্ডারে মৌসুম শুরু হয় ৫ মে, হিমসাগর ২০ মে, ল্যাংড়া ২৭ মে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারে ৫ মে শুরুর তারিখ বহাল থাকে, আর হিমসাগরের তারিখ ২০ মে থেকে এগিয়ে ১৫ মে করা হয়।

মৌসুম শুরুর আগেই নজরদারি শুরু হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল ভোরে অভিযান চালিয়ে সাতক্ষীরার পুলিশ প্রায় ৯ হাজার কেজি গোবিন্দভোগ আমবোঝাই একটি ট্রাক জব্দ করে; টিবিএসের খবর অনুযায়ী, আমগুলো রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়েছিল। ট্রাকচালক টিবিএসকে জানান, কালিগঞ্জ উপজেলার জিরোনগাছা থেকে ৩৫১ ক্যারেট আম তোলা হয়েছিল, গন্তব্য ছিল চট্টগ্রামের ফলের বাজার; সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। সেদিনই ভ্রাম্যমাণ আদালতের তত্ত্বাবধানে একটি ভাগাড়ে আমগুলো নষ্ট করা হয়, আর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সতর্ক করেন, অবৈধ উপায়ে অপরিপক্ব আম বাজারে তোলার চেষ্টা করলে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৌসুমের প্রথম দাম ও চাষিদের কথা


"অন্যবারের তুলনায় এবার ঝড় কম হয়েছে, পোকার সমস্যা কিছুটা ভুগিয়েছে, তবে সব মিলিয়ে ফলন ভালোই। আজকে পনের ক্যারেট গোবিন্দভোগ আম বাজারে দিলাম ১৯শ টাকা মণ করে," বিবিসি বাংলাকে বলেন কলারোয়া উপজেলার আমচাষি খান নাজমুস সাদাত। তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতেই সাতক্ষীরায় জাতভেদে মণপ্রতি ১,৯০০ থেকে ২,৪০০ টাকায় আম বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোহম্মদ শাহারুল ইসলাম রাজ বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই সাতক্ষীরার আম দেশের সব প্রান্তে পৌঁছে যাবে।

মণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত ওজনের একক, ৪০ সেরে এক মণ; বাংলাদেশে সাধারণত এক মণ ৪০ কেজি ধরা হয়। আগের মৌসুমগুলোতেও শুরুর দাম ছিল কাছাকাছি। ২০২৪ সালের ১০ মে টিবিএস সাতক্ষীরার বড় বাজারে মণপ্রতি ১,৫০০ থেকে ২,৪০০ টাকায় আম বিক্রি হতে দেখে; ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ফলন কম হওয়ায় দাম আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে আম পাড়ার প্রথম দিনে সুলতানপুর বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা টিবিএসকে জানান, গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ ১,৮০০ থেকে ২,৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং তা রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে যাচ্ছে।

২০২৬ সালের ৪ মে, আম পাড়া শুরুর আগের দিন, টিবিএস দেখতে পায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাতক্ষীরা শহরে অবস্থান নিয়ে বাজার ও বাগান ঘুরে দেখছেন। বড় বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলেন, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আম বাজারে আসার পরই বোঝা যাবে কোন জাতের আম কত দামে বিক্রি হচ্ছে। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে কোনো রাসায়নিক মেশানো আম বাজারজাত করা যাবে না, আর আগামী এক মাসে সাতক্ষীরায় তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো কোটি টাকার আম বেচাকেনা হবে বলে তিনি আশা করেন। এর আগের বছর চাষিরা দৈনিক ইত্তেফাককে বলেছিলেন, জেলায় আম বিক্রির বড় বাজার একটিই, সুলতানপুর বড় বাজার, যেখানে জায়গার অভাবে চাষি, পাইকার ও ক্রেতাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়; তারা আরও বিক্রয়কেন্দ্রের দাবি জানিয়েছিলেন।

উপকূলের আম কেন আগে পাকে: অক্ষাংশ ও তাপমাত্রা


আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে তার নিয়মটি ব্যাখ্যা করেন: "প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশ বৃদ্ধির জন্য আমের সংগ্রহকাল তিন দিন পিছিয়ে যায়।" তিনি বলেন, সাতক্ষীরা ২২ দশমিক ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৪ দশমিক ৫৬ ডিগ্রিতে, সেই হিসাবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম সংগ্রহ শুরু হয় সাতক্ষীরার অন্তত ছয় থেকে সাত দিন পরে, আর দূর উত্তরের পঞ্চগড় এলাকায় আরও কিছুটা পরে। "একই জাতের আম সাতক্ষীরায় যেটা আজকে হারভেস্ট হবে ওইসব এলাকায় অবস্থান ভেদে এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহ পরে শুরু হবে," বলেন তিনি। তার মতে, বিশ্বজুড়েই আম উৎপাদনে এই নিয়ম একই: অক্ষাংশ যত বাড়বে, আমের সংগ্রহকাল তত পিছিয়ে যাবে।

দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলার অবস্থান ২১°৩৬' থেকে ২২°৫৪' উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে, আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের (বাংলাপিডিয়ায় নবাবগঞ্জ জেলা) অবস্থান ২৪°২৫' থেকে ২৪°৫৮' উত্তর অক্ষাংশে। খান নাজমুস সাদাত যে উপজেলায় আম চাষ করেন, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তঘেঁষা সেই কলারোয়ার অবস্থান ২২°৪৮' থেকে ২২°৫৭' উত্তর অক্ষাংশে।

দ্বিতীয় কারণ তাপমাত্রা, বলেন ড. শরফ উদ্দিন: "মুকুলটা যখন আসে তখন থেকে এটা ফুটতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। কিন্তু যদি তাপমাত্রা বেশি হয় তাহলে মুকুল কিছুটা আগেভাগেই ফুটে যায়। সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী এলাকায় তাপমাত্রা বেশি থাকায় অন্য এলাকার তুলনায় আম আগেই পরিপক্ব হয়।" জেলার বিশ্বকোষ ভুক্তি অনুযায়ী সাতক্ষীরার জলবায়ু ক্রান্তীয় সাভানা ধরনের; বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ১,৭১০ মিলিমিটার।

উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ববিদরাও তাপমাত্রার সঙ্গে আমের সময়সূচির এই যোগসূত্রের কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ট্রপিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের গবেষক টমাস এল. ড্যাভেনপোর্ট ২০০৭ সালে ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব প্ল্যান্ট ফিজিওলজিতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় লেখেন, উপক্রান্তীয় অঞ্চলে আমের ফুল আসা মূলত শীতের ঠান্ডার তীব্রতা ও স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করে, আর ফুল আসা থেকে ফল পরিপক্ব হতে প্রায় চার মাস লাগে। তার ভাষ্য, বেশির ভাগ উৎপাদক ফুল আসার সময় নিয়ন্ত্রণ করে আগাম ফসল পেতে চান, কারণ মৌসুমের শুরুতেই দাম সবচেয়ে বেশি থাকে। বাংলাদেশে আমগাছে মুকুল আসে শীতল ও শুষ্ক মাসগুলোতে; বাংলাপিডিয়া জানায়, জানুয়ারি থেকে মার্চে মুকুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধরায় ক্ষতি করে।

বাংলাদেশে একটি আমগাছের মুকুল। ছবি: Kayser Ahmad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাংলাদেশে একটি আমগাছের মুকুল। ছবি: Kayser Ahmad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

মাটির লবণ


কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম আরেকটি কারণ হিসেবে মাটির লবণাক্ততার কথা বলেন। "ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সাতক্ষীরায় আমের মুকুলও আগাম আসে পরিপক্বতাও আগাম আসে। এছাড়া মাটিতে লবণ থাকার কারণে যে কোনো জিনিসের বয়স কমিয়ে দেয়," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। তার মতে, কেবল আম নয়, লবণাক্ততার কারণে সাতক্ষীরা এলাকায় ধানের জীবনকালও কিছুটা কম, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই ফসল পরিপক্ব হয়। এটি মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে তার ব্যাখ্যা; আমের ক্ষেত্রে এই প্রভাব মেপে দেখা কোনো গবেষণার উল্লেখ বিবিসির প্রতিবেদনে ছিল না।

লবণাক্ততা উপকূলের এক মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাপিডিয়ার 'লবণাক্ত মাটি' ভুক্তিতে ২০০৯ সালের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত, যার বড় অংশ উপকূলীয় জেলাগুলোর বদ্বীপ প্লাবনভূমি ও উপকূলবর্তী দ্বীপে; সাতক্ষীরা সেই জেলাগুলোর একটি। উপকূলের মাটির ওপরের স্তর হালকা থেকে মাঝারি লবণাক্ত, নিচের স্তর অত্যন্ত লবণাক্ত। মাটির লবণাক্ততা ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়তে থাকে এবং এপ্রিল-মে মাসে, অর্থাৎ যে সময় সাতক্ষীরার আম পাকে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়; জুনের পর তা দ্রুত কমে যায়। জ্ঞানকোষটি আরও বলছে, উপকূলে লবণাক্ততা উত্তর-পূর্বে সবচেয়ে কম এবং পশ্চিমের দিকে ক্রমে বাড়ে, আর সুন্দরবনের পশ্চিম অংশের মাটি অত্যন্ত লবণাক্ত।

জেলার জীবিকাও গড়ে উঠেছে লবণকে ঘিরে। সাতক্ষীরার দক্ষিণাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ স্থানীয়ভাবে 'ঘের' নামে পরিচিত জলাধারে মাছ ও চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল, আর জেলার রপ্তানিপণ্যের মধ্যে আছে চিংড়ি, আম, পাট, কাঁকড়া ও হাতে তৈরি মাটির টালি। আম ব্যবসায়ী মোহম্মদ শাহারুল ইসলাম রাজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, লবণাক্ত পানির কারণে কৃষিতে অনিশ্চয়তা থাকায় সাতক্ষীরার অনেক কৃষক এখন আম চাষের দিকে ঝুঁকেছেন, ফলে জেলায় প্রতি বছর আম ব্যবসার পরিধি বাড়ছে।

স্বাদ, আকার ও আবহাওয়া


বিবিসি বাংলা মনে করিয়ে দেয়, রাসায়নিক দিয়ে আগেভাগে ফল পাকানোর অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়; তাই মৌসুমের শুরুতে বাজারে আসা ফল নিয়ে অনেকের মনে আস্থাহীনতা কাজ করে, প্রশ্ন জাগে ফলটি অপরিপক্ব কি না বা ঠিক স্বাদ মিলবে কি না। ড. শরফ উদ্দিন বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়ার কারণেই সাতক্ষীরার আম অন্য এলাকার চেয়ে কিছুটা আগে বাজারে আসে, এর সঙ্গে স্বাদ কম-বেশি হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। "একই জাতের আম সাতক্ষীরা এবং রাজশাহী অঞ্চলে স্বাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য থাকেনা, ঊনিশ-বিশ হতে পারে," বলেন তিনি।

তবে বৃষ্টি কম হলে আকারে কিছুটা তফাত হতে পারে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ সময় তীব্র খরায় মাটিতে রসের ঘাটতি তৈরি হয়, আর সেই শুষ্ক আবহাওয়ায় আমের আকার কিছুটা বড় হয়। প্রতিবেদনের সময়কার আবহাওয়া নিয়ে তিনি বলেন, "এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে এটা আমের পরিপক্ব হওয়ার জন্য সহায়ক কিন্তু এই বৃষ্টি যদি আরও আট-দশদিন চলে তাহলে সেটা আমের জন্য ক্ষতিকর।"

কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলামের মতে, জাত ও মাটির গুণভেদে স্বাদে কিছুটা তফাত তৈরি হয়। "সাতক্ষীরার হিমসাগর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাত একই আম। কিন্তু তাপমাত্রা ও মাটিতে লবণ থাকার কারণে সাতক্ষীরার আমের মিষ্টতা কিছুটা বেশি, কারণ ড্রাই মেটারের পরিমাণ এই আমে কিছুটা বেশি থাকে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

হিমসাগর, যার আরেক নাম ক্ষীরসাপাতি, আঁশহীন জাতের আম; শাঁস হলুদ থেকে কমলা রঙের। ফল মাঝারি আকারের, ওজন ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম, যার প্রায় ৭৭ শতাংশই শাঁস, আর এটি বেশ কিছুদিন ভালো থাকে। এই আম মে মাসে পাকে; প্রধানত বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া ও হুগলি জেলায় এর চাষ হয়, আর ভারতে এটি ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে নিবন্ধিত। বাংলাদেশে হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া, আশ্বিনা ও ফজলির সঙ্গে ক্ষীরসাপাতিও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ পাওয়া আম, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গবেষক পাভেল পার্থ টিবিএসকে এ কথা বলেন।

এবার উত্তরাঞ্চলে আবহাওয়া ছিল বেশি প্রতিকূল। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল টিবিএসে প্রকাশিত বাসসের খবরে বলা হয়, তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘ খরার কারণে রাজশাহীর বাগানে কাঁচা আম অকালে ঝরে পড়ছে। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস ৭ এপ্রিল মাত্র ১ দশমিক ৪ মিলিমিটার এবং ২৮ মার্চ ৯ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছিল, আর মার্চের মাঝামাঝি থেকে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছিল। ডিএইর রাজশাহী কার্যালয়ের হিসাবে এ বছর জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪৪ হাজার টন। বাংলাপিডিয়া জানায়, ফল বড় হওয়ার সময় হালকা বৃষ্টি উপকারী, কিন্তু ঝড়, বিশেষ করে শিলাবৃষ্টি, প্রায়ই অপরিপক্ব আম ঝরিয়ে দেয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২২ সালের মে মাসে তোলা হিমসাগর আম; একই জাত সাতক্ষীরায় এবং ক্ষীরসাপাত নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাষ হয়। ছবি: Billjones94 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২২ সালের মে মাসে তোলা হিমসাগর আম; একই জাত সাতক্ষীরায় এবং ক্ষীরসাপাত নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাষ হয়। ছবি: Billjones94 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সাতক্ষীরার ক্যালেন্ডারের জাতগুলো


বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত আছে, যা মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত: কলম ও অন্যান্য অঙ্গজ উপায়ে বংশবিস্তার করা উন্নত বা অভিজাত জাত, আর আঁটি থেকে জন্মানো স্থানীয় আম, যা সাধারণত 'দেশি' বা 'গুটি আম' নামে পরিচিত; এগুলোর স্বীকৃত জাতের নাম নেই, স্বাদেরও নিশ্চয়তা নেই। অভিজাত জাতের তালিকায় আছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরসাপাত, আশ্বিনা, বোম্বাইসহ আরও অনেক জাত। জ্ঞানকোষটি জানায়, কলমের গাছে রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে এবং প্রায় ৪৫তম বছর পর্যন্ত ফলন থাকে।

গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ হলো আগাম স্থানীয় জাত, যা দিয়ে সাতক্ষীরার মৌসুম শুরু হয়, আর তার সঙ্গে দেশের আমের মৌসুমও। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের অতিরিক্ত উপপরিচালক বাসসকে বলেন, ৫ মে থেকে সাতক্ষীরার গোপালভোগ দিয়েই দেশে এ মৌসুমের আম সংগ্রহ শুরু হবে; ২০২৬ সালেও জেলাটি একই তারিখে মৌসুম শুরু করে।

মে মাসের শেষে আসে ল্যাংড়া। ভারতের বর্তমান উত্তর প্রদেশের বেনারসে ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে এই জাতের চাষ শুরু হয়; পাকার পরও আমটির গায়ে সবুজাভ ভাব থেকে যায়। টিবিএসের ২০২৪ সালের আমের জাত-পরিচিতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে সেরা ল্যাংড়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে, এবং এটি দেশের জিআই সনদপ্রাপ্ত জাতগুলোর একটি।

ক্যালেন্ডারের শেষ জাত আম্রপালি, দশেরি ও নীলম জাতের সংকর, ১৯৭১ সালে দিল্লির ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে ড. পীযূষ কান্তি মজুমদার এটি উদ্ভাবন করেন। গাছ খাটো, প্রতি বছর ফল দেয়, ছোট আকারের ফল থোকায় থোকায় ধরে; গাঢ় কমলা-লাল শাঁসে অন্যান্য বাণিজ্যিক জাতের চেয়ে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন থাকে, তবে এটি তুলনামূলক কম দিন ভালো থাকে। টিবিএসের জাত-পরিচিতিতে আম্রপালিকে মাঝারি আকারের, মিষ্টি ও মসৃণ শাঁসের আম বলা হয়েছে, যার আঁটি প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে ছোট।

সাতক্ষীরা জেলা


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার আয়তন ৩,৮১৭ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে যশোর জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে খুলনা জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। জেলায় সাতটি উপজেলা: সাতক্ষীরা সদর, আশাশুনি, দেবহাটা, তালা, কলারোয়া, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর। এর মধ্যে শ্যামনগর সবচেয়ে বড়, প্রায় ১,৯৬৮ বর্গকিলোমিটার, আর দেবহাটা সবচেয়ে ছোট। সাতক্ষীরা ১৮৬১ সালে যশোরের অধীনে মহকুমা হয়, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। জেলার প্রায় ১,৪৪৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা সুন্দরবনের অংশ, আর প্রধান নদীর মধ্যে আছে বেতনা, খোলপেটুয়া, ইছামতী, কালিন্দী, রায়মঙ্গল ও কপোতাক্ষ। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮২।

জেলার উত্তর প্রান্তের কলারোয়া উপজেলার আয়তন ২৩১ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১২টি। বাংলাপিডিয়ায় উপজেলাটির প্রধান ফলের তালিকায় প্রথমেই আছে আম, তারপর কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, লিচু ও নারকেল; ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী এখানকার ৬৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলো ও বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৩৫০টি বাগানে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ চাষি আম চাষ করেছেন, আর ডিএইর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭০ হাজার মেট্রিক টন। তার ভাষ্য, সাতক্ষীরার মাটি ও আবহাওয়ার কারণে এখানকার আম স্বাদে ও ঘ্রাণে অনন্য; অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে মুকুল আগে আসে, ফলও দ্রুত পাকে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে সাতক্ষীরার আম ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।

সারা দেশে আমের উৎপাদন ও রপ্তানি


আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ, আর আমের আদি নিবাস ধরা হয় বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার নিয়ে গড়া অঞ্চলকে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাসসের খবরে উদ্ধৃত ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ২ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন আম উৎপাদিত হয়; ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টনে, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টরে উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন। ২০২৫ মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ টন। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানান, রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ মূলত ১৫টি জেলায় আম উৎপাদিত হয়।

এই উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনো সামান্য। একই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৫৭ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন আম রপ্তানি হয়, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩২১ টনে; ২০২৫ সালের রপ্তানি লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ হাজার টন। যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স ও কানাডাসহ প্রায় ৩৮টি দেশে বাংলাদেশের আম রপ্তানি হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের সরকার তাজা আম রপ্তানির উদ্ভিদ সংগনিরোধ শর্তসংক্রান্ত প্রটোকলে সই করার পর চীন তার বাজার খোলে; ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষ শর্তগুলো ঘোষণা করে, আর চীনে প্রথম চালান পাঠানোর দিন ঠিক হয় ২০২৫ সালের ২৮ মে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে টিবিএসের এক প্রতিবেদনে বাধাগুলো তুলে ধরা হয়। ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, দেশের আম বেশি দিন ভালো থাকে না এবং বিমানভাড়া বেশি, এই দুই কারণে রপ্তানি বাড়ছে না; উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) সনদপ্রাপ্ত বাগানের অভাবও একটি ঘাটতি। রপ্তানিকারক আবুল হোসেন জানান, বিমানভাড়া কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৮৫ টাকা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে মোট উৎপাদনের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয় এবং দেশে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র মাত্র একটি। কৃষক ও কর্মকর্তাদের মানসম্মত আম উৎপাদন ও সংরক্ষণে দক্ষ করতে ৪৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প চলবে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

এই বাণিজ্যে সাতক্ষীরার অংশ বাড়ছে। ২০২৫ সালে জেলা থেকে প্রায় ৭০ টন আম রপ্তানির আশা করেছিল ডিএই, আর ২০২৬ সালের লক্ষ্য ১০০ টন। কৃষি কর্মকর্তারা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি, অর্থাৎ গাছে থাকা অবস্থায় কচি আম ব্যাগে মুড়ে রাখা, এবং বিষমুক্ত চাষাবাদের ফলে সাতক্ষীরার আম এখন ইউরোপের চেইন শপগুলোতেও জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলাদেশে গাছে ফ্রুট ব্যাগে মোড়া আশ্বিনা আম। ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে গাছে ফ্রুট ব্যাগে মোড়া আশ্বিনা আম। ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

উত্তরাঞ্চলের দেরির মৌসুম


উত্তরাঞ্চলের মৌসুম শুরু হয় দেরিতে, চলেও বেশি দিন। টিবিএসের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে ঠিক হওয়া রাজশাহীর ক্যালেন্ডারে গুটি আম ১৫ মে, গোপালভোগ ২২ মে, রানীপছন্দ বা লক্ষ্মণভোগ ২৫ মে, হিমসাগর বা ক্ষীরসাপাত ৩০ মে, ল্যাংড়া ১০ জুন, আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন, বারি আম-৪ ৫ জুলাই, আশ্বিনা ১০ জুলাই এবং গৌরমতি ১৫ জুলাই থেকে পাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সে বছর রাজশাহীর ডিএইর লক্ষ্য ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর বাগান থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার টন আম উৎপাদন।

দেরির এই দীর্ঘ মৌসুমের নিজস্ব চাপও আছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, পাঁচ-ছয় বছর ধরে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় রাজশাহীর চাষিরা বাগান কেটে ফেলছেন; সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুই বছরে এক হাজার হেক্টরের বেশি জমির গাছ কাটা হয়েছে, আর ডিএইর একজন অতিরিক্ত উপপরিচালকের হিসাবে তা প্রায় ৪৫০ হেক্টর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক কাজী জুলফিকার আলী পত্রিকাটিকে বলেন, রাজশাহীর আম মূলত নাবি জাতের, যা নওগাঁ ও রংপুরের আমের সঙ্গে একই সময়ে বাজারে আসে, ফলে সরবরাহ বেড়ে দাম পড়ে যায়; সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।

আম নিয়ে গবেষণার কেন্দ্রও উত্তরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা কেন্দ্র ১৯৮৫ সালে ৩০ একরের ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত হয়; এটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ। বারি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া সব ফসল নিয়ে গবেষণা করে। আর কয়েকটি অধিদপ্তর একীভূত করে ১৯৮২ সালে গঠিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি দপ্তর; এর জেলা কার্যালয়গুলোই সাতক্ষীরার মতো উৎপাদন ও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুর বাজারে ঝুড়িভর্তি আম। ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুর বাজারে ঝুড়িভর্তি আম। ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: Masum Ibn Musa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দৈনিক ইত্তেফাক, দেশ রূপান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব প্ল্যান্ট ফিজিওলজি, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)