সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

সাতক্ষীরার আম ক্যালেন্ডার ঘোষণা: হিমসাগর পাড়া যাবে ১৫ মে থেকে

২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন আম পাড়ার ক্যালেন্ডার ঘোষণা করে। স্থানীয় জাত ৫ মে, হিমসাগর ও খিরসাপাত ১৫ মে, ল্যাংড়া ২৭ মে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে পাড়া যাবে।

সাতক্ষীরার আম ক্যালেন্ডার ঘোষণা: হিমসাগর পাড়া যাবে ১৫ মে থেকে
ফল

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের জেলা সাতক্ষীরায় ২০২৬ সালের আম মৌসুমে কোন জাতের আম কবে থেকে পাড়া যাবে, তা নির্ধারণ করে ক্যালেন্ডার ঘোষণা করেছিল জেলা প্রশাসন। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল, রোববার বিকেলে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার এ ঘোষণা দেন। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, সাতক্ষীরার সবচেয়ে পরিচিত জাত হিমসাগর ১৫ মে থেকে সংগ্রহ করে বাজারে পাঠানো যাবে।

ক্যালেন্ডার যাঁরা বাস্তবায়ন করবেন এবং যাঁদের তা মেনে চলতে হবে, দুই পক্ষই সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাতক্ষীরার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ এবং জেলার আম চাষি সমিতির নেতা লিয়াকত আলীসহ আম ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস সেদিন সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে একই তারিখ ও একই অংশগ্রহণকারীদের নাম উল্লেখ করে।

২০২৬ সালের আম পাড়ার ক্যালেন্ডার


পুরো ফসলের জন্য একটি মাত্র দিন নয়, ক্যালেন্ডারে প্রতিটি জাত বা জাতের দলের জন্য আলাদা শুরুর তারিখ ঠিক করা হয়। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল ঘোষিত তারিখগুলো ছিল এ রকম:

  • ৫ মে থেকে ২৬ মে: গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাইসহ স্থানীয় জাতের আম।
  • ১৫ মে থেকে: হিমসাগর ও খিরসাপাত।
  • ২৭ মে থেকে: ল্যাংড়া।
  • ৫ জুন থেকে: আম্রপালি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, চাষিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ল্যাংড়া ও আম্রপালি জাতের আম পাড়ার সময় কিছুটা এগিয়ে আনা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আম পরিপক্বতা অর্জন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ তারিখ এগিয়ে আনার ফলে ক্রেতার হাতে কম পরিপক্ব আম পৌঁছাবে না, এটাই ছিল তাঁর প্রত্যাশা।

তিনি আরও বলেন, অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি থাকবে। আগের মৌসুমগুলোর মতো এবারও ক্যালেন্ডারের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল অপরিপক্ব আম বাজার থেকে দূরে রাখা। পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাতক্ষীরায় আসা ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও পাইকারি ক্রেতারা এই ক্যালেন্ডার থেকে জানতে পারেন, কোন জাতের আম কোন তারিখ থেকে বৈধভাবে বাগান থেকে বের হতে পারবে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের তারিখের সঙ্গে তুলনা


সাতক্ষীরা আগের মৌসুমগুলোতেও এ ধরনের ক্যালেন্ডার ঘোষণা করেছে। তাই ২০২৬ সালের তারিখগুলো আগের বছরগুলোর পাশাপাশি রেখে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

ঢাকা ট্রিবিউন ও দেশ রূপান্তরের ২০২৪ সালের ৬ ও ৭ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেবার রোববার, ৫ মে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নিরাপদ আম বাজারজাতকরণ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় ক্যালেন্ডার ঘোষণা করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। ডিএইর উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সারোয়ার হোসেন এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোয়াইব আহমাদ উপস্থিত ছিলেন। সেই ক্যালেন্ডারে বোম্বাই ও গোলাপখাস ৯ মে থেকে, গোবিন্দভোগ ১১ মে থেকে, হিমসাগর ২২ মে থেকে, ল্যাংড়া ২৯ মে থেকে এবং আম্রপালি ১০ জুন থেকে পাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। চাষি ও ব্যবসায়ীদের সূচি মেনে আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করতে বলা হয়, আর ক্রেতাদেরও সূচি মেনে সাতক্ষীরার আম কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ২০২৪ সালের ৮ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, সাতক্ষীরার আমের সুনাম রক্ষা এবং আগেভাগে অপরিপক্ব আম বাজারজাত ঠেকাতেই এই ক্যালেন্ডার।

২০২৫ সালে সোমবার, ৫ মে সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়নে কৃষক বিল্লাল হোসেনের বাগানে আম পাড়া উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ, জানিয়েছিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। সে বছরের ক্যালেন্ডারে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস ও শরিফাখাসের মতো স্থানীয় জাত ৫ মে থেকে, হিমসাগর ২০ মে থেকে, ল্যাংড়া ২৭ মে থেকে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে বাজারে আনার সময় নির্ধারিত ছিল।

এই দুই বছরের সঙ্গে মেলালে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারে স্থানীয় জাতের শুরু ২০২৫ সালের মতোই ৫ মে। তবে হিমসাগর ও খিরসাপাতের তারিখ আগের দুই মৌসুমের যেকোনোটির চেয়ে আগে: ১৫ মে, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল ২২ মে এবং ২০২৫ সালে ২০ মে। ল্যাংড়ার ২৭ মে তারিখটি ২০২৫ সালের সমান, আর ২০২৪ সালের ২৯ মের চেয়ে আগে। আম্রপালির ৫ জুন তারিখও ২০২৫ সালের সমান, আর ২০২৪ সালের ১০ জুনের চেয়ে আগে।

কাটা হিমসাগর আম, ভেতরে আঁশহীন হলুদ শাঁস। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
কাটা হিমসাগর আম, ভেতরে আঁশহীন হলুদ শাঁস। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

২০২৬ মৌসুমের আগে সাতক্ষীরার আমের বাণিজ্য


এই ঘোষণার আগের পূর্ণ মৌসুমটি দেখায়, ক্যালেন্ডার কত বড় একটি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৫ সালে আম পাড়া শুরুর দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, কৃষি বিভাগ সে মৌসুমে জেলায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। কৃষক ও ব্যবসায়ী মিলিয়ে জেলায় অন্তত এক লাখ মানুষ এই বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। উদ্বোধনের দিনই সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড়বাজারে প্রচুর গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ আম ওঠে, আর ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে ঢাকাসহ দেশের নানা জায়গায় আম পাঠাচ্ছিলেন।

সেদিন জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, নিরাপদ ও পাকা আম বাজারজাত করতেই আম ক্যালেন্ডার ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি জাতের আম পাড়ার সময় নির্দিষ্ট করা আছে। তিনি বলেন, রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আম বাজারে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আম বাজারজাতকরণে কোনো সিন্ডিকেট বরদাশত করা হবে না। একই প্রতিবেদনে তাঁর আরেকটি মন্তব্যও ছিল: জাতীয় ফল কাঁঠালের চেয়ে আমের চাষ বেশি হয়, তাই আমকে জাতীয় ফল করার কথা ভাবার সময় এসেছে।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন ২০২৫ সালের মে মাসে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সাতক্ষীরার আম এখন একটি প্রতিষ্ঠিত বড় ব্র্যান্ড, এই সুনাম ধরে রাখতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক কৃষক দাদনের চাপে থাকেন, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ ফসলের বিপরীতে আগাম টাকা নেন, ফলে তাঁরা ন্যায্য দাম পান না। কৃষিঋণসহ নানা বিষয়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

জেলার রপ্তানি পণ্যের তালিকাতেও আম আছে। জেলার পরিচিতিমূলক তথ্যসূত্রে চিংড়ি, আম, পাট, কাঁকড়া ও হাতে তৈরি মাটির টালিকে সাতক্ষীরার রপ্তানি পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আর জেলার ভোমরা স্থলবন্দরকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর বলা হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা: যেখানে দেশের আমের মৌসুম শুরু


সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের জেলা, খুলনা বিভাগের অন্তর্গত। জেলার আয়তন প্রায় ৩ হাজার ৮১৭ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে যশোর জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে খুলনা জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮২ জন, যা ২০১১ সালে ছিল ১৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯৫৯ জন।

জেলায় সাতটি উপজেলা: আশাশুনি, দেবহাটা, কলারোয়া, সাতক্ষীরা সদর, শ্যামনগর, তালা ও কালীগঞ্জ। কপোতাক্ষ, মরিচ্চাপ, খোলপেটুয়া, বেতনা, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা, ইছামতি, বেত্রাবতী ও কালিন্দী-যমুনা এ জেলার নদীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। জেলার দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম একক জোয়ারভাটার ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি অংশ। শুরুতে যশোর ও পরে খুলনা জেলার মহকুমা ছিল সাতক্ষীরা; ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এটি জেলায় উন্নীত হয়।

জেলার জলবায়ু ক্রান্তীয় সাভানা ধরনের। বছরে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন প্রায় ১২.৫ ডিগ্রি, আর বার্ষিক বৃষ্টিপাত মোটামুটি ১ হাজার ৭০০ মিলিমিটার। ধান এখানকার প্রধান ফসল; পাশাপাশি পাট, গম ও পানের চাষ হয়। আম, কাঁঠাল, পেঁপে, লিচু, নারিকেল ও পেয়ারা জেলার উল্লেখযোগ্য ফল। জেলার দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে ঘেরে চিংড়ি ও মাছ চাষের প্রাধান্য।

উত্তরাঞ্চলের আম অঞ্চলের চেয়ে সাতক্ষীরার আম আগে বাজারে আসে, আর ক্যালেন্ডারেও তা দেখা যায়। ২০২৫ সালে সাতক্ষীরায় হিমসাগর ২০ মে থেকে পাড়ার অনুমতি থাকলেও ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৫ সালের ৭ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ক্যালেন্ডারে হিমসাগর বা খিরসাপাত পাড়ার অনুমতি ছিল ৩০ মে থেকে, আর ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে।

ধানখেতের পাশে একটি আমবাগান; ক্যালেন্ডার যে ধরনের বাগানের জন্য, তার সাধারণ চিত্র। ছবি: SyedAminul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ধানখেতের পাশে একটি আমবাগান; ক্যালেন্ডার যে ধরনের বাগানের জন্য, তার সাধারণ চিত্র। ছবি: SyedAminul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ক্যালেন্ডারে থাকা জাতগুলো


হিমসাগর বাংলার আম; বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে এর চাষ হয়। ফল মাঝারি আকারের, ওজন প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম, আর ফলের ওজনের প্রায় ৭৭ শতাংশই শাঁস। শাঁস হলুদ থেকে কমলা রঙের, তাতে কোনো আঁশ নেই, আর ফলটি ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যায়। হিমসাগর মে মাসে পাকে এবং সাধারণত মের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত বাজারে থাকে। ভারতে মালদহের খিরসাপাতি (হিমসাগর) আম পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত।

সাতক্ষীরার ক্যালেন্ডারে হিমসাগরের সঙ্গে যে খিরসাপাতের নাম আছে, তাকে প্রায়ই হিমসাগর বলে ভুল করা হয়, যদিও তথ্যসূত্রগুলোতে দুটিকে আলাদা জাত হিসেবে ধরা হয়। খিরসাপাত মাঝারি আকারের, গোলাকার, আঁশহীন ও সুগন্ধি আম; এর চাষ মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়, যেখানে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়, সনদ দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি; এটি দেশের তৃতীয় জিআই পণ্য। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম জিআই সনদ পায় ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল।

২৭ মে থেকে যে ল্যাংড়া পাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তার উৎপত্তি ভারতের বর্তমান উত্তর প্রদেশের বেনারস (বারাণসী) অঞ্চলে; সেখানে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে প্রথম এর চাষ হয়। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গেও ল্যাংড়ার চাষ হয়। পাকার সময়ও এর খোসায় সবুজাভ আভা থেকে যায়, আর ফালি করে খাওয়া ও ক্যানজাত করার জন্য এটি সমাদৃত। ভারতে সাধারণত জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত ল্যাংড়া আম পাড়া হয়।

ক্যালেন্ডারের সবশেষ জাত আম্রপালি, যা পাড়া যাবে ৫ জুন থেকে। দশেরি ও নীলম জাতের সংকরায়ণে এটি উদ্ভাবন করেন দিল্লির ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএআরআই) ড. পীযূষ কান্তি মজুমদার; জাতটি অবমুক্ত হয় ১৯৭১ সালে। আম্রপালি গাছ খাটো, প্রতি মৌসুমেই ফল দেয়, ফল ছোট ও থোকায় থোকায় ধরে। এর শাঁস গাঢ় কমলা-লাল, তাতে অন্যান্য বাণিজ্যিক জাতের তুলনায় প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ বিটা-ক্যারোটিন থাকে; তবে এর সংরক্ষণকাল তুলনামূলক কম।

মৌসুমের শুরুতে যে গোপালভোগ ও বোম্বাই বাজারে আসে, বাংলাপিডিয়া সেগুলোকে বাংলাদেশের উন্নত জাতের আমের তালিকায় রেখেছে। এই উন্নত জাতগুলো কলম করে বংশবিস্তার করা হয়; অন্যদিকে বীজ থেকে জন্মানো দেশি বা গুটি আমের কোনো স্বীকৃত নাম নেই। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত পাওয়া যায়।

গাছে ঝুলে থাকা ল্যাংড়া আম। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে ঝুলে থাকা ল্যাংড়া আম। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

আম পাড়ার তারিখ কেন বেঁধে দেওয়া হয়


সাতক্ষীরার ক্যালেন্ডার একমাত্র নয়, অন্য জেলাতেও এমন ক্যালেন্ডার হয়। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৫ সালের ৭ মে জানায়, রাজশাহীর সে বছরের ক্যালেন্ডার ঠিক হয় জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারের সভাপতিত্বে এক সভায়, আর এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল নিরাপদ, রাসায়নিকমুক্ত ও পরিপক্ব আম নিশ্চিত করা। সেই ক্যালেন্ডারে আগাম জাতের আম ১৫ মে থেকে, গোপালভোগ ২০ মে থেকে, রানীপছন্দ বা লক্ষ্মণভোগ ২৫ মে থেকে, হিমসাগর বা খিরসাপাত ৩০ মে থেকে, ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে, আম্রপালি বা ফজলি ১৫ জুন থেকে, বারি আম-৪ ৫ জুলাই থেকে, আশ্বিনা ১০ জুলাই থেকে এবং গৌড়মতি ১৫ জুলাই থেকে পাড়ার সময় ঠিক করা হয়; কাটিমন ও বারি আম-১১ সারা বছর পাড়া যাবে বলে জানানো হয়।

একই প্রতিবেদনে সে বছর রাজশাহীর আমের পরিসরও উঠে আসে: ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন প্রায় ১৩.২৬ টন, সম্ভাব্য উৎপাদন ২ লাখ ৬০ হাজার ৬ টন এবং আনুমানিক বিক্রি ১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজশাহীতে ২০২৪ সালে আম পাড়া শুরু হয়েছিল ১৫ মে, ২০২৩ সালে ৪ মে এবং ২০২২ সালে ১৩ মে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে কৃষকেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে আগে আম পাড়তে পারবেন।

এসব ক্যালেন্ডারের ভিত্তি আমগাছের নিজস্ব মৌসুম। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আমগাছে মুকুল আসে। এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া হলে ফল ধরায় ক্ষতি হয়, আর প্রায় এক হাজার ফুলের মধ্যে মাত্র এক-দুটি পরিপক্ব ফলে পরিণত হয়। হালকা বৃষ্টি ফলের বৃদ্ধিতে সহায়ক, তবে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কাঁচা আম ঝরে পড়ে। দেশের সেরা আমবাগানগুলো গাঙ্গেয় প্লাবনভূমিতে, যেখানে মাটির পিএইচ ৫.৫ থেকে ৭.৫। কলমের গাছ চতুর্থ বছরে প্রথম ফল দেয় এবং প্রায় ৪৫ বছর পর্যন্ত ফলবান থাকে।

বাংলাদেশে আম


আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica)। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলকে এর আদি নিবাস ধরা হয়। আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ, আর জাতীয় ফল কাঁঠাল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০০৫-০৬ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৫২৫ একর জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। পুরোনো গাছ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বালাই দমনের অভাব, বীজের চারার ওপর নির্ভরতা এবং ফলবান গাছ কেটে ফেলাকে ফলন কম থাকার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাপিডিয়া।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উন্নত জাতের আমের কলম বিতরণ করে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আম গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে। নার্সারি থেকে পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত প্রায় তিন ডজন পোকা আমের ক্ষতি করে, যার মধ্যে আছে আমের হপার বা শোষক পোকা, আঁটির উইভিল, কাণ্ড ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা এবং ফলের মাছি। ছত্রাকজনিত রোগের মধ্যে রয়েছে অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, আগামরা ও পাউডারি মিলডিউ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে ২০২৩ সালে বিশ্বে আম, ম্যাঙ্গোস্টিন ও পেয়ারা মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি ১১ লাখ টন, যার মধ্যে শুধু ভারতেই প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখ টন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা আমে প্রায় ৬০ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৫ গ্রাম শর্করা, ১.৬ গ্রাম খাদ্য আঁশ এবং ৩৬.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, পাকা আম টাটকা খাওয়াই আম খাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়; কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর কাঁচা ও পাকা দুই ধরনের আম দিয়েই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়।

ক্যালেন্ডারের পেছনের প্রতিষ্ঠান


আম পাড়ার ক্যালেন্ডার জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, যার প্রধান জেলা প্রশাসক; সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই অধিদপ্তর গঠিত হয় ১৯৮২ সালে, কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটকে একীভূত করে। অধিদপ্তরের কাজের দিকনির্দেশনার জন্য ১৯৯৬ সালে সরকার নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করে। সাতক্ষীরায় ২০২৬ সালের তারিখগুলো এবং তার পেছনে চাষিদের দাবির কথা ব্যাখ্যা করেন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকই।

২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল ঘোষিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাতক্ষীরার বাগান ও বাজারে নজর রাখার দায়িত্ব ছিল এই দপ্তরগুলোর, যাতে কোনো জাত নির্ধারিত তারিখের আগে গাছ থেকে না নামে: স্থানীয় জাত ৫ মে থেকে, হিমসাগর ও খিরসাপাত ১৫ মে থেকে, ল্যাংড়া ২৭ মে থেকে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে।

ছবি: Billjones94 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), ঢাকা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া (সাতক্ষীরা জেলা, হিমসাগর, খিরসাপাত আম, ল্যাংড়া আম, আম্রপালি আম, আম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)