বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি ২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি চায়। বিবিসি বাংলা ১১ মে জানায়, তখন বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। সমিতির দাবি, আমদানির সুযোগ পেলে দাম কেজিপ্রতি ৫০০ টাকার মধ্যে রাখা যাবে। তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, মাংস আমদানির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
বিবিসি বাংলার হিসাবে দেশে প্রায় ৬০ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে, যার প্রায় ২৫ হাজারই ঢাকায়। কিছু প্রতিষ্ঠান অবশ্য হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি করে, যা পাঁচতারকা হোটেল ও কিছু রেস্তোরাঁয় ব্যবহার হয়।
রেস্তোরাঁ মালিকদের যুক্তি
সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের হোটেল রেস্তোরার ব্যবসা নির্ভর করে গরুর মাংসের ওপর। সব দেশে এর দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এখানে ৮০০-১০০০ টাকা দাম। আবার যে ধরনের মাংস রেস্টুরেন্টে দরকার তেমন মাংসও খুব একটা পাওয়া যায় না।"
তার অভিযোগ, বড় বড় শিল্পগ্রুপ ও শৌখিন উদ্যোক্তারা খামার নিয়ন্ত্রণ করায় মাংসের দাম বেড়েছে এবং সাধারণ কৃষকের জন্য গরু পালন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সংবাদ সম্মেলনে দাবি জানালেও সরকারের কাছে তারা তখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব দেননি।

সরকার কেন আমদানির পক্ষে নয়
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, এ ধরনের কোনো প্রস্তাবও কেউ তাদের দেয়নি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তার ভাষায়, "এবারের কুরবানিতেও পর্যাপ্ত সংখ্যক গবাদিপশু বাজারে আসবে। ফলে সরবরাহজনিত কারণে দাম বৃদ্ধির কোনো আশংকা নেই। আর আমরা মনে করি আমদানির প্রয়োজনীয়তাই তো নেই। কারণ কুরবানির চাহিদা পূরণের পরেও দেশে প্রায় ২৫ লাখের বেশি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকে।"
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেশে গরু ছিল ২৫১ দশমিক ৭১ লাখ, মহিষ ১৫ দশমিক ৩২ লাখ। ওই বছর মাংসের উৎপাদন ছিল ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা ধরা হয়েছিল ৭৭ দশমিক ৯২ লাখ মেট্রিক টন। ২০২২ সালের এপ্রিলে জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশে প্রথমবারের মতো গরু, ছাগল ও মুরগির মাংস আমদানিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতির বিধান আসে; অধিদপ্তর জানায়, বিশেষ কারণ ছাড়া এ অনুমতি দেওয়া হয় না।

দামের ইতিহাস ও আগের প্রস্তাব
বিবিসি বাংলার তথ্যে, ২০১৯ সালের রোজায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৫২৫ টাকা বেঁধে দেয়। ২০২১ সালে একই সময়ে দাম ছিল ৫৬০ থেকে ৬০০ টাকা, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, আর ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরে ২০২৩ সালে ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকা। ২০১২ সালের পর ভারত বাংলাদেশে গরু রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে এবং এক পর্যায়ে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেকের অভিযোগ, এই সুযোগে এক শ্রেণির বিক্রেতা দাম বাড়িয়েছেন।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দেশের কিছু ব্যবসায়ী ভারত থেকে গরুর মাংস আমদানির প্রস্তাব দেন। তখনকার এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন একে বাস্তবসম্মত সমাধান বলেছিলেন। কিন্তু ভারতের মাংস রপ্তানিকারকদের সমিতির প্রধান ফাওযান আলাভি তখন বিবিসিকে জানান, ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া মাংসের পুরোটাই মহিষের মাংস, কারণ সেখান থেকে গরু বা গরুর মাংস রপ্তানি নিষিদ্ধ। পরে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি নাকচ করে জানায়, দেশের বছরে ৭০ লাখ টন মাংসের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, আমদানি করলে খাতটি সংকটে পড়বে।
২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা প্রথমবারের মতো ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত গরুর মাংস রপ্তানির আগ্রহ জানান; বিবিসি বাংলা জানায়, কেজিপ্রতি পাঁচশ টাকারও কম দামে সরবরাহের কথা বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ এর বদলে কোরবানির জন্য জীবন্ত গরু আমদানির আগ্রহ দেখায়। সে সময় বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন বলেছিল, দেশে পর্যাপ্ত গরু আছে এবং দেশীয় শিল্পের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সেই আলোচনা আর এগোয়নি, আর সরকার দেশের পশু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্তে যেতে রাজি হয়নি।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস)





মন্তব্য
(০)