সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

অল্প মসলায় ঝিঙে দিয়ে মসুর ডাল: গরমের দুপুরের সহজ রেসিপি

২০২৬ সালের ১৭ মে জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক ঝিঙে দিয়ে পাতলা মসুর ডালের একটি রেসিপি প্রকাশ করে; এক টেবিল চামচ তেল আর ঘরোয়া কয়েকটি মসলায় তৈরি এই হালকা পদ গরমের দিনে ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য।

অল্প মসলায় ঝিঙে দিয়ে মসুর ডাল: গরমের দুপুরের সহজ রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ১৭ মে জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ঝিঙে দিয়ে পাতলা মসুর ডাল রান্নার একটি রেসিপি প্রকাশ করে। গরমের দিনের হালকা দুপুরের খাবার হিসেবে পদটি তুলে ধরা হয়: এক কাপ মসুর ডাল, দুটি ঝিঙে, ঘরে থাকা কয়েকটি সাধারণ মসলা আর মাত্র এক টেবিল চামচ তেল; অল্প সময়েই রান্না শেষ, পরিবেশন করতে হয় গরম ভাতের সঙ্গে।

ভাতের সঙ্গে পাতলা মসুর ডাল এ দেশের সবচেয়ে সাধারণ, আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবারগুলোর একটি। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া মসুরকে সবচেয়ে জনপ্রিয় ডাল ফসল এবং বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম প্রধান উপাদান বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং আন্তর্জাতিক শুষ্ক অঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (ইকার্ডা)-এর ২০০৪ সালের একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দেশে চাষ হওয়া প্রায় এক ডজন ডাল ফসলের মধ্যে খাওয়ার দিক থেকে মসুরই এক নম্বরে, আর এটি খাওয়া হয় ভাতের সঙ্গে স্যুপের মতো ডাল হিসেবে। নিচে প্রথমে জাগো নিউজের প্রকাশিত রেসিপিটি দেওয়া হলো, তারপর এর প্রধান দুই উপাদান নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের খাদ্য উপাদান তালিকা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কী বলে, তা তুলে ধরা হলো।

রেসিপি: উপকরণ ও রান্নার ধাপ


জাগো নিউজের রেসিপিটি এক কাপ মসুর ডালের হিসাবে লেখা। উপকরণ:

  • মসুর ডাল: ১ কাপ
  • ঝিঙে: ২টি
  • পেঁয়াজ কুচি: ২ টেবিল চামচ
  • টমেটো কুচি: ১টি (মাঝারি)
  • রসুন কুচি: ১ চা চামচ
  • কাঁচামরিচ: ৩ থেকে ৪টি
  • হলুদ গুঁড়া: সামান্য
  • লবণ: স্বাদমতো
  • তেল: ১ টেবিল চামচ
  • ধনেপাতা কুচি: সামান্য

রেসিপিতে দেওয়া ক্রম অনুযায়ী রান্নার ধাপ:

  • মসুর ডাল ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর লবণ, হলুদ গুঁড়া ও প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে প্রেশার কুকার বা হাঁড়িতে সেদ্ধ করুন।
  • এর মধ্যে ঝিঙের খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে রাখুন।
  • কড়াইয়ে তেল গরম করে রসুন কুচি দিয়ে হালকা সোনালি করে ভাজুন।
  • এরপর পেঁয়াজ কুচি দিয়ে নরম হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
  • পেঁয়াজ ভালোভাবে ভাজা হলে টমেটো কুচি দিয়ে কষান, যতক্ষণ না টমেটো গলে মসলার সঙ্গে মিশে যায়।
  • এই কষানো মসলায় সেদ্ধ ডাল, কাঁচামরিচ ও কাটা ঝিঙে দিয়ে দিন।
  • প্রয়োজনে সামান্য গরম পানি দিয়ে মাঝারি আঁচে ২ থেকে ৩ মিনিট ফুটিয়ে নিন, যাতে সব উপাদানের স্বাদ ভালোভাবে মিশে যায়।
  • ডাল পছন্দমতো ঘন হয়ে এলে চুলা থেকে নামানোর আগে ওপরে ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিন এবং গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

রেসিপির শেষে তিনটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:

  • ঝিঙে ছোট টুকরো করে কাটলে দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং ডালের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়।
  • ঝিঙে দেওয়ার আগে হালকা ভেজে নিলে স্বাদ ভালো আসে।
  • ডাল বেশি পাতলা রাখতে চাইলে রান্নার শুরুতেই বেশি পানি দিন।

জাগো নিউজ পদটিকে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বলে উল্লেখ করেছে এবং মসুর ডালের প্রোটিনের কথা বলেছে। দুই উপাদানের পুষ্টিমান নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্য উপাদান তালিকা কী বলে, তা নিচে আলাদা অংশে দেওয়া হলো।

অন্যান্য বাঙালি ডালের রেসিপির সঙ্গে মিল ও পার্থক্য


পদ্ধতিটি বাঙালি ডাল রান্নার চেনা ধারা মেনেই: আগে হলুদ ও লবণ দিয়ে ডাল সেদ্ধ করা হয়, আর স্বাদ আসে অল্প তেলে আলাদা করে ভাজা পেঁয়াজ-রসুনের মতো সুগন্ধি উপকরণ থেকে, যা পরে ডালে মেশানো হয়। বাংলা ট্রিবিউনের জীবনযাপন ডেস্ক ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মসুরের ডাল দিয়ে পুঁই শাকের যে রেসিপি প্রকাশ করে, সেটিও একই ধাঁচের। সেখানে আধা কাপ মসুরের ডাল অল্প হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে রাখা হয়; সরিষার তেলে কয়েকটি শুকনা মরিচ, পেঁয়াজ কুচি ও রসুন কুচি ভেজে তাতে সেদ্ধ ডাল ও লবণ দেওয়া হয়; এরপর আলাদা করে সেদ্ধ করা শাক দিয়ে মিনিট পাঁচেক রান্না করে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।

ঝিঙে আর ডালের জুটি বাংলাদেশের রান্নাঘরে নতুন নয়। ২০০৫ সালের ২ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোয় ছাপা হওয়া 'মুগডালে ঝিঙা' রেসিপিটি পরে ই-বাংলা লাইব্রেরি পুনঃপ্রকাশ করে। তাতে আধা কাপ মুগডাল আর ২৫০ গ্রাম ঝিঙে লাগে। মুগডাল অল্প ভেজে পেঁয়াজ, আদা, রসুন, কাঁচামরিচ, লবণ, হলুদ, তেজপাতা ও ছয় কাপ পানি দিয়ে সেদ্ধ করা হয়; খোসা ছাড়িয়ে গোল চাক করে কাটা ঝিঙে ডালে দেওয়া হয়; ঝিঙে সেদ্ধ হলে তেল বা ঘিয়ে দারচিনি, আদা, রসুন ও পেঁয়াজ বাদামি করে ভেজে বাগার দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জাগো নিউজের রেসিপিতে মুগের বদলে মসুর ডাল ব্যবহার করা হয়েছে, গোটা মসলা ও শেষের বাগার বাদ দেওয়া হয়েছে, আর স্বাদের ভিত তৈরি হয়েছে রসুন, পেঁয়াজ ও টমেটো দিয়ে।

কাজের দিনের দ্রুত রান্নার জন্য খোসা ছাড়ানো চেরা লাল মসুর বেশ উপযোগী। জাতভেদে মসুর সেদ্ধ হতে ১০ থেকে ৪০ মিনিট লাগে; খোসা ছাড়ানো ছোট দানার জাত, যেমন সাধারণ লাল মসুর, সবচেয়ে কম সময়ে সেদ্ধ হয় এবং বেশির ভাগ ডালজাতীয় শস্যের মতো একে আগে ভিজিয়ে রাখতে হয় না। খোসাহীন মসুর রান্নার সময় ভেঙে ঘন মণ্ডের মতো হয়ে যায়, ডালের ঘনত্ব আসে সেখান থেকেই। বাংলাদেশি জাতগুলোর মধ্যেও সময়ের পার্থক্য আছে: বারি ও ইকার্ডার পর্যালোচনা অনুযায়ী উৎফলা জাত সেদ্ধ হতে ১৬ মিনিট, বারি মসুর-৪ প্রায় ১৭ মিনিট এবং বারি মসুর-৩ লাগে ২১ মিনিট। সেদ্ধ হলে ডাল ফুলেও ওঠে: বাংলাদেশের খাদ্য উপাদান তালিকা সেদ্ধ মসুর ডালের জন্য ২.০৬ ইল্ড ফ্যাক্টর ব্যবহার করে, অর্থাৎ শুকনো ডালের যে ওজন, সেদ্ধ করার পর ওজন হয় তার ২.০৬ গুণ।

খোসা ছাড়ানো চেরা লাল মসুর, এই রূপেই মসুর ডাল বিক্রি ও রান্না হয়। ছবি: Sanjay Acharya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
খোসা ছাড়ানো চেরা লাল মসুর, এই রূপেই মসুর ডাল বিক্রি ও রান্না হয়। ছবি: Sanjay Acharya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মসুর ডাল আসলে কী


মসুর ডাল হলো মসুরের (Lens culinaris) চেরা বীজ; মসুর শিম্বি গোত্রের একটি ডাল ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, মিশর, দক্ষিণ ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় অতি প্রাচীনকাল থেকে মসুরের আবাদ হয়ে আসছে, পরে সেখান থেকে উত্তরে ইউরোপের ভেতরে এবং পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশ ও চীনে তা ছড়িয়ে পড়ে। হালকা দোআঁশ থেকে কালো মাটি পর্যন্ত নানা ধরনের মাটিতে এটি জন্মে এবং মাঝারি ক্ষারীয় মাটিও সহ্য করতে পারে। বাংলাদেশে এটি শীতকালীন ফসল হিসেবে চাষ হয়: অতিরিক্ত শীত বা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না, খরা সহ্যের কিছুটা ক্ষমতা আছে, তবে জলাবদ্ধতায় খুবই সংবেদনশীল।

মসুর গাছ খাড়া, প্রচুর শাখাপ্রশাখাযুক্ত একবর্ষজীবী বীরুৎ; উচ্চতা ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার, কাণ্ড সরু, পাতা পক্ষল এবং পাতার আগা শুঙ্গ বা আকর্ষে শেষ হয়। ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা ছোট ফুল থেকে চ্যাপ্টা ছোট শুঁটি হয়, প্রতিটিতে এক বা দুটি বীজ থাকে। বীজের আকৃতি পরকলা বা লেন্সের মতো, দুই দিকে উত্তল; ইংরেজি শব্দ 'লেন্টিল' এসেছে লাতিন 'লেন্স' শব্দ থেকে, আর এই আকৃতির কারণেই চশমার কাচের 'লেন্স' নামও একই শব্দ থেকে। বাংলাপিডিয়া মসুরের প্রধান রোগ হিসেবে মরিচা রোগ, গোড়া পচা, ঢলে পড়া এবং স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইটের কথা উল্লেখ করেছে।

বারি ও ইকার্ডার পর্যালোচনা বলছে, বাংলাদেশে শুধু লাল বীজপত্রের মসুরই খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। তা স্যুপের মতো ডাল করে ভাত বা রুটির সঙ্গে খাওয়া হয়, আবার চাল বা ভাঙা গমের সঙ্গে মিশিয়ে খিচুড়ি রান্না হয়; মসুরের খড় গবাদিপশুর মূল্যবান খাদ্য। বিশ্বে যে লাল মসুর কেনাবেচা হয়, তার বড় অংশের খোসা ছাড়িয়ে, দুই ভাগ করে পালিশ করা হয়; ভারতীয় উপমহাদেশে এই প্রক্রিয়াকে ডাল মিলিং বলে। মসুরের বীজের ওজনের মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ খোসা, যা বেশির ভাগ ডালজাতীয় শস্যের চেয়ে কম। পর্যালোচনায় বর্ণিত বাংলাদেশি জাতগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে খোসা ছাড়ালে ওজনের ৭৪ থেকে ৭৮ শতাংশ ডাল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে মসুর চাষ


ইকার্ডা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণা ২০২২ সালের জানুয়ারিতে পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাতে মসুরকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডাল ফসল বলা হয়েছে, যা মানুষের খাদ্য, পশুখাদ্য ও গোখাদ্য এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। দেশে মসুরের আবাদ ১৯৬১ সালের ৬২ হাজার হেক্টর থেকে ১৯৭৯ সালে ২ লাখ ৯৫ হাজার হেক্টরে পৌঁছায়। আশির দশকে দুটি কারণে আবাদ কমে যায়: সেচের দ্রুত বিস্তারে শুকনো মৌসুমের বোরো ধান মসুরের জমি দখল করে নেয়, আর প্রচলিত জাতগুলো আশির দশকের শুরু থেকে ছড়াতে থাকা স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট ও মরিচা রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। ২০১৩ সালে আবাদ নেমে আসে ৯০ হাজার হেক্টরে। এরপর আগাম ও উচ্চফলনশীল নতুন জাতের কল্যাণে ২০১৮ সালে তা বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়, যা ১৯৭৯ সালের চেয়ে অনেক কম হলেও ২০১৩ সালের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি।

মসুর চাষ হয় শীতকালে, নভেম্বর থেকে মার্চে। এতে চাষাবাদ ও মাঠের কাজ কম লাগে, সেচ লাগে খুব কম বা লাগেই না, আর মসুর বছরে হেক্টরপ্রতি ৩৫ থেকে ১০০ কেজি বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন মাটিতে সংবন্ধন করে; এ কারণেই গবেষকেরা ধাননির্ভর ফসলচক্রকে টেকসই করতে মসুরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কৃষকেরা মসুর এককভাবে, মিশ্র ফসল হিসেবে কিংবা গম, সরিষা, তিসি ও আখের সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে চাষ করেন। উঁচু জমি থেকে গড়িয়ে আসা পানি পায় এমন নিচু জমিতে রোপা ধান কাটার দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে ধানখেতেই মসুরের বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ধান কাটার পর মাটিতে থেকে যাওয়া আর্দ্রতায় ফসলটি বেড়ে ওঠে; একে রিলে চাষ বলে।

মসুরের প্রধান এলাকা বৃহত্তর ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহী। বারি ও ইকার্ডার পর্যালোচনায় চাষের ধরন এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: ফরিদপুর, পাবনা, নাটোর ও কুষ্টিয়ার মাঝারি নিচু জমিতে পাট কাটার পর বন্যার পানি নেমে গেলে এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে মসুর বোনা হয়; ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা ও নাটোরের নিচু এলাকার ভারী এঁটেল মাটিতে বোনা আমন ধানের পর মসুর হয়; আর যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, নাটোর, পাবনা, রাজবাড়ী ও মাগুরার বিস্তীর্ণ এলাকায় আখের সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে মসুর চাষ হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০২ সালের তথ্য ধরে পর্যালোচনাটি জানায়, আবাদি এলাকা (১ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর) ও উৎপাদনে (১ লাখ ১৬ হাজার টন) মসুর ডাল ফসলের মধ্যে দ্বিতীয় হলেও ভোক্তার পছন্দ ও মোট ভোগে প্রথম।

মরক্কোর মেকনেসের কাছে একটি খেতে মসুরগাছ; বাংলাদেশে ফসলটি শীত মৌসুমে চাষ হয়। ছবি: ChriKo / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
মরক্কোর মেকনেসের কাছে একটি খেতে মসুরগাছ; বাংলাদেশে ফসলটি শীত মৌসুমে চাষ হয়। ছবি: ChriKo / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

বারির গবেষণা ও নতুন জাত


পাবনার ঈশ্বরদীতে, মসুর চাষের নিবিড় এলাকার মাঝখানে অবস্থিত বারির ডাল গবেষণা কেন্দ্র সত্তরের দশকের শেষ ভাগ থেকে মসুর নিয়ে কাজ করছে; আশির দশকের শুরু থেকে ইকার্ডা কেন্দ্রটিকে প্রজননের উপকরণ সরবরাহ শুরু করে। প্রথম উন্নত জাতগুলো আসে নব্বইয়ের দশকে। পাবনার স্থানীয় জাত থেকে বাছাই করা উৎফলা ১৯৯১ সালে অবমুক্ত হয়, এর গড় ফলন হেক্টরে ১.৩ থেকে ১.৫ টন। ১৯৯৬ সালে অবমুক্ত বারি মসুর-৩ এর গড় ফলন হেক্টরে ২ টন এবং এটি মরিচা রোগ প্রতিরোধী। পর্যালোচনার সময় বারি মসুর-৪ ছিল দেশে চাষ হওয়া একমাত্র জাত, যা মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট দুই রোগই প্রতিরোধ করতে পারত। পর্যালোচনার হিসাবে ২০০২-০৩ মৌসুম নাগাদ প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত জাত স্থানীয় জাতের জায়গা নেয়, যার প্রায় ৩৯ হাজার হেক্টরে ছিল বারি মসুর-৪; উন্নত জাতগুলো স্থানীয় জাতের চেয়ে গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি ফলন দিয়েছে।

১৯৯১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বারি ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এককভাবে বা ইকার্ডার সঙ্গে মিলে মসুরের ১৫টি উন্নত জাত অবমুক্ত করে; ২০১৫ সালে এর আটটি জাত দেশের মোট মসুর আবাদের ৯৯ শতাংশের বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের ১ হাজার ৬৯৪টি মসুর প্লটের তথ্য বিশ্লেষণ করে পিএলওএস ওয়ানের গবেষণাটি দেখায়, ২০০৬ সালের পরে অবমুক্ত জাতগুলো পুরোনো জাতের চেয়ে ১৪.৩ শতাংশ (হেক্টরে ১৮১.১৪ কেজি) বেশি ফলন এবং ১৭.২৩ শতাংশ বেশি মোট মুনাফা দেয়; তবে এগুলো চাষ হচ্ছিল মোট মসুর জমির মাত্র ৪৫ শতাংশে।

প্রজনন কোন দিকে এগোচ্ছে, তা বোঝা যায় সাম্প্রতিক দুটি জাত থেকে। ইকার্ডায় তৈরি একটি লাইন থেকে ২০১৫ সালে অবমুক্ত বারি মসুর-৮ পাকে ১১৫ থেকে ১২০ দিনে; হেক্টরপ্রতি সম্ভাব্য ফলন ১ হাজার ৯৭৩ কেজি, স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট ও গোড়া পচা রোগ সহনশীল, আর বীজে আয়রন (কেজিতে ৭৪ মিলিগ্রাম), জিংক (কেজিতে ৬১ মিলিগ্রাম) ও সেলেনিয়াম (কেজিতে ৩২৫ মাইক্রোগ্রাম) বেশি। দীর্ঘমেয়াদি ধান কাটার পর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্তও এটি বোনা যায়। ২০১৮ সালে অবমুক্ত বারি মসুর-৯ দেশের প্রথম অতি আগাম মসুর: ৯৩ দিনের কম সময়ে পাকে বলে বর্ষার আমন ধান ও বসন্তের বোরো ধানের মাঝের স্বল্প পতিত সময়ে এটি চাষ করা যায়; গড় ফলন হেক্টরে ১ হাজার ২০১ কেজি, বীজে আয়রন ও জিংক কেজিতে যথাক্রমে ৭৩ ও ৬১ মিলিগ্রাম। জাতটির উদ্ভাবকেরা লিখেছেন, আমন ধান, মসুর ও বোরো ধানের এই ফসলচক্র বাংলাদেশ, পূর্ব ভারত ও পূর্ব নেপালের প্রায় ৮০ লাখ হেক্টর জমিতে কাজে লাগানো যেতে পারে।

আমদানি এবং চাহিদা ও জোগানের ফারাক


ডালের চাহিদার একটি অংশের জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘদিন আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বারি ও ইকার্ডার পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের শুরুতে দেশে উৎপাদিত ডাল চাহিদার অর্ধেকও মেটাতে পারত না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০০২ সালের তথ্য অনুযায়ী বছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টন ডাল আমদানি হতো, যার খরচ প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ মার্কিন ডলার; এর মধ্যে মসুরের পেছনেই যেত ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার, যা কেনা হতো মূলত অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, তুরস্ক ও কানাডা থেকে। পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, সে সময় বাংলাদেশের মানুষ দিনে মাথাপিছু প্রায় ১২ গ্রাম ডাল খেতেন, যা এফএও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৪৫ গ্রামের চেয়ে অনেক কম।

দেশে ফলন বাড়ায় এই খরচ কমেছে। পিএলওএস ওয়ানের গবেষণার হিসাবে উন্নত জাতগুলো দেশে মসুরের জোগান প্রায় ৮ হাজার ২৫৯ টন বাড়িয়েছে এবং ২০১৫ সালে আমদানি করা মসুরের গড় দাম টনপ্রতি ৮৬৫ ডলার ধরে দেশের প্রায় ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেছে। গবেষকদের উপসংহার ছিল, বাংলাদেশ নতুন জাতগুলোর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগাতে পারেনি, এগুলোর বিস্তার ঘটালে আমদানিনির্ভরতা আরও কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে মসুর কেনে, সেগুলো বিশ্বের বড় উৎপাদকদের মধ্যে। এফএওর পরিসংখ্যান ভান্ডার ফাওস্ট্যাট অনুযায়ী ২০২৩ সালে বিশ্বে শুকনো মসুর উৎপাদন হয় ৭০ লাখ ৬৮ হাজার টন। শীর্ষে ছিল অস্ট্রেলিয়া (১৮ লাখ ৪১ হাজার টন), কানাডা (১৬ লাখ ৭১ হাজার টন) ও ভারত (১৫ লাখ ৫৯ হাজার টন); এই তিন দেশ মিলে মোট উৎপাদনের ৭২ শতাংশ করে। এরপর ছিল তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও নেপাল।

ঢাকার তোপখানা রোডের একটি সুপারশপে বিক্রির জন্য রাখা ডাল ও চাল, নভেম্বর ২০১৭। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার তোপখানা রোডের একটি সুপারশপে বিক্রির জন্য রাখা ডাল ও চাল, নভেম্বর ২০১৭। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ঝিঙে: গরমের সবজি


ঝিঙে বা ঝিঙা (Luffa acutangula) লাউ-কুমড়া গোত্রের (Cucurbitaceae) একটি লতানো উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া একে কুমড়াজাতীয় একটি অপ্রধান সবজি বলে বর্ণনা করেছে, যার আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং যা শর্করা ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ। চাষের উপযুক্ত সময় মার্চ থেকে এপ্রিল, আর প্রায় ছয় সপ্তাহ পরেই কচি ফল তোলা যায়। ফল সাধারণত রান্না করে বা ভেজে খাওয়া হয়, ছোট ফল কখনো কখনো আচার করা হয়। গ্রামবাংলায় লাউ-কুমড়াজাতীয় সবজি বেশির ভাগই বসতবাড়ির আঙিনায় বাঁশের মাচায় বা ঘরের চালে জন্মানো হয়।

আফ্রিকার উদ্ভিদসম্পদ বিষয়ক হ্যান্ডবুক প্রোটা (২০০৪) জানায়, ঝিঙের উৎপত্তি ভারতে বলে মনে করা হয়, সেখানে এখনো বুনো ঝিঙে দেখা যায়; এখন গ্রীষ্মমণ্ডলের সব বৃষ্টিবহুল এলাকায় এটি ছড়িয়ে পড়েছে। এটি একবর্ষজীবী লতা; কাণ্ড পাঁচ কোনা, পাতা খাঁজকাটা, ফুল হালকা হলুদ। ফল মুগুরের মতো, ১৫ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা, গায়ে দশটি ধারালো শিরা বা খাঁজ, ইংরেজি নাম 'রিজ গার্ড' এসেছে সেখান থেকেই। কম তেতো জাতের কেবল কচি ফলই রান্না করে বা ভেজে খাওয়া হয়। গাছে রেখে দিলে ফল শুকিয়ে আঁশযুক্ত স্পঞ্জে পরিণত হয়, তবে স্পঞ্জ তৈরিতে মসৃণ ধুন্দুলই (Luffa aegyptiaca) বেশি পছন্দ করা হয়, কারণ এর আঁশ সহজে বের করা যায়।

প্রোটার বর্ণনা অনুযায়ী চাষের সময় সারা রাত ভিজিয়ে রাখা বীজ চার থেকে সাত দিনে গজায়, আর বপনের ছয় থেকে দশ সপ্তাহ পরে ফুল আসে; আগে আসে পুরুষ ফুল, পুরুষ ফুলের সংখ্যাও স্ত্রী ফুলের চেয়ে অনেক বেশি; মৌমাছি, প্রজাপতি ও মথ পরাগায়ন ঘটায়। কুমড়াজাতীয় অনেক ফসলের বিপরীতে ঝিঙে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিচু এলাকায় ভালো হয়। এটি জৈব পদার্থসমৃদ্ধ, পানি সহজে নেমে যায় এমন মাটি পছন্দ করে, যার পিএইচ ৬.৫ থেকে ৭.৫; তুষারপাত সহ্য করে না। সাধারণত মাচা বা খুঁটির ওপর তুলে দেওয়া হয়, কারণ ভেজা মাটিতে পড়ে থাকা ফল সহজে পচে যায়, আর ফুল ও ফল ধরার সময় ভারী বৃষ্টি হলে ফল পচা দেখা দেয়। ফল ধরার ১২ থেকে ১৫ দিন পরে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের কচি ফল তোলা হয়, মৌসুমজুড়ে প্রতি তিন দিন পরপর; একটি গাছে ১৫ থেকে ২০টি ফল হতে পারে, স্থানীয় জাতে হেক্টরে ফলন ১০ থেকে ১৫ টন। প্রোটা পাউডারি মিলডিউ ও ডাউনি মিলডিউ রোগ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফলের মাছির কীড়া, থ্রিপস, শুঁয়োপোকা, পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা ও জাবপোকাকে এর সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে; এসব দমনের পরামর্শের জন্য কৃষকদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। কচি ফল সহজে থেঁতলে যায় এবং ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ ভালো থাকে।

ভারতের তামিলনাড়ুর সালেম জেলার ইয়েরকাডে লতায় ঝুলে থাকা ঝিঙে (Luffa acutangula)। ছবি: Yercaud-elango / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ভারতের তামিলনাড়ুর সালেম জেলার ইয়েরকাডে লতায় ঝুলে থাকা ঝিঙে (Luffa acutangula)। ছবি: Yercaud-elango / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দুই উপাদানের পুষ্টিমান


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট খাদ্য মন্ত্রণালয় ও এফএওর সহায়তায় ২০১৩ সালের জুনে 'ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ' প্রকাশ করে। এতে খাওয়ার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রামের হিসাবে যে মান দেওয়া আছে, তা হলো: শুকনো কাঁচা মসুর ডালে ৩১৭ কিলোক্যালরি, ২৭.৭ গ্রাম প্রোটিন, ০.৮ গ্রাম চর্বি, ৪৩.২ গ্রাম শর্করা ও ১৩.২ গ্রাম খাদ্য আঁশ; সঙ্গে ৫.১ মিলিগ্রাম আয়রন, ৬৩৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৩.৮৯ মিলিগ্রাম জিংক এবং ০.৭৭ মিলিগ্রাম থায়ামিন (ভিটামিন বি১)। লবণ ছাড়া সেদ্ধ মসুর ডালের ১০০ গ্রামে থাকে ১৫৫ কিলোক্যালরি, ১৩.৬ গ্রাম প্রোটিন, ৬.৫ গ্রাম আঁশ ও ২.২ মিলিগ্রাম আয়রন, কারণ সেদ্ধ করার সময় ডাল পানি শুষে নেয়।

কাঁচা ঝিঙের বেশির ভাগই পানি, প্রতি ১০০ গ্রামে ৯২.৪ গ্রাম, আর এটি হালকা: ২৯ কিলোক্যালরি, ১.৩ গ্রাম প্রোটিন, ০.৪ গ্রাম চর্বি, ৪.৬ গ্রাম শর্করা ও ১.১ গ্রাম আঁশ; সঙ্গে ২১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.৩ মিলিগ্রাম আয়রন, ১৩৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ৪.৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। তালিকাটি ঝিঙের ৮২ শতাংশকে খাওয়ার উপযোগী ধরে, বাকিটা খোসা ও দুই প্রান্ত। হাঁড়ির অন্য উপকরণগুলো শক্তি খুব একটা না বাড়ালেও কিছু ভিটামিন সি যোগ করে: প্রতি ১০০ গ্রামে পাকা টমেটোয় ১২.৩ মিলিগ্রাম, কাঁচামরিচে ১০২.৩ মিলিগ্রাম এবং ধনেপাতায় ১০৫.৭ মিলিগ্রাম; ধনেপাতায় বিটা-ক্যারোটিনও আছে ১ হাজার ৫৯০ মাইক্রোগ্রাম।

ভাত আর ডাল কেন একসঙ্গে মানায়, তালিকাটিতে তারও ব্যাখ্যা আছে। এতে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ দানাশস্যের চেয়ে ডালে দুই থেকে তিন গুণ বেশি প্রোটিন থাকে; তবে ডালের প্রোটিনে মিথিওনিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড কম, লাইসিন বেশি, তাই এটি দানাশস্যের প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করে। দুটির মিশ্রণের প্রোটিনের মান আলাদাভাবে যেকোনোটির চেয়ে ভালো, আর সবচেয়ে কার্যকর অনুপাত হলো মোটামুটি ৮ ভাগ দানাশস্যের সঙ্গে ১ ভাগ ডাল। তালিকায় মসুর ডালকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি খাওয়া ডাল এবং গ্রামের মানুষের প্রোটিনের সবচেয়ে সাধারণ উৎসগুলোর একটি বলা হয়েছে। রান্নায় কিছু ভিটামিন নষ্টও হয়: তালিকার পুষ্টি সংরক্ষণ হার অনুযায়ী সেদ্ধ ডালের পদে কাঁচা উপকরণের ভিটামিন সি-র ৬০ শতাংশ এবং ফোলেটের ৫০ শতাংশ টিকে থাকে।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব ডাল দিবস উপলক্ষে এফএও ডাল নিয়ে যে নির্দেশনা প্রকাশ করে, তাতেও একই ধরনের কথা আছে। ডালে স্বাভাবিকভাবেই চর্বি ও সোডিয়াম কম, কোলেস্টেরল নেই; এতে আঁশ, পটাশিয়াম ও ফোলেট বেশি এবং এটি আয়রনের ভালো উৎস। ১০০ গ্রাম শুকনো মসুরে প্রায় ২৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে, রান্নার সময় পানি শুষে নেওয়ায় যা প্রায় ৮ শতাংশে নেমে আসে; তবে খাবারে দানাশস্যের সঙ্গে মিলিয়ে খেলে, এফএওর ভাষায় 'যেমন ভাতের সঙ্গে মসুর', ডালের প্রোটিনের মান বাড়ে। ডালের আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষণের জন্য এফএও ভিটামিন সি আছে এমন খাবারের সঙ্গে ডাল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যেমন মসুরের তরকারিতে লেবুর রস। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা বিশেষ খাদ্যাভ্যাস দরকার এমন কোনো অসুস্থতা থাকলে কতটা ডাল, লবণ ও তেল খাওয়া উচিত, তা চিকিৎসক বা স্বীকৃত পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

জাতীয় খাদ্য নির্দেশিকা ও বিশ্ব ডাল দিবসে ডাল


বাংলাদেশের খাদ্য নির্দেশিকা প্রথম প্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ, ২০০০ সালে; ২০১৩ সালে তা হালনাগাদ করে বারডেম (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিসঅর্ডারস), এফএও এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তায়। নির্দেশিকায় পাঁচ স্তরের একটি খাদ্য পিরামিড ব্যবহার করা হয়েছে: সবচেয়ে নিচে ভাত, রুটি ও অন্যান্য দানাশস্য, যা পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া যায়; দ্বিতীয় স্তরে শাকসবজি ও ফল, এগুলোও পর্যাপ্ত খাওয়া যায়; এরপর মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল এবং তার ওপরে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, সবই পরিমিত পরিমাণে; আর চূড়ায় চর্বি, তেল ও চিনি, যা খেতে হবে খুব কম। নির্দেশিকার বার্তাগুলোর মধ্যে আছে প্রতি বেলায় নানা ধরনের খাবার খাওয়া, তেল ও চর্বি পরিমিত খাওয়া, লবণ কম খাওয়া ও কেবল আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা এবং সঠিকভাবে রান্না করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা।

আন্তর্জাতিকভাবে ডালের জন্য আলাদা একটি দিবসও আছে। ২০১৬ সালে এফএওর পালন করা আন্তর্জাতিক ডাল বর্ষের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১০ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব ডাল দিবস ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি এফএও সে বছরের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে: 'বিশ্বের ডাল: সাধারণ থেকে অসাধারণ' (Pulses of the world: from modesty to excellence)। সংস্থাটি জানায়, উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশেই মাথাপিছু ডাল খাওয়া কমেছে, আর কয়েকটি সমাজে, বিশেষ করে শহরে, ডালকে এখনো কম দামের খাবার বা গ্রামের রান্না হিসেবে দেখা হয়; সাধারণ উৎস থেকে স্বাদ, পুষ্টি ও রান্নার বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতির দিকে এই পরিবর্তন তুলে ধরতেই প্রতিপাদ্যটি বেছে নেওয়া হয়।

২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্পেনের ভায়াদোলিদে দিবসটির বৈশ্বিক আয়োজন হয়, যেখানে সরকারি প্রতিনিধি, রন্ধনশিল্পী ও বিশেষজ্ঞেরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এফএওর মহাপরিচালক কু তংইয়ু বলেন, এবারের প্রতিপাদ্য 'ডালের মূল্য নতুন করে ভাবতে এবং ডাল যে বহুমুখী, পুষ্টিঘন খাবার, তা স্বীকার করতে আমাদের আহ্বান জানায়'। এফএওর উদ্ভিদ উৎপাদন ও সুরক্ষা বিভাগের পরিচালক ইউর্দি ইয়াসমি যোগ করেন, 'ডাল প্রোটিন ও অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানের একটি সাশ্রয়ী উৎস, একই সঙ্গে তা মাটির স্বাস্থ্য ভালো করে এবং আরও সহনশীল কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা গড়তে সহায়তা করে'।

ছবি: Bellayet / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ (পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এফএও), বারি ও ইকার্ডার পর্যালোচনা 'লেন্টিল ইমপ্রুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ' (এপিএএআরআই, ২০০৪), পিএলওএস ওয়ান, জার্নাল অব প্ল্যান্ট রেজিস্ট্রেশনস (ইকার্ডা ও সিজিআইএআর), প্রোটা৪ইউ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ফাওস্ট্যাট (উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে), বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো (ই-বাংলা লাইব্রেরির মাধ্যমে)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)