ইলিশের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ খুঁজতে সমীক্ষা চালিয়ে ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে সংস্থাটি আকার ও ওজন অনুযায়ী ইলিশের সর্বোচ্চ খুচরা দাম বেঁধে দেওয়ার সুপারিশ করে। প্রতিবেদনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো হয়।
ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। মাছটি উপকূলের সাগরে বড় হয় এবং ডিম ছাড়তে নদীতে উঠে আসে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টন ইলিশ আহরণ হয়; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন।

এক বছরে ওজনভেদে দাম কতটা বেড়েছিল
কমিশনের হিসাবে, ২০২৫ সালের আগস্টে দেড় কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের কেজি ছিল ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। এক থেকে দেড় কেজির ইলিশ বিক্রি হয় গড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে, ৭৫০ গ্রাম থেকে এক কেজির ইলিশ ১ হাজার ৫০০ টাকায় এবং আধা কেজি থেকে ৭৫০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
এক বছর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে, একই আকারের ইলিশের কেজি ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা এবং ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কমিশনের মাসভিত্তিক হিসাবও উঠে আসে। ২০২৫ সালের জুনে বাজারে ইলিশের কেজি ছিল ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, জুলাইয়ে ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা, আগস্টে সরবরাহ বাড়ায় ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং সেপ্টেম্বরে আবার ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। কমিশনের হিসাবে আগের পাঁচ বছরে স্থানীয় বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছিল ৫৭ শতাংশ।
রপ্তানি দাম ও আহরণ খরচের ফারাক
কমিশন জানায়, দেশের বাজারে কেজিপ্রতি ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে ইলিশ বিক্রি হলেও সে বছর ভারতে রপ্তানি হচ্ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৩৩ টাকা কেজি দরে। ২০২৫ সালে তখন পর্যন্ত ভারতে রপ্তানি হয় ৯৭ দশমিক ৩৬ টন ইলিশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানির গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ৯৪৭ টাকা। কমিশনের যুক্তি, রপ্তানির দামে ব্যবসায়ীরা লাভ করতে পারলে দেশের বাজারের দামে তাঁরা আহরণ খরচের তুলনায় অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন।
জেলেরা ছোট, মাঝারি ও বড়, এই তিন ধরনের নৌকায় ইলিশ ধরেন। কমিশনের হিসাবে প্রতি কেজি ইলিশ ধরতে ছোট নৌকায় মোট খরচ পড়ে ৮১৩ টাকা, মাঝারি নৌকায় ৮৪৭ টাকা এবং বড় নৌকায় ৮২৮ টাকা। সাধারণত চার থেকে ছয়বার হাতবদল হয়ে ইলিশ ক্রেতার কাছে পৌঁছায় এবং প্রতিটি স্তরে দাম ৫৯ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এতে জেলেরা প্রথম ধাপেই ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন, আর বাড়তি দামের ভার শেষ পর্যন্ত বইতে হয় ভোক্তাকে।

দাম বাড়ার ১১টি কারণ
সমীক্ষায় ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে ১১টি কারণ চিহ্নিত করা হয়:
- চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা
- মজুত ও সিন্ডিকেট
- জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি
- মাছ ধরার খরচ বৃদ্ধি
- নদীর নাব্যতা সংকট ও পরিবেশগত সমস্যা
- অবৈধ জালের ব্যবহার
- দাদন (আগাম ঋণ)
- বিকল্প কর্মসংস্থান
- নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা
- মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
- রপ্তানির চাপ
প্রতিবেদনে বলা হয়, চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় অবৈধভাবে ইলিশ মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন।
ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, "তিন কেজি গরুর মাংসের দামে এখন এক কেজি ইলিশ মাছ কিনতে হচ্ছে। একসময় এক কেজি গরুর মাংসের দামে তিন কেজি ইলিশ মাছ কেনা যেত।" তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ইলিশ প্রায় শতভাগ দেশীয় পণ্য এবং এর আহরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা ডলারের ওঠানামার তেমন প্রভাব নেই; তবু বাজারে এর দামের পেছনে কৃত্রিমতা রয়েছে। সমীক্ষায় মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয় আহরণের পরের নানা স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী ও তাঁদের অতিরিক্ত মুনাফা। তাঁর মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দাদন ব্যবসায়ীদের কারসাজির।

কমিশনের সুপারিশ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো ইলিশের খরচ বিশ্লেষণ করে আকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ। মইনুল খানের ভাষ্য, এতে প্রান্তিক বিক্রেতা ন্যায্য দাম পাবেন এবং ভোক্তা নির্ধারিত দামে ইলিশ কিনতে পারবেন। এর পাশাপাশি কমিশন যেসব সুপারিশ করে:
- হাতবদলের স্তর কমানো এবং দাদন ব্যবসায়ীদের নজরদারিতে আনা
- পাইকার বা আড়তদারের কাছে সরাসরি মাছ বিক্রির জন্য জেলেদের সমবায় সমিতি গঠন
- সরবরাহ চেইনের ধাপ কমাতে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি
- প্রধান শহরগুলোতে সরকারি উদ্যোগে ইলিশের বিশেষ বিপণন কেন্দ্র স্থাপন
- কোল্ড স্টোরেজ তৈরি
- সব আড়তদার ও পাইকারের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও লাইসেন্স
- সরবরাহের প্রতিটি ধাপে যৌক্তিক মুনাফা বেঁধে দেওয়া
- দাদনের দৌরাত্ম্য কমাতে জেলেদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ
ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)