টুথপেস্টের পর এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সামনে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বাজারের সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭.৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত হয়। নিত্যদিনের খাবারে এমন কণার খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে বোঝায় প্লাস্টিকের এমন যেকোনো কণা, যার প্রস্থ এক ন্যানোমিটার থেকে পাঁচ মিলিমিটারের মধ্যে।
ঢাকার ৬০টি নমুনায় লিটারে গড়ে ৫৩ হাজারের বেশি কণা
গবেষকরা ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে এক লিটার করে মোট ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মেলে। খোলা তেলে লিটারে গড় ছিল ৫৯ হাজার ৭৭৮টি, বোতলজাত তেলে ৪৮ হাজার ৬৭টি। সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া যায় তেজগাঁওয়ের খোলা তেলে, লিটারে ৭০ হাজার ৪৬৭টি কণা।
শরীরে কত কণা যেতে পারে, তা হিসাব করতে গবেষকরা দৈনিক তেল খাওয়ার পরিমাণ এবং প্রাপ্তবয়স্কের গড় ওজন ৭০ কেজি ও শিশুর ১৬ কেজি ধরেছেন। শরীরের ওজন কম বলে শিশুর ক্ষেত্রে হিসাবটি অনেক বড়: দিনে গড়ে ৭৭.২১টি, বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা। তবে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়, এগুলো তেল খাওয়ার অনুমিত পরিমাণ, ওজন ও গড় আয়ুর ভিত্তিতে করা মডেলনির্ভর হিসাব; মানুষের শরীরের ভেতরে কণা গুনে পাওয়া সরাসরি পরিমাপ নয়।

কণা আসছে কোথা থেকে
তেলের নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়: লো-ডেনসিটি ও হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট, পলিইউরেথেন ও নাইলন। পাওয়া কণার ৮২.৫ শতাংশই ছিল আঁশ বা তন্তু, আর ৫৬.২৯ শতাংশ ছিল স্বচ্ছ। গবেষক দলের প্রধান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেকের মতে, শিল্পকারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার কাছাকাছি অবস্থান এবং খোলা তেল রাখতে একই পাত্র বারবার ব্যবহারের কারণে খোলা তেলে কণা বেশি। বোতলজাত তেলও পাইপ, সিল ও ফিল্টারের সংস্পর্শে দূষিত হতে পারে।
খাবারে কণা ঢোকার তিনটি পথ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা: প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা থেকে সরাসরি; কারখানার মেশিন, পাইপ ও কনভেয়ার বেল্ট ক্ষয়ে গিয়ে; আর পরিবেশে ফেলা প্লাস্টিক ভেঙে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার অর্ধেকের বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না।

দুধ ও চিনিতেও প্লাস্টিক কণা
একই সময়ে আরও দুটি পৃথক গবেষণার তথ্য সামনে আসে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একটি গবেষক দল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কাঁচা দুধ ও সুপারশপের প্রক্রিয়াজাত দুধ পরীক্ষা করে দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পায়, প্রক্রিয়াজাত দুধে বেশি। কণাগুলোর বেশির ভাগ ছিল স্বচ্ছ ও আঁশের মতো; শনাক্ত হয় পিটিএফই বা টেফলন, পিইটি ও নাইলন-৬সহ কয়েকটি পলিমার। গবেষকদের মতে, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা দুধের ওপর বেশি নির্ভর করে বলে তাদের ঝুঁকিও বেশি।
চিনির গবেষণায় ঢাকার খুচরা বাজার থেকে সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনি পরীক্ষা করা হয়। ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে গড়ে ৪০৩টি কণা মেলে; পরিসংখ্যানের দিক থেকে পার্থক্য উল্লেখযোগ্য না হলেও খোলা চিনিতে দূষণ কিছুটা বেশি ছিল। কণার আকার ছিল ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩.১৯ মিলিমিটার। এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) বাজারের ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পায়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যা জানা, আর করণীয়
কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের কোন অঙ্গে কী প্রভাব ফেলে, তার বিস্তারিত গবেষণা তখনও হয়নি বলে জানান বিজ্ঞানীরা। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ধারণা, ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণা রক্তে মিশে যেতে পারে, যা থেকে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। অধ্যাপক শফি মুহাম্মদ তারেক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মাইক্রোপ্লাস্টিকের যে মাত্রা পাওয়া গেছে সেটি ভয়াবহ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং কীভাবে এটি কমানো যায় তাও ভাবা দরকার।"
গবেষকরা তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মোড়কজাতের প্রতিটি ধাপে নজরদারি, খাদ্যোপযোগী মানসম্মত ফিল্টার ব্যবহার এবং খোলা তেল বিক্রিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার পণ্য এমনভাবে নতুন করে নকশা করার কথা বলেন, যাতে তাতে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক ফাইবার কম থাকে এবং ব্যবহারের শেষে তা পরিবেশে না ছড়ায়; পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক বন্ধেরও পরামর্শ দেন তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানায় এবং বলে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ডকে অনিরাপদ বলা ঠিক হবে না।
ছবি: המבורגר1987 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, মেডিভয়েস




মন্তব্য
(০)