২০২৬ সালের জুনে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস নেপালের বিশিষ্টজনদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই সনদপ্রাপ্ত ক্ষীরশাপাত আম উপহার হিসেবে বিতরণ করে। দূতাবাসের বার্ষিক 'সিজনস বেস্ট কমপ্লিমেন্টস' উদ্যোগের আওতায় ১ হাজার ৭৫০ কেজির বেশি আম পৌঁছে দেওয়া হয় ৩৬০ জনের বেশি প্রাপকের কাছে। প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন নেপালের রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ১২ জুন, শুক্রবার রাতে এ তথ্য জানান।
দূতাবাস এই উপহারকে শুভেচ্ছা ও সৌহার্দ্যের কূটনৈতিক নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করে। দূতাবাস নিজেই নেপালে এই উদ্যোগকে 'ম্যাংগো ডিপ্লোমেসি' বা আম কূটনীতি নামে উল্লেখ করে।
কারা পেলেন এই উপহার
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উন্নত মানের এই বাংলাদেশি আম পাঠানো হয় নেপালের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, কাঠমান্ডুতে কর্মরত রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক কোরের সদস্য, ব্যবসায়ী নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ ও এর জনগণের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে। দূতাবাসের একটি দল আমের প্যাকেটগুলো প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেয়।
দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটি বাংলাদেশ ও নেপালের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব এবং দুই দেশের মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিফলন। দূতাবাস উপহারটিকে উষ্ণতা, সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে, যা দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে বলে তাদের প্রত্যাশা। নেপালে আম কূটনীতির এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে যাঁরা সহায়তা করেছেন, দূতাবাস তাঁদের সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কাঠমান্ডু: আম গেল যে পথে
আমগুলো সদ্য পাড়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুটি বাগান থেকে; জেলাটি দেশের আমের রাজধানী নামে পরিচিত। গুণগত মান ও সতেজতা ধরে রাখতে চালানটি সড়কপথে তিনটি সীমান্ত পয়েন্ট পেরিয়ে কাঠমান্ডু পৌঁছায়: বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ফুলবাড়ি স্থলবন্দর (শিলিগুড়ি সীমান্ত) এবং নেপালের কাকরভিটা সীমান্ত।
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে সরাসরি কোনো স্থলসীমান্ত নেই। দুই দেশের মাঝখানে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সরু ভূখণ্ড শিলিগুড়ি করিডোর, যা 'চিকেনস নেক' নামেও পরিচিত। তাই বাংলাদেশের কোনো পণ্য সড়কপথে নেপালে নিতে হলে ভারতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকাশনার বরাতে বিশ্বকোষীয় সূত্রে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ফুলবাড়ি চুক্তি ভারতের একটি ট্রানজিট পথ দিয়ে নেপালি পণ্যের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাবান্ধা দেশের সর্ব উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবস্থিত একটি স্থলবন্দর। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য যোগাযোগের লক্ষ্যে এটি গড়ে তোলা হয়। স্থলবন্দর হওয়ার আগে এটি ছিল একটি স্থল শুল্ক স্টেশন। বিশ্বকোষীয় তথ্য অনুযায়ী, বন্দরটিকে দেশের প্রথম 'রপ্তানিমুখী' স্থলবন্দর হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়, কারণ দেশের অন্য স্থলবন্দরগুলো মূলত ভারত থেকে আমদানির কাজে ব্যবহৃত হয়। বন্দরটি পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ৫৭ কিলোমিটার উত্তরে; এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০০৪ সালের মে মাসে।
বাংলাবান্ধার ঠিক ওপারে ভারতের দিকে ফুলবাড়ি। এই দুই পয়েন্টের মধ্যে যানবাহন পারাপার উদ্বোধন হয় ২০১১ সালের জানুয়ারিতে; তার আগে ১৯৯৭ সাল থেকে সীমিত পরিসরে এ পথে নেপাল-বাংলাদেশ ট্রানজিট চলত। পণ্যবোঝাই ট্রাক সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশের গুদামে মাল খালাস করে। বাংলাবান্ধা থেকে নেপাল সীমান্তের কাকরভিটার দূরত্ব প্রায় ৬১ কিলোমিটার।

কাকরভিটা (কাঁকড়ভিট্টা নামেও লেখা হয়) নেপালের কোশি প্রদেশের ঝাপা জেলার মেচিনগর পৌরসভার একটি এলাকা। এটি নেপালের পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়ক মহেন্দ্র রাজপথের পূর্ব প্রান্ত, যার ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা। এখানে শুল্ক বিভাগ এবং তৃতীয় দেশের নাগরিকদের জন্য সীমান্ত চেকপোস্ট রয়েছে; নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত পারাপারের যান চলাচল এই পথেই হয়। কাকরভিটা থেকে নেপালের ভদ্রপুর বিমানবন্দর প্রায় ২১ কিলোমিটার এবং ভারতের বাগডোগরা বিমানবন্দর প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার দূরে।

ক্ষীরশাপাত: কেমন আম
উপহারে পাঠানো জাতটি ক্ষীরশাপাত, যা ক্ষীরশাপাতি নামেও পরিচিত। দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে একে দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে সুস্বাদু আমগুলোর একটি বলা হয়। বাংলাপিডিয়া দেশের উৎকৃষ্ট জাতের তালিকায় ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগসহ বিভিন্ন জাতের নাম দিয়েছে এবং জানিয়েছে, এসব উৎকৃষ্ট জাত মূলত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে জন্মে।
নদী ও স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী ২০১৯ সালের জুনে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক লেখায় ক্ষীরশাপাতির বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এটি আগাম বা আশু জাতের আম। জুনের শুরু থেকে পাকতে শুরু করে এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাজারে থাকে, তবে ৭ থেকে ৩০ জুন এর আসল সময়। মুকুল আসার পর আমটি পোক্ত হতে মোট চার মাস লাগে।
একই লেখায় বলা হয়, আমটি মাঝারি আকারের, দেখতে অনেকটা গোলাকার, গড় ওজন ২৬৩ গ্রাম। বোঁটা মোটা ও শক্ত, ত্বক মসৃণ, আর পাকলে বোঁটার আশপাশ হলুদ রঙ ধারণ করে। শাঁস আঁশবিহীন ও হলুদাভ; খাবার উপযোগী অংশ শতকরা ৬৭ দশমিক ২ ভাগ এবং মিষ্টতা ১৯ শতাংশ। আঁটি পাতলা। গাছ থেকে নামানোর পর আমটি ছয় থেকে আট দিন ঘরে রাখা যায়। অনেক উচ্চমানের জাত গাছপাকা অবস্থায় টক থাকে এবং কয়েক দিন ঘরে রাখার পর মিষ্টি হয়, কিন্তু ক্ষীরশাপাতি গাছপাকা অবস্থাতেই কেটে খাওয়া যায়।
লেখকের ভাষ্যে, জাতটির ফলন খুব ভালো, তবে এটি অনিয়মিত: প্রতিবছর ফল আসে না, কিন্তু যে বছর আসে সে বছর গাছ ভরে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সর্বত্র, বিশেষ করে শিবগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষীরশাপাতির চাষ হয়; এর পরে রয়েছে রাজশাহী। এ ছাড়া নাটোর, দিনাজপুর, বগুড়া, নওগাঁ, পাবনা ও সাতক্ষীরায়ও এর আবাদ আছে। ক্ষুদিক্ষীরশা নামে এর একটি কাছাকাছি জাতও রয়েছে, যা ওজনে সামান্য কম এবং রঙে কালচে সবুজ।
হিমসাগর ও ক্ষীরশাপাতির স্বাদ ও চেহারা প্রায় একই রকম। মাহবুব সিদ্দিকীর লেখায় বলা হয়, হিমসাগরের উৎপাদন কম হওয়ায় ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও বরিশালের বাজারে অনেক সময় ক্ষীরশাপাতি হিমসাগর নামে বিক্রি হয়। দুটিকে আলাদা করার উপায় রঙ: পাকার পর ক্ষীরশাপাতির ওপরের অংশ হলুদ হয়, আর হিমসাগর পাকার পরও সবুজাভ হালকা হলুদ থাকে। ২০১৯ সালে জিআই সনদের খবরে দ্য ডেইলি অবজারভারও লিখেছিল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাত হিমসাগর নামে জনপ্রিয়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিমসাগর নামে পরিচিত আমটিও আঁশবিহীন ও মাঝারি আকারের। বিশ্বকোষীয় সূত্রে এর আরেক নাম হিসেবে ক্ষীরসাপাতির উল্লেখ আছে এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া ও হুগলির পাশাপাশি বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জকে এর প্রধান চাষ এলাকা বলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের হিমসাগর ভারতের জিআই সূচিতে আলাদাভাবে নিবন্ধিত।

জিআই সনদ ও এর আইনি ভিত্তি
ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই এমন একটি নাম বা চিহ্ন, যা কোনো পণ্যকে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক উৎসের সঙ্গে যুক্ত করে। নিবন্ধনের পর ওই এলাকার অনুমোদিত উৎপাদকেরাই পণ্যের জনপ্রিয় নামটি ব্যবহারের অধিকার পান। বাংলাদেশে এর আইনি ভিত্তি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩, যা ২০১৩ সালের ৫৪ নম্বর আইন হিসেবে ১০ নভেম্বর ২০১৩ গৃহীত হয়।
বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার (ডব্লিউআইপিও) আইন সংগ্রহশালার সারাংশ অনুযায়ী, আইনটি পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে (ডিপিডিটি) একটি জিআই ইউনিট গঠন করে। উৎপাদকদের প্রতিনিধিত্বকারী সমিতি ও সরকারি সংস্থা নিবন্ধনের আবেদন করতে পারে; আবেদন যাচাই ও প্রকাশের পর আপত্তি জানানোর সময় থাকে। নিবন্ধিত অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা লঙ্ঘনের প্রতিকার চেয়ে জেলা আদালতে যেতে পারেন। জিআই জাল করা বা মিথ্যাভাবে ব্যবহার করা অপরাধ, যার সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা। সাধারণ নাম বা বিভ্রান্তিকর নাম জিআই হিসেবে নিবন্ধন করা যায় না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাত দেশের তৃতীয় জিআই পণ্য। দ্য ডেইলি অবজারভারের খবর অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার হাতে এর জিআই সনদ তুলে দেওয়া হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের পক্ষে বারি এই সনদের আবেদন করেছিল। এর আগে জামদানি প্রথম এবং ইলিশ দ্বিতীয় জিআই পণ্য হিসেবে সনদ পায়।
সে সময়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষীরশাপাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবচেয়ে সুস্বাদু আম, জাতটি রপ্তানি তালিকার শীর্ষে এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। জিআই তালিকায় পরে আরও আম যুক্ত হয়: ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম জিআই সনদ পায়।
আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের এই জেলার আয়তন ১৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা। জেলাটি বরেন্দ্র ভূমি, দিয়ারা ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত; প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও পাগলা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নবাবগঞ্জ ছিল মালদহ জেলার একটি থানা; দেশভাগের সময় এটি রাজশাহী জেলার মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়।
জেলার পাঁচটি উপজেলা হলো সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও নাচোল। এর মধ্যে শিবগঞ্জ সবচেয়ে বড়, ৫২৫.৪৩ বর্গকিলোমিটার, যা জেলার আয়তনের ৩০.৮৬ শতাংশ; সবচেয়ে ছোট ভোলাহাট, ১২৩.৫২ বর্গকিলোমিটার। জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট।
বারির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধীনে ১৯৮৫ সালে নবাবগঞ্জে আম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রায় ১২.৪০ হেক্টর জায়গাজুড়ে কেন্দ্রটির বাগান, গবেষণাগার, অফিস ও আবাসিক ভবন রয়েছে; সেখানে প্রায় ৬৫টি জাতের ৩০০-এর বেশি আমগাছ আছে। আম চাষ, জাত উন্নয়ন ও উৎপাদনের সব দিক নিয়ে গবেষণা কেন্দ্রটির মূল লক্ষ্য।
২০২৬ সালের মৌসুমের শুরুতে জেলার আমবাগানে ব্যাপক মুকুল আসে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০ ফেব্রুয়ারি জানায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি মৌসুমে জেলার ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে প্রায় ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি আমগাছ রয়েছে, এবং তখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল।
১৬ মে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সালে জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টনের চেয়ে ৯১২ টন বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা উপপরিচালক বাসসকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ ও ভৌগোলিক কারণে এখানকার আম অন্য জেলার তুলনায় সুস্বাদু, তবে এখানে আম কিছুটা দেরিতে পাকে।
সেবার জেলা প্রশাসন আম পাড়ার কোনো ক্যালেন্ডার বেঁধে দেয়নি। জেলা প্রশাসক বাসসকে জানান, ১১ মে এক মতবিনিময় সভায় চাষিদের সম্মতিতে এ সিদ্ধান্ত হয় এবং গাছে আম পাকলেই বাজারে বিক্রি করা যাবে। ১৪ মে থেকে জেলার কয়েক জায়গায় গুটি ও গোপালভোগ জাতের পাকা আম পাওয়ার খবর আসে। একই প্রতিবেদনে শিবগঞ্জের এক চাষি অভিযোগ করেন, ৪০ কেজিতে এক মণ হওয়ার কথা থাকলেও জায়গাভেদে ৫০ থেকে ৫৫ কেজিতে এক মণ ধরে আম দিতে হয়; জেলা প্রশাসক জানান, ওজন নিয়ে দীর্ঘদিনের এই জটিলতা নিরসনে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

দেশের আম উৎপাদন ও রপ্তানির চিত্র
আম বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয় বলে বিডিনিউজ২৪ সেদিন জানায়; এর আগে দেশের কোনো জাতীয় বৃক্ষ ছিল না।
বাংলাপিডিয়া জানায়, আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা, এটি অ্যানাকার্ডিয়েসি পরিবারের উদ্ভিদ। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, চাষের আমের উৎপত্তি বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে। দেশে প্রায় ১০০টি জাতের আম পাওয়া যায়। এখানকার আম মূলত দুই দলে পড়ে: কলম বা অঙ্গজ উপায়ে বংশবিস্তার করা উৎকৃষ্ট জাত, আর বীজ থেকে জন্মানো স্থানীয় 'দেশি' বা 'গুটি' আম। কলমের গাছে সাধারণত রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, দেশের সেরা আমবাগানগুলোর অনেকগুলো গাঙ্গেয় প্লাবনভূমির গভীর, পলিসমৃদ্ধ দোআঁশ মাটিতে। আমের জন্য মাটির উপযুক্ত পিএইচ ৫.৫ থেকে ৭.৫। জানুয়ারি থেকে মার্চে মুকুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়ায় ফল ধরা ব্যাহত হয়; ফল বড় হওয়ার সময় হালকা বৃষ্টি উপকারী, কিন্তু ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কাঁচা আম ঝরে পড়ে।
২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক ফল-বাণিজ্যের সংবাদমাধ্যম ফ্রেশপ্লাজা ঢাকার ডেইলি সান-এর বরাতে জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালকের হিসাবে আবহাওয়া অনুকূল থাকলে সে মৌসুমে দেশের মোট আম উৎপাদন ২৭ লাখ টন ছাড়াতে পারে, যেখানে আগের বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ ৬০ হাজার টন। দেশে আম চাষ সে মৌসুমে ২ লাখ ৪ হাজার হেক্টরে বিস্তৃত হয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড ২ হাজার ১৯৪ টন আম ২৯টি দেশে রপ্তানি করে। ২০২৬ সালে মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো নতুন বাজার যুক্ত হয়ে রপ্তানি ৩ হাজার টনে পৌঁছানোর আশা করা হয়। আম পাড়া শুরু হয় ৫ মে, চলবে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত; প্রধান উৎপাদক জেলার মধ্যে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও দিনাজপুর। রপ্তানির জন্য আম প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পরিপক্ব অবস্থায় পাড়া হয়, যাতে সংরক্ষণ ও পরিবহনে মান ঠিক থাকে।
আম কূটনীতির ধারাবাহিকতা
মৌসুমি আম উপহার পাঠানো বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন নয়। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লেখে, 'আম কূটনীতি' নামে পরিচিত এই চর্চা আগের সরকারের সময়েও ছিল এবং তা শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রতীক হিসেবে চলে আসছে।
ঢাকা ট্রিবিউন ও ইউএনবির তখনকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ১ হাজার কেজি হাঁড়িভাঙা আম পাঠান, যা ১৪ জুলাই নয়াদিল্লি পৌঁছায়। এর আগে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ৬০টি কার্টনে ৩০০ কেজি হাঁড়িভাঙা আম পাঠানো হয় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অন্য বিশিষ্টজনদের জন্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর ত্রিপুরা রাজ্য সরকারকে মৌসুমি উপহার পাঠায়, আর ত্রিপুরা বিনিময়ে পাঠায় তাদের বিখ্যাত কুইন জাতের আনারস।
ইউএনবি ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই জানায়, সেবার প্রধান উপদেষ্টার উপহারের আম পাঠানো হচ্ছিল দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতাদের কাছে; প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন নেপালের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। ভুটান, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের শীর্ষ নেতারাও তালিকায় ছিলেন, আর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আলাদাভাবে এসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে আম পাঠান। ২০২৬ সালের কাঠমান্ডু উদ্যোগটি ছিল দূতাবাসের নিজস্ব বার্ষিক কর্মসূচি, যার আওতায় রাষ্ট্রীয় পদধারীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও কূটনীতিকেরাও উপহার পান।
বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্কের পটভূমি
যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের নেপালবিষয়ক কান্ট্রি স্টাডি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে প্রথমে নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও নেপাল ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়; ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের দুই দিন পর পাকিস্তান নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। নেপাল বাংলাদেশকে সমুদ্রে পৌঁছানোর একটি স্থায়ী প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখত।
একই সূত্রে বলা হয়, ১৯৭৬ সালের এপ্রিলে দুই দেশ বাণিজ্য, ট্রানজিট, বেসামরিক বিমান চলাচল ও কারিগরি সহযোগিতা বিষয়ে চারটি চুক্তি সই করে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানিসম্পদ উন্নয়নে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার যৌথ ইশতেহার দেয়। ট্রানজিট চুক্তিতে ট্রানজিট পণ্যকে সব শুল্ক ও মাশুল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড দিয়ে নেপালি পণ্য চলাচলের জন্য ছয়টি প্রবেশ ও প্রস্থান পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন ও ব্যবহারের আলোচনায় নেপালকে যুক্ত করার আগ্রহও দেখায় বাংলাদেশ।
দুই দেশই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক), বহুখাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য বঙ্গোপসাগরীয় উদ্যোগ (বিমসটেক) এবং জাতিসংঘের সদস্য। ঢাকায় নেপালের দূতাবাস এবং কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে; এবারের আম উপহারের আয়োজক ছিল কাঠমান্ডুর এই বাংলাদেশ দূতাবাসই।
ছবি: Fozli Mango Pack / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি অবজারভার, ইউএনবি, বাসস, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ২৪, ফ্রেশপ্লাজা, বাংলাপিডিয়া, বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা (ডব্লিউআইপিও লেক্স), লাইব্রেরি অব কংগ্রেস কান্ট্রি স্টাডিজ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)