২০২৪ সালের এপ্রিলের শুরুতে লিচুর জন্য দেশজুড়ে পরিচিত উত্তরের জেলা দিনাজপুরের গাছে গাছে হলুদাভ মুকুলের সমারোহ দেখা দেয়, আর বাম্পার ফলনের আশায় চাষিরা তখন বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল জেলা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে জাগো নিউজ ২৪ জানায়, সেই বসন্তে আবহাওয়া লিচুর উপযোগী থাকায় স্বস্তিতে ছিলেন জেলার বাগান মালিক ও লিচু চাষিরা। এর আগের মৌসুমে, অর্থাৎ ২০২৩ সালে, প্রচণ্ড তাপে তাঁদের ফলের বড় অংশ ঝলসে গিয়েছিল।
মাসিমপুর ও মাধববাটির বাগানে মুকুল
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগের কয়েক দিন পত্রিকাটির প্রতিনিধি দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর, বিরল উপজেলার মাধববাটিসহ বেশ কয়েকটি এলাকার লিচুবাগান ঘুরে দেখেন। গাছগুলো তখন হলুদাভ মুকুলে ছেয়ে গিয়েছিল। চাষিরা গাছের গোড়া আগাছামুক্ত করছিলেন, বাগানে সেচ দিচ্ছিলেন এবং মুকুল রক্ষায় বিভিন্ন জীবাণুনাশক স্প্রে করছিলেন।
মাসিমপুরের লিচু চাষি নজরুল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেন, তিনি দেড় হাজার গাছের দুটি বাগান ৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, 'গত বছর মুকুলের বদলে গাছে সবুজ পাতার সমারোহ ছিল। তার ওপর প্রচণ্ড তাপে লিচু জ্বলে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে। তবে এবার যে হারে মুকুল এসেছে, তাতে যদি খরা বা তাপ বেশি না হয়, তাহলে ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।'
মাধববাটির লিচু চাষি আমজাদ হোসেন জানান, তাঁর দুটি বাগান আছে এবং আগের বছরের তুলনায় এবার মুকুল বেশি এসেছে। ২০২৩ সালে তিনি লোকসান গুনেছিলেন, তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তা পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করছিলেন। তিনি বলেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যে সব গাছে গুটি আসবে, তখন ছত্রাকনাশক দেওয়া হবে। এবার ফলন ভালো হবে বলে তাঁর আশা ছিল।
চাষি ও বাগান মালিকেরা জাগো নিউজকে জানান, জেলাজুড়ে মুকুল সন্তোষজনক এসেছে। যে হারে মুকুল এসেছে, তাতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চাষিদের মুখে হাসি ফুটবে বলে তাঁরা আশা করছিলেন।

কৃষি বিভাগের হিসাব
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) দিনাজপুর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জেলায় ৫ হাজার ৭৮৭ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ১০৭ হেক্টর বেশি। জেলায় লিচুবাগান ছিল ৫ হাজার ৪১৮টি। জেলার ১৩টি উপজেলাতেই লিচুর চাষ হয়, তবে সদর, বিরল ও চিরিরবন্দর উপজেলার লিচুকে সেরা ধরা হয়।
সবচেয়ে বেশি চাষ হয় বিরল উপজেলায়। সেখানে আড়াই হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে লিচু চাষ হয়, ছোট-বড় মিলিয়ে বাগানের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। কৃষি বিভাগ জানায়, সেই মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদন হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, দিনাজপুরের লিচু সুস্বাদু ও রসালো এবং দেশব্যাপী এর চাহিদা আছে। তাঁর ভাষায়, 'গত বছর তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে কিছু গাছের ফসল নষ্ট হয়েছিল। এবার সময়মতো এবং বেশি মুকুল এসেছে।' তিনি জানান, জেলায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা করেন।
তিনি আরও বলেন, সঠিক নিয়মে পানি ও সার ব্যবস্থাপনা লিচুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুকুল ধরে রাখা, গাছ ছত্রাকমুক্ত রাখা এবং পরিমাণমতো অনুখাদ্য ও সার প্রয়োগের বিষয়ে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছিল। তাঁর কথায়, প্রতিটি ইউনিয়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছিলেন, যাতে লিচু চাষি ও বাগানিরা কোনো সমস্যায় না পড়েন।
একই মৌসুমের আরেকটি হিসাব এক সপ্তাহ আগে, ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ, দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং তা জাগো নিউজের সংখ্যার সঙ্গে মেলে না। সেই প্রতিবেদনে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজারের বেশি বাগানের কথা বলা হয়, ডিএই কর্মকর্তারা ৪৫ হাজার টন উৎপাদনের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন বলে জানানো হয়, আর উপপরিচালকের বরাতে ফসলটির বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ধরা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দিনাজপুরে সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি মুকুল আসা শুরু হয়, কিন্তু ২০২৪ সালে কম তাপমাত্রার কারণে কিছুটা দেরিতে, মাসের শেষ দিকে মুকুল আসে; লিচু পাড়া শুরু হওয়ার কথা ছিল মে মাসের শেষে, চলার কথা ছিল প্রায় এক মাস। সেখানে কথা বলা চাষিরা ভালো মুকুলের কারণ হিসেবে সময়মতো বৃষ্টি ও তুলনামূলক কম গরমের কথা বলেন।
২০২৩ সালের তাপের পর নতুন মৌসুম
আগের মৌসুমের অভিজ্ঞতার কারণেই চাষিদের এই স্বস্তি। চাষি ও বাগান মালিকেরা জাগো নিউজকে জানান, বিরূপ আবহাওয়ায় ২০২৩ সালে লিচুর ফলন কমে গিয়েছিল। মাত্রাতিরিক্ত তাপ ও পশ্চিমা উষ্ণ বাতাসের কারণে লিচুতে রং লাগার আগেই অধিকাংশ গাছের ফল ঝলসে যায়। অন্তত ৪০ শতাংশ লিচু ঝলসে যাওয়ায় চাষি ও বাগানিরা লোকসানে পড়েছিলেন।
২০২৩ সালের মৌসুমের প্রতিবেদনগুলোতেও একই সংকটের কথা আছে। ২০২৩ সালের ২৯ মে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছিল, ফেব্রুয়ারিতে মুকুল আসার সময় তাপমাত্রার ওঠানামা এবং মার্চে গুটি আসার সময় প্রচণ্ড গরম ও বৃষ্টিহীনতার কারণে ফলন কম হয়েছে। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে অনেক গাছে মুকুলই আসেনি। দিনাজপুরের ডিএই কর্মকর্তারা তখন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি ও প্রায় ৪ হাজার বাণিজ্যিক বাগান থেকে প্রায় ৪০ হাজার টন লিচু আশা করছিলেন, যেখানে ২০২২ সালে উৎপাদন ছিল ৪৫ হাজার টনের বেশি। দিনাজপুর সদরের কালীতলা ফলের বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, সে বছর পরিমাণ, আকার, রং ও স্বাদ, কোনো দিক থেকেই উৎপাদন ভালো হয়নি। ১০০টি বেদানা লিচুর একটি আঁটি বিক্রি হচ্ছিল সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায়, আগে যার সর্বোচ্চ দাম ছিল ৬০০ টাকা।
এক সপ্তাহ পর, ২০২৩ সালের ৪ জুন, দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণ জানায়, আগের ১০ থেকে ১৫ দিন দিনাজপুরে দৈনিক তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করেছে, আর প্রতিবেদনের আগের বৃহস্পতি ও শুক্রবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১ ডিগ্রি। বিশেষজ্ঞদের বরাতে পত্রিকাটি লেখে, ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা লিচু ফলনের জন্য সবচেয়ে ভালো। গাছেই লিচু ফেটে যাচ্ছিল, আর চাষিরা নির্ধারিত সময়ের আগেই ফল পেড়ে একসঙ্গে বাজারে আনছিলেন। পত্রিকাটি কালীতলাকে দিনাজপুরের লিচুর সবচেয়ে বড় বাজার বলে উল্লেখ করে; সেখানকার এক ব্যবসায়ী বলেন, লিচুর মৌসুমে এর আগে কোনো বছর এত গরম পড়েনি, অধিকাংশ লিচুতে দাগ আছে এবং অনেক লিচু ফেটে গেছে। নবাবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৬০০ গাছের মালিক এক চাষি জানান, সে বছর তাঁর প্রায় ৪০ শতাংশ গাছে মুকুলই আসেনি, আর তাপপ্রবাহে বাকি লিচুরও বেশির ভাগ নষ্ট হয়েছে। তিনি প্রতি হাজার বেদানা লিচু ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করছিলেন, অথচ মান ভালো হলে দাম হতো প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা।
দিনাজপুরের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ পত্রিকাটিকে বলেন, তীব্র গরমে লিচু হিট ইনজুরিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তাপপ্রবাহের সময় বাগানে হালকাভাবে পানি স্প্রে করার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, এ ছাড়া ছত্রাকনাশকও ব্যবহার করা যেতে পারে।
দিনাজপুর থেকে প্যারিসে: ২০২৩ সালের চালান
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৩ সালে দিনাজপুরের লিচু রপ্তানি হয় এবং ফলটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের জুনের প্রতিবেদনগুলো এই মাইলফলককে আরও নির্দিষ্ট করে বলে। ২০২৩ সালের ৮ জুন মেরিটাইম গেটওয়ের প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও ডিএইর বরাতে বলা হয়, বাংলাদেশ ১৯৯৯ সাল থেকেই বিভিন্ন বাজারে লিচু রপ্তানি করে আসছে, তবে ২০২৩ সালের জুনে দিনাজপুরের একটি বাগান প্রথমবারের মতো সরাসরি বিদেশে নিজের ফল পাঠায়।
প্রথম চালানে ছিল প্রায় ৩০০ কেজি, অর্থাৎ বেদানা জাতের প্রায় ১৬ হাজার লিচু। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চালানটির উদ্বোধন হয়, আর ঢাকা ছাড়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তা ফ্রান্সে পৌঁছানোর কথা ছিল। দিনাজপুরের কয়েকটি বাগান থেকে সংগ্রহ করা চায়না-৩ জাতের প্রায় ৫ লাখ লিচু, অর্থাৎ ৯ হাজার ৫০০ কেজির দ্বিতীয় একটি চালান ফ্রান্সে পাঠানোর পরিকল্পনাও ছিল।
২০২৩ সালের ১২ জুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ৮ জুন পরীক্ষামূলকভাবে লিচু প্যারিসে পাঠানো হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার পরীক্ষায় লিচুগুলো উত্তীর্ণ হয় এবং প্যারিসসহ ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে বিক্রি হয়। ফরাসি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সুস প্রিমেসিয়া দ্বিতীয় চালানের জন্য আরও ২৫ হাজার লিচুর ক্রয়াদেশ দেয়। উদ্যোগটির কৃতিত্ব দেওয়া হয় ফ্রান্সে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কাউন্সেলরকে, যিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, দিনাজপুর জেলা প্রশাসন, ডিএই এবং বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে মিলে কাজ করেন।
দেশের মোট লিচু রপ্তানি তখনও সামান্য। ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের একজন পরিচালক জানান, ২০২৩ সালের ৭ জুন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে রপ্তানিকারকেরা ১১২ টন লিচু পাঠিয়েছেন। হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৪৯ টন লিচু রপ্তানি করেছিল।
দিনাজপুর ও তার লিচু অঞ্চল
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার আয়তন ৩ হাজার ৪৪৪.৩০ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে। জেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়, দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট, পূর্বে নীলফামারী ও রংপুর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। জেলার নদীগুলোর মধ্যে আছে পুনর্ভবা, আত্রাই, তুলসীগঙ্গা ও যমুনা। জেলার ১৩টি উপজেলা হলো কাহারোল, খানসামা, ঘোড়াঘাট, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর সদর, নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, বিরল, বিরামপুর, বীরগঞ্জ, বোচাগঞ্জ ও হাকিমপুর। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৯০ হাজার ১২৮ জন, আর বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ৬৩.৯০ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
জেলার ভেতরে লিচুর মূল অঞ্চল সদর, বিরল ও চিরিরবন্দর। ২০২৩ ও ২০২৪ দুই বছরের প্রতিবেদনেই সদরের মাসিমপুর ও বিরলের মাধববাটিকে সবচেয়ে ভালো লিচুর জায়গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মৌসুমে সদর, নবাবগঞ্জ, বিরল, চিরিরবন্দরসহ বিভিন্ন উপজেলার চাষিরা শহরের কালীতলা ফলের বাজারে লিচু নিয়ে আসেন।
দিনাজপুরে লিচুর চাষ নতুন নয়। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে লিচু উৎপাদন নিয়ে ২০০২ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আঞ্চলিক প্রতিবেদনে যশোর, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, ঢাকা, কুষ্টিয়া, সিলেট ও চট্টগ্রামের সঙ্গে দিনাজপুরকেও বাংলাদেশের প্রধান লিচু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাপিডিয়া প্রধান চাষ এলাকা হিসেবে রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের নাম দিয়েছে।

বেদানা, বোম্বাই, চায়না-৩ ও বারির জাত
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে দিনাজপুরে চাষ হওয়া জাত হিসেবে মাদ্রাজি, বোম্বাই, বেদানা, চায়না থ্রি, গোলাপি ও কাঁঠালির নাম আছে, আর বলা হয়েছে বেদানা জাতের লিচুই এখনো সারা দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ২০২৪ সালের মার্চে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে এর সঙ্গে চায়না-১, চায়না-২ ও হাড়িয়া নামের একটি জাতের কথাও আছে; সেখানে বেদানা ও চায়নাকে প্রিমিয়াম জাত বলা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে, মাদ্রাজি সবার আগে পাকে।
এফএওর ২০০২ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে এস বি এম আবু বকর সিদ্দিকীর লেখা অধ্যায়ে প্রধান জাতগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা আছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া বোম্বাই নিয়মিত ফল দেয়; এর ফল হৃৎপিণ্ডের আকৃতির, লাল, শাঁস মিষ্টি, আর তোলা হয় মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। বেদানাকে সবচেয়ে ভালো মানের জাত বলা হয়েছে: ফল গোলাকার, উজ্জ্বল লাল, বিচি খুব ছোট, তবে ফলন সবচেয়ে কম; তখন এটি কেবল দিনাজপুরেই চাষ হতো এবং তোলা হতো জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে। চায়না-৩ ভালো মানের নাবি জাত, ফল গোলাকার এবং লাল, কমলা ও সবুজ রঙে মেশানো; তোলা হয় জুনের শেষ সপ্তাহে, আর ভালো ব্যবস্থাপনা ছাড়া এটি অনিয়মিত ফল দেয়। প্রতিবেদনে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী গাছের সাধারণ ফলন দেওয়া হয়েছে: বোম্বাই গাছপ্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার, চায়না-৩ গাছপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার এবং বেদানা গাছপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার ফল।
একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কাজের বিবরণও আছে। রাজশাহী অঞ্চলের জন্য আগাম, নিয়মিত ফলদায়ী ও উচ্চফলনশীল জাত বারি লিচু-১ ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহীর বিনোদপুর থেকে অবমুক্ত হয়। গোলাপি-লাল ফলের নাবি জাত বারি লিচু-২, যাকে ফল ছিদ্রকারী পোকা ও মাকড় সহনশীল বলা হয়েছে, এবং ছোট বিচি ও উচ্চফলনের মাঝ-মৌসুমি জাত বারি লিচু-৩, যা দেখতে অনেকটা চায়না-৩-এর মতো, পূর্বাঞ্চলের জন্য সিলেটের আকবরপুরে নির্বাচন করা হয়।

মুকুল থেকে ফল: গাছের যা দরকার
বাংলাপিডিয়া জানায়, লিচুর বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis, এটি সাপিনডেসি গোত্রের গাছ এবং এর আদি নিবাস চীন। মাঝারি থেকে বড় আকারের এই চিরসবুজ গাছ ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া গাছের বৃদ্ধিতে সহায়ক, কিন্তু শুষ্ক ও গরম বাতাস ফলের ক্ষতি করে। গভীর দোআঁশ পলিমাটিতে লিচু সবচেয়ে ভালো হয়, আর গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।
এপ্রিলে চাষিরা যে মুকুলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেটিই ফসলের সবচেয়ে নাজুক পর্যায়। এফএওর প্রতিবেদন বলছে, ফুল আসে মূলত চলতি বছরের নতুন ডালে; বাংলাদেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে মুকুল আসার সময় তাপমাত্রা থাকে ২৭ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো, আর মুকুলের সময় আগাম বৃষ্টি হলে ফল ধরা কমে যায়। গুটি আসার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ দিন পর, সাধারণত মে ও জুন মাসে, লিচু তোলা হয়। পুরোপুরি পাকলেই লিচু পাড়তে হয়, কারণ গাছ থেকে পাড়ার পর লিচুর মান আর বাড়ে না।
লিচুর ফুলের পরাগায়নে পোকামাকড় দরকার। ফসলের পরাগায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রকাশিত এস ই ম্যাকগ্রেগরের হ্যান্ডবুকে এমন গবেষণার কথা আছে, যেখানে পোকামাকড় ঢুকতে না দেওয়ার জন্য জাল দিয়ে ঘেরা একটি গাছে কোনো ফলই ধরেনি। আরেকটি গবেষণায় ঘেরা ফুলের মাত্র ০.০৩ থেকে ০.১০ শতাংশে ফল ধরেছিল, যেখানে পোকামাকড়ের নাগাল পাওয়া ফুলে ফল ধরেছিল ০.৭ থেকে ১১.২ শতাংশে; ভারতের সেই গবেষণায় ফুলে আসা পোকার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই ছিল মৌমাছি ও হুলবিহীন মৌমাছি। বাংলাদেশে প্রথম আলো ২০১৯ সালের মার্চে জানিয়েছিল, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় মৌচাষিরা লিচুবাগানে ৮ হাজার মৌবাক্স বসিয়েছেন; উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, লিচুর মুকুলে মৌমাছি বসলে পরাগায়ন ভালো হয়।
মুকুল থেকে ফল তোলা পর্যন্ত পানিই সবচেয়ে জরুরি। এফএওর প্রতিবেদনে মুকুল আসা, গুটি ধরা ও ফলের বৃদ্ধির সময় সেচ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ কৃষক ফলন্ত গাছে সেচ দেন না, ফলে খরার সময় ফল ঝরে পড়ে। প্রতিবেদনটি মার্চ ও সেপ্টেম্বরে দুই ভাগে সার দেওয়ার সুপারিশ করেছে; প্রধান পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন, সঙ্গে ফসফরাস, পটাশিয়াম, দস্তা, বোরন ও তামাও দরকার। নিজের গাছের জন্য সারের সঠিক মাত্রা জানতে চাষিদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা উচিত; ডিএইর উপপরিচালক নিজেও জানিয়েছিলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
এফএওর প্রতিবেদনে লিচুর মাকড়কে (Aceria litchi) সবচেয়ে ক্ষতিকর বালাই বলা হয়েছে; এটি পাতায় গল তৈরি করে এবং ফুল ও ফলের ক্ষতি করে। দমনের উপায় হিসেবে আক্রান্ত ডাল ছেঁটে পুড়িয়ে ফেলা এবং এপ্রিল ও মে মাসে অনুমোদিত মাকড়নাশক বা সালফার স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। ফল ছিদ্রকারী পোকার কীড়া বোঁটার দিক দিয়ে ফলে ঢোকে; এর দমনে সহনশীল জাত এবং পাকার আগে স্প্রে করার কথা আছে, আর বাকল খেকো শুঁয়োপোকার ক্ষেত্রে এর গর্ত বন্ধ করে দেওয়ার কথা। পাকা ফলের সময় বাদুড় ও পাখিও লিচু খায়। প্রতিবেদনে কোনো মাত্রা দেওয়া নেই; কোন বালাইনাশক কতটা দিতে হবে, তা চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
দেশের ফলের ঝুড়িতে লিচু
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের বৃক্ষজাত ফলের মধ্যে আমের পরেই লিচুর স্থান, আর সারা দেশেই এর চাষ হয়। ২০২৩ সালে ডিএই কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত হিসাবে দেশে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদন হয়। ২০২৩ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার টন থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। এফএওর ২০০২ সালের প্রতিবেদনে দেশের গড় ফলন দেওয়া হয়েছিল হেক্টরপ্রতি মাত্র প্রায় আড়াই টন, যা আন্তর্জাতিক মানে কম।
লিচু মূলত তাজা খাওয়া হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, ফলের ওজনের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ খাওয়ার উপযোগী শাঁস, যাতে মূলত শর্করা থাকে, সঙ্গে কিছু আমিষ, ভিটামিন বি ও সি, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা লিচুতে ভিটামিন সি থাকে ৭১.৫ মিলিগ্রাম।
লিচুর মৌসুম ছোট। এফএওর প্রতিবেদন প্রধান সীমাবদ্ধতা হিসেবে প্রায় ৬০ দিনের সংক্ষিপ্ত সংগ্রহ মৌসুম, উন্নত জাতের সংকীর্ণ ভিত্তি, ভালো চারা-কলমের ঘাটতি, ক্ষতিকর ছাঁটাই ও ফল তোলার পদ্ধতি এবং এক বছর পরপর ভালো ফলন দেওয়ার প্রবণতার কথা বলেছে, আর উল্লেখ করেছে যে লিচু দ্রুত পচনশীল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রায়ই পাকার আগেই গাছের লিচু কিনে নিতেন। ২০২৩ সালের জুনে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলা নবাবগঞ্জের চাষি জানিয়েছিলেন, তাপপ্রবাহে কয়েক দিনেই তাঁর প্রায় ১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে; সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই ২০২৪ সালের এপ্রিলে মাসিমপুর ও মাধববাটির চাষিরা মুকুলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, মেরিটাইম গেটওয়ে, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ), প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)