২০২৬ সালের জুনের শুরুতে আম রপ্তানির বাজারে বড় খবর ছিল জাপানের সিদ্ধান্ত: প্রায় দুই দশক পর দেশটি ভারত থেকে তাজা আম আমদানি স্থগিত করেছে। উত্তর প্রদেশের রেহমানপুরে একটি ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) কেন্দ্র পরিদর্শনে জাপানি কোয়ারেন্টিন দল ধোঁয়ানাশক (ফিউমিগেশন) ও জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি পেয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়। ৭ জুন জাগো নিউজ লিখেছিল, এই শূন্যস্থান বাংলাদেশের জন্য জাপানের প্রিমিয়াম আমের বাজারে ঢোকার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদি জাপানের কঠোর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ ও খাদ্য নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করা যায়। সে সময় বাংলাদেশ থেকে তাজা আম নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
জাপান কেন ভারতীয় আম নেওয়া বন্ধ করল
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৬ সালের ২৯ মে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট ও অন্যান্য সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জানায়, জাপানের একটি পরিদর্শক দল উত্তর প্রদেশের রেহমানপুরের একটি ভিএইচটি কেন্দ্রে যাচাই সফরে গিয়ে কাঠামোগত ঘাটতি এবং ধোঁয়ানাশক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি খুঁজে পায়। এরপর ইয়োকোহামা প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন একটি নির্দেশনা দেয়: ২৫ মার্চ বা তার পরে ইস্যু করা ভারতীয় ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদস্বাস্থ্য) সনদধারী আমের চালান জাপানের বন্দরে গ্রহণ করা হবে না, যতক্ষণ না টোকিওর কর্তৃপক্ষ কার্যপ্রণালীর মান উন্নয়নে সন্তুষ্ট হয়।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার খাদ্য বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফুড বিজনেস এমইএ ৬ জুন জানায়, পরিদর্শনটি হয়েছিল ২০২৬ সালের মার্চে এবং জাপানি কোয়ারেন্টিন কর্মকর্তারা কেন্দ্রটিতে অপর্যাপ্ত কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং ধোঁয়ানাশক ও জীবাণুমুক্তকরণে ব্যর্থতা দেখতে পান। সাময়িকীটির ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কার্যপ্রণালী তাদের সন্তুষ্টি অনুযায়ী মানসম্মত না হওয়া পর্যন্ত প্রবেশাধিকার স্থগিত থাকবে। ভারতের অনুমোদিত ভিএইচটি কেন্দ্রগুলো অন্ধ্র প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত বলেও সাময়িকীটি উল্লেখ করে।
ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিবিষয়ক প্রকাশনা দৃষ্টি আইএএস ১ জুন লেখে, জাপান ২০২৬ মৌসুমের জন্য ভারতীয় আম আমদানি স্থগিত করেছে, কারণ দেশটির পরিদর্শক দল ভারতের কেন্দ্রগুলোতে শোধন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ঘাটতি পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে আলফোনসো, কেসর, ল্যাংড়া ও বাঙ্গানাপল্লির মতো জনপ্রিয় জাত; ফুড বিজনেস এমইএর তালিকায় চৌসাও ছিল। ভারতের আম রপ্তানির ভরা মৌসুম এপ্রিল থেকে জুন, ফলে স্থগিতাদেশটি এসেছে ঠিক সেই সময়ে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বাজারসংশ্লিষ্টদের বরাতে বলা হয়, চলতি মৌসুমে বিষয়টির সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ভারত সরকার তখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে ম্যাঙ্গো গ্রোয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার সভাপতি এস ইনসরাম আলী জানান, কেন্দ্রীয় সরকার প্রশাসনিক সমাধানের জন্য টোকিওর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এমনটি জানায়।
১৯৮৬ থেকে ২০০৬: আগের নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
জাপান এর আগেও ভারতীয় আম নিষিদ্ধ রেখেছিল। দৃষ্টি আইএএস ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে ফলমাছির সংক্রমণের কারণ দেখিয়ে জাপান ভারতীয় আম আমদানি বন্ধ করে। সেই নিষেধাজ্ঞা টানা প্রায় ২০ বছর বহাল ছিল। ভারত জাপানের উদ্ভিদস্বাস্থ্যের শর্ত পূরণ করার পর এবং ভিএইচটি প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করার পর ২০০৬ সালের জুনে দুই দেশের মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ফুড বিজনেস এমইএর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় একাধিক পরিদর্শন, মূল্যায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের পর বাজার খুলেছিল।
জাপানি ভাষার উইকিপিডিয়ার আমবিষয়ক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০০৬ সাল থেকে শর্তসাপেক্ষে ভারতীয় আম জাপানে ঢোকার অনুমতি পায় এবং অনুমোদিত জাতগুলো হলো আলফোনসো, কেসর, চৌসা, বাঙ্গানাপল্লি, মল্লিকা ও ল্যাংড়া। একই নিবন্ধ অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের আম শর্তসাপেক্ষে জাপানে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিল ১৯৮৭ সালে, এবং সেখানেও নির্দিষ্ট কয়েকটি জাতই কেবল উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ পরীক্ষার আওতায় আমদানি করা যায়। অর্থাৎ জাপানে আম রপ্তানির অনুমতি একটি দেশ বা একটি জাতের জন্য আলাদা আলাদাভাবে, শোধন পদ্ধতির নিশ্চয়তা দেওয়ার পরই মেলে।
প্রতি বছর রপ্তানি মৌসুমের আগে জাপানের কোয়ারেন্টিন কর্মকর্তারা ভারতে এসে ভিএইচটি কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন; দুই দেশের রপ্তানি ব্যবস্থায় এই শোধন বাধ্যতামূলক। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে এই নিয়মিত পরিদর্শনের কথাই বলা হয়েছিল, আর ২০২৬ সালের মার্চের পরিদর্শনেই ত্রুটি ধরা পড়ে।
ফলমাছি ও জাপানের কঠোর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ
জাপানি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জাপানের উদ্ভিদ সুরক্ষা আইনে (প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাক্ট) যেসব দেশ বা অঞ্চলে কৃষির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ফলমাছি রয়েছে, সেখান থেকে তাজা আম আমদানি নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ। তবে রপ্তানিকারক দেশে যদি ফলের ভেতরের ফলমাছি পুরোপুরি মেরে ফেলার মতো শোধন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই দেশের আবেদন করা জাতগুলো জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করে এবং সমস্যা না পেলে শোধনের শর্ত জুড়ে আমদানির অনুমতি দেয়। সাধারণত দুটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়: বাষ্পে ফল গরম করার ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট এবং গরম পানিতে ফল ডুবিয়ে রাখার হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট। নিবন্ধটি জানায়, এভাবে শর্তসাপেক্ষে আমদানি খোলার পর ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে জাপানের সুপারমার্কেটে ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের আম সহজলভ্য হয়।
এই নিয়মের কেন্দ্রে আছে ফলমাছি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত প্রজাতিগুলোর একটি হলো ওরিয়েন্টাল ফ্রুট ফ্লাই বা ব্যাকট্রোসেরা ডরসালিস। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এটি টেফ্রিটিডি গোত্রের মাছি, যার আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চাষ করা ও বুনো, দুই ধরনের অনেক ফলেই এটি আক্রমণ করে। পূর্ণবয়স্ক মাছির দেহ প্রায় ৮ মিলিমিটার লম্বা; বক্ষে হলুদ-কালো দাগ ও পেটে গাঢ় ইংরেজি ‘টি’ আকৃতির চিহ্ন দেখে একে চেনা যায়।
স্ত্রী মাছি পাকা ফলের খোসা ফুটো করে ভেতরে একবারে ৩ থেকে ৩০টি করে ডিম পাড়ে। মাঠপর্যায়ে একটি স্ত্রী মাছি জীবদ্দশায় সাধারণত ১,২০০ থেকে ১,৫০০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়া সাদাটে লার্ভা ৬ থেকে ৩৫ দিন ফলের শাঁস খেয়ে বড় হয়, তারপর মাটিতে নেমে পিউপা হয়। গ্রীষ্মে ডিম থেকে পূর্ণবয়স্ক মাছি হতে প্রায় ১৬ দিন লাগে। ফলের ভেতরে ডিম বা লার্ভা থাকে বলে বাইরে থেকে দেখে আক্রান্ত আম চেনা কঠিন; এ কারণেই আমদানিকারক দেশগুলো রপ্তানির আগে পুরো চালান শোধনের ওপর জোর দেয়। উইকিপিডিয়া জানায়, ১৯১০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫টি দেশে এর উপস্থিতি দেখা গেলেও পরের তিন দশকে দ্রুত ছড়িয়ে এটি অন্তত ৬৫টি দেশে পৌঁছেছে।
ভিএইচটি হলো রাসায়নিকবিহীন একটি পদ্ধতি, যেখানে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার গরম বাতাসে আম রেখে ফলের ভেতরের ফলমাছির ডিম ও লার্ভা মেরে ফেলা হয়। ফুড বিজনেস এমইএর ভাষায়, এই শোধন নিশ্চিত করে যে চালান পাঠানোর আগে আম ফলমাছির ডিম ও লার্ভামুক্ত। প্রথম আলোও একে আমের ভেতরে থাকা ফলমাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকার ডিম ও লার্ভা ধ্বংসের বিশেষ তাপপ্রয়োগ পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ভারতের আম ও রপ্তানির ধাক্কা
ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী দেশ। কৃষি জাগরণ ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই জানায়, ভারতের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী রামনাথ ঠাকুর ২২ জুলাই সংসদে বলেন, দ্বিতীয় অগ্রিম প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৪-২৫ সালে দেশটির আম উৎপাদন ২২৮.৩৭ লাখ টন, যা আগের বছর ছিল ২২৩.৯৮ লাখ টন। জাগো নিউজের মূল প্রতিবেদনে ভারতের বার্ষিক উৎপাদন ‘প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টন’ লেখা হয়েছিল; সরকারি প্রাক্কলনের সঙ্গে মিলিয়ে এখানে সংশোধিত সংখ্যাটি দেওয়া হলো। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে আম, ম্যাঙ্গোস্টিন ও পেয়ারার মোট উৎপাদন ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ টন, যার ৪৩ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে।
উৎপাদনের বেশির ভাগ দেশের ভেতরেই খাওয়া হয়, তবে জাপানের মতো উচ্চমূল্যের বাজার রপ্তানিকারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপান ভারত থেকে ১৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের আম আমদানি করেছিল। ফুড বিজনেস এমইএ জানায়, জাপানে ভারতের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম রপ্তানির মূল্য প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং এর বড় অংশ ছিল গুজরাটের কেসর জাত। দৃষ্টি আইএএসের ভাষায়, পরিমাণের দিক থেকে জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় গন্তব্য না হলেও কঠোর মানদণ্ড ও উচ্চমূল্যের ক্রেতার কারণে এটি একটি প্রিমিয়াম বাজার।
নিষেধাজ্ঞা এসেছে এমন সময়ে, যখন ভারতের রপ্তানিকারকেরা আরও কয়েকটি চাপের মধ্যে ছিলেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে রপ্তানির পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছিল; সমুদ্রপথে হিমায়িত কনটেইনারের সংকট দেখা দেয়, মার্চেই কনটেইনার ভাড়া ১,০০০ ডলার বাড়ে এবং ৪,০০০ ডলারের যুদ্ধ সারচার্জ যোগ হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র তাপপ্রবাহে দেশটির আমের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ২০২৫ সালে খাতটির মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। ফুড বিজনেস এমইএ জানায়, মহারাষ্ট্রের কোঙ্কণ অঞ্চলে গরমে আলফোনসো আমের ক্ষতি হওয়ায় রপ্তানিযোগ্য আমের সরবরাহও কমেছিল। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে রপ্তানিকারকদের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল যে এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া জাতগুলো
আলফোনসো ভারতের অন্যতম দামি আম। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এর নামকরণ পর্তুগিজ ভারতের ভাইসরয় আফোনসো দে আলবুকার্কের নামে; জাতটি মূলত পশ্চিম ভারতের কোঙ্কণ অঞ্চলে, অর্থাৎ মহারাষ্ট্র, গোয়া ও কর্ণাটকে, এবং দক্ষিণ গুজরাটের ভালসাদ ও নভসারি জেলায় চাষ হয়। জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপে এটি রপ্তানি হয়, আর ২০১৮ সালে কোঙ্কণের আলফোনসো ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পায়।
কেসর বা গির কেসর গুজরাটের গিরনার পাহাড়ের পাদদেশে জন্মানো জাত, যার শাঁস উজ্জ্বল কমলা; ২০১১ সালে এটি জিআই স্বীকৃতি পায়। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, সৌরাষ্ট্রের জুনাগড় ও আমরেলি জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টরে এর চাষ হয় এবং বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২ লাখ টন। ল্যাংড়া বা বেনারসি ল্যাংড়ার উৎপত্তি উত্তর প্রদেশের বেনারসে, প্রায় আড়াই থেকে তিনশ বছর আগে; উত্তর প্রদেশ ছাড়াও বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে এর চাষ হয় এবং পাকার সময়ও এর খোসায় সবুজাভ ভাব থাকে। চৌসা মূলত ভারত ও পাকিস্তানে চাষ হয়, ভারতে এর প্রধান এলাকা বিহার ও উত্তর প্রদেশ।

জাপানের আমের বাজার
জাপানে আমের চাহিদা উল্লেখযোগ্য, আর দেশটি বিভিন্ন দেশ থেকে আম আমদানি করে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটা ব্রিজ মার্কেট রিসার্চের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জাপানের আমের বাজারের মূল্য ছিল ৪২০.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, ২০২৫ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত এই বাজার বছরে গড়ে ৭.১৮ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে এবং ২০৩২ সালে ৬৫০.২১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। জাগো নিউজের মূল প্রতিবেদনে ৭.১৮ শতাংশকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত মোট প্রবৃদ্ধি হিসেবে লেখা হয়েছিল; প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে এটি বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার। একই প্রাক্কলনে ২০২৪ সালে দোকানভিত্তিক (অফলাইন) বিক্রির অংশ ছিল ২৫১.৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং জাতভিত্তিক হিসাবে আলফোনসোকে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অংশ বলা হয়েছে।
জাপান নিজেও কিছু আম উৎপাদন করে, তবে তা সীমিত। জাপানি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বছরে প্রায় ৩,০০০ টন আম উৎপাদিত হয়, যার প্রায় সবই আরউইন জাত; উৎপাদনে শীর্ষে ওকিনাওয়া, এরপর মিয়াজাকি ও কাগোশিমা। আম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল আর আমের ফুল ফোটার সময় জাপানের বর্ষাকালের সঙ্গে মিলে যায়, তাই বৃষ্টি থেকে পরাগ রক্ষা করতে কৃষকেরা মূলত পলিথিনের ঘরে (গ্রিনহাউস) আম চাষ করেন। মিয়াজাকির গাছে পাকা আমের সেরা অংশ ‘তাইয়ো নো তামাগো’ (সূর্যের ডিম) নামে বাজারজাত হয়, যার দাম অনেক বেশি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের অনুপস্থিতিতে জাপানের বিকল্প সরবরাহের বাজার ধরতে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও মেক্সিকোর মতো প্রতিযোগীরা সক্রিয় হয়ে উঠছিল। জাপানি উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের আম জাপানে আমদানি করা বিদেশি আমের মধ্যে মেক্সিকো ও ফিলিপাইনের পরে তৃতীয় এবং জাপানি ক্রেতারা থাইল্যান্ডের নাম দোকমাই জাতটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও জাপানের শর্ত
প্রথম আলো ২০২৬ সালের ৩১ মে জানায়, জাপান ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহী এবং এ নিয়ে দেশের রপ্তানিকারকেরা আশাবাদী। জাপানের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও দেশটি বেশ কিছু শর্ত দিয়েছিল, যা নিয়ে তখন আলোচনা চলছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের ধারণা, জাপানের বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও খুব মানসম্পন্ন বাজার হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপান শুধু আমের স্বাদ নয়, উৎপাদন, সংরক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মতো বিষয়েও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে। রপ্তানিকারকদের মতে, সবচেয়ে বড় শর্ত কোয়ারেন্টিন ও খাদ্য নিরাপত্তার মান পূরণ করা। ডিএই জানায়, বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তথ্য আদান-প্রদান চলছিল। বাংলাদেশের জমা দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জাপান ১৬টি সম্ভাব্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছিল, যেগুলো ২০২৩ সালের পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিসে (পিআরএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
পিআরএ হলো এমন একটি ঝুঁকি মূল্যায়ন, যার মাধ্যমে আমদানিকারক দেশ নিশ্চিত হয় যে রপ্তানি করা আমের সঙ্গে কোনো ক্ষতিকর পোকামাকড় বা উদ্ভিদরোগ তাদের দেশে ঢুকবে না। প্রথম আলো জানায়, জাপানের শর্তের বিষয়ে ডিএইর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ শাখার পরিচালক মো. আবদুর রহিম ৬ মে সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালকে (সিএবিআই) চিঠি দেন; জাপানের চাওয়া বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রস্তুত করতে প্রতিষ্ঠানটির সহায়তা চাওয়া হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সিএবিআই (আগের নাম কমনওয়েলথ অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যুরোস) একটি অলাভজনক আন্তঃসরকারি সংস্থা, যা মূলত উন্নয়নশীল বিশ্বের কৃষি ও পরিবেশ বিষয়ে কাজ করে; ফসলের পোকামাকড় ও রোগ, আগ্রাসী প্রজাতি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রাপ্যতা এর কাজের বিষয়।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, জাপানিরা আম উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে চায় এবং মাটির গুণাগুণও দেখতে চায়, যা বেশ জটিল। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শর্তগুলো পূরণ করা কঠিন নয়। এর একটি হলো ভিএইচটি। ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজধানীর গাবতলীতে ভিএইচটির ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করেছি। বাকি কিছু পোকা নিয়ে কথা আছে। আশা করছি, জাপানেও এ বছর আম রপ্তানি শুরু করা যাবে।’ ফুড বিজনেস এমইএ ৩ জুন একই তথ্য জানিয়ে লেখে, ১৬টি পোকার বৈজ্ঞানিক তথ্য সংকলনে বাংলাদেশ সিএবিআইয়ের কারিগরি সহায়তা চেয়েছে।
একই প্রতিবেদনে প্রথম আলো জানায়, মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল জুনের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে এসে আম উৎপাদন এলাকা, প্যাকিং, সংরক্ষণ ও রপ্তানি-প্রস্তুতি দেখার কথা ছিল। মালয়েশিয়ায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি থাকায় সেই বাজার নিয়ে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বেশি ছিল। গ্লোবাল ট্রেড লিংকের স্বত্বাধিকারী রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা এ বছর থেকেই আম রপ্তানি করব মালয়েশিয়ায়।’
জাপানের আগ্রহের পুরোনো সূত্র
জাপানের আগ্রহ নতুন নয়। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২২ সালের ১ নভেম্বর জানায়, ঢাকায় জাপানি কৃষিযন্ত্র প্রতিষ্ঠান ইয়ানমার ও এসিআই মোটরসের যৌথ উদ্যোগে একটি কৃষিপ্রযুক্তি পার্কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বাংলাদেশ থেকে আম নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই অনুষ্ঠানে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী বলেন, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে আম রপ্তানির জন্য কিছু নিয়ম মানতে হবে এবং নিরাপদ আম নিশ্চিত করতে সরকার দুই বছরের একটি ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জানায়, চীন বাংলাদেশ থেকে আম আমদানি শুরু করেছে, আর জাপান ও অস্ট্রেলিয়া আগ্রহ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশের আম উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব
দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয় এবং দেশীয় বাজারের আকার ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাণিজ্যিক আম চাষ তখন ২৩টি জেলায় বিস্তৃত, আর সারা দেশে ৭২টি জাতের আম চাষ হয়। এর মধ্যে মাত্র সাত-আটটি জাত বিদেশে যায়; রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই আম্রপালি, বাকিগুলোর মধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, বারি আম-৪ ও ফজলি। রপ্তানির মৌসুম মে মাসের শেষ দিকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত চলে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানি শুরু হয় ২০১৬ সালে। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৮৮ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩২১ টন, আর ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন। অর্থাৎ ২০২৫ সালে রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে বাড়লেও ২০২৩ সালের তুলনায় অনেক কম ছিল।
দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৫ মৌসুমে বাংলাদেশের আম ২৬টি দেশে গেছে। সবচেয়ে বেশি নিয়েছে যুক্তরাজ্য, ৬৮৬ টন; এরপর সৌদি আরব ৩৫৬ টনের বেশি, ইতালি ২৬৪ টনের বেশি, কুয়েত ১৬৭ টনের বেশি এবং কাতার ১৬৩ টন। নতুন গন্তব্য হিসেবে চীনে গেছে ৫ টন। যুক্তরাজ্যে রপ্তানির বড় চালিকা শক্তি সেখানকার দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে তাজা আমের রপ্তানি ছিল প্রায় ২১ থেকে ২২ লাখ টন, যার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বাংলাদেশের।
সেই প্রতিবেদনে বাধাগুলোর কথাও এসেছিল। মোহাম্মদ মনসুর বলেছিলেন, আগের বছর বিমানভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমেছিল, আর ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট সুবিধার অভাবের মতো অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রধান বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সীমিত করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরফ উদ্দিনের মতে, বিদ্যমান সক্ষমতায় বছরে আম রপ্তানি প্রায় ৪,০০০ টনে আটকে থাকে এবং সমন্বিত উদ্যোগ নিলেও ৮,০০০ টন ছাড়ানো কঠিন হবে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বিকেন্দ্রীকৃত অবকাঠামো, চুক্তিভিত্তিক চাষ ও বড় রপ্তানিকারকের প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন।

আমের আদিভূমি ও বাংলাদেশের আমের এলাকা
ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, আম (ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা) গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছের আঁটিযুক্ত ফল, যার উৎপত্তি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বর্তমান বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার এলাকায়। আম ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল, আর আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। বিশ্বে আমের পাঁচশর বেশি জাত পরিচিত; ফুল ফোটা থেকে ফল পাকতে চার থেকে পাঁচ মাস লাগে। ভালো জাতের অনেকগুলো একভ্রূণী, তাই বীজ থেকে গাছ করলে মাতৃগাছের গুণ থাকে না এবং কলম করে বংশবিস্তার করতে হয়।
বাংলাদেশে রপ্তানির আলোচনায় যে জাতগুলো আসে, তার একটি ফজলি। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, এটি দেরিতে পাকা বড় আকারের আম, একেকটি প্রায় এক কেজি পর্যন্ত হতে পারে; পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ এবং বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগে এর চাষ বেশি, আর ২০২১ সালে বাংলাদেশ ফজলির ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পায়। রপ্তানির বড় অংশ যে আম্রপালির, সেটি ১৯৭১ সালে ভারতের ইন্ডিয়ান অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে দশেরি ও নীলম জাতের সংকরায়ণে উদ্ভাবিত; গাছ খাটো, প্রতি বছর ফল দেয় এবং থোকায় ছোট আকারের ফল ধরে।
দেশের আমের প্রধান এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যা রাজশাহী বিভাগের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের জেলা; এর উত্তর ও পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ। ১৯৮৪ সালে এটি আলাদা জেলার মর্যাদা পায়। প্রথম আলোর ৩১ মের প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের আম উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ায় এবারই আম রপ্তানির সুযোগ হতে পারে। একই প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, প্রয়োজনীয় মান ও নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করা গেলে বাংলাদেশের আম দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে নতুন সুযোগ পেতে পারে।
ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ফুড বিজনেস এমইএ, দৃষ্টি আইএএস, দ্য ডেইলি স্টার, কৃষি জাগরণ, ডাটা ব্রিজ মার্কেট রিসার্চ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)