আম আমাদের প্রায় সবার প্রিয় ফল। সারা বছর আম ধরে রাখতে ঘরে ঘরে নানা রকম মজাদার আচার বানানো হয়, আর পাকা আম দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকম ডেজার্ট। ২০২৫ সালের জুনে, আমের ভরা মৌসুমে, জাগো নিউজ ২৪ এমনই একটি ডেজার্টের রেসিপি প্রকাশ করেছিল, যা দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনই মজাদার: হংকং ধাঁচের ম্যাঙ্গো পিলো ডেজার্ট। এতে পাতলা প্যানকেকের ভেতরে হুইপড ক্রিম আর পাকা আমের টুকরা রেখে চারদিক থেকে ভাঁজ করে ছোট চৌকো একটি 'বালিশ' বানানো হয়। পত্রিকাটি রেসিপির তথ্যসূত্র হিসেবে রান্নার ওয়েবসাইট রেসিপিটিন ইটসের নাম উল্লেখ করেছিল।
রেসিপিটির দুটি অংশ: প্যানকেক ও ফিলিং। এর জন্য ওভেন লাগে না। রান্না বলতে শুধু ফ্রাইপ্যানে প্যানকেক তৈরি করা; ফিলিং হলো ফেটানো ক্রিম ও তাজা ফল, আর তৈরি বালিশগুলো পরিবেশনের আগে আধা ঘণ্টা ফ্রিজে ঠান্ডা করা হয়। তাই গরমের দিনে বিকালের নাস্তায় এটি সহজেই বানানো যায়। নিচের পরিমাণগুলো মূল রেসিপিতে যেমন দেওয়া ছিল, হুবহু তেমনই রাখা হয়েছে।
উপকরণ
প্যানকেকের জন্য
- ময়দা: ১/২ কাপ
- কর্নফ্লাওয়ার: ২ টেবিল চামচ
- ডিম: ১টি
- চিনি: ১ টেবিল চামচ
- তরল দুধ: ১ কাপ
- গলানো মাখন: ১ টেবিল চামচ
- হলুদ ফুড কালার বা ম্যাঙ্গো ফ্লেভার: সামান্য (ঐচ্ছিক)
ফিলিংয়ের জন্য
- হুইপিং ক্রিম: ১ কাপ (ঠান্ডা অবস্থায় ফেটানো)
- ছোট টুকরো করে কাটা আম: ২টি
- আইসিং সুগার: ২ টেবিল চামচ
- ভ্যানিলা এসেন্স: কয়েক ফোঁটা
সাজানোর জন্য রেসিপিতে ফিলিং থেকে আলাদা করে রাখা কিছু আমের টুকরা ও পুদিনা পাতা ব্যবহার করা হয়েছে; চাইলে সামান্য চকলেট সস বা আইসিং সুগারও দেওয়া যায়। এই ব্যাটারে কয়টি প্যানকেক হবে, মূল রেসিপিতে তা বলা নেই; সেটি নির্ভর করে প্যানের মাপ আর প্রতিটি প্যানকেক কতটা পাতলা করে ছড়ানো হচ্ছে তার ওপর।
প্রণালী
- ব্যাটার তৈরি: একটি বাটিতে ময়দা, কর্নফ্লাওয়ার ও চিনি মিশিয়ে নিন। এরপর ডিম, দুধ ও গলানো মাখন দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে একটি পাতলা ব্যাটার তৈরি করুন। চাইলে সামান্য হলুদ রং বা ম্যাঙ্গো ফ্লেভার দিতে পারেন, তবে এটি ঐচ্ছিক। ব্যাটারটি ১৫ থেকে ২০ মিনিট রেখে দিন।
- প্যানকেক ভাজা: একটি ননস্টিক প্যানে হালকা তেল মেখে অল্প ব্যাটার ঢেলে পাতলা রুটির মতো ছড়িয়ে দিন। নিচের দিক হালকা বাদামি হলে তুলে ফেলুন; উল্টানোর দরকার নেই। এভাবে সবগুলো প্যানকেক তৈরি করে ঠান্ডা হতে দিন।
- ক্রিম ফেটানো: ঠান্ডা হুইপিং ক্রিম একটি বাটিতে নিয়ে ইলেকট্রিক বিটার বা হ্যান্ড বিটার দিয়ে ফেটাতে থাকুন, যতক্ষণ না তা হালকা ও ফেনার মতো হয়। এরপর আইসিং সুগার ও ভ্যানিলা এসেন্স মিশিয়ে দিন; মিষ্টি কম চাইলে এই ধাপটি বাদ দিতে পারেন।
- আম মেশানো: ক্রিমের সঙ্গে আমের টুকরাগুলো আলতো করে মিশিয়ে নিন; সাজানোর জন্য কিছু টুকরা আলাদা রাখুন।
- বালিশ গড়া: প্রতিটি প্যানকেকের মাঝখানে হুইপড ক্রিম ও আম দিন, এরপর চারদিক থেকে ভাঁজ করে বালিশের মতো আকার দিন। আলতো করে উল্টে রাখুন, যাতে বন্ধ অংশটি নিচে থাকে। এবার ফ্রিজে ৩০ মিনিট রেখে ঠান্ডা করুন।
- পরিবেশন: আলাদা করে রাখা আমের টুকরা ও পুদিনা পাতা দিয়ে বালিশগুলো সাজিয়ে নিন। চাইলে ওপরে হালকা চকলেট সস বা আইসিং সুগার ছিটিয়ে দিতে পারেন।

রেসিপির পরামর্শ
- হুইপিং ক্রিম যেন ভালোভাবে ঠান্ডা থাকে; তা না হলে ঠিকমতো ফেটানো যাবে না।
- ভালোভাবে পাকা ও মিষ্টি আম নিন, না হলে স্বাদ ঠিক আসবে না।
- প্যানকেকের ভেতরে আমের বড় টুকরা বা ছোট টুকরা, যেটা পছন্দ, দিতে পারেন।
ম্যাঙ্গো প্যানকেক কী, এল কোথা থেকে
এ ধরনের ডেজার্ট সাধারণভাবে ম্যাঙ্গো প্যানকেক নামে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান এসবিএসের খাদ্যবিষয়ক বিভাগ ২০১৬ সালে "অস্ট্রেলিয়াই কি ম্যাঙ্গো প্যানকেক উদ্ভাবন করেছে?" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে পরিচিত সংস্করণটির বর্ণনা ছিল এমন: ঠান্ডা একটি প্যানকেক রোল, যার ভেতরে চিনি মেশানো ফেটানো ক্রিম আর এক টুকরা আম; সিডনির ডিম সাম রেস্তোরাঁগুলোর ডেজার্ট ট্রলিতে এটি খুবই সাধারণ খাবার।
নামের কারণে ডেজার্টটিকে সাধারণত হংকংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এসবিএস জানিয়েছিল, কিছু সূত্র হংকংয়ের ডেজার্ট চেইন হানিমুন ডেজার্টকে এর উদ্ভাবক বলে থাকে। চৌকো, বালিশের মতো যে সংস্করণটি এসবিএসের ভাষায় চীন ও অন্যান্য জায়গায় জনপ্রিয় হয়েছে, সেটি এই চেইনেরই, আর জাগো নিউজের রেসিপিও এই আকারটিই অনুসরণ করেছে। তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হানিমুন ডেজার্ট তাদের প্রথম দোকান খোলে ১৯৯৫ সালে।
এসবিএস কথা বলেছিল সিডনির এখন বন্ধ হয়ে যাওয়া ম্যারিগোল্ড রেস্তোরাঁর সাবেক গ্রুপ ম্যানেজার কনি চুংয়ের সঙ্গেও। তিনি জানান, রেস্তোরাঁটি ১৯৯১ বা ১৯৯২ সালের দিকে ম্যাঙ্গো প্যানকেক পরিবেশন শুরু করে; ম্যাঙ্গো পুডিংয়ের জনপ্রিয়তা থেকেই এই ভাবনা এসেছিল। যে শেফরা এটি তৈরি করেছিলেন, তাঁরা অবসরে চলে গেছেন, তাই ঠিক কোথা থেকে শুরু, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। শেফ ও চীনা খাবারবিষয়ক লেখক ফুশিয়া ডানলপ সিডনিতে ম্যাঙ্গো প্যানকেক দেখার পর প্রথম প্রশ্নটি তোলেন; তিনি লিখেছিলেন, চীনে, এমনকি হংকংয়েও এমন খাবার তিনি কখনো দেখেননি। কনি চুং আরও বলেন, চীনা ডেজার্ট সাধারণত কম মিষ্টি হয় এবং প্রায়ই গরম পরিবেশন করা হয়, তাই ঠান্ডা, ক্রিমভরা এই প্যানকেক হয়তো অস্ট্রেলীয় রুচির সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি।
এসবিএসের সিদ্ধান্ত ছিল, ম্যাঙ্গো প্যানকেক হয়তো হংকং থেকে সিডনিতে নয়, বরং সিডনি থেকে হংকংয়ে গেছে। ২০১৬ সালে প্রশ্নটির মীমাংসা হয়নি; প্রতিবেদনটি পাঠকদের কাছে জানতে চেয়েছিল, তাঁরা প্রথম কখন, কোথায় এটি খেয়েছেন। তবে এটুকু স্পষ্ট যে বালিশ আকারের সংস্করণটি হংকং ধাঁচের ডেজার্টের দোকানগুলোর নিয়মিত খাবারে পরিণত হয়েছে, আর সে কারণেই এ ধরনের রেসিপির নামে হংকং জুড়ে থাকে।
হংকংয়ের ডেজার্টের দোকান ও আমের মিষ্টান্ন
হংকংয়ে ডেজার্টের দোকানের ঐতিহ্য বেশ পুরোনো। ক্যান্টনিজ শব্দ 'টং সুই'-এর আক্ষরিক অর্থ 'চিনির পানি'; দক্ষিণ চীন, হংকং ও ম্যাকাওয়ে খাবারের শেষে পরিবেশন করা মিষ্টি স্যুপ, যেমন লাল শিমের স্যুপ, কালো তিলের স্যুপ ও মিষ্টি বাদামের স্যুপ, এই নামে পরিচিত। হংকংয়ে টং সুইয়ের দোকান মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাড়তে থাকে, যখন অভিবাসীরা নিজেদের এলাকার মিষ্টি স্যুপ সঙ্গে নিয়ে আসেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমা প্রভাবে তাজা ফলের ডেজার্ট যুক্ত হয়, আর কিছু ভেষজ চায়ের দোকান ডেজার্টের দোকানে পরিণত হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি হুই লাউ শান। বিশ্বকোষে থাকা এর ইতিহাস অনুযায়ী, হুই চি-ইউক ষাটের দশকে হংকংয়ের নিউ টেরিটরিজের ইউয়েন লংয়ে কচ্ছপ জেলি ও ভেষজ চা বিক্রির একটি দোকান হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। আশির দশকে দোকানটি ডেজার্ট ও হালকা খাবার যোগ করে, আর নব্বইয়ের দশকে পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের মালিক আম ও সাগু দিয়ে একটি ডেজার্ট তৈরি করেন। চেইনটি চীনের মূল ভূখণ্ড, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শাখা খোলে, এবং বছরে এক হাজার টন পর্যন্ত কারাবাও আম, অর্থাৎ ফিলিপাইনের একটি জাত, ব্যবহার করত বলে জানা যায়।
আমভিত্তিক আরেকটি ঠান্ডা হংকং ডেজার্ট হলো ম্যাঙ্গো পোমেলো সাগো, ক্যান্টনিজে যার নাম 'ইয়েউং জি গাম লো'। এতে থাকে তাজা আম, জাম্বুরা, সাগুদানা, নারকেলের দুধ এবং ইভাপোরেটেড মিল্ক বা ক্রিম। বলা হয়ে থাকে, হংকংয়ের রেস্তোরাঁ চেইন লেই গার্ডেন ১৯৮৪ সালে সিঙ্গাপুরে প্রথম শাখা খোলার সময় এটি উদ্ভাবন করে, আর প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান শেফ ওং উইং-চি রেসিপিটি নিজের বলে দাবি করেছেন।
সবচেয়ে পরিচিত সম্ভবত ম্যাঙ্গো পুডিং। এটি হংকংয়ের জনপ্রিয় ডেজার্ট, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ম্যাকাও ও দক্ষিণ চীনেও পাওয়া যায়। এটি ঠান্ডা পরিবেশন করা হয় এবং প্রায়ই ডিম সামের অংশ হিসেবে আসে। রেস্তোরাঁয় এটি তৈরি হয় আগার বা জেলাটিন, আম, ইভাপোরেটেড মিল্ক ও চিনি দিয়ে, কখনো ওপরে তাজা ফল দিয়ে সাজানো হয়; কারখানায় তৈরি সংস্করণে তাজা আমের বদলে ম্যাঙ্গো এসেন্স ব্যবহার করা হয়। ম্যাঙ্গো প্যানকেক ঠান্ডা, ক্রিমি, আমপ্রধান এই মিষ্টান্নের পরিবারেরই সদস্য, আর এসবিএসকে দেওয়া কনি চুংয়ের বক্তব্য এর জন্মকে সরাসরি ম্যাঙ্গো পুডিংয়ের সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করে।

প্যানকেক ও ক্রিম: দুই অংশের কারিগরি
এই ডেজার্টের প্যানকেকটি ফরাসি ক্রেপের কাছাকাছি। ক্রেপ হলো খামিরবিহীন ব্যাটারে তৈরি পাতলা প্যানকেক, যা ফ্রাইপ্যান বা তাওয়ায় ভাজা হয়। প্রচলিত ফরাসি ক্রেপের ব্যাটারে থাকে ময়দা, ডিম, দুধ, লবণ ও মাখন, চিনি ঐচ্ছিক; ব্যাটার বেশ তরল রাখা হয় যাতে তা পাতলা স্তরে ছড়িয়ে যায়, আর প্রতিটি পিঠ ভাজতে মোটামুটি ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড লাগে। মিষ্টি ক্রেপের ভেতরে সাধারণত জ্যাম, চিনি, লেবুর রস, ফেটানো ক্রিম, কাস্টার্ড বা নরম ফলের টুকরা দেওয়া হয়। ম্যাঙ্গো পিলোর রেসিপিও একই ধারণা অনুসরণ করে ময়দা, কর্নফ্লাওয়ার, ডিম, চিনি, দুধ ও মাখনের পাতলা ব্যাটারে; তবে প্রতিটি প্যানকেক কেবল এক পিঠ ভাজা হয়, নিচের দিক হালকা বাদামি হলেই তুলে ফেলা হয়।
ফিলিংয়ের মূল ভিত্তি ফেটানো ক্রিম। ফেটানোর জন্য সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ বাটারফ্যাটযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা হয়, কারণ এর চর্বিকণাগুলো বাতাসের বুদ্বুদ ধরে রাখতে সাহায্য করে; ফেটানোর পর ক্রিমের আয়তন মোটামুটি দ্বিগুণ হয়। ক্রিম ও সরঞ্জাম ঠান্ডা রাখলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়, আর সে কারণেই রেসিপিতে ঠান্ডা ক্রিমের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফেটানো থামাতেও হয় সময়মতো: বেশিক্ষণ ফেটালে চর্বিকণাগুলো জোড়া লেগে যায়, ফেনা ভেঙে পড়ে এবং ক্রিম মাখনে পরিণত হয়।
ফেটানো ক্রিম ইউরোপের পুরোনো একটি পদ। এর প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ মেলে ষোড়শ শতকে, তখন একে 'দুধের তুষার' বা 'ক্রিমের তুষার' জাতীয় নামে ডাকা হতো; ১৫৪৯ সালে ক্রিস্তোফোরো দি মেসিসবুগো এবং ১৫৭০ সালে বার্তোলোমেও স্কাপ্পির ইতালীয় রান্নার বইয়ে এর রেসিপি পাওয়া যায়। উনিশ শতক পর্যন্ত উইলো বা নলখাগড়ার ডাল দিয়ে এটি ফেটানো হতো; তখনই সেন্ট্রিফিউজে ক্রিম আলাদা করার পদ্ধতি বেশি চর্বিযুক্ত ক্রিম তৈরি সহজ করে দেয়। 'ক্রেম শান্তিই' নামটি উনিশ শতকে প্রচলিত হয় এবং ফ্রান্সের শান্তিই প্রাসাদের সঙ্গে যুক্ত।
২০২৫ সালের জুনের মৌসুমে কোন আম
রেসিপিতে ভালোভাবে পাকা ও মিষ্টি আম নিতে বলা হয়েছে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ২২ জুন, তখন দেশের বেশ কয়েকটি পরিচিত জাতের আম বাজারে ছিল। ২০২৫ সালের ৭ মে রাজশাহী জেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে কৃষি কর্মকর্তা, আমচাষি, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের নিয়ে এক সভায় সে বছরের 'আম ক্যালেন্ডার' ঠিক করে, অর্থাৎ কোন জাতের আম কোন তারিখ থেকে পাড়া যাবে। উদ্দেশ্য ছিল, চাষিরা যেন নিরাপদ, রাসায়নিকমুক্ত ও পরিপক্ব আম সংগ্রহ করেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ক্যালেন্ডারের তারিখগুলো ছিল:
- সব ধরনের আগাম (গুটি) আম: ১৫ মে থেকে
- গোপালভোগ: ২০ মে থেকে
- রানীপছন্দ বা লক্ষ্মণভোগ: ২৫ মে থেকে
- হিমসাগর বা খিরসাপাত: ৩০ মে থেকে
- ল্যাংড়া: ১০ জুন থেকে
- আম্রপালি ও ফজলি: ১৫ জুন থেকে
- বারি আম-৪: ৫ জুলাই থেকে
- আশ্বিনা: ১০ জুলাই থেকে
- গৌড়মতি: ১৫ জুলাই থেকে
- কাটিমন ও বারি আম-১১: সারা বছর
অর্থাৎ রেসিপিটি প্রকাশের সময় রাজশাহীতে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি সবই পাড়ার সময় হয়ে গিয়েছিল। একই সভায় জেলায় আমবাগানের আয়তন ধরা হয় ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১৩.২৬ টন, সম্ভাব্য উৎপাদন ২ লাখ ৬০ হাজার ৬ টন এবং সম্ভাব্য বিক্রি ১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ক্যালেন্ডারের শুরুর তারিখ ২০২২ সালে ছিল ১৩ মে, ২০২৩ সালে ৪ মে এবং ২০২৪ সালে ১৫ মে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে চাষিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে আগে আম পাড়তে পারবেন বলেও জানানো হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত আছে। এর অভিজাত জাতের তালিকায় রয়েছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, আশ্বিনা, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ ও মিছরিভোগ; আর স্বীকৃত জাতের নাম নেই এমন বীজের গাছের আম পরিচিত দেশি বা গুটি আম নামে। বাণিজ্যিক অভিজাত জাতগুলোর চাষ মূলত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে। পাকা আম টুকরা বা শাঁস হিসেবে তাজা খাওয়া হয়, কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর দুই রকম আম দিয়েই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়, যে আচারের কথা দিয়ে জাগো নিউজের রেসিপির শুরু।

বাংলাদেশে আম: ডেজার্টের পেছনের ফসল
আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা, এটি কাজুবাদামের পরিবার অ্যানাকার্ডিয়েসির সদস্য। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এর আদি নিবাস উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল, যার মধ্যে বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমার রয়েছে। ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত সফর করা চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংকে বাইরের দুনিয়ার কাছে আমকে প্রথম পরিচিত করানোর কৃতিত্ব দেওয়া হয়। মোগল সম্রাট আকবর দারভাঙ্গার কাছে লাখবাগ নামে একটি বাগানে প্রায় এক লাখ আমগাছ লাগিয়েছিলেন বলে জানা যায়, যাকে উপমহাদেশের প্রথম সুসংগঠিত আমবাগান ধরা হয়। ইংরেজি 'ম্যাঙ্গো' শব্দটি এসেছে একটি তামিল নাম থেকে, যা পর্তুগিজরা পশ্চিম ভারতে গ্রহণ করেছিল।
আমগাছে ফুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চে। এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া থাকলে ফল কম ধরে; ফল বড় হওয়ার সময় হালকা বৃষ্টি উপকারী, কিন্তু ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কাঁচা আম ঝরে পড়তে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে আমের বংশবিস্তার, উৎপাদন ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা চালায়।
এই রেসিপি প্রকাশের এক মাস আগে, ২০২৫ সালের ২১ মে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, দেশে বছরে প্রায় ২৭ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এ খবর দিয়েছিল। তাঁর দেওয়া হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩২১ টন। তিনি আরও জানান, ২৮ মে চীনে প্রথমবারের মতো আম রপ্তানি শুরু হবে এবং মৌসুমে প্রায় ৫০ টন পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২৭ মে জানায়, বাংলাদেশ ২০১৯ সালে চীনে আম রপ্তানির আবেদন করেছিল এবং চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশি আমের রপ্তানি নিবন্ধন দেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান পত্রিকাটিকে বলেন, সব ঠিক থাকলে প্রথম চালান পরদিনই প্রস্তুত হবে।
এর দুই বছর আগে, ২০২৩ সালের মে মাসে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৮টি দেশে ১ হাজার ৭৫৭ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তম কৃষি চর্চা (জিএপি) সনদ দেওয়ার সক্ষমতা তখন দেশে না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার মূলধারার সুপারশপে বাংলাদেশের আম পাঠানো যাচ্ছিল না, আর রপ্তানিযোগ্য আমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২২ থেকে ২০২৭ মেয়াদে ১৫ জেলার ৪৬ উপজেলায় ৪৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
পুষ্টিগুণ ও চিনির পরিমাণ
এই ডেজার্টে আম সত্যিকারের পুষ্টি যোগ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা (রান্না না করা) পাকা আমে থাকে প্রায় ৬০ কিলোক্যালরি, ৮৩.৫ গ্রাম পানি, ১৫ গ্রাম শর্করা, যার মধ্যে ১৩.৭ গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি, ১.৬ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ০.৮ গ্রাম আমিষ ও ০.৪ গ্রাম চর্বি। একই পরিমাণ আমে আছে ৩৬.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল অ্যাকটিভিটি ইকুইভ্যালেন্ট হিসেবে, যার বড় অংশ আসে ৬৪০ মাইক্রোগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন থেকে, আমের শাঁসের কমলা রং এরই), ৪৩ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট ও ১৬৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম।
ডেজার্টের বাকি অংশ বেশ সমৃদ্ধ। হুইপিং ক্রিমে চর্বি বেশি, আর রেসিপিতে ব্যাটারে এক টেবিল চামচ চিনি ও ক্রিমে দুই টেবিল চামচ আইসিং সুগার দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০১৫ সালের চিনিবিষয়ক নির্দেশিকা প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম 'ফ্রি সুগার' গ্রহণের জোরালো সুপারিশ করে, এবং বলে যে তা ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে মোটামুটি ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচে নামাতে পারলে আরও উপকার মিলবে। ফ্রি সুগার বলতে বোঝায় রাঁধুনি বা প্রস্তুতকারক খাবার ও পানীয়ে যে চিনি যোগ করেন, সেই সঙ্গে মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি; তাজা ফল ও দুধে থাকা চিনি এই নির্দেশিকার আওতায় পড়ে না।
সেই হিসাবে এই ডেজার্টের চিনির হিসাব আসে যোগ করা চিনি থেকে, আম থেকে নয়। রেসিপিতেই তা কমানোর উপায় বলা আছে: মিষ্টি কম চাইলে ক্রিমে আইসিং সুগার না দিলেও চলে, আর ভালো পাকা আম নিজেই মিষ্টতা দেয়। এই বালিশগুলোকে রোজকার নয়, মাঝেমধ্যের নাস্তা হিসেবে ধরাই ভালো। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা চিকিৎসকের দেওয়া নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা মেনে চলা কেউ এমন ডেজার্ট কীভাবে খাবেন, তা চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
রান্নাঘরে নিরাপদ রাখার নিয়ম
ডেজার্টটিতে দুধের ক্রিম, ডিমের রান্না করা ব্যাটার আর কাঁচা ফল একসঙ্গে থাকে এবং এটি ঠান্ডা পরিবেশন করা হয়, তাই খাদ্য স্বাস্থ্যবিধির মৌলিক নিয়মগুলো জরুরি, বিশেষ করে বাংলাদেশের গরমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি', যা সংস্থাটির আমেরিকা অঞ্চলের দপ্তর প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (পাহো) ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আবার তুলে ধরে, এখানে সরাসরি প্রযোজ্য:
- নিরাপদ পানি ও উপকরণ ব্যবহার করুন: তাজা ও ভালো খাবার এবং পাস্তুরিত দুধের মতো নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিন, ফল ধুয়ে নিন (বিশেষ করে যে ফল কাঁচা খাওয়া হয়, যেমন এখানে আম ও পুদিনা পাতা), আর মেয়াদ পেরোনো কিছু ব্যবহার করবেন না।
- হাত, বাসনপত্র ও কাজের জায়গা পরিষ্কার রাখুন: খাবার ধরার আগে এবং রান্নার সময় বারবার হাত ধুয়ে নিন, ব্যবহৃত সব জায়গা ও সরঞ্জাম পরিষ্কার করুন।
- খাবার ভালোভাবে রান্না করুন, বিশেষ করে ডিম, মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার; এই রেসিপিতে ডিমটি প্যানকেকের ব্যাটারের সঙ্গে রান্না হয়ে যায়।
- খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন: রান্না করা খাবার দুই ঘণ্টার বেশি ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখবেন না, রান্না করা ও দ্রুত নষ্ট হয় এমন খাবার দ্রুত ফ্রিজে রাখুন (সম্ভব হলে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে), আর ফ্রিজেও খুব বেশি দিন রাখবেন না।
- কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন: কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবারের জন্য আলাদা ছুরি ও বোর্ড ব্যবহার করুন এবং খাবার ঢাকনাওয়ালা পাত্রে রাখুন।
বাস্তবে এর মানে হলো ফ্রিজ থেকে সরাসরি বের করা ক্রিম ফেটানো, পরিষ্কার জায়গায় বালিশগুলো গড়া, রেসিপির কথামতো ৩০ মিনিটের জন্য আবার ফ্রিজে রাখা, এবং পুরো বিকাল বাইরে ফেলে না রেখে ঠান্ডা থাকতেই খেয়ে ফেলা।
ছবি: Charles Haynes / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (রেসিপির তথ্যসূত্র রেসিপিটিন ইটস), এসবিএস ফুড, বাংলাপিডিয়া, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)