২০২৬ সালের জুনে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে আয়োজিত তিন দিনের জাতীয় ফল মেলায় দেশের নানা অঞ্চলের জনপ্রিয় ও বিরল জাতের ফল ক্রেতা-দর্শনার্থীদের টানে। মেলার দ্বিতীয় দিন শুক্রবার, ১৯ জুন, নরসিংদীর বিখ্যাত ‘ঘোড়াশাল’ আনারস, ‘থ্রি টেস্ট’ নামের একটি আম আর জাপানি জাতের মিয়াজাকি আম ছিল আগ্রহের কেন্দ্রে; তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় দেশি জাতের আম।
মেলার আয়োজন ও পরিসর
‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’ প্রতিপাদ্য নিয়ে জাতীয় ফল মেলা-২০২৬ শুরু হয় ১৮ জুন বৃহস্পতিবার, চলে ২০ জুন শনিবার পর্যন্ত। আমার সংবাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ব্যবস্থাপনায় মেলাটির আয়োজন করা হয়। লক্ষ্য ছিল দেশি ফলের উৎপাদন বাড়ানো, সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্প্রসারণ, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফল রপ্তানির সম্ভাবনা তুলে ধরা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড উদ্বোধনের দিন জানায়, মেলায় দেশি-বিদেশি ১০০টির বেশি ফল প্রদর্শিত হয় এবং স্টল ছিল ৭৮টি; জাগো নিউজের হিসাবে স্টলের সংখ্যা ছিল ৬৭টি। ডিএইর স্টলে প্রায় ৫০টি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ফলের প্রজাতি দেখানো হয়, যার মধ্যে ছিল কাউফল, ডেউয়া, গাব, আতা, বিলিম্বি ও লুকলুকি।

দেশি আমের বিক্রিই সবচেয়ে বেশি
১৯ জুন মেলা প্রাঙ্গণের স্টলগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল। ক্রেতারা ৫, ১০, এমনকি ২০ কেজি করেও আম কেনেন। জাগো নিউজ জানায়, হিমসাগর, গোপালভোগ, আম্রপালি ও ল্যাংড়া জাতের আম আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বাবুল আহমেদ সেদিন ২০ কেজি আম কেনেন। তিনি বলেন, প্রতিবছর ফল মেলার জন্য অপেক্ষা করেন, মেলা এলে বেশি করে আম কিনে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করেন, আর এখানে দাম তুলনামূলক কিছুটা কম।
মেলায় ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাগ ফজলি, বারি-৪, হাড়িভাঙা ও সূর্যপুরীর মতো দেশি জাতের পাশাপাশি থাই কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, মিয়াজাকি ও অ্যাপল ম্যাঙ্গোর মতো বিদেশি ও উন্নত জাতের আমও প্রদর্শিত হয়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ১৫ জুন ২০২৬ প্রকাশিত এক নিবন্ধ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ প্রজাতির ফল আছে, যার প্রায় ৭০টি বাণিজ্যিক ও বসতবাড়ি পর্যায়ে চাষ হয়। ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ২৮তম এবং আম উৎপাদনে ৭ম; বছরে দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ১০০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত হলেও দেশে ফলের প্রাপ্যতা মাত্র ৯৫ গ্রাম, আর মোট ফলের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপাদিত হয় মে থেকে আগস্টের চার মাসে।

নরসিংদীর ‘ঘোড়াশাল’ আনারস
মেলায় অংশ নেওয়া ন্যাচারস ফ্রুটের মালিক হাবিবুর রহমান নরসিংদীর পলাশ উপজেলার রাবান গ্রাম থেকে ‘ঘোড়াশাল’ জাতের আনারস নিয়ে আসেন। মিষ্টি স্বাদ, সুঘ্রাণ ও রসে ভরা এই আনারস দেখতে তাঁর স্টলে ভিড় জমে। হাবিবুর রহমান জানান, নরসিংদীতে এই আনারসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে; স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তিনি ঢাকায় বাজার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। তাঁর ভাষায়, দেশের অনেক জায়গার আনারস খেয়েছেন, তবে এমন মিষ্টি আনারস খুব কমই পাওয়া যায়।
পলাশ নরসিংদী জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা, আর ঘোড়াশাল এই উপজেলার পৌরসভা। নরসিংদী জেলা ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, পুরোনো ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার প্লাবনভূমিতে অবস্থিত।
ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ‘থ্রি টেস্ট’ ও মিয়াজাকি
আলহামদুলিল্লাহ এগ্রোর স্টলে ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল ‘ব্যানানা ম্যাঙ্গো’ ঘিরে। ক্রেতা সামসুদ্দিন জানান, বাজারে ব্যানানা ম্যাঙ্গো সাধারণত কেজি ১৫০ থেকে ২০০ টাকার নিচে মেলে না, অথচ মেলায় ১০০ টাকায় ভালো মানের আম পাওয়া যাচ্ছিল। স্টলটির উদ্যোক্তা মুরাদ শেখ দর্শনার্থীদের ‘থ্রি টেস্ট’ নামের একটি জাত দেখান। তিনি বলেন, এই আম কাঁচা অবস্থাতেই বেশ মিষ্টি, খোসাসহ খাওয়া যায় এবং পাকলেও স্বাদ ভালো থাকে। আগের দিন ১১০ টাকা কেজি দরে আনা সব আম বিক্রি হয়ে যায়; দিনাজপুরে তাঁরা এই আমসহ বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম চাষ করেন।
জাপানি জাতের মিয়াজাকি আম কয়েকটি স্টলে প্রদর্শিত হলেও বিক্রি করছিল কেবল মাস্টার এগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্টলের বিক্রয়কর্মী জানান, রাজশাহীর বাগানে চাষ হওয়া মিয়াজাকি প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। শাহরিয়ার এন্টারপ্রাইজের স্টলে মিয়াজাকি, দকমাই, চিয়ানমাই ও রেড পামারসহ বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম দেখানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আনসার আলী জানান, তাঁরা ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কাটিমন ও বারি-৪ জাতের আমের বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জাতের চাষও বাড়াবেন।
বাংলা ট্রিবিউনের ২০২৬ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদনে মিয়াজাকিকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমগুলোর একটি বলা হয়। জাপানে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত এই আমের প্রিমিয়াম গ্রেডের নাম ‘তাইয়ো নো তামাগো’ বা ‘এগ অব দ্য সান’। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মিয়াজাকি আমের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি।

ছবি: Mashkawat.ahsan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, আমার সংবাদ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), বাংলা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)