রসুন শুধু রান্নার স্বাদ ও গন্ধ বাড়ানোর মসলা নয়, বহুদিন ধরে এটি ভেষজ গুণের জন্যও পরিচিত। ভাজাভুজি, মাছ-মাংসের ঝোল, স্যুপ কিংবা আচার, প্রায় সব রান্নাতেই রসুন লাগে, আর অনেকে প্রতিদিন সকালে কাঁচা রসুনও খান। ২০২৬ সালের ১০ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রসুনের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং রসুন খাওয়ার সঠিক নিয়ম নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, রসুন রক্তে শর্করা সামান্য কমাতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়।
ডায়াবেটিস ও রসুন: গবেষণা যা বলে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ব্যাখ্যায়, ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা হয় যখন অগ্ন্যাশয় যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করে না, অথবা শরীর তৈরি হওয়া ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। সংস্থাটির মতে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় জীবনযাপনের পরিবর্তনের পাশাপাশি ওষুধ লাগে, যেমন মেটফরমিন, সালফোনিলইউরিয়া ও এসজিএলটি-২ ইনহিবিটর।
রসুন নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ বেড়েছে। ২০১৭ সালে ‘ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৭৬৮ জন রোগীর ওপর করা ৯টি র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিচার করা হয়। দেখা যায়, রসুনের সাপ্লিমেন্ট নেওয়া দলে খালি পেটে রক্তের শর্করা, গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c) ও কোলেস্টেরল তুলনামূলকভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘নিউট্রিশন অ্যান্ড মেটাবলিক ইনসাইটস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় ৮টি গবেষণা বিশ্লেষণ করেও শর্করা ও HbA1c কমার ইঙ্গিত মেলে, তবে গবেষকেরা লেখেন যে অন্তর্ভুক্ত গবেষণাগুলোর মান কম, তাই আরও ভালো মানের পরীক্ষা দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের (NIH) অংশ ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (NCCIH) বিষয়টির সারকথা এভাবে বলেছে: রসুনের সাপ্লিমেন্ট ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করা সামান্য পরিমাণে কমাতে পারে। একই সংস্থা জানায়, উচ্চ কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সামান্য। লক্ষ করার বিষয়, এসব গবেষণার বেশির ভাগই রসুনের সাপ্লিমেন্ট নিয়ে, রান্নাঘরের রসুন নিয়ে নয়।

থেঁতো করে কিছুক্ষণ রেখে দেওয়ার কারণ
অনেকে মনে করেন, রসুনের কোয়া ছাড়িয়ে খেয়ে ফেললেই সব উপকার মেলে। বিষয়টি একটু ভিন্ন। অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির লিনাস পাউলিং ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, রসুনে অ্যালিন নামে একটি সালফারযুক্ত উপাদান আর অ্যালিনেজ নামে একটি এনজাইম থাকে। কাঁচা রসুন থেঁতো করলে, কুচি করলে বা চিবালে এনজাইমটি অ্যালিনকে অ্যালিসিনে রূপান্তর করে, আর এই রূপান্তর থেঁতো করার ১০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের মধ্যেই শেষ হয়।
সমস্যা হয় তাপে। ইনস্টিটিউটটি জানায়, খোসাসহ আস্ত রসুন মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে অ্যালিনেজ এনজাইম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। তবে রসুন থেঁতো করে ১০ মিনিট রেখে তারপর তাপ দিলে এর কার্যকারিতা আংশিকভাবে রক্ষা পায়। জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনেও একই পরামর্শ ছিল:
- রসুনের খোসা ছাড়িয়ে কুচি বা থেঁতো করুন।
- প্রায় ১০ মিনিট খোলা অবস্থায় রেখে দিন।
- এরপর কাঁচা খেতে পারেন, অথবা রান্নায় দিতে পারেন।
কাঁচা রসুনের ঝাঁজ যাঁদের সহ্য হয় না, তাঁরা রান্নায় মিশিয়ে খেতে পারেন। দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপে রান্না করলে রসুনের অ্যালিসিন তৈরির ক্ষমতার একটা অংশ নষ্ট হয়, তাই থেঁতো করে কিছুক্ষণ রেখে তারপর রান্নায় দেওয়াই ভালো।

কাদের সতর্ক থাকা দরকার
খাবারের স্বাভাবিক পরিমাণে রসুন সাধারণত নিরাপদ। NCCIH জানায়, মুখে খাওয়া রসুন ৭ বছর পর্যন্ত চলা গবেষণাতেও নিরাপদে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে: মুখে ও শরীরে গন্ধ, পেটব্যথা, পেট ফাঁপা ও বমিভাব। লিনাস পাউলিং ইনস্টিটিউট বুকজ্বালা, ঢেকুর, বমি ও ডায়রিয়ার কথাও উল্লেখ করেছে। তাই যাঁদের অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা আছে, তাঁরা নিয়মিত কাঁচা রসুন খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। কাঁচা রসুন ত্বকে লাগালে মারাত্মক জ্বালা ও পোড়া হতে পারে।
রক্তক্ষরণের ঝুঁকিই সবচেয়ে বড় সতর্কতা। NCCIH-এর মতে, রসুনের সাপ্লিমেন্ট রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে; লিনাস পাউলিং ইনস্টিটিউট জানায়, এটি ওয়ারফারিনের মতো রক্ত পাতলা করার ওষুধের প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। যাঁরা রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা অ্যাসপিরিন খান, কিংবা যাঁদের শিগগির অস্ত্রোপচার হবে, তাঁদের রসুনের সাপ্লিমেন্ট বা বেশি পরিমাণে রসুন খাওয়ার আগে চিকিৎসককে জানাতে হবে। অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে খাবারের স্বাভাবিক পরিমাণের চেয়ে বেশি রসুন নিরাপদ নাও হতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মূল কথা হলো, রসুন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বা নিয়মের বিকল্প নয়। রসুন খাচ্ছেন বলে কোনো ওষুধ কমানো বা বন্ধ করা যাবে না; খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনতে চাইলে বা সাপ্লিমেন্ট নিতে চাইলে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ছবি: Dubravko Sorić SoraZG on Flickr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (NCCIH), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির লিনাস পাউলিং ইনস্টিটিউট, ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন রিসার্চ (২০১৭), নিউট্রিশন অ্যান্ড মেটাবলিক ইনসাইটস (২০২৬)




মন্তব্য
(০)