ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ গত এক দশকে বড় অগ্রগতি করলেও উৎপাদিত ফলের বড় একটি অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয়কে সম্পদে রূপ দেওয়ার তাগিদ দিয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন জাগো নিউজে একটি কলাম লেখেন সংবাদমাধ্যমটির ডেপুটি এডিটর, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ড. হারুন রশীদ। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশ ফল উৎপাদনের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে; এখন উৎপাদনের অর্থনীতিকে মূল্য সংযোজনের অর্থনীতিতে রূপ দিতে হবে।
কলামটি লেখা হয় জাগো নিউজ আয়োজিত 'ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের পর। ২৭ জুন শনিবার ঢাকার বাড্ডায় সংবাদমাধ্যমটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বক্তারা জানান, পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ফল নষ্ট হয়। ফল বিশেষজ্ঞ ও বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ এই হিসাবের ব্যাখ্যা দেন: বছরে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন টন ফল নষ্ট হলে কেজিপ্রতি গড় দাম ৫০ টাকা ধরলে ক্ষতি অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা, আর গড় দাম ১০০ টাকা ধরলে তা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। বৈঠকে ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়।
উৎপাদন বেড়েছে, চাপ মৌসুমে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার টন ফল উৎপাদিত হয়, যার চাষ হয় ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ হেক্টর জমিতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই উৎপাদন ছিল ৯৯ লাখ ৭২ হাজার টন। জাগো নিউজের ২৭ জুনের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, আমে সপ্তম ও পেয়ারায় অষ্টম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে ওই প্রতিবেদন জানায়, এক দশক আগে দেশে উৎপাদিত ফলের সংখ্যা ছিল ৫৬টি, যা বেড়ে ৭৮টিতে দাঁড়িয়েছে।
সমস্যাটি মৌসুমে। কলামে বিশেষজ্ঞদের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হলেও এর প্রায় ৬৫ শতাংশ মাত্র চার মাসে বাজারে আসে। এতে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়ে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, অনেক সময় উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে হয়। ডিএই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সতর্ক করে যে পর্যাপ্ত হিমাগার ও পরিবহন অবকাঠামোর অভাবে পেঁপে ও পেয়ারার মতো ফলের ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ নষ্ট হয়।

কাঁচা ফল নয়, প্রক্রিয়াজাত পণ্যে লাভ
হারুন রশীদের মতে, সমস্যাটি কেবল কারখানার অভাব নয়, বরং সমন্বয়হীনতা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও তা অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছায় না; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি শিল্পের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি লেখেন, কৃষকের আয় এখনও মূলত কাঁচা পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। কাঁচা আম বিক্রিতে আয় সীমিত থাকে, কিন্তু সেই আম পাল্প, জুস, ম্যাঙ্গো বার বা আমসত্ত্বে রূপ নিলে একই কাঁচামাল থেকে কয়েক গুণ বেশি মূল্য তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের কথা বলেন, যারা ফলকে শিল্পে পরিণত করেছে।
কলামে রাজশাহী অঞ্চলের প্রসঙ্গও আসে। লেখকের ভাষায়, সেখানে এবার আমের উৎপাদন রেকর্ড হলেও প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক কৃষক প্রত্যাশিত দাম পাননি। গোলটেবিল বৈঠকে খাতসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, রপ্তানি প্রণোদনা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করায় প্রক্রিয়াজাত শিল্প চাপে আছে।

কলামে যেসব প্রস্তাব
রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক মান, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, ট্রেসেবিলিটি, আধুনিক প্যাকেজিং ও কোল্ড চেইনের সীমাবদ্ধতায় বাংলাদেশ সেই বাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বলে লেখক মনে করেন। এ খাত এগিয়ে নিতে তাঁর প্রস্তাবগুলো হলো:
- ফল উৎপাদন এলাকায় বিশেষ ক্লাস্টার, যেখানে হিমাগার, সংগ্রহ কেন্দ্র, পরীক্ষাগার, প্রক্রিয়াজাত কারখানা ও রপ্তানি সুবিধা একসঙ্গে থাকবে
- প্রক্রিয়াজাত শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের ঋণ, কর-সুবিধা ও প্রযুক্তি আমদানিতে প্রণোদনা
- আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সহায়তা
- বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর
লেখকের মতে, এই খাত নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গেও যুক্ত। সঠিক নীতি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প আগামী দশকে দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ (ড. হারুন রশীদের কলাম, ৩০ জুন ২০২৬; গোলটেবিল বৈঠক ও ফল উৎপাদন বিষয়ক প্রতিবেদন, ২৭ জুন ২০২৬), ফ্রেশপ্লাজা, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস





মন্তব্য
(০)