২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক ফিচারে বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি দেখা "ফার্মের মুরগি" বা ব্রয়লারের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। দামে তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় এই মুরগি মধ্যবিত্তের খাবারের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিবেদনের মূল কথা ছিল, ব্রয়লার কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো আলাদা প্রজাতি নয়; বনের এক পাখির হাজার বছরের গৃহপালন আর কয়েক দশকের বাছাই প্রজননের ফল এটি।
জঙ্গলের পাখি থেকে গৃহপালিত মুরগি
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গৃহপালিত মুরগির মূল পূর্বপুরুষ রেড জাঙ্গলফাউল (Gallus gallus)। পাখিটির প্রাকৃতিক বিস্তার পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ চীন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ২০২০ সালের এক জিনোম গবেষণা বলেছে, সব গৃহপালিত মুরগির উৎস এই প্রজাতির G. g. spadiceus উপপ্রজাতি, যার বিস্তার উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে দক্ষিণ চীন ও মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত।
কবে পোষ মানানো শুরু, তা নিয়ে গবেষকদের মত এক নয়। ২০২০ সালের ওই গবেষণা সময়টি প্রায় সাড়ে নয় হাজার বছর আগে ধরেছিল। অন্যদিকে ২০২২ সালে জার্মানির লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়োরিস পিটার্সের নেতৃত্বে এক আন্তর্জাতিক গবেষণা জানায়, নিশ্চিতভাবে চেনা সবচেয়ে পুরোনো মুরগির হাড় মিলেছে মধ্য থাইল্যান্ডের বান নন ওয়াত নামের এক ধানচাষের প্রত্নস্থলে, যার বয়স মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ১৬৫০ থেকে ১২৫০ সাল। গবেষকদের ব্যাখ্যা, শুকনো জমির ধান ও মিলেট জাতীয় শস্যের টানে বুনো পাখিরা মানুষের কাছাকাছি আসে এবং এভাবেই পোষ মানে।
শুরুতে মুরগি শুধু খাবার ছিল না। ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন প্রত্নস্থলে মানুষের কবরে পূর্ণবয়স্ক মুরগির কঙ্কাল রাখা হতো। জাগো নিউজের প্রতিবেদনেও বলা হয়, অনেক অঞ্চলে ধর্মীয় আচার, বিনোদন ও মোরগ লড়াইয়ের জন্য মুরগি পালন করা হতো। পরে মানুষ বেশি ডিম দেওয়া ও দ্রুত বাড়ন্ত পাখি বেছে বেছে প্রজনন করতে থাকে।
ডেলাওয়ারের এক ভুল চালান আর "চিকেন অব টুমরো"
বাণিজ্যিক ব্রয়লার শিল্পের জন্মস্থান ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের সাসেক্স কাউন্টির ওশান ভিউকে। ১৯২৩ সালে সেখানকার খামারি সিসিল লং স্টিল নিজের মুরগির ঝাঁক পূরণ করতে ৫০টি বাচ্চার অর্ডার দিয়েছিলেন, কিন্তু ভুলবশত হাতে পান ৫০০টি। ডেলাওয়ার পাবলিক আর্কাইভসের ঐতিহাসিক ফলকের লেখা অনুযায়ী, ১৬ সপ্তাহ বয়সে বাচ্চাগুলোর ওজন হয় সোয়া দুই পাউন্ড, আর বিক্রি হয় প্রতি পাউন্ড ৬২ সেন্টে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বেঁচে থাকা ৩৮৭টি মুরগি বিক্রি করে লাভ দেখে ১৯২৪ সালে তিনি উৎপাদন দ্বিগুণ করে ১ হাজারে নেন। স্টিলদের একটি মুরগির ঘর "ফার্স্ট ব্রয়লার হাউস" নামে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব হিস্টোরিক প্লেসেসে তালিকাভুক্ত।
এরপর আসে বাছাই প্রজননের বড় উদ্যোগ। মার্কিন মুদি দোকান চেইন এঅ্যান্ডপি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সঙ্গে মিলে ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত "চিকেন অব টুমরো" প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। চূড়ান্ত পর্ব হয় ১৯৪৮ সালে ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি পরীক্ষা কেন্দ্রে। বিশুদ্ধ জাতের বিভাগে জেতে হেনরি সাগলিওর আর্বার একরস খামারের হোয়াইট রক, আর সামগ্রিকভাবে জেতে ভ্যানট্রেস হ্যাচারির রেড কর্নিশ সংকর।

দ্রুত বাড়ে কেন: হরমোন নয়, প্রজনন ও ব্যবস্থাপনা
উইকিপিডিয়ার ব্রয়লার নিবন্ধ অনুযায়ী, বেশির ভাগ বাণিজ্যিক ব্রয়লার চার থেকে ছয় সপ্তাহ বয়সে জবাইয়ের ওজনে পৌঁছায়, আর ধীরে বাড়ে এমন জাতের লাগে প্রায় ১৪ সপ্তাহ। ডেলাওয়ারের ফলকেও লেখা আছে, ১৯৮৯ সাল নাগাদ খামারিরা অর্ধেক সময়ে দ্বিগুণ ওজনের মুরগি তুলছিলেন।
ফার্মের মুরগি হরমোন দিয়ে বড় করা হয়, এমন ধারণা প্রচলিত। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটির এক্সটেনশন সার্ভিসের এক প্রকাশনা জানায়, দেশটিতে ১৯৫০-এর দশকে পোলট্রি উৎপাদনে হরমোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। প্রকাশনাটির ব্যাখ্যা, বৃদ্ধির হরমোন আসলে প্রোটিন; খাবারের সঙ্গে দিলে পাকস্থলীতেই ভেঙে কার্যকারিতা হারায়। প্রকাশনাটি ব্রয়লারের দ্রুত বৃদ্ধির তিনটি কারণ বলেছে:
- প্রজনন কোম্পানিগুলোর বহু প্রজন্মের জেনেটিক নির্বাচন
- বিভিন্ন জেনেটিক লাইনের উপযোগী করে তৈরি সুষম খাদ্য
- সঠিক তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল, আলো ও খাবারের পাত্রের জায়গাসহ খামারের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশে ব্রয়লার ও পোলট্রি শিল্প
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে একসময় মুরগি পালন ছিল মূলত গ্রামীণ পরিবারের আঙিনার উদ্যোগ; দেশি মুরগি ধীরে বাড়ত, উৎপাদনও ছিল কম। নব্বইয়ের দশকের পর ছোট ও মাঝারি খামারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে এবং ব্রয়লার সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাবারের অংশ হয়ে ওঠে।
২০১৭ সালে এশিয়ান জার্নাল অব পোলট্রি সায়েন্সে প্রকাশিত হামিদ ও সহকর্মীদের এক পর্যালোচনায় এই বদলের হিসাব মেলে। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালে দেশে পোলট্রির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বছরে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, যা ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় বছরে ৪ শতাংশে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যিক পোলট্রিতে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়, যা পরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (বার্ড ফ্লু) প্রাদুর্ভাবের কারণে কমে আসে। নব্বইয়ের দশকে খাতটিতে মোট বিনিয়োগ ছিল ১৫ হাজার মিলিয়ন টাকা, আর পর্যালোচনার সময় তা ১৫০ হাজার মিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছিল। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল বলে লেখকেরা উল্লেখ করেন।

ছবি: Lip Kee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, সায়েন্স নিউজ, ডেলাওয়ার পাবলিক আর্কাইভস, মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, এশিয়ান জার্নাল অব পোলট্রি সায়েন্স, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)