আমজনতার দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল, বুধবার, নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লেখেন, অনলাইনে তিনি যে আমের ব্যবসা করেন, তাতে ভুয়া অর্ডারের কারণে লোকসান হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এভাবে তাঁকে সবচেয়ে বেশি হয়রানি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেই লোকজন, যাঁদের তিনি পোস্টে ‘ভাইয়েরা’ বলে উল্লেখ করেছেন। জাগো নিউজ ২৪ সেদিনই পোস্টটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে; দৈনিক ইত্তেফাকও সেদিন সন্ধ্যায় একই বিবরণ ছাপে, যাতে তাঁর দেওয়া হিসাব এবং দুই মণ গোপালভোগ আমের একটি অর্ডারের ঘটনা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত থানা পর্যন্ত গড়ায়। কোনো প্রতিবেদনেই জামায়াতে ইসলামীর কোনো বক্তব্য ছিল না; পোস্টের দাবিগুলো তাঁর নিজের বিবরণের ওপর দাঁড়িয়ে।
পোস্টের বিবরণ অনুযায়ী, তারেক রহমান এক সময় তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি লেখেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি চাকরির জন্য বারবার চেষ্টা করেছেন, একের পর এক ভাইভা দিয়েছেন, কিন্তু সফল হননি। পরে জীবিকার তাগিদে, জাগো নিউজের ভাষায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে, তিনি আমের ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর বিক্রি চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; দেশের বিক্রেতারা এ ধরনের ব্যবসাকে বলেন এফ-কমার্স, কারণ এ ধরনের ছোট দোকানের বেশির ভাগই চলে ফেসবুক পেজে।
ক্যাশ অন ডেলিভারির অর্ডার নিয়ে তিনি যা লিখেছেন
পোস্টে তিনি এফ-কমার্সে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লেখেন। তাঁর ভাষায়, গত বছর তিনি কিছু পোস্ট বুস্ট করেছিলেন, অর্থাৎ টাকা দিয়ে ফেসবুকে পেজের পোস্টের প্রচার চালিয়েছিলেন, আর ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কোনো অগ্রিম ছাড়াই অর্ডার নিচ্ছিলেন। তখন প্রচুর অর্ডার আসছিল। কিন্তু তাঁর হিসাবে এর প্রায় ১০ শতাংশ ছিল ভুয়া অর্ডার: ক্রেতা ইচ্ছা হলে আম নেবেন, না হলে আর ফোনই ধরবেন না।
এরপর তিনি প্রতিটি অর্ডারে ৫০০ টাকা অগ্রিম নেওয়ার নিয়ম চালু করেন। তিনি লেখেন, এতে অর্ডার কমে যায়, কিন্তু লোকসান বন্ধ হয়।
পোস্টে তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভুয়া অর্ডার দিয়ে সবচেয়ে বেশি হয়রানি করেছেন ‘জামায়াতের ভাইয়েরা’; তাঁর দাবি, রাজনৈতিক বিরোধে টিকতে না পেরে তাঁরা তাঁর ব্যবসার ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লাগেন। দৈনিক ইত্তেফাক বিষয়টি তুলে ধরে এভাবে: রাজনৈতিক বিরোধের কারণে জামায়াতের কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া অর্ডার দিয়ে তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি তাঁর নিজের; প্রতিবেদনগুলোতে তাঁর বিবরণের বাইরে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ বা দলটির কোনো জবাব ছিল না।
দুই মণ গোপালভোগের সেই অর্ডার
বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি অর্ডারের কথা লেখেন। তাঁর বিবরণে, এক দলিল লেখকের স্ত্রী গোপালভোগ আম অর্ডার করে দেখেন, আমগুলো আকারে মাঝারি। পোস্টে তিনি ব্যাখ্যা করেন, গোপালভোগ আকারে একটু ছোটই হয়, তবে খুব মিষ্টি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তাঁর ওপর প্রতিশোধ নিতে ওই নারী দুই মণ আমের অর্ডার দেন, আর তিনিও কোনো অগ্রিম ছাড়াই আম পাঠিয়ে দেন। পরে সেই ক্রেতা আর আম নিচ্ছিলেন না।
তিনি লেখেন, এরপর তিনি থানায় অভিযোগ করেন, আর পুলিশ হয়রানির বিষয়টি বুঝতে পেরে দম্পতিকে ডেকে পাঠায়। পোস্টের বিবরণে, দম্পতি কান্নাকাটি করেন, দুই মণ আম দিয়ে তাঁরা কী করবেন সে প্রশ্ন তোলেন এবং ক্ষমা চান। পুলিশের সামনেই তাঁরা আমের বাক্স খোলেন, আর পরীক্ষা করতে পুলিশ সদস্যরা দুটি আম খান। তিনি লেখেন, আম সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় পুলিশ সদস্যরা ওই দম্পতিকে ১০ কেজি আম দিয়ে বাকি সবটাই দাম দিয়ে নিজেরা রেখে দেন।
দুই পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোস্টে দম্পতির নাম, থানার নাম বা অর্ডারের তারিখ ছিল না, আর কোনো প্রতিবেদনেই দম্পতি বা পুলিশের কোনো বক্তব্য ছিল না। রাজশাহীর আমের বাজারে প্রচলিত হিসাবে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি; ২০২৫ সালের জুনে বাঘা উপজেলার বাগানমালিকেরা দৈনিক ইত্তেফাককে এ কথা জানান। সে সময় দাম পড়ে যাওয়ার মধ্যে তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতি মণে পাঁচ কেজি করে বাড়তি আম নিচ্ছেন, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে ঢলন।
ওই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের মৌসুমে বাঘা বাজারে আমের মণপ্রতি দামও উল্লেখ ছিল: লকনা ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, হিমসাগর ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, ল্যাংড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, ফজলি ৮৫০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং আম্রপালি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। বাগানমালিকেরা জানান, ভরা মৌসুমে ঈদুল আজহার লম্বা ছুটির কারণে ঢাকার বাজারে দাম পড়ে গিয়েছিল, আর আগের বছর উৎপাদন কম থাকায় আম বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর ৯টি উপজেলার মধ্যে শুধু বাঘা উপজেলাতেই ৮ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে; সেখানকার উল্লেখযোগ্য জাতের মধ্যে গোপালভোগ, হিমসাগর, আম্রপালি, ল্যাংড়া, তোতাপুরি, ফজলি, আশ্বিনা ও লক্ষণভোগ রয়েছে।
গোপালভোগ: মৌসুমের প্রথম দিকের আম
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আম (বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica, অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের) ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের, বাংলাদেশসহ, স্থানীয় ফল বলে বিবেচিত; বাংলাপিডিয়া আমকে বলেছে ‘ফলের রাজা’। বাণিজ্যিকভাবে উৎকৃষ্ট জাতের আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে বাংলাপিডিয়া রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুরের নাম করেছে, আর উন্নত জাতের তালিকায় ক্ষীরশাপাত, ল্যাংড়া ও ফজলির সঙ্গে গোপালভোগের নাম রেখেছে। এর বাংলা সংস্করণ বলছে, দেশে প্রায় ১০০ রকমের আমের জাত পাওয়া যায়। জ্ঞানকোষটি জানায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আমগাছে মুকুল আসে, আর এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া থাকলে ফল ধরায় ক্ষতি হয়। পাকা আম টাটকা খাওয়া হয়, কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর কাঁচা-পাকা দুই রকম আম দিয়েই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়।
নামী জাতগুলোর মধ্যে গোপালভোগ সবার আগে বাজারে আসা আমগুলোর একটি। রাজশাহীতে অপরিপক্ব ও রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আম ঠেকাতে জেলা প্রশাসন প্রতিটি জাতের আম পাড়া ও বাজারজাত শুরুর তারিখ বেঁধে দেয়। পোস্টের আগের শেষ মৌসুম, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ ঘোষণা করা হয় ২০২৫ সালের ৭ মে, জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভায়; সেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন বলে দৈনিক ইত্তেফাক জানায়। সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী:
- সব ধরনের গুটি আম ১৫ মে থেকে;
- গোপালভোগ ২০ মে থেকে;
- রানীপছন্দ বা লক্ষণভোগ ২৫ মে থেকে;
- হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাত ৩০ মে থেকে;
- ল্যাংড়া ও বানানা ম্যাঙ্গো ১০ জুন থেকে;
- আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন থেকে;
- বারি আম-৪ ৫ জুলাই থেকে, আশ্বিনা ১০ জুলাই থেকে এবং গৌড়মতি ১৫ জুলাই থেকে;
- সারা বছর ফল দেওয়া কাটিমন ও বারি আম-১১ যেকোনো সময়।
কোনো দুর্যোগ হলে চাষিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে আগাম আম পাড়তে পারবেন বলে সভায় জানানো হয়। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহীতে গুটি আম নামানো শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে ৪ মে এবং ২০২২ সালে ১৩ মে থেকে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরায় আম আসে আরও আগে। দৈনিক ইত্তেফাক ২০২৫ সালের ৪ মে জানায়, মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়ার কারণে সাতক্ষীরার আম দেশের অন্য এলাকার আগে পরিপক্ব হয়; সে বছর জেলা প্রশাসন গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ ৫ মে থেকে, হিমসাগর ২০ মে থেকে, ল্যাংড়া ২৭ মে থেকে এবং আম্রপালি ৫ জুন থেকে বাজারজাতের সময় বেঁধে দেয়। ফলে এপ্রিলের শুরুতে লেখা এই পোস্ট নতুন মৌসুমের প্রথম গোপালভোগ বাজারে আসার কয়েক সপ্তাহ আগের; এতে বর্ণিত অভিজ্ঞতা আগের মৌসুম ও তারও আগের ব্যবসার।

পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের আম
জমির পরিমাণ ও মোট উৎপাদনের হিসাবে আম দেশের এক নম্বর ফল। ২০২৪ সালের মে মাসে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপক ও কৃষি অনুষদের ডিন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস, ২০২৩) তথ্য উদ্ধৃত করে লেখেন: ২০২২-২৩ সালে দেশে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৯৮ হেক্টর জমি থেকে ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৯৩৭ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ১১.৯৬ মেট্রিক টন; আর ২০০০-০১ সালে ৫০ হাজার ৬২৬ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন, হেক্টরপ্রতি ৩.৭৭ মেট্রিক টন। তিনি লেখেন, মোট আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তখন সপ্তম, আর ২০১০ সালে সরকার আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করে।
তাঁর লেখা অনুযায়ী, দেশের সব জেলায় আম চাষ হলেও বাণিজ্যিক চাষের কেন্দ্র ‘আমের রাজধানী’ নামে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সঙ্গে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জেলাগুলো। আম ব্যবসার সমস্যার মধ্যে তিনি বাগান থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থার অপ্রতুলতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্যাকেজিংয়ের অভাব এবং চাষি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সংরক্ষণাগারের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন; আর সম্ভাবনার মধ্যে রাখেন অনলাইনে আম ও আমজাত পণ্যের বিপণনকে।
প্রধান আম অঞ্চলে ব্যবসার আকার বোঝা যায় ডিএইর জেলাভিত্তিক হিসাব থেকে। ২০২৫ সালের মে মাসে রাজশাহীর সেই সভায় জানানো হয়, জেলায় ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে; হেক্টরপ্রতি সম্ভাব্য গড় উৎপাদন ১৩.২৬ টন ধরে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন, আর জেলায় আম বেচাকেনার সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলায় ৪ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৫ হাজার আমবাগান রয়েছে, আর ২০২৫ মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন।

যেভাবে আমের ব্যবসা অনলাইনে গেল
ফেসবুক পেজ ও কুরিয়ারের মাধ্যমে আম বিক্রি তারেক রহমানের পোস্টের বহু বছর আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। ২০২০ সালের জুনে, কোভিড-১৯ মহামারির সময়, দ্য ডেইলি স্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে জানায়, সেখানকার তরুণ ব্যবসায়ীরা ক্রমেই অনলাইনে আম বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন। জেলার ডিএইর উপপরিচালক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেন, ৩০০-র বেশি তরুণ উদ্যোক্তা এই ব্যবসায় যুক্ত। শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুরের এক বিক্রেতা জানান, তিনি আট বছর ধরে গ্রামের বাড়ি থেকে অনলাইনে আমের ব্যবসা করছেন, তাঁর দশ বিঘা জমিতে আমবাগান আছে, আর সেই মৌসুমে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আড়াই শ মণের বেশি আম বিক্রি করেছেন, যার বেশির ভাগ কুরিয়ারে ঢাকায় গেছে; আমগুলো তিনি নিজেই প্যাকেট করেন। সদর উপজেলার মহারাজপুরের আরেকজন প্রথম মৌসুমেই ফেসবুক পেজে ১০০ মণের বেশি গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাত ও ল্যাংড়া বিক্রি করেন। সেই মৌসুমে জেলায় ডিএইর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ২ লাখ টন আম।
রাষ্ট্রীয় ডাক বিভাগও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তাদের স্পিড পোস্ট সেবায় আমসহ গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি ফল রাজশাহী, ঢাকা, সাতক্ষীরা, খুলনা, নাটোর, বগুড়া ও দিনাজপুরসহ ২৫টি জেলায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এবং বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও নেত্রকোণা ছাড়া অন্য প্রায় সব জেলা শহরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। একটি পার্সেলে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত আম পাঠানো যাবে; মাশুল প্রথম কেজির জন্য ১০ টাকা এবং পরের প্রতি কেজি ৫ টাকা। ২০১৮ সালের ৩ জুন চালু হওয়া স্পিড পোস্ট কাউন্টারভিত্তিক সেবা: ডাকঘরে বুকিং হয়, আর প্রাপক পাওয়া বার্তাটি দেখিয়ে ডাকঘরের জানালা থেকে পার্সেল বুঝে নেন।
এফ-কমার্সের সামগ্রিক বাজারও বড়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দৈনিক ইত্তেফাক ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, ফেসবুকে ৫ লাখের বেশি বাংলাদেশির নিজস্ব ব্যবসায়িক পেজ রয়েছে, এফ-কমার্স উদ্যোক্তারা আনুমানিক ২ থেকে আড়াই লাখ পেজ চালান, আর এর প্রায় ৬০ হাজার পেজে নিয়মিত বেচাকেনা হয়। একই পত্রিকার ২০২৩ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২২ সাল শেষে দেশের ই-কমার্সের বাজারের আকার ছিল ৬৬০ কোটি মার্কিন ডলার, আর ২০২৬ সাল নাগাদ তা ১ হাজার ৫০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে।

ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কেন ভুয়া অর্ডার আসে
বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটায় দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাশ অন ডেলিভারির প্রাধান্য। ২০১৬ সালের এপ্রিলে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনলাইন শপ বাগডুমের প্রধান নির্বাহী জানান, বিভিন্ন জরিপে ই-কমার্স লেনদেনের ৭৫ শতাংশই ক্যাশ অন ডেলিভারিতে হয়; তিনি এর ঝামেলার কথাও বলেন: বিক্রেতাকে খুচরা টাকা প্রস্তুত রাখতে হয়, আর নগদ টাকা বহনকারী কুরিয়ারকর্মীর টাকা হারানো বা ছিনতাইয়ের ঝুঁকি থাকে।
আরেক খরচ ভুয়া অর্ডার, অর্থাৎ ক্রেতা অর্ডার দিয়ে পরে পণ্য গ্রহণ করেন না। ঢাকার স্টার্টআপবিষয়ক প্রকাশনা ফিউচার স্টার্টআপ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে লেখে, এটি একটি স্থায়ী এবং প্রায়ই ব্যয়বহুল সমস্যা, যা বেশির ভাগ ঘটে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে। প্রকাশনাটির বর্ণনায়, তখন দেশে কার্ডে লেনদেন প্রায় ছিল না, বিকাশ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা লেনদেনের সমস্যা আংশিক মিটিয়েছে, আর ডেলিভারি সহযোগীদের নিয়ে অভিযোগ ছিল ব্যাপক। দোকানমালিকেরা যেসব উপায় কাজে লাগানোর কথা বলেছেন, প্রকাশনাটি সেগুলো তুলে ধরে, সঙ্গে এ-ও জানায় যে কোনো একক উপায়ে সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয় না:
- অর্ডার নিশ্চিত করার আগে ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম নেওয়া; বান্দরবানের ই-হাট একটি ফেসবুক গ্রুপে জানায়, এতে তাদের ভুয়া অর্ডার শূন্যে নেমে এসেছে;
- অর্ডার দেওয়ার পর এবং পণ্য পাঠানোর আগে আবার ক্রেতাকে ফোন করা;
- অর্ডার নেওয়ার আগে ক্রেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল দেখে নেওয়া;
- দরদাম না করা; কিছু মালিকের মতে, এতে যাঁরা আসলে কিনবেন না তাঁরা নিরুৎসাহিত হন;
- মানসম্পন্ন পণ্য বিক্রি করা; উদ্যোক্তাদের ধারণা, এতে গুরুতর ক্রেতারা আসেন।
তারেক রহমানের ৫০০ টাকা অগ্রিম নেওয়ার নিয়ম এর প্রথম উপায়টির কাছাকাছি, আর তিনি যে ফলের কথা লিখেছেন, অর্ডার কম কিন্তু লোকসান বন্ধ, সেটিই ওই দোকানমালিকদের বর্ণিত লাভ-ক্ষতির হিসাব।
২০২১ সালের ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা যা বলে
দৈনিক ইত্তেফাক সে সময় জানায়, দেশে প্রথমবারের মতো জারি করা ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেল ২০২১ সালের ৪ জুলাই, রোববার, প্রজ্ঞাপন দিয়ে জারি করে; তখন থেকে অনলাইনে বেচাকেনা এই নির্দেশিকার আওতায়। পত্রিকাটি একে খবর হিসেবে তুলে ধরে ইভ্যালি, আলেশা মার্টের মতো প্রতিষ্ঠানের সেই ক্রেতাদের জন্য, যাঁরা অগ্রিম টাকা দিয়ে সময়মতো পণ্য বা টাকা ফেরত কোনোটিই পাচ্ছিলেন না। পত্রিকায় প্রকাশিত বিধানগুলোর মধ্যে ছিল:
- ক্রেতা মূল্য পরিশোধের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রেতাকে পণ্য ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে হবে এবং ক্রেতাকে এসএমএসে জানাতে হবে;
- ক্রেতা ও বিক্রেতা একই শহরে থাকলে মূল্য পরিশোধের ৫ দিনের মধ্যে এবং ভিন্ন শহরে থাকলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সময় আরও কম রাখতে হবে;
- বিক্রেতা নির্ধারিত সময়ে পণ্য দিতে ব্যর্থ হলে ক্রেতা কার্ড, ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং যে মাধ্যমে অগ্রিম মূল্য দিয়েছেন, সেই মাধ্যমেই তা ফেরত দিতে হবে;
- পণ্যের বিবরণ, মূল্য, কর এবং ডেলিভারিসহ অন্যান্য খরচ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, আর নকল বা ভেজাল পণ্য প্রদর্শন করা যাবে না;
- বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) পদ্ধতিতে ব্যবসা করা যাবে না।
এসব বিধান মূলত ক্রেতা অগ্রিম টাকা দেওয়ার পর বিক্রেতার দায়িত্ব ঠিক করে দেয়। তারেক রহমানের পোস্ট সমস্যাটিকে দেখেছে উল্টো দিক থেকে: কোনো টাকা ছাড়াই দেওয়া অর্ডার, যার জবাবে তিনি প্রত্যেক ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া শুরু করেন বলে জানিয়েছেন।
ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, ফিউচার স্টার্টআপ





মন্তব্য
(০)