২০২৬ সালের জুনের শুরুতে, আমের মৌসুম যখন জমে উঠছে, জাগো নিউজ ২৪-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসে বাংলাদেশের আম খাতের বড় এক বৈপরীত্য। দেশে আমের বাজার আনুমানিক ১৩ হাজার কোটি টাকার, অথচ বিদেশে রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১০০ কোটি টাকারও কম। রপ্তানিকারকদের ভাষায়, প্রধান বাধা মাত্রাতিরিক্ত বিমান ভাড়া, সঙ্গে আছে মানসম্মত আম উৎপাদন, সমন্বয় ও অবকাঠামোর ঘাটতি।
উৎপাদন বিপুল, রপ্তানি সামান্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে জাগো নিউজ জানায়, ২০২৫ সালে দেশে ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমিতে ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন আম উৎপাদন হয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বছরে উৎপাদন ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন এবং দেশি বাজারের মূল্য ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করে। আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে ২০২৩ সালে বিশ্বে আম, ম্যাঙ্গোস্টিন ও পেয়ারার উৎপাদন ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ টন, যার ৪৩ শতাংশই ভারতের; এরপর ইন্দোনেশিয়া ও চীন।
রপ্তানির চিত্র একেবারে আলাদা। ডিএইর হিসাবে ২০১৭ সালে মাত্র ৩০৯ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৩ সালে রপ্তানি হয় ৩ হাজার ১০০ টন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ; ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ১ হাজার ৩২১ টনে, আর ২০২৫ সালে হয় ২ হাজার ১৯৪ টন। ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে তাজা আম রপ্তানি হয়েছিল ২১ থেকে ২২ লাখ টন, যাতে বাংলাদেশের অংশ ছিল প্রায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি আম যায় যুক্তরাজ্যে, ৬৮৬ টন, আর মোট চালানের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল আম্রপালি জাতের।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের আম গেছে ৩৮টি দেশে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি হয়। জাগো নিউজ জানায়, ২০২৬ সালে মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের আম আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

মান ও সমন্বয়ের ঘাটতি
রপ্তানিকারকেরা বলেন, বাংলাদেশের আমের স্বাদ ও গন্ধের চাহিদা অনেক দেশে আছে, কিন্তু বাজারটি খুব প্রতিযোগিতামূলক। বাংলাদেশে আমদানিকারক দেশের চাহিদামতো মানের আম ধারাবাহিকভাবে মিলছে না, আর চুক্তিভিত্তিক চাষে উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) মেনে উৎপাদন হচ্ছে কম, যা রপ্তানির প্রথম শর্ত। সঙ্গনিরোধ কর্তৃপক্ষ, চাষি, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, গবেষক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে খরচ বাড়ছে; যথাযথ গ্রেডিং ও প্যাকিং সুবিধা এবং অ্যাক্রিডিটেড ল্যাবরেটরিরও ঘাটতি আছে।

বিমান ভাড়াই সবচেয়ে বড় বাধা
দেশের অন্যতম শীর্ষ আম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংকের প্রধান নির্বাহী কাওসার আহমেদ রুবেল জাগো নিউজকে বলেন, বিমান ভাড়ার কারণে আগের বছরও বড় পরিসরে রপ্তানির লক্ষ্য পূরণ হয়নি, আর ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। তাঁর হিসাবে, বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো যুক্তরাজ্যে প্রতি কেজি আম পাঠাতে নিচ্ছিল ৫০৫ টাকা, আর রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিচ্ছিল ৫৮০ টাকা। বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভাড়াও আগের বছরের চেয়ে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছিল।
অন্য রপ্তানিকারকেরা জানান, বাগান থেকে সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকিং ও দেশের ভেতরের পরিবহন মিলিয়েই কেজিপ্রতি খরচ দাঁড়াচ্ছিল ১৫০ টাকার বেশি। এর ওপর বিমান ভাড়া যোগ হয়ে বিদেশে এক কেজি আম পাঠাতে খরচ পড়ছিল প্রায় ৭০০ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৫০০ টাকার মধ্যে আর বছর তিনেক আগে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ফলে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের আমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের আমের চেয়ে বেশি পড়ছিল। আম রপ্তানিকারকদের সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ মনসুরও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, চড়া পরিবহন খরচ ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো তাঁদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সীমিত করছে।

মন্ত্রীর আশ্বাস ও রপ্তানিযোগ্য আম প্রকল্প
ঈদের কয়েক দিন আগে ২০২৬ সালের আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে পণ্য পাঠাতে বেশি বিমান ভাড়া গুনতে হয়, মন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি নিজেও এ সমস্যায় ভুগেছেন। তিনি রপ্তানিকারকদের কথা দেন, কৃষিমন্ত্রী থাকতেই এ সমস্যার সমাধান হবে। তিনি জানান, বিমান বাংলাদেশ বেশ কিছু উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে এবং সেগুলো এলে কার্গো ফ্লাইট চালু হবে।
ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, প্রধান আম উৎপাদন এলাকা চিহ্নিত করা, চুক্তিভিত্তিক চাষে উত্তম কৃষি চর্চা আর আধুনিক প্যাকহাউসের মাধ্যমে প্রকল্পটি রপ্তানি বাড়াতে কাজ করছে। তাঁর মতে, সে বছর ফলন ভালো হয়েছিল, তাই রপ্তানি ব্যাহত হলে চাষিরা ন্যায্য দাম পাবেন না, আর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাগো নিউজ জানায়, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙ্গা ও গৌড়মতিসহ বিভিন্ন জাতের আম ৫ মে থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাজারে আসার কথা ছিল। চাষিদের আশা ছিল, রপ্তানি কম হলেও দেশের বাজারে দাম ভালো থাকলে লাভ হবে।
ছবি: Mahinur11 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার (২৪ আগস্ট ও ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএওস্ট্যাট), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)