সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

দই ফুলকপি: টকদই ও মসলায় রান্না ফুলকপি-আলুর শীতের রেসিপি

২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর শীতের ফুলকপির ভরা মৌসুমে জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক দই ফুলকপির রেসিপি প্রকাশ করে: হালকা ভাজা ফুলকপি ও আলু ফেটানো টকদই, সরিষার তেল, জিরা, হলুদ ও মরিচে রান্না।

দই ফুলকপি: টকদই ও মসলায় রান্না ফুলকপি-আলুর শীতের রেসিপি
শাকসবজি

শীতের সবজির ভরা মৌসুমে, ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর, বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ঘরে রান্নার একটি রেসিপি প্রকাশ করে: দই ফুলকপি। এতে ফুলকপি ও আলু হালকা ভেজে নিয়ে ফেটানো টকদইয়ে রান্না করা হয়, সঙ্গে থাকে সরিষার তেল, আস্ত জিরা, শুকনা মরিচ, হলুদ, মরিচ ও জিরার গুঁড়া, লবণ আর সামান্য চিনি। প্রতিবেদনে একে কয়েকটি সহজ ধাপে তৈরি পরিবারের খাবার হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা ছোট-বড় সবার পছন্দ হবে বলে লেখা হয়; আর বলা হয়, পরিচিত ভাজি, তরকারি বা সুপের বাইরে ফুলকপি রান্নার এটি আরেকটি উপায়।

নিচে রেসিপিটি জাগো নিউজ ২৪ যেভাবে প্রকাশ করেছিল সেভাবেই দেওয়া হলো। এরপর আছে এর দুই মূল উপকরণ দই ও ফুলকপির পরিচয়: এগুলো কী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশে এর জোগান কোথা থেকে এসেছিল, দেশের খাদ্য উপাদান সারণি এগুলোর পুষ্টি সম্পর্কে কী বলে, আর ঘরে রান্না যেকোনো তরকারির চিনি, লবণ ও রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ কী।

জাগো নিউজ ২৪-এর রেসিপি


রেসিপিটি পরিবারের এক বেলার খাবারের জন্য লেখা, এতে একটি গোটা ফুলকপি লাগে। নিচের পরিমাণগুলো মূল রেসিপিরই।

উপকরণ


  • ফুলকপি: ১টি
  • আলু: ২টি
  • টকদই: ২০০ গ্রাম
  • হলুদের গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
  • পেঁয়াজ: ২টি
  • লবণ: স্বাদমতো
  • মরিচের গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
  • জিরার গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
  • সরিষার তেল: পরিমাণমতো
  • চিনি: ২ টেবিল চামচ
  • শুকনা মরিচ: ২টি

যেভাবে তৈরি করবেন


  • ফুলকপি ও আলু ছোট ছোট টুকরা করে কেটে হালকা ভেজে তুলে রাখুন।
  • কড়াইয়ে সরিষার তেল গরম করে তাতে আস্ত জিরা ও শুকনা মরিচ হালকা ভেজে নিন।
  • ভাজা হলে অল্প পানিতে মেশানো হলুদ, মরিচ ও জিরার গুঁড়া দিন।
  • টকদই ফেটিয়ে কড়াইয়ে দিন, সঙ্গে লবণ ও চিনি দিন।
  • এবার ভাজা আলু ও ফুলকপি দিয়ে ভালো করে কষান।
  • কষানো হলে অল্প পানি দিন।
  • পানি শুকিয়ে গেলে নামিয়ে নিন। তৈরি হয়ে গেল দই ফুলকপি।

রান্নার আগে প্রকাশিত লেখার দুটি বিষয় জেনে রাখা ভালো। উপকরণের তালিকায় দুটি পেঁয়াজ আছে, কিন্তু প্রণালিতে পেঁয়াজ কখন দিতে হবে তা বলা নেই। আবার প্রণালিতে শুরুতে তেলে আস্ত জিরা ভাজার কথা আছে, অথচ তালিকায় আছে কেবল জিরার গুঁড়া। তাই রাঁধুনিকে পেঁয়াজ কখন দেবেন তা ঠিক করে নিতে হবে, আর ফোড়নের জন্য একটু আস্ত জিরা আলাদা রাখতে হবে।

মূল লেখার ভূমিকায় পদটিকে প্রচুর পুষ্টিকর ও হজমে সহায়ক উপাদানে ভরা বলা হয়েছিল। সেই সাধারণ দাবিগুলো এখানে রাখা হয়নি; তার বদলে নিচে ‘প্লেটে কী থাকে’ অংশে বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্য উপাদান সারণি ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) মাপা পুষ্টিমান দেওয়া হয়েছে।

দই: কড়াইয়ের টকদই


দই, দক্ষিণ এশিয়ায় যাকে দহি বা কার্ডও বলা হয়, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রচলিত দই, যা দুধকে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে গাঁজিয়ে তৈরি হয়। সাধারণত গরুর দুধে দই হয়, কখনো মহিষ বা ছাগলের দুধেও। গাঁজনের সময় ব্যাকটেরিয়া দুধের ল্যাকটোজকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিণত করে, তাতে দুধ ঘন হয় ও টক স্বাদ আসে। কোন জীবাণু কাজ করবে তা জায়গার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে; এর মধ্যে থাকতে পারে ল্যাকটোকক্কাস ল্যাকটিস, স্ট্রেপটোকক্কাস থার্মোফিলাস ও ল্যাকটোব্যাসিলাস ডেলব্রুকি উপপ্রজাতি বুলগারিকাস।

ঘরে দই পাততে দুধ ফুটিয়ে ঠান্ডা করে নেওয়া হয়, তারপর আগের বারের দই থেকে একটু বীজ হিসেবে মিশিয়ে পাত্রটি পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টা না নেড়ে রেখে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না হালকা টক হয়। মহিষের দুধে চর্বি বেশি বলে তাতে দই আরও ঘন জমে, আর মহিষের দুধের দই সাধারণত মাটির পাত্রে বিক্রি হয়।

বাংলায় দই মোটা দাগে দুই রকম। মিষ্টি দই তৈরি হয় দুধ জ্বাল দিয়ে কিছুটা ঘন করে, চিনি বা গুড় (আখের গুড় বা খেজুরের গুড়) দিয়ে মিষ্টি করে, রাতভর মাটির পাত্রে গাঁজিয়ে; মাটির পাত্রের ছিদ্রময় দেয়াল দিয়ে পানি ধীরে বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যায়, এতে দই আরও ঘন হয় এবং জীবাণুর বৃদ্ধির উপযোগী তাপমাত্রা বজায় থাকে। টকদই হলো সাধারণ, টক স্বাদের দই, আর এই রেসিপিতে সেটিই লাগে। উপমহাদেশজুড়ে নোনতা রান্নায় টকদই একটি পরিচিত ভিত্তি: দই মাছ, অর্থাৎ দইয়ের ঝোলে রান্না মাছ, বাঙালি রান্নার একটি পরিচিত উদাহরণ; দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অঞ্চলের রায়তা ও কড়ির মতো পদও দইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে।

দই ফুলকপিতে লবণ ও দুই টেবিল চামচ চিনি মেশানো ফেটানো টকদই-ই হয়ে ওঠে সেই ঝোল, যাতে ভাজা ফুলকপি ও আলু শেষ পর্যন্ত রান্না হয়।

ভারতের কলকাতার চাঁদনি চকের একটি মিষ্টির দোকানে মাটির পাত্রে পাতা দই। ছবি: Anwesha394 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ভারতের কলকাতার চাঁদনি চকের একটি মিষ্টির দোকানে মাটির পাত্রে পাতা দই। ছবি: Anwesha394 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বগুড়ার দই আর দেশের দুধ


বাংলাদেশে দইয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে বগুড়ার নাম। ২০২৩ সালের জুনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর বগুড়ার দইকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ দেয়; একই সঙ্গে সনদ পায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আম এবং শেরপুরের তুলসীমালা চাল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের ৫ জুলাই জানায়, সনদগুলো দেওয়া হয় ২৫ জুন, আর এর ফলে জামদানি, ইলিশ ও রাজশাহী সিল্কসহ দেশের ১৫টি পণ্য জিআই স্বীকৃতি পায়।

একই প্রতিবেদনে বগুড়াকে বলা হয় দেশের ‘দইয়ের রাজধানী’; সেখানে ছোট-বড় প্রায় ৪০০ কারখানায় দিনে গড়ে ৫০ টন দই তৈরি হয়, আর ঈদের মতো উৎসবে চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। জেলার একটি প্রতিষ্ঠিত মিষ্টি ও দই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পত্রিকাটিকে বলেন, বগুড়া শহর ও শেরপুর উপজেলা মিলে দিনে অন্তত এক লাখ পিস দই বিক্রি হয়, যার দাম ১ কোটি টাকা।

সব দইয়ের শুরু দুধ থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য নিয়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৈরি ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৪-২০২৫’ সারসংক্ষেপে, যেখানে তথ্যগুলো সাময়িক হিসেবে চিহ্নিত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন ধরেছে ১৫৫.৩৮ লাখ টন, যা ২০২৩-২৪ সালে ছিল ১৫০.৪৪ লাখ টন। জনপ্রতি দিনে ২৫০ মিলিলিটার হিসাবে চাহিদা ধরা হয়েছে ১৬২.৩৩ লাখ টন, আর প্রাপ্যতা জনপ্রতি দিনে ২৩৯.২৯ মিলিলিটার। একই সারসংক্ষেপে স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অংশ ১.৮১ শতাংশ।

ফুলকপি: ভূমধ্যসাগর থেকে বাংলায়


ফুলকপি একই বুনো প্রজাতি ব্রাসিকা ওলেরাসিয়া থেকে উদ্ভাবিত কয়েকটি সবজির একটি; এটি সরিষা পরিবারের (ব্রাসিকেসি, যাকে ক্রুসিফেরিও বলা হয়) সদস্য। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া একে শীতকালীন আবাদি ফসল ব্রাসিকা ওলেরাসিয়া ভ্যারাইটি বোট্রাইটিস হিসেবে বর্ণনা করে, যার পুষ্পমঞ্জরি একটি আঁটসাঁট, মাংসল মাথা তৈরি করে। এই সাদা মাথাটি ঘন হয়ে থাকা অপরিণত ফুলের কুঁড়ি দিয়ে গঠিত, ইংরেজিতে একেও ‘কার্ড’ বলা হয়; সাধারণত কেবল মাথাটিই খাওয়া হয়।

ফুলকপি বাছাই করে প্রজননের ফল, আর সম্ভবত এর উৎপত্তি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। এর ইংরেজি নাম এসেছে ইতালীয় ‘কাভোলফিওরে’ থেকে, যার অর্থ ‘বাঁধাকপির ফুল’; মূলে লাতিন ‘কাউলিস’ (বাঁধাকপি) ও ‘ফ্লোস’ (ফুল)। মধ্যযুগে এটি সাইপ্রাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল, আর ধারণা করা হয় ১৪৯০ সালের দিকে সাইপ্রাস বা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল থেকে এটি ইতালিতে আসে, পরের শতাব্দীগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশে। ব্রিটিশরা ১৮২২ সালে ভারতে ফুলকপি নিয়ে আসে।

ফুলকপিকে মোটা দাগে চার ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে এশীয় ধরনটি ভারত ও চীনে চাষ হওয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফুলকপি, যা উনিশ শতকে ভারতে এখন বিলুপ্ত একটি ধরন থেকে উদ্ভাবিত হয়; এর পুরোনো জাতের মধ্যে আছে আর্লি বেনারস ও আর্লি পাটনা। বাঁধাকপির তুলনায় ফুলকপি চাষ কঠিন: দিনের মাঝারি তাপমাত্রা, ২১ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, প্রচুর রোদ ও আর্দ্র মাটিতে এটি সবচেয়ে ভালো হয়, আর বাংলাদেশে এটি শীতকালীন ফসল হিসেবে চাষ হয়।

বিশ্বে ২০২৩ সালে ফুলকপি ও ব্রকলি মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছিল ২৬.৫ মিলিয়ন টন, যার ৭২ শতাংশই চীন ও ভারতের।

বাংলাদেশে জাত, মৌসুম ও ২০২৪-২৫ সালের ফলন


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশের মাঠে তিন ধরনের ফুলকপি চাষ হয়। আগাম জাতের মধ্যে আছে কার্তিকা, পাটনাই ও ট্রপিক্যাল-৫৫; মধ্য মৌসুমের জাতের মধ্যে অগ্রহায়ণী, পৌষালী ও স্নোবল; আর নাবি জাতের মধ্যে হোয়াইট মাউন্টেন, মাঘী ও রাখুসি লেট। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৮ সালে ‘রূপা’ নামে মধ্য মৌসুমের একটি উচ্চফলনশীল জাত অবমুক্ত করে। প্রায় ৩০ দিন বয়সী চারা অক্টোবর-নভেম্বরে রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, আর হেক্টরপ্রতি ফলন ২৫ থেকে ৩০ টন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফুলকপির উৎপাদন অনেকটা বেড়েছিল। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার, বিবিএসের প্রকাশিত ফসল পরিসংখ্যান নিয়ে সেদিনই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, উৎপাদন ২০২৩-২৪ সালের ৪,২৯,৬৭০ টন থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে হয়েছে ৫,৭৯,৩৪৪ টন। একই সময়ে এর নিকটাত্মীয় বাঁধাকপি ৪,৫০,০২৩ টন থেকে বেড়ে ৬,৩৬,০০৯.৮৬ টন হয়, আর এই রেসিপির তালিকায় থাকা পেঁয়াজ ২৯,১৭,৩৫৪ টন থেকে বেড়ে হয় ৩২,২১,৪৩৭ টন।

২০২০ সালের নভেম্বরে পাবনায় ব্রাসিকা ওলেরাসিয়ার খেত; ফুলকপি ও বাঁধাকপি এই প্রজাতিরই। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
২০২০ সালের নভেম্বরে পাবনায় ব্রাসিকা ওলেরাসিয়ার খেত; ফুলকপি ও বাঁধাকপি এই প্রজাতিরই। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

২০২৫ সালের ডিসেম্বর: শেরপুরের ফুলবাড়ি হাটে দরপতন


রেসিপিটি যখন প্রকাশিত হয়, নতুন ফুলকপি তখন বাজারে প্রচুর আসছিল, আর কোনো কোনো উৎপাদন এলাকায় দাম অনেক পড়ে গিয়েছিল। দেশ রূপান্তর ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বগুড়ার শেরপুর উপজেলা থেকে, দইয়ের জন্য পরিচিত সেই উপজেলা থেকেই, জানায় যে শীতকালীন সবজির ভরপুর সরবরাহ থাকলেও সেখানকার ফুলকপি চাষিরা বড় লোকসানের মুখে। গাড়িদহ ইউনিয়নের ফুলবাড়ি হাট, উপজেলার সবচেয়ে বড় কাঁচা শাকসবজির পাইকারি বাজার, সেখানে সেদিন রবিবার ফুলকপি বিক্রি হয় প্রতি মন (৪০ কেজি) ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা পত্রিকার হিসাবে কেজিপ্রতি মাত্র ২ টাকার মতো।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সে মৌসুমে গাড়িদহ, খামারকান্দি, মির্জাপুর ও খানপুর ইউনিয়নে ফুলকপিসহ নানা শীতকালীন সবজির ব্যাপক চাষ হয়েছিল। কৃষকেরা পত্রিকাটিকে জানান, সার, বীজ ও কীটনাশকের বাড়তি দামের কারণে কেজিপ্রতি ফুলকপি উৎপাদনে খরচ হয়েছে অন্তত ৫ থেকে ৭ টাকা, আর দুই সপ্তাহ ধরে দাম ক্রমাগত কমছিল। একজন চাষি বলেন, এক মাস আগে প্রতি মন ফুলকপির দাম ছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১৫ দিন আগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, এক সপ্তাহ আগে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, আর আগের তিন দিন ধরে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। পত্রিকাটি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করে অতিরিক্ত আমদানি, ক্রেতা সংকট ও সংরক্ষণের কোনো সুবিধা না থাকা, যার ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কম দামে টাটকা সবজি বিক্রি করছিলেন।

হাটে আসা একজন পাইকার বলেন, কয়েক দিন ধরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি; আর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বলেন, সে বছর উপজেলায় সবজির ফলন ভালো হয়েছে এবং চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে।

ঢাকায় ফুলকপি। ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ঢাকায় ফুলকপি। ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

আলু, সরিষার তেল ও মসলা


কড়াইয়ের আরেক সবজি আলুর পেছনে ছিল আরও বড় ফলন। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট বিবিএসের বরাতে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন রেকর্ড ১১.৫৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়, যা ২০২৩-২৪ সালের ১০.৬০ মিলিয়ন টনের চেয়ে ৯.১৭ শতাংশ বেশি; আবাদ ৩৫ হাজার হেক্টর বাড়া ও অনুকূল আবহাওয়া এতে ভূমিকা রাখে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যে, ২০২৫ সালের আলু তোলার মৌসুমে দাম কেজিপ্রতি ৭ থেকে ৮ টাকায় নেমে আসে, অথচ ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে খুচরা বাজারে কেজি উঠেছিল রেকর্ড ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায়; সেই বছর দেশের ইতিহাসে প্রথমবার বেসরকারি খাত ০.২ মিলিয়ন টন আলু আমদানি করে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানায়, হিমাগার থেকে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ টাকায়।

এই রেসিপির রান্নার তেল সরিষার তেল। বাংলাপিডিয়া জানায়, মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশে রান্নার একমাত্র তেল ছিল সরিষার তেল। প্রচলিত পদ্ধতিতে বলদে টানা ঘানিতে বীজ পিষে তেল বের করা হতো, এখন বেশির ভাগ কাজ হয় বৈদ্যুতিক মিলে। সরিষা রবি মৌসুমের ফসল, প্রায় সব জেলায় চাষ হয়, তবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় আবাদ তুলনামূলক বেশি; তবু দেশি তেলে চাহিদার সামান্য অংশই মেটে, ফলে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের বিবিএস পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশি ও উচ্চফলনশীল জাত মিলিয়ে সরিষার উৎপাদন ২০২৩-২৪ সালের ১১.১৮ লাখ টন থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে হয়েছে ১০.৬ লাখ টন।

মসলাগুলো আসে গাছের ভিন্ন ভিন্ন অংশ থেকে। বাংলাপিডিয়া হলুদকে রাইজোম বা কন্দ থেকে পাওয়া মসলার তালিকায় রাখে, আর জিরা ও মরিচকে ফল থেকে পাওয়া মসলার তালিকায়। বাংলাদেশে সাধারণত চাষ হওয়া মসলার মধ্যে আছে হলুদ, পেঁয়াজ ও লাল মরিচ, আর জিরার নাম আছে অন্যান্য সাধারণ মসলার তালিকায়, যেগুলোর অনেকগুলো দেশ ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করে। এই রেসিপিতে আস্ত জিরা ও শুকনা মরিচ আগে তেলে ভেজে তেলে স্বাদ আনা হয়, আর গুঁড়া মসলাগুলো অল্প পানিতে মিশিয়ে কড়াইয়ে দেওয়া হয়।

প্লেটে কী থাকে


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তৈরি ‘ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ’ অনুযায়ী, কাঁচা ফুলকপির খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামে থাকে ২৭ কিলোক্যালরি (১১৩ কিলোজুল) শক্তি, ৯১.৮ গ্রাম পানি, ২.৬ গ্রাম আমিষ, ০.৩ গ্রাম চর্বি, ২.৫ গ্রাম প্রাপ্য শর্করা ও ২.০ গ্রাম খাদ্য আঁশ। সারণিতে ফুলকপির খাওয়ার উপযোগী অংশের সহগ ধরা হয়েছে ০.৪৫, অর্থাৎ পাতা ও মোটা ডাঁটা ছাঁটার পর কেনা ওজনের কতটুকু আসলে খাওয়া হয় তার মাপ। লবণ ছাড়া সেদ্ধ ফুলকপিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২৮ কিলোক্যালরি ও ২.৭ গ্রাম আমিষ থাকে বলে সারণিতে উল্লেখ আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল কাঁচা ফুলকপির প্রতি ১০০ গ্রামের জন্য কাছাকাছি মান দেয়: ২৫ কিলোক্যালরি, ১.৯২ গ্রাম আমিষ, ২.০ গ্রাম আঁশ, ৪৮.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৭ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ২৯৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ১৫.৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে। ননী না তোলা দুধের সাধারণ দইয়ের প্রতি ১০০ গ্রামে সেখানে ধরা আছে ৬১ কিলোক্যালরি, ৩.৪৭ গ্রাম আমিষ, ৩.২৫ গ্রাম চর্বি ও ১২১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। রান্নায় এসব মানের কিছু বদলায়। বাঁধাকপি পরিবারের গ্লুকোসিনোলেট নামের সালফারযুক্ত যৌগ ফুলকপি সেদ্ধ করলে কমে যায়, অথচ ভাপে, মাইক্রোওয়েভে বা অল্প তেলে নেড়ে ভাজায় এর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যপত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম, অর্থাৎ পাঁচ ভাগ, ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা ও অন্যান্য শ্বেতসারপ্রধান মূল এই হিসাবে ধরা হয় না; তাই এই পদে আলু নয়, ফুলকপি ও পেঁয়াজই সেই হিসাবে পড়ে।

একই নির্দেশনায় ফ্রি সুগার বা মুক্ত চিনি দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখতে বলা হয়েছে, যা দিনে প্রায় ২,০০০ কিলোক্যালরি খাওয়া সুস্থ ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রায় ৫০ গ্রাম বা সমান করে মাপা ১২ চা চামচের সমান; বাড়তি উপকারের জন্য ৫ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শও আছে। রাঁধুনির যোগ করা চিনিও মুক্ত চিনির মধ্যে পড়ে, তাই এই রেসিপির দুই টেবিল চামচ চিনিও এই সীমার হিসাবে ধরতে হবে। ডব্লিউএইচও দিনে লবণ ৫ গ্রামের, অর্থাৎ প্রায় এক চা চামচের নিচে এবং সম্পৃক্ত চর্বি মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখারও পরামর্শ দেয়। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির রোগ আছে কিংবা বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলেন এমন কেউ কতটা চিনি, লবণ ও তেল খেতে পারবেন, তা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত, এবং সে অনুযায়ী রেসিপিতে চিনি ও লবণ কমিয়ে নেওয়া যায়।

নিরাপদে রান্না ও সংরক্ষণ


ডব্লিউএইচওর ‘ফাইভ কিজ টু সেফার ফুড’ বা নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠিতে ঘরের রান্নাঘরের মৌলিক নিয়মগুলো বলা আছে: হাত, রান্নার জায়গা ও বাসনপত্র পরিষ্কার রাখা; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা; খাবার ভালোভাবে রান্না করা; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা, যার মধ্যে আছে ফল ও সবজি ধুয়ে নেওয়া, বিশেষ করে যদি তা কাঁচা খাওয়া হয়।

আগে থেকে রেঁধে রাখা দইয়ের তরকারির ক্ষেত্রে তাপমাত্রার নিয়মটিই সবচেয়ে জরুরি। ডব্লিউএইচও রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি না রাখতে, রান্না করা ও পচনশীল খাবার দ্রুত, সম্ভব হলে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে, ফ্রিজে রাখতে এবং পরিবেশনের আগে খাবার ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম রাখতে বলে। তাই বেঁচে যাওয়া দই ফুলকপি খাওয়ার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা এবং আবার খাওয়ার আগে ভেতর পর্যন্ত ভাপ ওঠা গরম করে নেওয়া উচিত।

ছবি: Hrishikes / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দেশ রূপান্তর, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাপিডিয়া, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

শাকসবজি

সম্পর্কিত খবর

শাকসবজি

কুয়াশায় শিকড় খাওয়ানোর প্রযুক্তিতে রোগমুক্ত আলুবীজ উৎপাদনের পরীক্ষা ইংল্যান্ডে

স্টার্টআপ এয়ারপনিক্স ও ডাইসন ফার্মিং ডেফরার অর্থায়নে দুই বছরের এক পরীক্ষা শুরু করেছে: কুয়াশাভিত্তিক পদ্ধতিতে বর্তমান খরচের অর্ধেকেরও কমে ইংল্যান্ডে রোগমুক্ত প্রথম প্রজন্মের আলুবীজ উৎপাদন সম্ভব কি না।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মাশরুমের গাঁজন প্রযুক্তিতে টফুর বর্জ্য হলো প্রোটিনসমৃদ্ধ সুস্বাদু উপাদান

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সয়া দুধ ও টফুর অবশিষ্ট ওকারা ঝিনুক মাশরুমের মাইসেলিয়াম দিয়ে গাঁজন করে এর প্রোটিন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে তুলেছেন, বাড়িয়েছেন উমামি স্বাদ।

Green Queen১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

মাদারগঞ্জে ৬০ হেক্টরে আগাম শসা, দুই হাজার টন উৎপাদনের আশা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে এবার প্রায় ৬০ হেক্টরে আগাম শসার আবাদ হয়েছে, উৎপাদন হতে পারে প্রায় দুই হাজার টন; পাইকারি বাজারে কেজি ৩০-৪০ টাকা, বিঘায় খরচ ১৫-২০ হাজার আর বিক্রি ৩০-৪০ হাজার টাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)