সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

রাঙ্গুনিয়ায় ছাদের টবে সাকিবের আমবাগানে থোকায় থোকায় পাকা আম

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কলেজছাত্র মো. সাকিবের ছাদের টবে লাগানো আমগাছে থোকায় থোকায় আম ধরেছিল, কয়েকটিতে আম পাকতেও শুরু করেছিল; উপজেলা কৃষি অফিসের মতে ভালো চারা ও সঠিক পরিচর্যায় এটি অস্বাভাবিক নয়।

রাঙ্গুনিয়ায় ছাদের টবে সাকিবের আমবাগানে থোকায় থোকায় পাকা আম
আঙিনা কৃষি

চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার পাশে সৈয়দ বাড়ী এলাকায় একটি বাড়ির ছাদে টবে সারি সারি আমগাছ। দ্য এগ্রো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদকের ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকটি গাছে থোকায় থোকায় আম ঝুলছিল, তার কিছু তখনই পাকা, আবার অন্য ডালে নতুন মুকুলও এসেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকা আমের মিষ্টি ঘ্রাণে এলাকার মানুষ ছাদের বাগান দেখতে আসছিলেন।

বাগানটি কলেজছাত্র মো. সাকিবের। এই লেখায় থাকছে প্রতিবেদনে তাঁর ছাদের আমবাগান নিয়ে কী বলা হয়েছিল, আর রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি অফিস ও উপজেলা প্রশাসন এ নিয়ে কী বলেছিল। এরপর সরকারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তারিখযুক্ত তথ্য থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, বাংলাদেশে আমের মুকুল আসে ও আম পাকে কখন, প্রতিবেদনে কোন কোন জাতের নাম এসেছে, চট্টগ্রামে বারির উন্নত জাতের আম নিয়ে বিজ্ঞানীরা কী পেয়েছেন, শহরে ছাদবাগান কীভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং পরামর্শ কোথায় পাওয়া যায়।

রাঙ্গুনিয়ার এক ছাদে টবের আমবাগান


প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাকিব পরিবারের বাড়ির ছাদে টবে আমগাছগুলো লাগান এবং দীর্ঘদিন ধরে সেগুলোর পরিচর্যা করে আসছিলেন। মুকুলের পাশাপাশি কয়েকটি গাছে থোকায় থোকায় আম ধরেছিল, আর কয়েকটি গাছের আম পাকতেও শুরু করেছিল। এলাকার লোকজন বাগান দেখতে আসছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমের স্বাভাবিক মৌসুমের বাইরে গাছে আম ধরা নিয়ে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।

ছাদে শুধু আম নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাকিব লেবু, আনারসসহ আরও কয়েক ধরনের ফলের চারাও লাগিয়েছিলেন এবং সেগুলোতেও আশানুরূপ ফল ধরেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাগানটি দেখে এলাকার বেশির ভাগ তরুণ নিজেদের ছাদে টবে আমবাগান করার আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন।

ছাদবাগান নিয়ে জানতে চাইলে সাকিব প্রতিবেদককে বলেন, ছাদের অল্প জায়গায় উন্নত মানের আমের চারা লাগানো হয়েছে এবং একজন কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে তিনি বাগানের পরিচর্যা করেন। তাঁর ভাষ্য, ফলন ভালো হয়েছে এবং দু-একটি গাছের আম পাকতে শুরু করেছে। তাঁর মতে, ছাদে অল্প পরিসরে টবে আমবাগান করলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যায় এবং পরিবারের পুষ্টির চাহিদাও মেটানো যায়। তিনি জানান, পরের বছর তিনি আরও বড় পরিসরে আমবাগান করার পরিকল্পনা নিয়েছেন এবং তাঁর দেখাদেখি অনেকে ছাদের টবে আমবাগান করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। প্রতিবেদনে তাঁর ফলন, খরচ বা আয়ের কোনো হিসাব ছিল না, এখানেও তা দেওয়া হয়নি।

কৃষি অফিস ও উপজেলা প্রশাসন যা বলেছিল


মৌসুম ছাড়া আম ধরার বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি অফিস প্রতিবেদককে জানায়, উন্নত মানের চারা ও সঠিক পরিচর্যার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে ছাদে আম ধরা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অফিসটি আরও জানায়, কেউ বাণিজ্যিকভাবে ছাদে আমবাগান করার উদ্যোগ নিলে সাকিবের মতোই সফল হতে পারেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাকায় আগ্রহ সবচেয়ে বেশি ছিল প্রচলিত জাত ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাত ও আশ্বিনার প্রতি। পাশাপাশি গবেষণায় উদ্ভাবিত বারি আম-৩ ও বারি আম-৪ জাতের বাগান করতেও অনেকে আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন।

প্রতিবেদনে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্যও ছিল; প্রতিবেদনে তাঁর নাম লেখা হয় মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, ফরমালিনমুক্ত আম খাওয়ার জন্য এবং পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে যে কেউ অনায়াসে ঘরের ছাদে আমবাগান করতে পারেন। এগুলো প্রতিবেদনে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের ও বাগানমালিকের নিজস্ব বক্তব্য।

রাঙ্গুনিয়া: খবরের পেছনের উপজেলা


রাঙ্গুনিয়া চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজেলা। দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর আয়তন ৩৬১.৫৩ বর্গকিলোমিটার; অবস্থান ২২ ডিগ্রি ১৮ মিনিট থেকে ২২ ডিগ্রি ৩৭ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১ ডিগ্রি ৫৮ মিনিট থেকে ৯২ ডিগ্রি ০৮ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। উত্তরে রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলা, দক্ষিণে চন্দনাইশ, পটিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা। কর্ণফুলী এর প্রধান নদী।

বাংলাপিডিয়ায় রাঙ্গুনিয়ার জনসংখ্যা ৩,৩৯,০০৪ জন, এর মধ্যে পুরুষ ১,৬৮,৪১২ এবং নারী ১,৭০,৫৯২ জন। উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন, ৭৪টি মৌজা ও ১৩৮টি গ্রাম। বাঙালি মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধদের পাশাপাশি সেখানে চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন। আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষির হার দেখানো হয়েছে ৩৯.৭১ শতাংশ।

একই ভুক্তিতে প্রধান ফসল হিসেবে ধান, তামাক, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, পান ও সবজির নাম আছে, আর প্রধান ফল হিসেবে আম, জাম, নারকেল, কলা, লিচু, পেঁপে, আমড়া ও জলপাই। অর্থাৎ সাকিবের মতো ছাদবাগানিরা টবে আম তোলার আগেই আম ছিল এই উপজেলার পরিচিত ফলগুলোর একটি।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কাছে কর্ণফুলী নদী। ছবি: Sakib toni / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কাছে কর্ণফুলী নদী। ছবি: Sakib toni / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আমের মুকুল আসে ও আম পাকে কখন


ছাদের আম নিয়ে এত কৌতূহল কেন? কারণ বাংলাদেশে আমের একটি নির্দিষ্ট মৌসুম আছে। বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি অনুযায়ী, আমগাছে মুকুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাংলাদেশ কৃষি-আবহাওয়া তথ্য ব্যবস্থা (বামিস) ২০২২ সালে রাঙ্গুনিয়ার পাশের পার্বত্য জেলাগুলো নিয়ে গঠিত রাঙামাটি অঞ্চলের জন্য আমের যে ফসল-আবহাওয়া পঞ্জিকা প্রকাশ করে, তাতে আমের মেয়াদ ধরা হয়েছে ১৬০ থেকে ১৬৫ দিন, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত।

পঞ্জিকাটি মৌসুমকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করেছে: ডগার কুঁড়ি ফোলা, মুকুলের মঞ্জরি লম্বা হওয়া, ফুল ফোটা, কচি আমের মটরদানা অবস্থা, ফলের বৃদ্ধি এবং শেষে পরিপক্বতা, পাকা ও সংগ্রহ। এ অঞ্চলের সাপ্তাহিক স্বাভাবিক আবহাওয়ার হিসাবে জানুয়ারির শুরুতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ২৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এপ্রিল-মে মাসে বেড়ে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৪ ডিগ্রিতে পৌঁছায়; জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে প্রায় ১৩ ডিগ্রি।

দেশের প্রধান আম অঞ্চলে প্রতিবছর আম পাড়ার তারিখ বেঁধে দেওয়া হয়। ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৪ সালের ১৬ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ২০২৪ সালের আম পঞ্জিকায় গোপালভোগ পাড়া যাবে ২৫ মে থেকে, হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাত ৩০ মে থেকে, ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে, আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন থেকে, বারি-৪ ৫ জুলাই থেকে এবং আশ্বিনা ১০ জুলাই থেকে। একই পঞ্জিকায় কাটিমন ও বারি-১১ কে সারা বছরের জাত হিসেবে দেখানো হয়।

মৌসুমের বাইরে আম পাওয়ার একটি পরিচিত পথ এই বারোমাসি জাত। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০২৩ সালের ২৫ মার্চের এক প্রতিবেদনে যশোরের শার্শা থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত বারি আম-১১ বছরে তিনবার ফল দেয়। সেখানে উদ্ধৃত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এর স্বাদ ভালো, অসময়ে আসায় ভালো দাম পাওয়া যায় এবং বাসার ছাদেও এই গাছ লাগানো যায়। তবে রাঙ্গুনিয়ার প্রতিবেদনে সাকিবের ছাদে যে গাছগুলোতে আম ধরেছিল সেগুলোর জাতের নাম ছিল না, তাই তাঁর বাগানে কোন কারণে আগাম ফল এসেছিল তা জানা যায় না।

মুকুলে ভরা আমগাছ (Mangifera indica); সাধারণ ছবি, রাঙ্গুনিয়ার বাগানের নয়। ছবি: Amar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
মুকুলে ভরা আমগাছ (Mangifera indica); সাধারণ ছবি, রাঙ্গুনিয়ার বাগানের নয়। ছবি: Amar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

প্রতিবেদনে যে জাতগুলোর নাম এসেছে


আমের বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica, এটি Anacardiaceae পরিবারের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আমের উৎপত্তি বাংলাদেশ, ভারতের আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে। প্রধানত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে চাষ হওয়া উৎকৃষ্ট জাতের মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, কিষাণভোগ ও মোহনভোগের নাম আছে বাংলাপিডিয়ায়; এসব জাতের বংশবিস্তার হয় জোড়কলমে।

রাঙ্গুনিয়ার প্রতিবেদনে নাম আসা চারটি প্রচলিত জাত মিলে আমের মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। রাজশাহীর ২০২৪ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী গোপালভোগ সবচেয়ে আগাম জাতগুলোর একটি, মে মাসের শেষে আসে ক্ষীরশাপাত, জুনে ল্যাংড়া, আর জুলাই থেকে শেষের দিকের জাত আশ্বিনা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রপ্তানি হওয়া জাতগুলোর মধ্যে ক্ষীরশাপাত, গোপালভোগ ও হিমসাগর ছিল।

বারি আম-৩ কৃষকের কাছে আম্রপালি নামে পরিচিত। ইবাউব জার্নালে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিদের নিয়ে এক গবেষণায় এই গাছকে খাটো ও নিয়মিত ফল দেওয়া জাত বলা হয়েছে, যাতে থোকায় থোকায় ছোট আকারের আম ধরে এবং আম অনেক দিন ভালো থাকে। এর শাঁস গাঢ় কমলা-লাল, আর গবেষণা অনুযায়ী অন্যান্য বাণিজ্যিক জাতের তুলনায় এতে প্রায় ২.৫ থেকে ৩.০ গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন থাকে।

একই গবেষণা অনুযায়ী, বারি আম-৪ এসেছে দেশি আশ্বিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি জাতের সংকরায়ণে। এর একেকটি আমের ওজন প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ গ্রাম, আর বাজারে আসে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্ট পর্যন্ত। গবেষণায় বলা হয়, জাতটি জনপ্রিয় হতে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর লেগেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১৩০ জন চাষির ৭৮.৪৬ শতাংশ আম্রপালি ও বারি-৪ দুটোই চাষ করতেন, আর দুই জাতেরই সুপারিশকৃত ফলন ধরা হয়েছে একরপ্রতি ৮ টন। চাষিদের জানানো গড় দাম ছিল আম্রপালির কেজিপ্রতি ৬৫ টাকা আর বারি-৪ এর ৯০ টাকা; ৩০.৮ শতাংশ চাষি বলেন, দেরিতে পাকা ও আকর্ষণীয় রঙের কারণে বারি-৪ এর চাহিদা বেশি।

গাছে ল্যাংড়া আম। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে ল্যাংড়া আম। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

চট্টগ্রামে বারির আম: গবেষণায় যা পাওয়া গেছে


চট্টগ্রাম অঞ্চলেই বারির উন্নত জাতের আম পরীক্ষা করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চের ৩৮তম খণ্ডে (২০১৩) এইচ বড়ুয়া, এম এম আলম পাটোয়ারী ও এম এইচ রহমানের এক গবেষণাপত্রে ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামের একটি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে বারির পাঁচটি জাতের তুলনা করা হয়। সবচেয়ে আগে মুকুল আসে ও আম পাড়া হয় বারি আম-১ এ, সবচেয়ে দেরিতে বারি আম-৮ এ।

ওই পরীক্ষায় গাছপ্রতি ৫১ থেকে ১১৭টি আম ধরে। সবচেয়ে বেশি আম ও গাছপ্রতি সর্বোচ্চ ফলন, ৩৩.৫৯ কেজি, দেয় বারি আম-৮; এরপর বারি আম-৪, ১৯.০২ কেজি। সবচেয়ে ভারী আমও ছিল বারি আম-৪ এর, গড়ে ৩৭৩.০ গ্রাম। খাওয়ার উপযোগী অংশ ছিল ৬৫.৯৯ থেকে ৭৮.৬৬ শতাংশ, আর মিষ্টতার মাপ মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ ছিল ১৬.৫১ থেকে ২১.৩৬ শতাংশ।

একই জার্নালের ৪৩তম খণ্ডে (২০১৮) হাটহাজারী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের এম জে উদ্দিন ও সহকর্মীদের আরেকটি গবেষণাপত্রে দেখা হয়, চট্টগ্রামের কৃষকেরা আসলে কোন জাত লাগাচ্ছেন। জেলার তিনটি উপজেলার ২৮টি গ্রামের ১৩১ জন আমচাষির ওপর জরিপ চালানো হয়। বারির ১১টি জাতের মধ্যে বারি আম-৩ গ্রহণ করেছিলেন ৭৭ শতাংশ কৃষক, বারি আম-৪ ২২.১ শতাংশ এবং বারি আম-৮ ১৫.৯ শতাংশ।

লেখকেরা দেখেন, চারা না পাওয়া এবং জাত সম্পর্কে না জানার কারণে বারির অন্যান্য জাতের চাষ কম। তাঁরা আরও দেখেন, গর্তের মাপ, রোপণ দূরত্ব, জৈব ও রাসায়নিক সার, বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক এবং পোকামাকড় ও রোগ দমনে সুপারিশকৃত পদ্ধতি বেশির ভাগ কৃষক মানছিলেন না। রাঙ্গুনিয়া কৃষি অফিসের কথার সঙ্গেও এটি মেলে: ফল নির্ভর করে ভালো চারা আর সঠিক পরিচর্যার ওপর।

চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ছাদবাগান


সাকিবের বাগান শহর ও মফস্বলের ছাদে কৃষির বড় এক ধারার অংশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে "খাদ্য নিরাপত্তায় নগর উদ্যান ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি" (টিসিপি/বিজিডি/৩৫০৩) নামে একটি প্রকল্প চালায়, যার বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার মার্কিন ডলার।

এফএওর প্রকল্প-সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, দুই শহরে ২৫০টি প্রদর্শনী ছাদবাগান করা হয়, ৮০০ জন নগরবাসী ছাদবাগানের প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ পান এবং ৪৫ জন স্থানীয় তরুণকে মালি হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। স্কুলবাগানের পাঁচটি প্রদর্শনী হয়, তিনটি ঢাকায় ও দুটি চট্টগ্রামে। দুই শহরে ২০০ জন উপকারভোগীর জন্য দুটি উদ্বুদ্ধকরণ সফর ও একটি অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরের আয়োজন হয়, আর নার্সারি মালিক, বীজ ব্যবসায়ী, সার বিক্রেতা ও বাগান সরঞ্জাম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চারটি পরামর্শ সভা হয়। প্রকল্পটি একটি নির্দেশিকাও তৈরি করে, যাতে ছিল ভবনের ভারবহন ক্ষমতা যাচাই, জায়গার ব্যবহার, গাছ ও জাত বাছাই, উপকরণ ও বীজ সংগ্রহ, মাটি তৈরি এবং ফসল পঞ্জিকার মৌলিক তথ্য।

এফএও জানায়, এই প্রকল্পের ফলে ডিএই নগর উদ্যান ফসলের কাজকে তার মূল কার্যক্রমে যুক্ত করে, আর দুই শহরে তাজা সবজি ও ফলের উৎপাদন বাড়ে, পাশাপাশি আয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও নগর পরিবেশেও তা ভূমিকা রাখে। বাড়ির বাগানের কাজের কেন্দ্রে নারীরা থাকায় প্রকল্পটি নারীদের আয় বাড়াতেও সহায়তা করে বলে এফএও উল্লেখ করেছে। নির্দেশিকার প্রথম বিষয়, ছাদ কতটা ভার বইতে পারে, মাটিভর্তি টবে গাছ লাগাতে চাওয়া যে কারও জন্য জরুরি।

সিলেটের একটি ছাদবাগান। ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সিলেটের একটি ছাদবাগান। ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাংলাদেশে আম: জাতীয় চিত্র


ছাদের গাছ বিশাল এই ফসলের ছোট একটি অংশ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬,৪১,৫২৫ একর জমিতে প্রায় ৬,৩৯,৮২০ টন আম উৎপাদিত হয়। ২০২৩ সালে পরিসর ছিল অনেক বড়: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের ১৪ মে জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আম উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩.৩৫ লাখ টন, আর প্রকৃত উৎপাদন প্রায় ২৮ লাখ টন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে রপ্তানির লক্ষ্য ছিল ৪ হাজার টন, যা আগের বছরের রপ্তানি ১ হাজার ৭৫৭ টনের দ্বিগুণের বেশি। তখন বাংলাদেশের আম ১৫টির বেশি দেশে যাচ্ছিল, অথচ পাঁচ বছর আগে যেত মাত্র দুই-তিনটি দেশে। রপ্তানির মৌসুম ছিল মে থেকে জুলাই।

ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৪ সালের মে মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু রাজশাহী জেলায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৬০২ হেক্টর জমি থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার ৩১৫ টন আম উৎপাদনের আশা করছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়, হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৩.২৮ টন। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক জানান, কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে আম পাড়ার পঞ্জিকা ঠিক করা হয়েছিল।

পরিচর্যা, রোগবালাই ও পরামর্শ কোথায়


রাঙ্গুনিয়া কৃষি অফিস যে পরিচর্যার কথা বলেছিল, তার বড় অংশই সময় মেনে কাজ করা আর আবহাওয়ার দিকে নজর রাখা। রাঙামাটি অঞ্চলের জন্য বামিসের পঞ্জিকায় আমের প্রধান রোগগুলোর অনুকূল আবহাওয়ার বর্ণনা আছে। অ্যানথ্রাকনোজ রোগ ছড়ায় গড় তাপমাত্রা ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে এবং গাছে পানি জমে থাকলে বা আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯৫ শতাংশের বেশি হলে।

পাউডারি মিলডিউ বা সাদা গুঁড়া রোগের জন্য অনুকূল উষ্ণ দিন ও ঠান্ডা রাত, ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রির মাঝারি তাপমাত্রা, ছায়া বা কম আলো এবং ৯৫ শতাংশের বেশি আর্দ্রতা। ফল পচা ও আগা মরা রোগ দেখা দেয় বেশি আর্দ্রতা, ভেজা মাটি, মেঘলা আবহাওয়া এবং কয়েক দিন ২৪ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা থাকলে। ফিউজেরিয়াম ছত্রাকের কারণে হওয়া আমের বিকৃতি রোগ বাড়ে উচ্চ তাপমাত্রা এবং উষ্ণ ও ভেজা মাটিতে। পঞ্জিকায় আমের হপার পোকা, ফলের মাছি, আমের আঁটির পোকা (ফ্রুট উইভিল), পাতা খেকো পোকা ও পাতা কাটা উইভিলের অনুকূল তাপমাত্রাও দেওয়া আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার আইএফএএস এক্সটেনশন অ্যানথ্রাকনোজকে ফ্লোরিডায় আমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোগ বলেছে, যা ফুল, কচি ফল, পাতা ও ডালে আক্রমণ করে; আর পাউডারি মিলডিউ সাদা গুঁড়ার মতো আস্তরণ তৈরি করে মুকুল নষ্ট করে দিতে পারে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কলমের গাছে লাগানোর তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ফল আসতে শুরু করে; বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে কলমের গাছের ক্ষেত্রে প্রায় চার বছরের কথা বলেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জরিপে চাষিরাও একই সমস্যার কথা বলেছেন: ৪৩.১ শতাংশ অ্যানথ্রাকনোজের মুখে পড়েছিলেন, অনেকে হপার পোকা ও ফলের মাছির কথা জানান। কোন বালাইনাশক কতটা লাগবে তা পোকা বা রোগ, জাত ও গাছের অবস্থার ওপর নির্ভর করে, তাই ছাদবাগানির উচিত অনুমানে নয়, কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। সাকিব নিজেও জানিয়েছিলেন, তিনি কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে কাজ করেন।

রাঙ্গুনিয়ায় সেই পরামর্শের জায়গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিস, যারা এই প্রতিবেদনের জন্য প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছিল। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীতে বারির আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, যার বিজ্ঞানীরা স্থানীয় পর্যায়ে বারির আমের জাত গ্রহণ নিয়ে গবেষণা করেছেন, প্রতিবেদনে নাম আসা উন্নত জাতগুলো নিয়ে কাজ করে।

ছবি: Mohaiminul Adil / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাপিডিয়া, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস ফসল-আবহাওয়া পঞ্জিকা), বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ, ইবাউব জার্নাল, ঢাকা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

আঙিনা কৃষি

সম্পর্কিত খবর

আঙিনা কৃষি

বসতবাড়ির গাছের কার্বন বেচে কৃষকের আয়: গাকৃবির ‘কার্বোডিট’ উদ্ভাবন এশিয়ায় রানার্সআপ

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দল কার্বোডিট বসতবাড়ি ও কৃষি বনায়নের গাছের কার্বন মজুত মেপে ক্ষুদ্র কৃষককে কার্বন ক্রেডিটের বাজারে আনার মডেল দিয়ে কলম্বোয় সিরডাপের আঞ্চলিক উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় ১৮৭ প্রস্তাবের মধ্যে রানার্সআপ হয়েছে।

সমকাল১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ছাদকৃষি

ইউটিউব দেখে ছাদে আর আঙিনায় ড্রাগন, বছরে লাখ টাকা লাভ মতলবের বিদেশফেরত হানিফের

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে বাড়ির ১,৪০০ বর্গফুট ছাদে ও সাড়ে ৬ শতক আঙিনায় ২০২৪ সালে ড্রাগন লাগিয়েছিলেন ৬২ বছরের আবু হানিফ; এখন বছরে লাখ টাকার বেশি লাভ করছেন, এবার ইজারা নিয়েছেন আরও ৬০ শতক জমি।

প্রথম আলো১২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফল

বাড়িতে চারটি চারা থেকে প্যাশন ফলের বাগান, কেজি বিকোচ্ছে ৬০০-৮০০ টাকায়

কুমিল্লার দাউদকান্দির ইছাপুরা গ্রামের দন্তচিকিৎসক আবুল হাসান ফারুক ২০২৪ সালে শখ করে বাড়িতে চারটি প্যাশন ফলের চারা লাগান; এখন মাচাভরা বাগান থেকে দুই দফায় ফল পেয়েছেন।

কৃষি সময়১২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)