সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

গোল মরিচের উপকারিতা ও চাষ পদ্ধতি: পুষ্টিগুণে ভরপুর এক লাভজনক ফসল

রান্নাঘরের পরিচিত ‘মসলার রাজা’ গোল মরিচ আসলে এক লতানো গাছের শুকনো ফল। উষ্ণ, আর্দ্র জলবায়ুতে খুঁটি বা গাছ বেয়ে ওঠা এই লতা একবার লাগালে বহু বছর ফল দেয়। এর পুষ্টিগুণ, মাটি, রোপণ, গর্তপ্রতি সার, পোকা, রোগ আর ফসল তোলার পুরো পদ্ধতি।

গোল মরিচের উপকারিতা ও চাষ পদ্ধতি: পুষ্টিগুণে ভরপুর এক লাভজনক ফসল
ফসল

রান্নাঘরের মসলার কৌটায় কালো, কুঁচকানো ছোট দানাগুলো আমরা প্রতিদিন দেখি। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই গোল মরিচ আসলে একটি লতানো গাছের শুকনো ফল, যে লতা গাছ বা খুঁটি বেয়ে কয়েক মানুষ সমান উঁচুতে উঠে যায়। ‘মসলার রাজা’ নামে পরিচিত গোল মরিচ শুধু স্বাদ আর ঝাঁঝের উপকরণ নয়; এটি পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও সম্ভাবনাময় একটি ফসল। এর চাহিদা দেশে যেমন আছে, আন্তর্জাতিক বাজারেও তেমনি ব্যাপক।

গোল মরিচের আদি নিবাস দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা আর মালাবার উপকূলের বনাঞ্চল। সেখান থেকেই এই মসলা শত শত বছর আগে আরব, ইউরোপ আর এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় এর দাম এত বেশি ছিল যে একে বলা হতো ‘কালো সোনা’। আজ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা আর থাইল্যান্ডের মতো দেশ এর বড় উৎপাদক।

মজার ব্যাপার হলো, গোল মরিচ আমাদের অনেক পরিচিত গাছের আত্মীয়। পান, পিপুল আর খুলনা অঞ্চলের জনপ্রিয় চুই ঝাল, সবাই একই পরিবারের, একই গণের উদ্ভিদ। পানের লতা যেমন গাছ বা বাঁশের অবলম্বনে বেয়ে ওঠে, গোল মরিচের লতাও তেমনি গিঁট থেকে ছোট ছোট শিকড় বের করে অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে ওপরে ওঠে। যাঁরা পান বা চুই ঝালের চাষ দেখেছেন, তাঁদের কাছে গোল মরিচের চাষ তাই একেবারে অচেনা মনে হবে না।

বাংলাদেশে গোল মরিচের অবস্থা


বাংলাদেশে গোল মরিচের চাষ এখনো খুবই সীমিত। কৃষি তথ্য সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ সালে সারা দেশে মাত্র ৫ হেক্টর জমিতে গোল মরিচের চাষ হয়েছিল, মোট উৎপাদন ছিল ৬ মেট্রিক টন। ফলে দেশের বাজারে যে গোল মরিচ বিক্রি হয়, তার প্রায় পুরোটাই আসে আমদানি করে। বাড়ির আঙিনায় বা বাগানে কিছু গাছ থাকলেও বাণিজ্যিক চাষ এখনো শুরুর পর্যায়ে।

অথচ দেশের কিছু এলাকার আবহাওয়া এই ফসলের জন্য বেশ উপযোগী। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী সিলেট, চট্টগ্রাম আর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় গোল মরিচের চাষ হয়, আর হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা এর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বারি ১৯৮৭ সালে জৈন্তিয়া এলাকার গোল মরিচ থেকে বাছাই করে ‘বারি গোলমরিচ-১’ জাত উদ্ভাবন করে, যা এখনো দেশের একমাত্র অবমুক্ত জাত। মাঠে অবশ্য স্থানীয় জাতও চাষ হয়। আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তাই এখানে বড়।

পুষ্টিগুণ আর ভেষজ গুণ


গোল মরিচের দানায় আছে আমিষ, চর্বি, এবং প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম ও লৌহ। মূল লেখায় একে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে আর ভিটামিন এ সমৃদ্ধ এবং ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রনের ভালো উৎস বলা হয়েছে। এতে প্রদাহরোধী আর জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্যও রয়েছে বলে ধরা হয়। তবে মনে রাখা দরকার, মসলা হিসেবে আমরা একবারে খুব অল্প পরিমাণ গোল মরিচ খাই, তাই এর পুষ্টির অবদানও সেই অনুপাতে ছোট।

গোল মরিচের ঝাঁঝের মূল কারণ পাইপারিন নামের একটি যৌগ। প্রচলিত ধারণা ও মূল লেখায় গোল মরিচের যেসব স্বাস্থ্যগত উপকারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো:

  • হজমশক্তি বাড়ায়: গোল মরিচে থাকা পাইপারিন হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে।
  • ওজন কমাতে সহায়ক: এটি বিপাকক্রিয়া বাড়িয়ে শরীরের চর্বি কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা জারণরোধী উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
  • ত্বকের যত্ন: ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে আর ব্রণ কমাতে একে কার্যকর বলা হয়।
  • শ্বাসযন্ত্রের আরাম: ঠান্ডা, কাশি আর সাইনাসের সমস্যায় গোল মরিচ বহুদিন ধরে ঘরোয়াভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

লোকজ চিকিৎসায় গোল মরিচের আরও কিছু ভেষজ গুণের কথা বলা হয়। এটি হজমে সহায়তা করে, স্নায়ুর শক্তি বাড়ায়, দাঁতের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে, মাংসপেশি ও হাড়ের জোড়ার ব্যথা উপশম করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। এসব ব্যবহার বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। তবে কোনো অসুখে গোল মরিচ ওষুধের বিকল্প নয়; দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

রান্নায় এর ব্যবহার সবার জানা। মাংস, ডিম, স্যুপ, সালাদ থেকে শুরু করে চা পর্যন্ত নানা খাবারে গোল মরিচ মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই লতার ফল থেকে প্রক্রিয়াভেদে কালো আর সাদা, দুই রকম গোল মরিচ হয়। পুরো দানা খোসাসহ শুকালে হয় কালো গোল মরিচ, আর পাকা ফলের বাইরের খোসা ছাড়িয়ে ভেতরের বীজ শুকালে হয় সাদা গোল মরিচ।

সাদা গোল মরিচের ঝাঁঝ তুলনামূলক মৃদু, রংও হালকা, তাই সাদা সস বা হালকা রঙের খাবারে রাঁধুনিরা এটি পছন্দ করেন। অন্যদিকে কাঁচা সবুজ দানা আচার বা টাটকা রান্নায় ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একই লতা থেকে বাজারের চাহিদা বুঝে তিন রকম পণ্য তৈরির সুযোগ আছে।

মাটি আর জলবায়ু


গোল মরিচ উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ফসল। যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয় আর বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে, সেখানে এটি ভালো জন্মে। বছরে ১০০ থেকে ২০০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এমন অঞ্চলে ফলন ভালো হয়। গাছটি ১০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে।

মাটির ক্ষেত্রে দোআঁশ মাটি এবং জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ মাটি সবচেয়ে উপযুক্ত। মাটির পিএইচ সাধারণভাবে ৫.৫ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে থাকলে ভালো, তবে ৪.৫ থেকে ৬.০ পিএইচের অম্লীয় মাটিতেও এই ফসল ফলানো যায়। পিএইচ হলো মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্বের মাপ; ৭ এর নিচে মানে অম্লীয়। পাহাড়ি এলাকার মাটি এই দিক থেকে গোল মরিচ চাষের জন্য খুব উপযোগী, কারণ সেখানকার মাটি সাধারণত অম্লীয়, আর ঢালু জমিতে পানি জমে থাকে না।

পানি জমে থাকা গোল মরিচের সবচেয়ে বড় শত্রু। শিকড়ের গোড়ায় পানি দাঁড়ালে গোড়া পচা রোগ দেখা দেয়, যা পুরো লতা মেরে ফেলতে পারে। তাই সমতল জমিতে চাষ করলে ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা জরুরি। গর্তের চারপাশ সামান্য উঁচু করে রাখা আর বর্ষায় পানি বের হওয়ার জন্য ছোট নালা কেটে দেওয়া এর সবচেয়ে কম খরচের সমাধান। টিলা বা ঢালু জমিতে এই সমস্যা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে।

জাত, চারা আর রোপণ


স্থানীয় জাতের পাশাপাশি বারি গোলমরিচ-১ চাষ করা যায়। চারা তৈরির জন্য উন্নত জাতের ভালো মাতৃগাছ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। গোল মরিচ সাধারণত বীজ থেকে নয়, লতার কাটিং বা ডাল কেটে চারা করা হয়, কারণ তাতে মাতৃগাছের গুণাগুণ হুবহু বজায় থাকে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ভালো মাতৃগাছ থেকে কাটিং নিতে হয়, প্রতিটি কাটিংয়ে অন্তত দুই থেকে তিনটি গিঁট বা চোখ থাকা আবশ্যক। ছায়ায় রেখে নিয়মিত পানি দিলে এক মাসের মধ্যে কাটিংয়ে শিকড় গজায়।

গোল মরিচ গাছ লতানো প্রকৃতির, তাই একে বেয়ে ওঠার জন্য খুঁটি বা জীবন্ত গাছের অবলম্বন দিতে হয়। আম, কাঁঠাল বা সুপারির মতো গাছকে অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে বাড়তি জমি লাগে না; বাড়ির আঙিনার বা বাগানের পুরোনো গাছই গোল মরিচের খুঁটি হয়ে যায়। সুপারি বাগানের গাছে গোল মরিচের লতা তুলে দেওয়া তাই অনেক এলাকায় একটি ভালো মিশ্র চাষের উপায়।

গাছ থেকে গাছের দূরত্ব রাখতে হয় ২ থেকে ৩ মিটার। বড় পরিসরের বাণিজ্যিক বাগানে কৃষি তথ্য সার্ভিস গাছ থেকে গাছে ৪ মিটার আর সারি থেকে সারিতে ৫ মিটার দূরত্ব এবং দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় ৫০ সেন্টিমিটারের গর্তের কথা বলেছে। চারা রোপণের সবচেয়ে ভালো সময় বর্ষাকালের শুরু, যখন মাটিতে রস থাকে আর বাতাস আর্দ্র। চারা লাগাতে হয় খুঁটি বা অবলম্বন গাছের গোড়ায়, যাতে লতা বাড়তে শুরু করলেই বেয়ে ওঠার জায়গা পায়।

গর্ত তৈরির ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা বা বামিসের পরামর্শ হলো, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর গভীরতায় আধা মিটারের গর্ত করে তাতে প্রায় ১০ কেজি জৈব সার, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার আর হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে কিছুদিন রেখে দিতে হবে, তারপর চারা লাগাতে হবে। বামিস রোপণের সময় হিসেবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ, অর্থাৎ মে-জুন মাসের কথা বলেছে, যা বর্ষার শুরুর সঙ্গে মিলে যায়। চারা লাগানোর পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ হালকা ছায়া আর নিয়মিত পানি পেলে গাছ দ্রুত মাটি ধরে।

গর্তপ্রতি সারের হিসাব


গোল মরিচ বহু বছরের ফসল, তাই এর সার দেওয়ার হিসাবও বছর ধরে ধরে করতে হয়। সাধারণভাবে জৈব সার বা কম্পোস্ট এবং পটাশিয়াম ও ফসফরাসযুক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। পূর্ণবয়স্ক গাছের জন্য প্রতি গর্তে প্রতি বছর দিতে হবে:

  • ইউরিয়া: ৩০০ গ্রাম
  • টিএসপি: ১১০ গ্রাম
  • পটাশ বা এমওপি: ৪৫০ গ্রাম
  • পচা গোবর: ১০ কেজি, প্রতি বছর মে-জুন মাসে
  • চুন: ৬০০ গ্রাম, এক বছর পরপর

রাসায়নিক সারের এই পূর্ণ মাত্রা দিতে হবে তৃতীয় বছর থেকে। প্রথম বছর দিতে হবে এর তিন ভাগের এক ভাগ, আর দ্বিতীয় বছর তিন ভাগের দুই ভাগ। অর্থাৎ গাছ যত বড় হবে, সারের পরিমাণও তত বাড়বে। সার সাধারণত বছরে দুই দফায় দিতে হয়: একবার মে-জুন মাসে, আরেকবার আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে।

চুন দেওয়ার কারণটা বোঝা দরকার। বৃষ্টিবহুল এলাকার মাটি সময়ের সঙ্গে আরও অম্লীয় হয়ে যায়। এক বছর পরপর চুন দিলে মাটির অম্লতা নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর গাছ মাটি থেকে পুষ্টি ঠিকমতো নিতে পারে। পটাশের মাত্রা বেশি রাখার কারণ হলো পটাশিয়াম গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় আর ফলের মান ভালো করে।

সেচ, আগাছা আর লতার যত্ন


গোল মরিচে নিয়মিত সেচ দরকার, তবে কোনোভাবেই পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। মাটিতে রসের অভাব হলে, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে, পানি সেচ দিতে হবে। গাছের গোড়ায় আগাছা দেখা দিলে পরিষ্কার করতে হবে, কারণ আগাছা মাটির পুষ্টি আর পানিতে ভাগ বসায়।

ডগা বাড়তে থাকলে তাকে ঠেস গাছ বা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে, যাতে লতা নিচে ঝুলে না পড়ে বা মাটিতে ছড়িয়ে না যায়। নিয়মিত ছাঁটাই করে গাছের অতিরিক্ত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখাও দরকার। এতে গাছের ভেতরে আলো-বাতাস ঢোকে, ফল তোলার কাজও নাগালের মধ্যে থাকে, আর কিছু পোকার আক্রমণও কমে, যা নিচে বলা হয়েছে।

সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা: ফ্লি বিটল


গোল মরিচের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হলো ফ্লি বিটল, এক ধরনের ছোট গুবরে পোকা। এর আক্রমণে ফসলের শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। সে কারণে পোকা দেখামাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পোকা চেনার উপায় হলো, পূর্ণবয়স্ক বিটলের পাখা কালো, আর মাথা ও ঘাড় হলদে বাদামি রঙের। ক্ষতির ধরন এরকম: পূর্ণবয়স্ক পোকা আর কীড়া দুটোই গাছের কচি অংশ খেয়ে নষ্ট করে। পূর্ণবয়স্ক বিটল ফল ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে ভেতরের অংশ খায়। আক্রান্ত ফল প্রথমে হলুদ, পরে কালো হয়ে যায়। কীড়া ফলের বীজ ছিদ্র করে ভেতরের অংশ খেয়ে ফেলে।

এই পোকার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ হলো ছায়াযুক্ত জায়গা। জীবনচক্রের দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। স্ত্রী বিটল জুলাই মাসে কচি ফলে একটি বা দুটি করে ডিম পাড়ে, আর একটি পোকা মোট প্রায় ১০০টি ডিম পাড়ে। ৫ থেকে ৮ দিনে ডিম থেকে কীড়া বের হয়। কীড়া ২০ থেকে ৩২ দিন পর পুত্তলি বা মূককীটে পরিণত হয়। ৬ থেকে ৭ দিন পর পুত্তলি থেকে পূর্ণবয়স্ক বিটল বের হয়, যা ৩৯ থেকে ৫০ দিন বাঁচে।

দমনের জন্য নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করে অতিরিক্ত বৃদ্ধি কমাতে হবে, যাতে ছায়া কমে। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা বা বামিস এই পোকার জন্য সাইপারমেথ্রিনজাতীয় কীটনাশক ১০ থেকে ১২ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছে। কীটনাশক ব্যবহারের আগে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া আর বোতলের নির্দেশনা মানা জরুরি।

নার্সারির রোগ


গোল মরিচ গাছে পাতা পুড়ে যাওয়া, গোড়া পচা এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে। প্রতিরোধের প্রথম শর্ত সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা, যাতে পচন না ধরে, আর দ্বিতীয় শর্ত সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া।

নার্সারিতে চারা থাকা অবস্থায় দুটি রোগ বেশি দেখা যায়: পাতা পচা আর ঢলে পড়া। পাতা পচা রোগে পাতায় কালো দাগ পড়ে, আর ঢলে পড়া রোগ হলে কাটিং নেতিয়ে পড়ে। ব্যাভিস্টিন বা কপার অক্সিক্লোরাইড নামের ছত্রাকনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পরপর তিনবার প্রয়োগ করলে এই রোগ দমন করা যায়।

মাঠে হঠাৎ ঢলে পড়া রোগ


মাঠের গাছের সবচেয়ে ভয়ের রোগ হলো হঠাৎ ঢলে পড়া। বিশ্বের গোল মরিচ চাষি অঞ্চলগুলোতেও এটি অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে পরিচিত, যার জন্য সাধারণত মাটিবাহিত ফাইটোফথোরা নামের জীবাণুকে দায়ী করা হয়। এর লক্ষণগুলো হলো:

  • পাতার ওপর কালো দাগ পড়ে, পরে দাগ বড় হয়।
  • কচি পাতা আর ডগা আক্রান্ত হয়ে কালো হয়ে যায়; বেশি আক্রমণে গাছ মরে যায়।
  • গোড়াসহ গাছের সব জায়গায় আক্রমণ ছড়াতে পারে।
  • বর্ষা মৌসুমের শেষে আক্রমণ হলে গাছ হলুদ হয়ে ঢলে পড়তে পারে।

এই রোগ দমনে পাঁচটি ধাপ মেনে চলতে হয়: আক্রান্ত গাছ মাটিসহ তুলে ধ্বংস করা; রোগমুক্ত কাটিং ব্যবহার করা; পরিচর্যার সময় শিকড়ে যেন ক্ষত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা; সাকার বা মাটির দিকে নেমে আসা ডগাকে মাটিতে বাড়তে না দেওয়া; এবং ০.২ শতাংশ হারে কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করা। ০.২ শতাংশ মানে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম।

শিকড়ে ক্ষত না করার পরামর্শটি গুরুত্বপূর্ণ। মাটির জীবাণু সাধারণত ক্ষতস্থান দিয়েই গাছে ঢোকে। তাই আগাছা পরিষ্কার বা মাটি আলগা করার সময় গোড়ার খুব কাছে কোদাল চালানো ঠিক নয়। একইভাবে মাটিতে ছড়ানো ডগা মাটির সংস্পর্শে এসে জীবাণু ডেকে আনে, তাই সেগুলো তুলে বেঁধে দিতে হয় বা কেটে ফেলতে হয়।

ফল তোলা আর শুকানো


রোপণের দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে গোল মরিচ গাছ ফল দিতে শুরু করে। মে-জুন মাসে গাছে ফুল আসে, আর ৬ থেকে ৮ মাস পর ফল তোলা যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাবে পৌষ-মাঘ মাস গোল মরিচ তোলার উপযুক্ত সময়।

ফল ধরে থোকায় থোকায়, লম্বা ছড়ার মতো। থোকার এক-দুটি ফল যখন উজ্জ্বল কমলা বা বেগুনি-লাল রং ধারণ করে, তখন পুরো থোকা সংগ্রহ করতে হয়। এরপর দানাগুলো ছাড়িয়ে ৭ থেকে ১০ দিন রোদে শুকালে সবুজ দানা কুঁচকে কালো হয়ে যায়; এটাই বাজারের কালো গোল মরিচ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শে শুকানোর আগে দানা অল্প সময় গরম পানিতে ডুবিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, এতে রং আর ঝাঁঝ ভালো থাকে। ভালোভাবে শুকানোর পর বায়ুরোধী পাত্রে বা প্যাকেটে ভরে সংরক্ষণ করতে হয়।

ফলনের একটি ধারণাও কৃষি তথ্য সার্ভিস দিয়েছে। ৭ থেকে ৮ বছর বয়সী একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে ৩ থেকে ৫ কেজি টাটকা গোল মরিচ পাওয়া যায়, যা শুকানোর পর দাঁড়ায় দেড় থেকে আড়াই কেজি।

শুরুর আগে কয়েকটি হিসাব


গোল মরিচ ধৈর্যের ফসল। প্রথম ফল আসতে দুই থেকে তিন বছর লাগে, আর পূর্ণ ফলন পেতে গাছের বয়স হতে হয় সাত-আট বছর। তাই যাঁরা দ্রুত নগদ আয়ের আশায় চাষ শুরু করতে চান, তাঁদের জন্য এটি মূল ফসল নয়, বরং অন্য ফসল বা বাগানের পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

জায়গা বাছাইয়েও একটা ভারসাম্য দরকার। গোল মরিচ আর্দ্রতা আর হালকা ছায়া পছন্দ করে, কিন্তু খুব ঘন ছায়ায় ফ্লি বিটলের উপদ্রব বাড়ে, আর ফলনও কমে যায়। তাই অবলম্বন গাছের ডালপালা মাঝে মাঝে ছেঁটে আলো ঢোকার পথ রাখা ভালো। কাটিং সংগ্রহ করতে হবে রোগমুক্ত, ভালো ফলন দেয় এমন মাতৃগাছ থেকে, কারণ একবার রোগাক্রান্ত চারা লাগালে বহু বছরের পরিশ্রম ঝুঁকিতে পড়ে।

একবার লাগালে বহু বছরের আয়


গোল মরিচের অর্থনৈতিক শক্তি এর দীর্ঘ জীবনে। ধান বা সবজির মতো প্রতি মৌসুমে নতুন করে লাগাতে হয় না; একবার ভালোভাবে লাগানো লতা বহু বছর ধরে ফল দেয়। তা ছাড়া এর জন্য আলাদা জমিরও দরকার পড়ে না। বাড়ির আম-কাঁঠাল গাছ, সুপারি বাগান বা বসতবাড়ির পাশের গাছপালাকে অবলম্বন করে এটি বাড়ানো যায়। শুকনো গোল মরিচ নষ্ট হয় না বলে দাম ভালো না পেলে কিছুদিন ধরে রাখারও সুযোগ থাকে।

দেশের বাজারে গোল মরিচের চাহিদা সারা বছর, আর সেই চাহিদার প্রায় পুরোটাই এখন আমদানিতে মেটে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে সেই আমদানির একটা অংশ কমানো সম্ভব, আর কৃষকের হাতে আসতে পারে একটি উচ্চমূল্যের নগদ ফসল। সিলেট আর পার্বত্য অঞ্চলের বসতবাড়ি থেকে শুরু করে দেশের যেকোনো আর্দ্র, ছায়াঘেরা আঙিনায় একটি-দুটি লতা দিয়েও শুরু করা যায়।

রান্নাঘরের ছোট্ট কালো দানাটির পেছনে তাই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘমেয়াদি কৃষি সম্ভাবনা। সঠিক মাটি, ভালো কাটিং, সময়মতো সার আর রোগ-পোকার দিকে নজর রাখলে গোল মরিচ কৃষকের জন্য বছরের পর বছর আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। আগ্রহী কৃষকেরা শুরুর আগে উপজেলা কৃষি অফিস বা বারির মসলা গবেষণা কেন্দ্রের পরামর্শ নিতে পারেন।

ছবি: গোল মরিচের লতায় কাঁচা মরিচের গুচ্ছ, This Photo was taken by Timothy A. Gonsalves. Feel free to use my photos, but pl / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)