গোলাপের পাপড়ি বা গোলাপজল মুখে মাখলে ত্বক উজ্জ্বল হয়, এমন কথা প্রচলিত আছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা হয়েছে, গোলাপ নিয়ে গবেষণা আসলে কী বলে, আর ত্বকে নতুন কিছু ব্যবহারের আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কী সাবধানতার কথা বলে। মূল কথা হলো, গোলাপের কিছু উপাদানের গুণ পরীক্ষাগারে পাওয়া গেছে, তবে মানুষের ত্বকে এর উপকারিতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো সীমিত।
ফুলের রানী গোলাপ
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্ণ, গন্ধ, কমনীয়তা ও সৌন্দর্যের বিচারে গোলাপকে ফুলের রানী বলা হয়। এটি মূলত শীতকালীন মৌসুমি ফুল হলেও এখন সারা বছর চাষ হয়। গোলাপ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কাটা ফুল হিসেবে; সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, বাগান ও বারান্দা সাজাতে এবং আতর ও সুগন্ধি শিল্পেও এর ব্যবহার আছে।
এআইএস জানায়, গোলাপের বংশবৃদ্ধি হয় বীজ, কাটিং, গুটি কলম ও চোখ কলমের মাধ্যমে। বীজ দিয়ে বংশবিস্তার কেবল প্রজনন বা জাত উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হয়; বাণিজ্যিকভাবে কাটা ফুল উৎপাদনে নতুন গাছ তৈরির প্রধান পদ্ধতি চোখ কলম বা বাডিং। বাংলাদেশে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোলাপের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।

গোলাপজল ও গোলাপ তেল যেভাবে তৈরি হয়
গোলাপ রোজাসি পরিবারের রোজা গণের উদ্ভিদ; এই গণে তিন শতাধিক প্রজাতি আছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, গোলাপের পাপড়ি থেঁতো করে বাষ্প পাতনের মাধ্যমে গোলাপ তেল বা আতর তৈরি হয়, আর এক গ্রাম তেলের জন্য প্রায় দুই হাজার ফুল লাগে। সুগন্ধির জন্য গোলাপ তেল তৈরির সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া যায় গোলাপজল। এর প্রধান উৎস দামাস্ক গোলাপ (রোজা × দামাসেনা)। দক্ষিণ এশিয়ার মিষ্টান্নসহ নানা খাবারে গোলাপজল স্বাদ ও গন্ধের জন্য ব্যবহার করা হয়।
ইরানিয়ান জার্নাল অব বেসিক মেডিকেল সায়েন্সেসে ২০১১ সালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বোসকাবাদি ও সহকর্মীরা লিখেছেন, ইরানে, বিশেষ করে কাশানে, গোলাপজল ও সুগন্ধি তেল তৈরির জন্য দামাস্ক গোলাপের চাষ হয়।

গবেষণা যা বলে, আর যা বলে না
বোসকাবাদি ও সহকর্মীদের ওই পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরীক্ষাগারে দামাস্ক গোলাপের নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ পাওয়া গেছে, এর সুগন্ধি তেল ই. কোলাই ও সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসার মতো ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর দেখা গেছে, আর ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় একটি নির্যাস ফোলা কমিয়েছে। ক্ষত সারানো ও ত্বকের যত্নে গোলাপের প্রথাগত ব্যবহারের কথাও সেখানে আছে। তবে এসব ফলের বেশির ভাগ পরীক্ষাগার বা প্রাণীর ওপর গবেষণা থেকে পাওয়া, মানুষের ত্বকে পরীক্ষা থেকে নয়।
আভিসেনা জার্নাল অব ফাইটোমেডিসিনে ২০১৭ সালে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় গোলাপ তেল নিয়ে ১৩টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিশ্লেষণ করা হয়, যাতে ৭৭২ জন অংশ নেন। গবেষকেরা লিখেছেন, প্রাণীর ওপর অনেক গবেষণা হলেও মানুষের ওপর গবেষণা কম। তাঁদের পাওয়া প্রধান প্রভাবগুলো ছিল শরীর ও মনের প্রশান্তি, ব্যথা ও উদ্বেগ কমা; ত্বকের কোনো সমস্যা নিয়ে ট্রায়াল ওই পর্যালোচনায় ছিল না। তাই গোলাপের ফেসপ্যাক ত্বক উজ্জ্বল করে, কালচে ভাব দূর করে বা পাপড়ির গুঁড়া অসুখ সারায়, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।

ত্বকে ব্যবহারের আগে সাবধানতা
আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজির (এএডি) চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রুস এ. ব্রড ২০২১ সালে জানান, ১৫ হাজারের বেশি উপাদান ত্বকে অ্যালার্জি ঘটাতে পারে এবং ত্বকের যত্নের পণ্য এর একটি সাধারণ কারণ। “প্রাকৃতিক” লেখা পণ্যেও প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) বলছে, প্রসাধনীর উপাদান থেকে কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস হতে পারে; তাতে ত্বক চুলকায়, ফোসকা পড়ে, শুকিয়ে ফেটে যায়, সাধারণত সংস্পর্শের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে।
নতুন কিছু মুখে ব্যবহারের আগে এএডির পরামর্শ:
- হাতের ভেতরের দিকে বা কনুইয়ের ভাঁজে, যেখানে ঘষা বা ধোয়া লাগে না, একটি ছোট মুদ্রার সমান জায়গা বেছে নিন।
- সাধারণত যতটুকু ব্যবহার করেন ততটুকু সেখানে দিনে দুবার, সাত থেকে ১০ দিন লাগান।
- এ সময়ে লালচে ভাব, চুলকানি বা ফোলা না হলে তবেই নিয়মিত ব্যবহার করুন।
- প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব আলতো করে ধুয়ে ফেলুন এবং আর ব্যবহার করবেন না; প্রতিক্রিয়া তীব্র হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান।
এনএইচএস বলছে, উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী, বারবার ফিরে এলে বা তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ত্বকের কোনো সমস্যায় ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ছবি: Azim Khan Ronnie / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), ইরানিয়ান জার্নাল অব বেসিক মেডিকেল সায়েন্সেস (বোসকাবাদি ও সহকর্মী, ২০১১), আভিসেনা জার্নাল অব ফাইটোমেডিসিন (মোহেবিতাবার ও সহকর্মী, ২০১৭), আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি, এনএইচএস, উইকিপিডিয়া (গোলাপ, গোলাপজল)




মন্তব্য
(০)