ঢাকার একটি মিষ্টান্ন ও বেকারি প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের মে মাসে গ্রাহকদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ইনডোর গাছ বিতরণের একটি ক্যাম্পেইন শুরু করে বলে ১৪ মে ২০২৬ তারিখে জাগো নিউজ ২৪ জানায়। প্রতিষ্ঠানটির নাম মিঠাই; এর নির্ধারিত ১০টি আউটলেট থেকে কেক কিনলে গ্রাহকেরা উপহার হিসেবে টবে লাগানো একটি ইনডোর গাছ পাচ্ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং শহরের ঘরে সবুজের উপস্থিতি বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। সে সময় ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় ছিল।
ক্যাম্পেইন যেভাবে চলছিল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাছগুলো সবার জন্য বিনা মূল্যের বিতরণ ছিল না; নির্ধারিত আউটলেটে কেক কিনলেই কেবল উপহার হিসেবে গাছ মিলছিল। রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা ও নিকেতনসহ ১০টি আউটলেট এতে যুক্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করা এবং নগরজীবনে সবুজের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ব্র্যান্ড ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ জানান, ক্যাম্পেইনটি সম্প্রতি চালু হয়েছে এবং প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ৫০০টি ইনডোর গাছ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কার্যক্রম চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত, আর এই সময়ের মধ্যে প্রায় তিন হাজার গাছ বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কোন কোন প্রজাতির গাছ দেওয়া হচ্ছিল, সেগুলো কোথায় উৎপাদিত বা কীভাবে বড় করা হয়েছে, তা বলা হয়নি; প্রতিষ্ঠানের বাইরের কারও মন্তব্যও তাতে ছিল না। ক্যাম্পেইনের বিস্তারিত তথ্য প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ফেসবুক পেজে দেওয়া হয়েছিল।
শহরের বাতাস নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যা বলেছিল
প্রতিষ্ঠানটির হেড অব মার্কেটিং আনিসুল ইসলাম ক্যাম্পেইনটিকে বায়ুদূষণের সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি বলেন, বায়ুদূষণ এখন নগরজীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এবং আইকিউএয়ারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর। তাঁর মতে, এই বাস্তবতায় ইনডোর গাছ ঘরের বাতাসের মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে; সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারাকে উৎসাহিত করতেই এ উদ্যোগ।
তাঁর বক্তব্যে দুটি দাবি ছিল, যা ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়: ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে খারাপগুলোর একটি, এবং ইনডোর গাছ ঘরের বাতাসের মান বাড়ায়। প্রথম দাবিটি সে সময়ের পর্যবেক্ষণ তথ্যে সমর্থিত। দ্বিতীয়টি দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত বিশ্বাস, যা পরিবেশ সংস্থা ও গবেষকেরা যাচাই করে দেখেছেন; সেই ফলাফল নিচে তুলে ধরা হলো।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ঢাকার বাতাস
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ তাদের ২০২৫ সালের বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেদিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত দেশ ছিল বাংলাদেশ, ২০২৪ সালেও দেশটির অবস্থান ছিল একই। বাংলাদেশে সূক্ষ্ম বস্তুকণা, অর্থাৎ পিএম২.৫-এর বার্ষিক গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৬.১ মাইক্রোগ্রাম। প্রথম স্থানে থাকা পাকিস্তানে এ মাত্রা ছিল ৬৭.৩ এবং তৃতীয় তাজিকিস্তানে ৫৭.৩। বাংলাদেশের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিত সীমা, প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের ১৩ গুণেরও বেশি ছিল।
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বিশেষভাবে তীব্র দূষণের রাজধানীগুলোর মধ্যে ঢাকার নাম আসে: দুশানবে ও দিল্লির সঙ্গে ঢাকাতেও অন্তত দুই মাস পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে যায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বাংলাদেশের দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে শিল্প ও যানবাহনের নিঃসরণ, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা এবং মৌসুমি ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর কথা উল্লেখ করে।
বিশ্বজুড়ে আইকিউএয়ার ১৪৩টি দেশ, অঞ্চল ও ভূখণ্ডের ৯ হাজার ৪৪৬টি শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করে। তাতে দেখা যায়, ১৪৩টির মধ্যে ১৩০টিতেই বায়ুর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিকার চেয়ে খারাপ, আর ২০২৫ সালে মাত্র ১৪ শতাংশ শহর সেই নির্দেশিকা পূরণ করতে পেরেছে, যা আগের বছর ছিল ১৭ শতাংশ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইকিউএয়ারের প্রধান নির্বাহী ফ্র্যাংক হ্যামস বায়ুর মানকে একটি ভঙ্গুর সম্পদ বলে বর্ণনা করেন, যার সুরক্ষা প্রয়োজন।
এর আগের সংস্করণটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ১১ মার্চ। তাতেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে ছিল, বার্ষিক গড় প্রতি ঘনমিটারে ৭৮ মাইক্রোগ্রাম; শীর্ষে ছিল চাদ, ৯১.৮ মাইক্রোগ্রাম। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ঢাকা ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ দূষিত রাজধানী, যেখানে পিএম২.৫-এর গড় মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৮ মাইক্রোগ্রাম।

দূষিত বাতাস স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি করে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পিএম২.৫-কে ব্যাখ্যা করে ২.৫ মাইক্রন বা তার চেয়ে ছোট ব্যাসের কণা হিসেবে, যা ফুসফুসের গভীরে ঢুকে যেতে পারে, এমনকি রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে এবং মূলত হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে। ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ুমান নির্দেশিকায় সংস্থাটি ২০০৫ সালের তুলনায় প্রায় সব মাত্রাই কমিয়ে আনে।
২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর তারিখের ডব্লিউএইচওর বাইরের বায়ুমান বিষয়ক তথ্যপত্র অনুযায়ী, বাইরের ও গৃহস্থালির বায়ুদূষণ মিলে বছরে ৬৭ লাখ অকালমৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত। শুধু বাইরের বায়ুদূষণেই ২০১৯ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়, আর সে বছর বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বাস করত, যেখানে ডব্লিউএইচওর নির্দেশিত মাত্রা পূরণ হয়নি। বাইরের দূষণজনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৮ শতাংশ ইস্কেমিক হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে, ১৪ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের বাধাজনিত রোগে (সিওপিডি), ১৪ শতাংশ নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণে এবং ৪ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসারে।
বাংলাদেশ নিয়ে একটি বিস্তারিত জাতীয় গবেষণা হলো বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন "ব্রিদিং হেভি: নিউ এভিডেন্স অন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড হেলথ ইন বাংলাদেশ", যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, ঢাকার যেসব জায়গায় বড় নির্মাণকাজ ও অবিরাম যানচলাচল আছে, সেখানে পিএম২.৫-এর গড় মাত্রা ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকার চেয়ে প্রায় ১৫০ শতাংশ বেশি, যা দিনে প্রায় ১.৭টি সিগারেট খাওয়ার সমান। বৃহত্তর ঢাকার ইটভাটার আশপাশে এ মাত্রা ছিল নির্দেশিকার চেয়ে প্রায় ১৩৬ শতাংশ বেশি, আর সবচেয়ে কম দূষিত বিভাগ সিলেটেও প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণে বাংলাদেশে ৭৮ হাজার ১৪৫ থেকে ৮৮ হাজার ২২৯ জনের মৃত্যু হয় এবং সে বছর এর আর্থিক ক্ষতি ছিল দেশের জিডিপির ৩.৯ থেকে ৪.৪ শতাংশের সমান।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকার ওপরে পিএম২.৫ প্রতি ১ শতাংশ বাড়লে শ্বাসকষ্টের সম্ভাবনা ১২.৮ শতাংশ, কফসহ কাশির সম্ভাবনা ১২.৫ শতাংশ এবং নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি ৮.১ শতাংশ বাড়ে; বিষণ্নতার সম্ভাবনা বাড়ে ২০ শতাংশ। প্রতিবেদনে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ ও ফুসফুসের রোগে আক্রান্তদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। বায়ুমান পর্যবেক্ষণ জোরদার, আগাম সতর্কব্যবস্থা চালু এবং দূষণপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও শ্বাসকষ্টের জন্য মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুপারিশও করা হয়।
ঘরের বাতাস: দূষণ কোথা থেকে আসে, কী কাজে দেয়
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) ঘরের বাতাসের মান বলতে ভবনের ভেতরের ও চারপাশের বাতাসের মানকে বোঝায়, বিশেষ করে ভেতরে থাকা মানুষের স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এর সম্পর্কের দিক থেকে। সংস্থাটির মতে, ঘরের বাতাসের সমস্যার মূল কারণ ভেতরের এমন সব উৎস, যা গ্যাস বা কণা ছড়ায়; সঙ্গে থাকে অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, যার ফলে দূষক জমতে থাকে। উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাও কিছু দূষকের মাত্রা বাড়াতে পারে। ইপিএর তালিকায় এসব উৎসের মধ্যে আছে জ্বালানি পোড়ানো যন্ত্র, তামাক, নির্মাণসামগ্রী ও আসবাব, পরিষ্কার ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বাইরে থেকে ঘরে ঢোকা দূষিত বাতাস।
ঘরের বাতাস উন্নত করার নির্দেশনায় ইপিএ তিনটি মৌলিক কৌশলের কথা বলে: উৎস নিয়ন্ত্রণ, বায়ু চলাচল বাড়ানো এবং বায়ু পরিশোধক যন্ত্র। দূষণের উৎস সরিয়ে ফেলা বা এর নিঃসরণ কমানো, অর্থাৎ উৎস নিয়ন্ত্রণকেই সাধারণত ঘরের বাতাস ভালো করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলা হয়, আর অনেক ক্ষেত্রে তা বায়ু চলাচল বাড়ানোর চেয়ে কম খরচেরও। বায়ু চলাচল বাড়ানো মানে জানালা, দরজা ও এগজস্ট ফ্যানের মাধ্যমে বাইরের বাতাস বেশি করে ঢোকানো, বিশেষ করে রান্না বা রং করার মতো অল্প সময়ের বেশি দূষণকারী কাজের সময়। তবে বাইরে দূষণের বড় উৎস থাকলে বিষয়টি ভেবেচিন্তে করার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। বায়ু পরিশোধক যন্ত্রের কার্যকারিতা অনেক রকম; টেবিলে রাখার ছোট যন্ত্রগুলো সাধারণত অনেক কম কার্যকর এবং বেশির ভাগ যন্ত্রই গ্যাসীয় দূষক দূর করার জন্য তৈরি নয়।
বিশ্বের বড় অংশে ঘরের দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস রান্না। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখের ডব্লিউএইচওর গৃহস্থালি বায়ুদূষণ বিষয়ক তথ্যপত্র অনুযায়ী, প্রায় ২১০ কোটি মানুষ কাঠ, ফসলের অবশিষ্টাংশ, কাঠকয়লা, কয়লা, গোবর বা কেরোসিনে চলা খোলা আগুন বা অদক্ষ চুলায় রান্না করেন। গৃহস্থালি বায়ুদূষণে ২০২১ সালে আনুমানিক ২৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ৩ লাখ ৯ হাজারের বেশি। এটি স্ট্রোক, ইস্কেমিক হৃদ্রোগ, সিওপিডি, ফুসফুসের ক্যানসার ও শিশুদের নিউমোনিয়ার সঙ্গে যুক্ত। যেসব ঘরে বাতাস চলাচল কম, সেখানে ভেতরের সূক্ষ্ম কণার মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার প্রায় ১০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে; আর সাধারণত রান্না ও জ্বালানি সংগ্রহের কাজ করেন বলে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি এর শিকার হন।
ডব্লিউএইচও সৌরশক্তি, বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), প্রাকৃতিক গ্যাস, অ্যালকোহল জ্বালানি এবং সংস্থাটির নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে এমন বায়োমাস চুলাকে ঘরের জন্য পরিচ্ছন্ন বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, আর কেরোসিন ও অপরিশোধিত কয়লা ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়। দূষণের সংস্পর্শ কমানোর উপায় হিসেবে উন্নত বায়ু চলাচল ও ঘরের নকশার কথাও বলে সংস্থাটি।
ইনডোর গাছ কি ঘরের বাতাস পরিষ্কার করে?
ঘরের গাছ বাতাস বিশুদ্ধ করে, এই প্রচলিত ধারণার উৎস মূলত নাসার একটি গবেষণা: বি. সি. উলভারটন, অ্যান জনসন ও কিথ বাউন্ডসের "ইন্টেরিয়র ল্যান্ডস্কেপ প্ল্যান্টস ফর ইনডোর এয়ার পলিউশন অ্যাবেটমেন্ট", যা প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এতে ঘরের বাতাসের দূষক কমানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে গাছের পাতা, শিকড়, মাটি ও সংশ্লিষ্ট অণুজীবকে মূল্যায়ন করা হয় এবং গাছের সঙ্গে সক্রিয় কার্বনের স্তর জুড়ে দিয়ে এমন একটি বায়ু ছাঁকনির নকশা প্রস্তাব করা হয়, যার ভেতর দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাতাস চালানো হবে।
পরে গবেষকেরা যাচাই করেন, এ ধরনের ফল সাধারণ একটি ভবনে কতটা খাটে। জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে ২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর অনলাইনে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায়, যার শিরোনাম "টবের গাছ ঘরের বাতাসের মান উন্নত করে না", বি. ই. কামিংস ও এম. এস. ওয়ারিং উল্লেখ করেন, ছোট ও বদ্ধ প্রকোষ্ঠে বহু ঘণ্টা বা কয়েক দিন ধরে রাখা অবস্থায় গাছ উদ্বায়ী জৈব যৌগ দূর করার ক্ষমতা দেখিয়েছে। তাঁরা এমন ১২টি প্রকাশিত প্রকোষ্ঠ-পরীক্ষা পর্যালোচনা করেন এবং ১৯৬টি পরীক্ষার ফলকে ক্লিন এয়ার ডেলিভারি রেট বা পরিচ্ছন্ন বাতাস সরবরাহের হারে রূপান্তর করেন, যে মাপকাঠিতে বায়ু পরিশোধক যন্ত্রের মান নির্ধারণ করা হয়।
একটি গাছের এই হারের মধ্যমা ছিল ঘণ্টায় ০.০২৩ ঘনমিটার। এর ভিত্তিতে লেখকেরা হিসাব করেন, সাধারণ ভবনে বাইরের ও ভেতরের বাতাসের স্বাভাবিক আদান-প্রদান যে হারে এসব যৌগ সরিয়ে দেয়, টবের গাছ দিয়ে সেই হার পেতে মেঝের প্রতি বর্গমিটারে ১০ থেকে ১ হাজারটি গাছ লাগবে। তাঁরা পরামর্শ দেন, গবেষণার মনোযোগ বরং যাওয়া উচিত গাছ কীভাবে এসব যৌগ শোষণ করে, বিকল্প জৈব-ছাঁকন প্রযুক্তি এবং গাছের মানসিক সুস্থতা ও কর্মদক্ষতার উপকারিতার দিকে।
ইপিএও একই রকম অবস্থান নেয়। ঘরের বাতাস উন্নত করার নির্দেশনায় সংস্থাটি বলে, পরীক্ষাগারে ঘরের গাছ কিছু রাসায়নিকের মাত্রা কমিয়েছে বলে প্রচার রয়েছে, কিন্তু যুক্তিসংগত সংখ্যক ঘরের গাছ বাড়ি ও অফিসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দূষক দূর করে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো নেই। সংস্থাটি আরও বলে, ঘরের গাছে অতিরিক্ত পানি দেওয়া উচিত নয়, কারণ অতিরিক্ত ভেজা মাটিতে এমন অণুজীব জন্মাতে পারে, যা অ্যালার্জিপ্রবণ মানুষের ক্ষতি করতে পারে।
এসব গবেষণা ও নির্দেশনার আলোকে দূষক দূর করার প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটির এই বক্তব্য সমর্থিত হয় না যে ইনডোর গাছ ঘরের বাতাসের মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী রান্নার ধোঁয়া ও তামাকের মতো উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং ভালো বায়ু চলাচলই অনেক বেশি জরুরি।
গাছ ও মানসিক সুস্থতা
কামিংস ও ওয়ারিং যে দিকটির কথা বলেছিলেন, সে বিষয়ে কিছু গবেষণা আছে। জার্নাল অব ফিজিওলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজিতে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত এম. এস. লি ও সহকর্মীদের একটি দৈবচয়িত ক্রসওভার গবেষণায় ২৪ জন তরুণকে দুই অবস্থায় তুলনা করা হয়: একবার তাঁরা একটি ইনডোর গাছ এক টব থেকে আরেক টবে স্থানান্তর করেন, আরেকবার কম্পিউটারে একটি কাজ করেন। গাছ স্থানান্তরের পর অংশগ্রহণকারীরা কম্পিউটারের কাজের তুলনায় নিজেদের বেশি স্বস্তিপূর্ণ, প্রশান্ত ও স্বাভাবিক বোধ করার কথা জানান।
হৃৎস্পন্দনের পরিবর্তনশীলতা দিয়ে মাপা তাঁদের সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা কম্পিউটারের কাজের সময় ক্রমে বাড়ে, কিন্তু গাছ স্থানান্তরের কাজ শেষে কমে যায়; গাছ নিয়ে কাজ করার পর তাঁদের ডায়াস্টোলিক রক্তচাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, মানসিক কাজের তুলনায় ইনডোর গাছের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া শারীরিক ও মানসিক চাপ কমাতে পারে। গবেষণাটি ২৪ জন তরুণ পুরুষের ওপর করা, এবং এতে গাছের যত্ন নেওয়ার কাজটি পরীক্ষা করা হয়েছে, ঘরের বাতাসে গাছের প্রভাব নয়।
ইনডোর গাছের যত্ন যেভাবে
দোকান থেকে বাড়িতে আনা গাছ বাঁচিয়ে রাখতে উপযুক্ত জায়গা ও যত্ন দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশন আলো, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পানিকে গাছের বৃদ্ধির মূল উপাদান বলে এবং ঘরের পরিবেশের সঙ্গে গাছের চাহিদা মিলিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। বেশির ভাগ গাছ উজ্জ্বল আলোয় সবচেয়ে ভালো থাকে, যদিও কিছু গাছ মাঝারি বা কম আলো সহ্য করতে পারে। বাইরের সূর্যালোক প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ফুট-ক্যান্ডল পর্যন্ত হতে পারে, অথচ ঘরের ভেতরের আলো অনেক দুর্বল।
উত্তর গোলার্ধের জন্য লেখা এক্সটেনশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কম আলো, প্রায় ৭৫ ফুট-ক্যান্ডল, পাওয়া যায় উত্তরমুখী জানালা থেকে কয়েক ফুট দূরে, পূর্ব বা পশ্চিমমুখী জানালা থেকে ৩ থেকে ১০ ফুট দূরে, অথবা দক্ষিণমুখী জানালা থেকে ১৫ থেকে ২০ ফুট দূরে। মাঝারি আলো, প্রায় ১৫০ ফুট-ক্যান্ডল, মেলে উত্তরমুখী জানালার ঠিক সামনে, পূর্ব বা পশ্চিমমুখী জানালা থেকে কয়েক ফুট দূরে, অথবা দক্ষিণমুখী জানালা থেকে ৩ থেকে ১০ ফুট দূরে। উজ্জ্বল আলো, প্রায় ৩০০ ফুট-ক্যান্ডল, পূর্ব বা পশ্চিমমুখী জানালার ঠিক সামনে বা দক্ষিণমুখী জানালা থেকে ৫ ফুটের মধ্যে, আর সরাসরি আলো, প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট-ক্যান্ডল, দক্ষিণমুখী জানালার ঠিক সামনে।
কম আলোয় চলতে পারে এমন গাছের তালিকায় এক্সটেনশন রেখেছে চাইনিজ এভারগ্রিন, পারলার পাম, বোস্টন ফার্ন, হার্ট-লিফ ফিলোডেনড্রন, স্নেক প্ল্যান্ট ও পিস লিলি। অন্তত মাঝারি আলো লাগে এমন গাছের মধ্যে আছে পোথোস (মানিপ্ল্যান্ট নামে পরিচিত), স্পাইডার প্ল্যান্ট, ড্রাসিনা, রাবার প্ল্যান্ট, ডাম্ব কেন, প্রেয়ার প্ল্যান্ট, পেপেরোমিয়া ও অ্যান্থুরিয়াম। আলো কম হলে কৃত্রিম আলো দিয়ে দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পূরণ করাই যথেষ্ট, তবে ১৬ ঘণ্টার বেশি নয়, কারণ গাছের বিশ্রামের সময় দরকার।
পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে এক্সটেনশনের পরামর্শ হলো, আঙুল দিয়ে মাটির দুই ইঞ্চি গভীর পর্যন্ত পরীক্ষা করা এবং শুকনো হলে পানি দেওয়া; দিন-তারিখ মেনে নয়, গাছের প্রয়োজন বুঝে। গাছ নেতিয়ে পড়ার মানে পানির অভাব হতে পারে, আবার অতিরিক্ত পানির লক্ষণও হতে পারে। পানি দেওয়া নিয়ে এর নির্দেশনার মধ্যে আছে:
- ওপর থেকে পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে দিন, বাড়তি পানি নিচের প্লেটে ঝরে যেতে দিন, তারপর প্লেট খালি করে ফেলুন; টব কখনো পানিতে দাঁড় করিয়ে রাখবেন না।
- বিকল্প হিসেবে টবটি কয়েক ইঞ্চি পানিতে বসিয়ে রাখুন এবং মাটির ওপরের স্তর পর্যন্ত আর্দ্রতা উঠে এলে তুলে নিন।
- ঠান্ডা নয়, ঘরের তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন এবং সফটনার দিয়ে নরম করা পানি এড়িয়ে চলুন; পানি অন্তত ২৪ ঘণ্টা রেখে দিলে ক্লোরিন ও ফ্লোরাইড উড়ে যায়।
- চকচকে প্রলেপ ছাড়া মাটির টবে প্লাস্টিকের টবের চেয়ে বেশি ঘন ঘন পানি লাগে, কারণ মাটির টব ছিদ্রযুক্ত।
কিছু গাছ প্রতিবছর নতুন টবে বদলাতে হয়, আবার কিছু গাছ বহু বছর একই টবে থাকতে পারে। এক্সটেনশনের তালিকায় টব বদলের লক্ষণগুলো হলো: পানি বের হওয়ার ছিদ্র দিয়ে শিকড় বেরিয়ে আসা বা মাটির ওপরে দেখা দেওয়া, মাটির বেশির ভাগ শিকড়ে ভরে যাওয়া, নতুন পাতা স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হওয়া এবং স্বাভাবিক পানি দেওয়ার মাঝখানে গাছ নেতিয়ে পড়া। গাছ যখন সক্রিয়ভাবে বাড়ছে, তখনই টব বদল করা ভালো। গাছটি আলতো করে তুলে আনতে হয়, পেঁচিয়ে যাওয়া শিকড় কেটে বা খুলে দিতে হয়, মাটির ওপর সাদা লবণের আস্তর থাকলে তা চেঁছে ফেলতে হয়, এরপর আগের গভীরতায় নতুন পটিং মিশ্রণে বসিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানি দিতে হয়।
সমস্যা দেখা দিলে কারণ খোঁজার জন্যও এক্সটেনশন একটি তালিকা দেয়। পাতা ঝরে যাওয়ার কারণ হতে পারে তাপমাত্রা বা আলোর হঠাৎ পরিবর্তন, টব বদলের ধাক্কা, অতিরিক্ত পানি বা আলোর অভাব; পাতার ডগা বাদামি হওয়ার কারণ অনিয়মিত পানি, ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা, পোকার আক্রমণ বা অতিরিক্ত সার; পাতার স্বাভাবিক রং হারানোর কারণ অতিরিক্ত পানি, সারের ঘাটতি, পোকার আক্রমণ বা অনুপযুক্ত আলো; আর পাতায় দাগের কারণ অতিরিক্ত পানি, সরাসরি রোদে পুড়ে যাওয়া বা রোগ।

কিছু প্রচলিত ঘরের গাছ খেলে ক্ষতি হয়
বহুল বিক্রি হওয়া কয়েকটি ঘরের গাছ শিশু বা বড় কেউ চিবিয়ে খেলে ক্ষতি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস ডিফেনবাকিয়া বা ডাম্ব কেনকে বড় ও রঙিন পাতার একটি ঘরের গাছ হিসেবে বর্ণনা করে, যার বিষাক্ত উপাদান অক্সালিক অ্যাসিড ও অ্যাসপারাজিন। এ গাছ খেলে বা এর পাতা, কাণ্ড বা শিকড়ের সংস্পর্শে এলে মুখ ও গলায় ফোসকা, জ্বালাপোড়া ও ফোলাভাব হতে পারে, যা স্বাভাবিকভাবে কথা বলা ও গিলতে বাধা দিতে পারে; সঙ্গে লালা বেড়ে যাওয়া, গলা ভেঙে যাওয়া, বমিভাব, বমি ও ডায়রিয়া হতে পারে। চোখে লাগলে চোখ লাল হওয়া, ব্যথা, ফোলা এবং কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে।
মেডলাইনপ্লাস জানায়, ফিলোডেনড্রনে আছে ক্যালসিয়াম অক্সালেট এবং এটিও একই ধরনের উপসর্গ তৈরি করে। দুই গাছের ক্ষেত্রেই এর পরামর্শ হলো ঠান্ডা ভেজা কাপড় দিয়ে মুখের ভেতর মুছে দেওয়া, চোখ বা ত্বকে লাগলে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা এবং চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া; বিষক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ সেবা বা চিকিৎসক না বললে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বমি করানো যাবে না। মুখে হালকা সংস্পর্শ হলে উপসর্গ সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়, তবে বিরল ক্ষেত্রে ফোলাভাব এত বেশি হতে পারে যে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে যায়। বিষক্রিয়ার সন্দেহ হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান, সম্ভব হলে গাছটিও সঙ্গে নিন।

ছবি: Karl Thomas Moore / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, আল জাজিরা, ঢাকা ট্রিবিউন, আইকিউএয়ার (২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদন, সংবাদমাধ্যমের বরাতে), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ), নাসা টেকনিক্যাল রিপোর্টস সার্ভার, জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি, জার্নাল অব ফিজিওলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশন, মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন)




মন্তব্য
(০)