রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস-চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন ২০২৫ সালের ২০ মে, মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন, আম রপ্তানি বাড়াতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০টি হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানো হবে। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে তিনি জেলার রপ্তানিযোগ্য কয়েকটি আমবাগান ঘুরে দেখেন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত স্থানীয় রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
সভায় তিনি আরও জানান, ম্যাংগো বোর্ড গঠন, আম নীতিমালা তৈরি, আম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চাষিদের মধ্যে কম দামে সোলার প্যানেল বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগে বিদেশে আম রপ্তানি বাড়বে।

চীনের বাজার ও রপ্তানির লক্ষ্য
মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে শুধু চীনের বাজারে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন আম রপ্তানি হতে যাচ্ছে। এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যে ৫ লাখ টন আম বিদেশে রপ্তানি করা যায়।’ তিনি জানান, পরের মাসে বিদেশি কূটনীতিক ও আমদানিকারকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে, যাতে আম রপ্তানি করে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়।
একই দিনে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ইপিবির বরাতে জানায়, চীনা সরকারের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে সে দেশে আম রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চীনের সাধারণ শুল্ক প্রশাসন (জিএসিসি) ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশের তাজা আম আমদানির অনুমোদন ঘোষণা করে। মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা প্রডিউস রিপোর্টের তথ্যে, শর্ত অনুযায়ী বাগান, প্যাকিং হাউস, হিমাগার ও তাপ শোধনের স্থাপনা কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিবন্ধনের পর জিএসিসির অনুমোদন পেতে হবে। পেয়ারার মাছি ও পিচের মাছিসহ কয়েকটি কোয়ারেন্টাইন বালাই তালিকায় রাখা হয়।
তুলনার জন্য, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের এপ্রিলে জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১ হাজার ৭৫৭ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২১ টন আম রপ্তানি করেছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন বছরে প্রায় ৪ লাখ টন আম আমদানি করে।

হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট কেন দরকার
হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট হলো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার গরম পানিতে নির্দিষ্ট সময় আম ডুবিয়ে রাখা, যাতে ফলের ভেতরের পোকা, বিশেষ করে ফলের মাছির ডিম ও কীড়া নষ্ট হয়। চীনের শর্তে রপ্তানির আগে তাপ শোধন বাধ্যতামূলক: গরম পানিতে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুরো ডুবিয়ে ১৫ মিনিট, অথবা গরম বাষ্পে ফলের ভেতরের তাপমাত্রা ৪৬.৫ ডিগ্রিতে তুলে ১০ মিনিট।
এ সুবিধার ঘাটতি পুরোনো। ২০২২ সালের জুনে বাসসের এক প্রতিবেদনে রাজশাহীর বাঘার এক আমচাষি বলেছিলেন, পোকা থেকে রক্ষায় রপ্তানির জন্য হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের আমে সংগ্রহের পর এই শোধন করা হয় না। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এপ্রিলের প্রতিবেদনে এক রপ্তানিকারক জানান, প্যাকিং হাউস ঢাকার শ্যামপুরে, অথচ চালান যায় বিমানবন্দর দিয়ে।
সভায় উঠে আসা দাবি
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত ইপিবির বিবৃতি অনুযায়ী, সভায় অংশীজনেরা আমের স্থায়িত্বকাল বাড়ানো, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সুবিধা, রাসায়নিক নিরাপত্তা, উন্নত প্যাকেজিং, ফলের মাছি দমন ও উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) মেনে চলার প্রয়োজনের কথা বলেন। চেম্বার চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষিভিত্তিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, জাতীয় আম নীতিমালা, বাগানে সোলার প্যানেল, সহজ ঋণ, মাঠপর্যায়ে কোয়ারেন্টাইন সুবিধা এবং রাজশাহী থেকে সরাসরি বিমানে আম পাঠানোর দাবি জানায়।
ইপিবির তথ্যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে ২৫ লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয় এবং আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাজ্য, হংকং, কানাডা, বাহরাইন, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও সুইডেনে আম রপ্তানি হয়, যার মধ্যে যুক্তরাজ্য শীর্ষে। রপ্তানি হওয়া জাতের মধ্যে আছে ল্যাংড়া, ফজলি, হিমসাগর, খিরসাপাত ও আশ্বিনা।
দেশের সবচেয়ে উত্তর-পশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আয়তন ১ হাজার ৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার। আমই এ জেলার অর্থনীতির মূল ভরসা, তাই একে দেশের আমের রাজধানী বলা হয়। শিবগঞ্জ, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আম হয়।
জেলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদের সভাপতিত্বে সভায় ইপিবির পরিচালক (পণ্য) মো. শাহজালাল ও চেম্বারের সহসভাপতি আখতারুল ইসলাম রিমন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বাসস, প্রডিউস রিপোর্ট, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)